ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : নারী প্রগতি ও বাংলাভাষা সংস্কারের পথিকৃৎ

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধাংশে এই উপমহাদেশ আলোকিত করে নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবির্ভূত হয়েছিলেন বেশ কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ। বাংলার সেই রেনেসাঁসের যুগে- রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ সংস্কার, নারী প্রগতিসহ সকল উন্নয়নমূলক কাজে এই সাহসী, প্রখঢ় বুদ্ধিসম্পন্ন ও মৌলিক চিন্তার মানুষরা মাত্র একশ বছরে এই ভূখণ্ডকে মিলিতভাবে যতখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা আর অন্য কোনো শতাব্দীতে ঘটেছে বলে মনে হয় না। এই সময়টিতে কী ধরনের নারীবান্ধব নীতির সংযোজন ঘটেছিল বা সামাজিক সংস্কারে কী ধারার বৈপ্লবিক কাজ চলছিল, এবং এসব ব্যাপারে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, নারীরা কতখানি এগিয়ে যেতে পেরেছিল, কোন কোন মহল বা শক্তি তাদের সহযোগিতা করেছিল, কারা বাধা দিয়েছিল, তার আভাস পেতে পারি আমরা। পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত অথবা বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে তখন বিশ্লেষণ করা সহজতর হয়ে ওঠে। 

আমরা জানি রাজা রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলার গৌরবোজ্জ্বল এক সময়। বলা চলে আঠারো শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের মধ্যেকার সময়টি- বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের, বিশেষ করে নারীর অবস্থার উন্নয়নের, এক স্বর্ণযুগ ছিল। একে বাংলার নবযুগও বলা চলে। 

এই সময় প্রথম নারীকল্যাণকর যে আইনটি পাস হয়, তা হচ্ছে রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে সতীদাহ প্রথা রহিত আইন (১৮২৯)। মৃত স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারা থেকে রক্ষা পেয়ে নারী যখন তার জীবন ফিরে পেল, তখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অহর্নিশি প্রচেষ্টা ও সুযোগ্য নেতৃত্বে এই নারীদের একটি সম্মানজনক, মানবিক ও স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ সৃষ্টি হলো বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ করে। বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে একে একে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত বলে মেনে নেওয়া হয় (১৮৫৭), বাল্যবিবাহ নিবারণের জন্য আইন পাস হয় (১৮৭১ বয়স ১২-এর কম নয়)। সমাজের আরেক ব্যাধি ‘বহুবিবাহ’ দূর করার জন্য বিদ্যাসাগর বহুরকম চেষ্টা করেন, আইনের সহায়তা কামনা করেন; কিন্তু কার্যত বাংলায় ‘বহুবিবাহ’ রোধের আইনি অনুমতি মিললেও (১৮৭১) ভারতের অন্যান্য জায়গায় তখন পর্যন্ত এই প্রথা রহিতের ছাড়পত্র মেলে না। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে আইন করে তা বন্ধ করা না গেলেও সামাজিক আন্দোলন, সাহিত্য আর নাটকের (বিশেষত প্রহসন) মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ ও মূল্যবোধে বহুবিবাহের গ্রহণযোগ্যতা এতটাই কমিয়ে দেওয়া হয় যে এই অসুস্থ প্রক্রিয়াটি আইনি সাহায্য ছাড়াই সমাজ থেকে উচ্ছেদ হতে শুরু করে। এ ছাড়া, কৌলিন্য কিংবা বর্ণ বা জাতিভেদের মতো কুসংস্কারকে পুনঃপুনঃ আঘাতে নির্মূল করে দিয়ে মানবতার জয়গান গাইতে প্রস্তুত হয়েছিলেন তখনকার কয়েকজন প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারক। বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম। 

ওই সময়ে একটু একটু করে দানা বাঁধছিল নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংকল্প। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের প্রতি অদম্য আকাক্সক্ষা এবং সেই সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার বাসনা দিনে দিনে বেড়ে চলছিল নারীর। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে ঊনবিংশ শতকে ও বিংশ শতকের প্রথম অর্ধাংশে যে নারীবাদী আন্দোলন এই ভূখণ্ডে হয়েছিল, তা মূলত প্রগতিশীল, মুক্তমনা পুরুষের হাত ধরেই এগিয়েছিল। এক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের রয়েছে অসমান্য অবদান।

বহুমাত্রিক গুণে গুণান্বিত বিদ্যাসাগরের অবদানকে মোটা দাগে চার ভাগে ভাগ করা যায়।

সমাজ সংস্কারক
এক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে আইনসিদ্ধ বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ, কৌলিণ্যপ্রথা দূর করা ইত্যাদি বিষয়গুলো।

আমরা সকলেই অবগত যে ১৮১৮ সালে রামমোহন কলকাতায় সহমরণ এবং সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্য জনমত তৈরি করেন এবং ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিং কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই প্রথা বিলোপ করে আইন পাস করেন। বিদ্যাসাগর ১৮৫০-৫৫ সালে বিধবা বিবাহের সপক্ষে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর প্র্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে ভারতবর্ষে বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন পাস হয়। বিধবা বিবাহের সামাজিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ১৮৬৭ সাল নাগাদ ৬০টি বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন। বাল্যবৈধব্যের অন্যতম প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ প্রধানত তাঁর-ই চেষ্টায় রোধ হয় ১৮৭১ সালে। হুমায়ূন আজাদ ঠিক-ই বলেছিলেন, রামমোহন বাংলার মেয়েদের জীবন দান করেছিলেন, কিন্তু তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিদ্যাসাগর। সমাজ থেকে আরও দুটি কুপ্রথা বিদায় করতে সচেষ্ট ছিলেন বিদ্যাসাগর যা দূর করতে বেশ কিছু সময় নিয়েছিল। তার একটি বহুবিবাহ, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিল আরেকটি কুপ্রথা, আর সেটি হলো বৈবাহিক ব্যাপারে কুলীনপ্রথা পালন। 

সতীদাহ প্রথা নিবারণের ফলে বহু অল্পবয়ষ্ক নারী বিধবা হয়। তাদের অসহায়ত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং উঠতি বয়সের স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদার কারণে পরবর্তীকালে কেউ কেউ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করে, অনেকে সংসারে বা বাড়ির বাইরে অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়। গুপ্ত ভ্রূণ হত্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রামমোহন রায়ের মতোই টের পেলেন অকাট্য যুক্তির জোরে নয়, শাস্ত্রীয় কুসংস্কার দিয়েই এদেশের মানুষের অন্ধ বিশ্বাস ও কর্মধারা পরিচালিত হয়। ফলে সতীদাহ নিবারণের জন্য রামমোহন যেমন শাস্ত্র থেকেই মাল-মসলা জোগাড় করে শাস্ত্রকেই ঘায়েল করেছিলেন, বিদ্যাসাগর-ও এক-ই পথ বেছে নিলেন। শাস্ত্র দিয়েই শাস্ত্রের সংস্কারকে প্রতিহত করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মনোসংযোগ করেন বিভিন্ন ধরনের শাস্ত্র অধ্যয়ন করার জন্য। সহমরণের বদলে ব্রহ্মাচার্য্য পালনের মধ্য দিয়ে বিধবা নারী যে জীবন ধারণ করে, বিদ্যাসাগর তাকে স্বাভাবিক জীবনের পরিবর্তে মৃতসম জীবন বলে অবহিত করেন। অথচ তিনি নারীকে দিতে চেয়েছিলেন একটি পরিপূর্ণ, উপভোগ্য জীবন। নারীর শরীরকে তিনি নারীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে পরিতৃপ্ত রাখার অধিকার নারীকেই দিতে চেয়েছিলেন বিধবা বিবাহের মাধ্যমে। সেই হিসেবে বিদ্যাসাগর প্রকৃত-ই প্রগতিশীল ও আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন একজন নারীবান্ধব মানুষ বলে নিজেকে প্রমাণ করেন। 

বিধবাদের, বিশেষ করে বাল্য বিধবাদের, সমস্যার সমাধান এনেছিলেন বিদ্যাসাগর বহু শাস্ত্র ঘেঁটে। অবশেষে বিদ্যাসাগর আবিষ্কার করেছিলেন পরাশরের বিধান। এই বিধানে স্বামী মারা গেলে বিধবাদের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকে; পুনঃবিবাহ, ব্রহ্মচারিত্ব, স্বামী সহগমন বা সতীদাহ। সতীদাহ যেহেতু তখন আইন বহির্ভূত হয়ে গেছে রামমোহনের নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলে, তিনি বিধবাদের ওপর রামমোহনের মতো ব্রহ্মাচারীর জীবন চাপিয়ে দেন না। তিনি রামমোহনের মতো কেবল প্রাণ নয়, রক্তমাংসে গড়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মানুষের মতো জীবন দিতে চেয়েছেন বিধবাদের। ফলে বহু কষ্টে বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়ে এইসব বিধবা মেয়েদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ খুলে দেন তিনি। আর সেটা করলেন তিনি যুক্তি বা আইনের ভয় দেখিয়ে নয়। ধর্মীয় শাস্ত্র ঘেঁটেই প্রমাণ করলেন যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। সেই সময়ে অল্প বয়সে যারা বিধবা হতো, তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর নানারকম অত্যাচার চলত। সেই সঙ্গে আরও বহুভাবে অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল সমাজে। কখনো বাইরের চাপে, কখনো নিজের প্রাকৃতিক চাহিদার কারণে অল্পবয়সী বিধবাদের মধ্যে গোপনে ভ্রূণহত্যা ও পতিতাবৃত্তিগ্রহণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে ‘বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয় ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই। 

বাংলা ভাষার সংস্কার ও আধুনিকায়ন
বাংলাকে সহজ, সরল, প্রাঞ্জল, শ্রুতিমধুর এবং সংহত করে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। বাংলা ভাষার সংস্কার ও আধুনিকায়ণের প্রচেষ্টায় বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় যতি বা বিরাম চিহ্ন সংযোজন করেন, যেমন দাড়ি(।), কমা(,), সেমিকোলন(;), প্রশ্নবোধক চিহ্ন(?) ইত্যাদি। এতে করে ভাষা ও বক্তব্য অন্যের বোধগম্য হয়ে ওঠে। বিদ্যাসাগর-ই প্রথম বাংলাকে আধুনিক ও ব্যবহারযোগ্য ভাষা হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর আগে বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল মধ্যযুগীয়। সেই বাংলা দিয়ে ধোপাবাড়িতে পাঠানো পোশাকের তালিকা তৈরি করা যেত। তৈরি করা যেত বাজারের ফর্দ, কাঁচাবাজারের রশিদ; কিন্তু সেই ভাষায় রোমান্টিক প্রেমপত্র বা আধুনিক সাহিত্য রচনা ছিল প্রায় অসম্ভব। বিদ্যাসাগর তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সার্বক্ষণিক চিন্তা ও মননের সংমিশ্রণে এক অসাধ্য সাধন করেন। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে সংস্কৃতের নাগপাশ থেকে, কতগুলো অপ্রয়োজনীয় বর্ণ থেকে মুক্ত করে প্রয়োজনীয়, গতিশীল ও পরিচ্ছন্ন নবতর বর্ণমালা প্রণয়ন করেন। যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলার শব্দ ও পদ সাজিয়ে বাক্য রচনা করে তিনি এই ভাষাকে যুক্তিবহ, সহজতর, শ্রুতিমধুর ও অপরবোধ্য করে তোলেন। অর্থাৎ বাংলা ভাষাকে বিশেষ করে বাংলা গদ্যকে মসৃণ, মধুর ও সকলের বোধগম্য করে পরিবেশনের চেষ্টা করেন বিদ্যাসাগর। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। এ ছাড়া শিশুদের বর্ণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ১৯৫৫ সালে তিনি বর্ণ-পরিচয় লেখেন যা আজ ১৭৫ বছর পরেও সমান জনপ্রিয়। বাংলা গদ্যে বিদ্যাসাগরের অবদান স্বীকার করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন’। বাংলাকে তিনি সাহিত্য গুণসম্পন্ন ও সকল রকম ভাব প্রকাশে সক্ষম একটি আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও সমৃদ্ধ ভাষা হিসাবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন বলেই বাংলা গদ্যের এক নতুন চেহারা দিয়েছিলেন, যার জন্য ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা ভাষার জনক বলা হয়। বিদ্যাসাগরের কয়েকটি বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থের নাম ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা, ‘সীতার বনবাস’ ও ‘ভ্রান্তিবিলাস’। তাঁর বেশির ভাগ লেখায় উদাহরণস্বরূপ তিনি তাঁর প্রস্তাবিত যতি চিহ্ন ব্যবহার করেছিলেন ও সুসংহত বাক্য গঠনের জন্য পদ ও শব্দকে সূবিন্যস্ত করেছিলেন।

শিক্ষার, বিশেষত নারী শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতি
বহুমুখী কর্মকাণ্ডের ভেতর ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর কালীকৃষ্ণ মিত্র, তাঁর সহোদর নবীনকৃষ্ণ মিত্র, প্যারিচাঁদ সরকার, মদনমোহন তর্কালঙ্কার সহকারে বারাসতে জেলা স্কুলসহ একাধিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, বারাসতে বাংলার সর্বপ্রথম এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রমের ও অসাম্প্রদায়িক (মিশনারি, মাদ্রাসা ও টোল বহির্ভূত) চেতনার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের স্বাধীনতা বা ভারত বিভাগের একশত বছর আগে অর্থাৎ ১৮৪৭ সালে। এর আগে উনিশ শতাব্দীর বিশের দশক থেকেই মিশনারিদের গড়া মেয়েদের স্কুল কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে; কিন্তু সেখানে হিন্দু-মুসলমান ঘরের কোনো মেয়েই পড়তে যেত না ভয়ে যে তাদের খ্রিস্টান করে দেবে এই স্কুল। তাদের সন্দেহ সম্পূর্ণ অমূলক ছিল না এজন্য যে, স্কুলের কারিকুলামে যথেষ্ট খ্রিস্টান ধর্মের কথা লিপিবদ্ধ ছিল। দু’চারজন বস্তিবাসী শিশু সেসব স্কুলে যেত, যাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল সেই স্কুলে পরিবেশিত বিনা পয়সার খাবার ও উপহার। ফলে তারা সেসব স্কুল থেকে অচিরেই ঝরে পড়েছে। বারাসতে বালিকাদের জন্য এই উচ্চ বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বিদ্যাসাগর স্বয়ং; কিন্তু স্কুলঘর নির্মাণের আগেই, মানে ১৯৪৬ সালেই, বিস্তর আলাপ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নবীনকৃষ্ণের বাড়ির একটি ঘরে মাত্র তিনটি মেয়ে নিয়ে স্কুল শুরু করে দেন বিদ্যাসাগর। নবীনকৃষ্ণ মিত্রের কন্যা বিদ্যাসাগরের বিশেষ স্নেহের পাত্রী কুন্তিবালাই এই স্কুলের প্রথম ছাত্রী এবং সর্বপ্রথম ক্লাসের তিন ছাত্রীর অন্যতম। ১৯৪৮ সালে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলটিকে সরকারি নথিভুক্ত করতে দরখাস্ত করলে কলকাতা থেকে যে পরিদর্শকদল স্কুল ও তার কার্যক্রম পরিদর্শন ও যাচাই করে দেখতে বারাসত আসেন, তাদের মধ্যে ছিলেন জন ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন। স্কুল পরিদর্শন করে খুব-ই সন্তুষ্ট হন স্কুল পরিদর্শকদল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি নথিভুক্ত হয়ে যায় সেই স্কুল। এরপর কলকাতা গিয়ে মেয়েদের জন্য একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, পরে যা বেথুন স্কুল নামে বিখ্যাত হয়ে যায়। বারাসতের মেয়েদের স্কুলের কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে স্কুল পরিচালনা ও শিক্ষকতার জন্য কলকাতা থেকে বারাসত পায়ে হেঁটে আসতেন বিদ্যাসাগর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেথুন স্কুল (কলেজ) স্থাপনের-ও আগে ১৯৪৬ সালে বারাসতে মেয়েদের জন্য অভিন্ন কারিকুলামের এই হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে সকলের-ই তা চোখে পড়ে। ফলে গোঁড়া হিন্দু সমাজ মিত্র ভ্রাতৃদ্বয়সহ মেয়েদের এই হাইস্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমাজচ্যুত করে দেয়। তারপরে আরও প্রায় পৌনে দুশ’ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে; কিন্তু সেই মেয়েদের স্কুল আজও ‘বারাসত কালীকৃষ্ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’ নামে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে স্বস্থানে-মাথা উঁচু করে। যদিও অধিকাংশ মানুষ-ই জানে না এর জন্মকথা, এর সুদীর্ঘ ইতিহাস, জানে না এটাই এই সমগ্র অঞ্চলের সর্বপ্রথম সর্বসাধারনের জন্য উন্মুক্ত উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়।

শিক্ষাবিদের ভূমিকায় বিদ্যাসাগর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও নিবেদিত-প্রাণ ছিলেন। বাংলা ভাষার প্রসার ও উন্নয়নে এবং অন্যান্য ভাষা, বিশেষ করে ইংরেজি ও সংস্কৃত থেকে মণিমুক্তো আহরণ করে অর্থাৎ বিদেশি ভাষায় রচিত মনোগ্রাহী পাঠ্যবস্তু বাংলায় অনুবাদ করে বাংলার ছেমেয়েদের নতুন কিছু উপহার দিতে তিনি এতটাই সময় ব্যয় করেছেন, যে তাঁর নিজের সৃজনশীল ও মৌলিক লেখার জন্য ততটা সময় দিতে পারেননি। এটাই ছিল বিদ্যাসাগরের বৈশিষ্ট ও অভিনবত্ব। নিজের খ্যাতি বা সুনামের চাইতে সমাজের কল্যাণ ও অগ্রগতির দিকে তাঁর নজর ছিল অনেক বেশি।

কিংবদন্তিসম ‘দয়ার সাগর’
জ্ঞানের সাগর বিদ্যাসাগর কেবল তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাই নয়; অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবিকবোধে আচ্ছন্ন এই সমাজ সচেতন মানুষটি সমাজে স্বামীহারা নারীদের দুরবস্থা মোচনে অনেক সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন- বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ রোধ এবং বহুবিবাহ ও কৌলিণ্যপ্রথা উচ্ছেদের অভিযান। এ ছাড়া বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত ছিলেন। গরিব, আর্ত ও পীড়িত কোনো ব্যক্তি কখনই তাঁর দুয়ার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি তাঁর নিজের চরম অর্থসঙ্কটের সময়ও তিনি নানাভাবে আর্থিক ও বিভিন্ন রকম পার্থিব সাহায্য দিয়ে পরোপকার করেছেন। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিকে তিনি তাঁদের চরম দুর্দিনের সময় বিভিন্ন পন্থায় আর্থিক সহযোগিতা করেছেন, তাদের দুঃসময়ে পরম স্বজনের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। পিতা-মাতার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভক্তি ও বিরল নিষ্ঠা বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে আমরা পড়েছি, মার কাছে যাবেন সেদিন কথা দেওয়া থাকায় নদীপাড়ে এসে যখন দেখলেন, আসন্ন ঝড়ের জন্য কোনো নৌকোই নেই ঘাটে, তিনি আর দেরি না করে উত্তাল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এই ঝড়ো হাওয়ায় প্রচণ্ড ঢেউ আর প্রবল স্রোতে ভেসে যেতে যেতে সাঁতার কেটে দমোদর নদী পাড় হয়ে গিয়ে উঠেছিলেন মাকে দেওয়া কথা পূরণ করতে। 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগরের মধ্যে দেখেছিলেন ‘প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।’ বিদ্যাসাগরের অফুরন্ত অর্জন ও বৈশিষ্ট্যকে রবীন্দ্রনাথ তার ‘বিদ্যাসাগরচরিত’সহ চারখানি প্রবন্ধে বিভিন্নভাবে স্মরণ করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বিদ্যাসাগরের মধ্যে ইহজাগতিকতা, যুক্তিবাদী শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নারীশিক্ষার প্রসার, নতুন গদ্যরীতি, সমাজসংস্কার, বিধবাবিবাহ, পাঠ্যসূচি থেকে অলৌকিকতার বিলুপ্তি, জ্যোতিষ শাস্ত্রের পরিবর্তে জ্যোতির্বিদ্যার শিক্ষা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, মানবমুখিনতার মতো বৈশিষ্ট্য আবির্ভূত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নির্মাণ। তিনি বলেন, ‘বঙ্গ প্রতিমায় ‘চক্ষুদান’ করেছিল বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’।’ 

সবশেষে, ১৮৯৫ সালের ২৯ জুলাই। বিদ্যাসাগরের জন্য আয়োজিত এক স্মরণসভায় রবীন্দ্রনাথ অকুণ্ঠচিত্তে এই অসাধারণ মহান ব্যক্তিটির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন যা পরে ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রবন্ধাকারে প্রকাশিত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি অতি শ্রদ্ধাশীল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন বিদ্যাসাগরের চরিত্রের ও কর্মের ওপর বিস্তৃত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিদ্যাসাগরকে কেবল বিদ্যা ও দয়ার আধার বলিয়া জানি। দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ। তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব এবং যতই তাহা অনুভব করিব ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চির দিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।’

বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ এই অতি বিরল, প্রগতিশীল, নারীবান্ধব সমাজগঠক, দয়ার সাগর, ও সৃজনশীল মানুষটির তুলনা কেবল তিনি নিজেই।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh