কণিকা নামের সেই বাড়িটি ইতিহাসের কথা কয়

বাড়িটির নাম ‘কণিকা’। পুরনো এলিফ্যান্ট রোডের ৩৫৫ নম্বর বাড়ি। সেই বাড়ি যার প্রতিটি কোণায় কোণায় ইট-কাঠ, পলেস্তরায়, দরোজা, জানালা, ঝুল বারান্দার গ্রিলে আঁকা হয়ে আছে একাত্তরের দিনগুলো। এখনো হয়তো মা কান পেতে আছেন ওই বুঝি বাড়িতে গাড়ি ঢোকার শব্দ শোনা যায়, ওই বুঝি গাড়িটি থামলো পোর্চে। মা ছুটে যাবেন ঝুল বারান্দায়। উঁকি মেরে দেখবেন খোকা ফিরছে ঘরে ফিরছে। মায়ের চোখের তারায় ভোরের আলোর ঝিলিক। মা তাঁর সন্তানকে কোরবান করে দিয়েছিলেন দেশের জন্যে সেই ১৯৭১ এর মার্চের উত্তাল সময়ে। সন্তান তাঁর বুক ফুলিয়ে চলে গেল যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে মেলাঘরে। লেখা হতে থাকলো মায়ের ডায়েরি-একাত্তরের দিনগুলো। সেই মায়ের নাম জাহানারা ইমাম। তিনি বাংলাদেশের মা, শহীদ জননী। সেই সন্তান শাফি ইমাম রুমী। বাংলাদেশের বীর। ট্রেনিং শেষে বীর রুমী ফিরে এসেছিলেন মায়ের কোলে তবে ঘুমাতে নয়, বরং মায়ের ঘুম যারা হরণ করেছিলো তাদের চরম শাস্তি দিতে। প্রথম গেরিলা অপারেশন ক্র্যাক প্লাটুনে অংশ নিতে। মা দৌড়ে গিয়েছিলেন ছেলের কাছে, ছেলে তখন যোদ্ধা। ক্র্যাক প্লাটুন অপারেশন সফল হলেও এক সময় ধরা পড়ে গেলেন পাকিস্তানি জান্তাদের হাতে শাফি ইমাম রুমীসহ পুরো একটা গেরিলা দল। ফিরে আসেননি কেউ রুমীও আর ফিরে আসেননি কণিকা নামের এই বাড়িটিতে। যেখানে বসে মা ক্ষণ গুনেছিলেন ‘খোকা তার কখন আসে কখন আসে, ক্লান্ত খোকা।’ মায়ের চোখের জল শুকিয়ে সেখানে জন্ম নিয়েছিলো  খরতাপ। পোড়াতে চেয়েছিল দেশ শত্রুদের। কণ্ঠকে পরিণত করেছিল বজ্রে। গড়ে উঠেছিল ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। দেশজুড়ে আওয়াজ উঠেছিল, ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’। 

এই বাড়িটি সেই থেকে একজন বীর শহীদ এবং একজন শহীদ মায়ের হাহাকার বুকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একবুক স্মৃতি নিয়ে। যার কোণগুলো কথা কয় ফিসফিসিয়ে, কান পাতলে আজো শোনা যায় বিছানায় শুয়ে রুমী মাকে বলছে, মেলাঘরে ট্রেনিং নেবার সময়ের কথা। মা এই বাড়ির কোথাও বসে পড়ছে মেলাঘর থেকে ছেলের পাঠানো চিঠি আর গর্বে ফুলে উঠছে মায়ের বুক।  


কণিকা নামের সেই বাড়িটি আজ জাদুঘর। 

বাড়ির ভেতরে ঢুকেই বাঁ দিকে চোখে পড়বে এক আলমারি, যাতে ডিনার সেট, চায়ের সরঞ্জাম সাজানো। যেন এসব দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। এরপর তিন প্রজন্মের তিনজনের ছবি। অর্থাৎ দাদা, বাবা ও নাতি। তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু সালের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে, দাদার মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে। বাবার মৃত্যু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়টিতে আর রুমীর ছবির নীচে শুধু জন্মের বছরটাই লেখা রয়েছে। কারণ, একাত্তরে তাকে পাকিস্তানিবাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কবে, কোথায় কখন তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, সেটা জানা যায়নি এখনো।

৩৫৫ নম্বর কণিকা বাড়িটির নিবির নিভৃত বর্ণনা আমরা পাই জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলো’ বইটিতে। যা কিনা একটি ডায়েরি। শহীদ জননী এটি লিখতে শুরু করেছিলেন যুদ্ধকালীন সময়ে এই বাড়িতে বসে। সেই ডায়েরি খুলে দিয়েছে ইতিহাসের ফটক।  এই বাড়ি জুড়ে এখন ছড়িয়ে আছে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও তার আদরের সন্তান শহীদ শাফি ইমাম রুমীর হাতের স্পর্শ, পায়ের চিহ্ন, তাঁদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র।  এই বাড়ি ঘিরে তাঁদের স্মৃতি রক্ষায় জাহানারা ইমামের কনিষ্ঠ সন্তান এবং শহীদ রুমীর ছোট ভাই সাইফ ইমাম জামীর উদ্যোগে ২০০৭ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর’। জাহানারা ইমামের কনিষ্ঠ সন্তান সাইফ ইমাম জামী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও তার পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণ করতেই এক সময় এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হলেও এখানে প্রদর্শিত আলোকচিত্র এবং প্রামাণ্য-দলিলপত্র সন্তানের জন্য এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদেরই প্রতিচ্ছবি। যা প্রতিফলিত করছে একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সূর্যালোকের মতো এই মহৎ নারীর অবস্থান। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অনুধাবনে সহায়তা করবে।

এই বাড়ির একটি বড় হল রুম ও অফিস রুমের সমন্বয়ে স্বল্প পরিসরে পরিপাটি করে গড়ে তোলা হয়েছে জাহানারা ইমাম জাদুঘর। ইমাম পরিবারের নানা স্মৃতি চিহ্ন ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র সর্ব-সাধারণের প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। জাদুঘরের এক দেয়ালে কিশোরী বয়স থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত শহীদ জাহানারা ইমামের মুখাবয়বের পরিবর্তিত বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে। শৈল্পিক মনের অধিকারী শহীদ জননীর সাহিত্য সম্ভারেরও পরিচয় পাওয়া যাবে এই জাদুঘরে।  

জাহানারা ইমামের লেখা বইয়ের আলমারি দেখার পাশাপাশি মিউজিয়াম থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন বই কেনারও সুযোগ আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য থাকা শহীদ জননীর ছেলে শাফি ইমাম রুমীর স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য অবদানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে এই জাদুঘরে। শহীদ জননী ও রুমীর আলোক চিত্রের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র, শৌখিন জিনিস, প্রাপ্ত বিভিন্ন সম্মাননা, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নথি পত্র, গণ-আন্দোলনের বিষয়ে নানা ছবি, পোস্টার, বিভিন্ন বই, জাহানারা ইমাম ও রুমীর লেখা বিভিন্ন চিঠি, ১৯৭১ সাল ও তাঁর পরবর্তী বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রদর্শিত করে রাখা আছে এখানে। এছাড়াও শহীদ রুমীর নিজের মাকে নিয়ে করা বিভিন্ন উক্তি ও তাঁর বন্ধুদের রুমীকে উদ্দেশ্যে করে লেখা স্মৃতিচারণাও স্থান পেয়েছে এই জাদুঘরে। এখানেই ব্যক্তি জাহানারা ইমাম, শহীদজননী এবং ইতিহাস মিলেমিশে আছে কণিকায়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh