হালের খাতা হালখাতা

অব্যয় আত্মদীপ বয়স পাঁচ বছর। খাঁটি বাঙালি ঘরের সন্তান। সেদিন অমরাবতীর সঙ্গে খেলতে খেলতে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসল- হালখাতা কি বাবা? আমরা সবাই অবাক। কখন কোথায় শব্দটি শুনেছে কে জানে; কিন্তু জিজ্ঞাসু মনে সেই শব্দটি সে বয়ে বেড়াচ্ছে। হয়ত অনেক কিছুর সঙ্গে মেলাতে চেয়েছে কিংবা মনে মনে খুঁজেছে পায়নি। হালখাতা শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যারা সেখানে ছিলাম মনে হলো অব্যয় আত্মদীপ আর অমরাবতী ছাড়া সবাই পলকে ফিরে গেলো ফেলে আসা সেই শৈশবে। বাংলা বছরের প্রথম দিন দোকানগুলো সেজে উঠেছে রঙ, বেরঙের কাগজের মালায়, ফুলে। হিন্দু দোকানগুলো সাজছে কলাগাছে, ঘটে। বাড়িতে বাড়িতে তখন শিশুরা প্রস্তুত হচ্ছে সন্ধ্যায় বাবা বা বড়দের সঙ্গে হালখাতা করতে যাবে। দোকানি একটা বাংলা ক্যালেন্ডার দেবে, ক্যালেন্ডার না দিলেও মিষ্টির প্যাকেট কিংবা বসিয়ে নিমকি আর মিষ্টি খাওয়াবেই। হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো চোখের তারায় জ্বলজ্বল করে সবার। দীর্ঘশ্বাসে ভেসে আসে ইতিহাস যেখানে স্যাঁতসেঁতে স্মৃতিতে দাঁড়িয়ে আছে হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করার দিন ‘হালখাতা’। 

পয়লা বৈশাখের দ্বিতীয় বৃহৎ অনুষ্ঠান ছিল ‘হালখাতা’। জমিদারি আমলে খাজনার হিসাব হালনাগাদ করা হতো, পয়লা বৈশাখে নবাব ও জমিদারেরা ‘পুণ্যাহ’ উৎসব পালন করতেন এইদিনে। জমিদারি আমল শেষে এই উৎসবটি হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীদের উৎসব, গ্রাম-নগরের ব্যবসায়ীরা পুরনো খাতা বদলে পহেলা বৈশাখ বা অক্ষয় তৃতীয়ায় খুলতেন হিসাবের নতুন খাতা। সেই সময় কৃষকরা ফসল বিক্রি করলেই হাতে নগদ পয়সা পেত। পাট ছিল নগদ পয়সার উৎস। ফসলের মৌসুমি ফসল বিক্রির টাকা হাতে না এলে কৃষকসহ প্রায় কেউই নগদ টাকার মুখ খুব একটা দেখতে পেতো না। তাই সারাবছর বাকিতে জিনিসপত্র না কিনে কারো কোনো উপায় ছিল না। পয়লা বৈশাখের হালখাতা অনুষ্ঠানে তাই প্রায় সবাই দোকানিদের বাকির টাকা মিটিয়ে দিতেন। অনেকে আংশিক পরিশোধ করেও নতুন বছরের খাতা খুলতেন। দোকানি বাকিতে বিক্রি করতেন। সবাই সবাইকে চিনতেন বলে বাকি দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধা থাকত না। টাকা কেউ মেরে দেবে না বলেই বিশ্বাস করতেন তারা। হালখাতার প্রচলন ঠিক কবে থেকে শুরু হয় তা নিয়ে দু’ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। 

কেউ বলেন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের আমল থেকে শুরু, আবার কেউ বলেন, মুঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকে। শামসুজ্জামান খানের প্রবন্ধ, মোবারক হোসেনের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে উৎসব, নববর্ষ’, সাদ উর রহমানের ‘উৎসবের ঢাকা’ বই এবং ঢাকা কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে জানা যায় হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে মোগল আমলে খাজনা আদায় করা হতো, কিন্তু হিজরি বর্ষপঞ্জি চন্দ্র মাসের হিসাবে চলার কারণে এখানে কৃষি খাজনা আদায়ে অসুবিধা হতো। খাজনা আদায়ের শৃঙ্খলা আনতে ও প্রজাদের অনুরোধে মোগল সম্রাট আকবর বিখ্যাত জ্যোতিষবিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে দিয়ে বাংলা সালের সংস্কার করেন। সিরাজী হিন্দু সৌর ও হিজরি পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম নির্ধারণ করেন। বাংলা সালের ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পন্ডিত মনে করেন ১৫৫৬ সাল বা ৯৯২ হিজরিতে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন। 

আধুনিক গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, আকবর সর্বভারতীয় যে ইলাহী সন প্রবর্তন করেছিলেন তার ভিত্তিতেই বাংলায় আকবরের কোনো প্রতিনিধি বা মুসলমান সুলতান বা নবাব বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সে জন্য একে ‘সন’ বা ‘সাল’ বলা হয়। ‘সন’ কথাটি আরবি, আর ‘সাল’ হলো ফারসি। প্রথমে এ সালের নাম রাখা হয়েছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ হিসেবে পরিচিতি পায়। এরপর চৈত্র মাসের শেষ দিনে (সংক্রান্তি) জমিদারি সেরেস্তারা প্রজাদের কাছ থেকে কৃষি ও রাজস্ব কর বা খাজনা আদায় করতেন। এ সময় প্রত্যেক চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাসুল বা কর পরিশোধ করা হতো। এর পরের দিন পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা নিজেদের অঞ্চলের প্রজা বা অধিবাসীদের মিষ্টি, মিষ্টান্ন, পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। 

একই ধারাবাহিকতায় ১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খান চিশতি তাঁর বাসভবনের সামনে প্রজাদের শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ ও উৎসবের আয়োজন করতেন। খাজনা আদায় ও হিসাব নিকাশের পাশাপাশি চলত মেলা, গান বাজনা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। পরবর্তী সময় ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস, পাটুয়াটুলীর সামনে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। তবে দ্বিমত যাই থাক, হালখাতা খাজনা আদায় থেকে শুরু হয়েছে। অব্যয় আত্মদীপ কি বুঝল কতটা বুঝল কে জানে? সবাই যখন ভাবনায় বুদ এক দৌড়ে পাশের ঘরে ছুটে গেলো ফিরে এসে বলল- এখন হালখাতা কেন হয় না?

অতীতের মতো সারাদেশে একযোগে এ উৎসব পালিত না হলেও কিছু কিছু জায়গায় হালখাতার প্রচলন এখনো আছে। বড় পরিসরে না হলেও ছোট পরিসরে কিছু কিছু ব্যবসায়ী টিকিয়ে রেখেছেন এ হালখাতা। বর্তমানে আমাদের দেশে হিসাব রাখার জন্য ব্যবহৃত লাল মোড়কের বিশেষ খাতার পরিবর্তে এখন হিসাব সংরক্ষণ করা হয় কম্পিউটারে। তবু হালখাতার হাল আগের মতো না থাকলেও চিরায়ত এ অনুষ্ঠানটি কিন্তু হারিয়ে যায়নি, এখনও সার্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ বাংলা নববর্ষের অন্যতম উপাদান। হালখাতার এই আতিথেয়তায় এক অন্যরকম তৃপ্তি; অন্য রকম স্বাদ, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির প্রতীক। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জীবনে হালখাতা উৎসব বেঁচে থাকুক।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh