আগুন

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আধুনিক কোরিয়ান সাহিত্যে বাস্তববাদী কথাশিল্পীদের মধ্যে ইয়ন চিন গন (১৯০০-১৯৪৩) বিশেষভাবে চিহ্নিত। তিনি প্রথমে টোকিওর একটি উচ্চ বিদ্যালয়, পরে সাংহাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। স্বল্পায়ু ইয়ন লিখেছেন খুব কম, অবরোধের সময় জাপানি নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন আরও কম। তবু মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনা, সংগ্রাম, আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি যে নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ‘কোরিয়ার মুখগুলি’ ১৯২৬ গল্পগ্রন্থে তা সত্যিই অতুলনীয়। 

মাসখানেক হলো সুনির বিয়ে হয়েছে। এই সবে ও পনেরোয় পা দিয়েছে। ওর অস্ফুট মানসিকতায় কেবলই মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে, যেন ভারী একটা পাথর চাপানো রয়েছে বুকের ওপর। পাথর সাধারণত হিমেল, তবে সুনির বুকের ওপর যেটা চেপে থাকে, সেটা ঘুঘুর মতো নরম, স্যাঁতসেঁতে আর সুসংবদ্ধ, মৌসুমির দমকা বাতাসের মতো শ্বাসরোধী আর এক’শ মণের চাইতেও বেশি ভারী। তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো সুনি হাঁফিয়ে ওঠে। তারপরেই শুরু হয়ে যায় দুর্বিষহ যন্ত্রণা- ছিঁড়ে খুঁড়ে নিষ্পেষিত করে ওর কটিতট, ব্যথায় থর থর করে কাঁপতে থাকে শ্রোণীদেশ। লোহার একটা মুগুর যখন দাবড়ে বেড়ায় ওর দেহের গভীরে, শক্ত করে চেপে ধরে বুকটাকে, ওর মুখখানা হা হয়ে যায়, প্রবলভাবে আক্ষিপ্ত হতে থাকে সারাদেহ। স্বাভাবিকভাবে এই তীব্র যন্ত্রণা ওকে জাগিয়ে তুলতে পারত; কিন্তু সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম- মাথায় করে কলসিতে পানি বয়ে আনা, ধান ভানা, পানি কলের জন্য পাখা ঘোরানো, চাষের জন মজুরদের জন্য ধানক্ষেতে খাবার বয়ে নিয়ে যাওয়া,  প্রভৃতি নানান কাজ ওকে এমনই ক্লান্ত করে তুলত যে কোনো কিছুই ওকে আর জাগিয়ে রাখতে পারত না। তা বলে ও যে গভীর ঘুমিয়ে পড়ত তা কিন্তু নয়। ‘আমি মরে যাব, এই মুহূর্তে মরে যাব, যদি যন্ত্রণাটা আরও বেড়ে ওঠে। আমাকে চোখ মেলতেই হবে।’ সুনি নিজের মনেই বলত; কিন্তু কিছুতেই চোখ মেলতে পারত না, যেন ও দুটি আঠার মতো জুড়ে গেছে। গাঢ় তন্দ্রাচ্ছন্নতার বিশৃঙ্খল স্রোতটাকে ও কিছুতেই ঠেলে সরিয়ে দিতে পারত না।

ইতিমধ্যে হা হয়ে গেছে মুখখানা, আক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে সারাশরীর দাঁতে দাঁত চেপে সুতীব্র যন্ত্রণাকে ও সহ্য করার চেষ্টা করছে। একটু পরে দুঃস্বপ্নে ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা দুটি একটু একটু করে মেলেতে পারল, আর তখনই দেখতে পেল স্বামীর মুখটাকে, ঠিক ওর মুখের ওপরে, ভাতের হাঁড়ির বেশ বড় গোল একটা সরার মতো। লোকটার কালো মুখখানা চারপাশের আবছা আঁধারের সঙ্গে মিলে থাকলেও, সাদা চোখ দুটি যেন জ্বলছে এবং যেটা ও স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারল- হলদে ছোপধরা ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত আর অর্ধেক ফাঁক হয়ে থাকা লালায় ভেজা পুরু ঠোঁট। গাঢ় বাদামি দুটি কাঁধের মাঝখানে তার সরার মতো বড় মুখখানা ক্রমশ বড় হতে হতে সয়াবিনের এটা ঝাড়, এমন কি ঘরটাকেও ছাড়িয়ে গেল। নাভি থেকে উঠে আসা একটা আতঙ্ক আর দেহাভ্যন্তরের প্রতিটা অন্ত্রকে মুচড়ে ধরা তীব্র যন্ত্রণায় বিহ্বল হয়ে সুনি এখন কাঁপছে, যে অনড় ঘুম ওর ঘাড়টাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য ও এখন ছটফট করছে। তারপরেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা কি ঘটেছে।

অবশেষে যন্ত্রণা থেকে ও যখন মুক্তি পেল, গ্রীষ্মের স্বল্পায়ু রাত্রি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দৈত্যের মতো বিশাল চেহারাটাকে ও ঘরের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখল, তারপর বেরিয়ে গেল। সুনি যখন বুঝতে পারল লোকটা মাঠের কাজে বেরিয়ে গেছে, তখনই ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, যেন এই প্রথম সম্পূর্ণ জেগে উঠল। কালো কালির মতো অন্ধকারে মোড়া কাগজের জানলাটা এখন সবে ধূসর হতে শুরু করেছে, মেঝেতে পাতা হলুদ মাদুরের বিনুনি করা প্রান্তগুলো চোখে পড়ছে। কুলুঙ্গিতে রাখা আয়নার উজ্জ্বলতা, মাথার কাছে দেয়ালে ঝোলানো নোংরা জামাকাপড়-এ সবই প্রমাণ করে দিচ্ছে এটা ওর শত্রুপুরী। ‘আমি এই মাদুরটার ওপর এলাম কি করে?’ সুনি এফোঁড় হয়ে ভাবার চেষ্টা করল। ‘গতরাত্রে আমি তো অন্য একটা জায়গায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! নৈশ-নির্যাতন এড়াবার জন্য, বাসন-কোসন মাজার পর ও খামারবাড়ির এক কোণে লুকিয়েছিল। মাটিতে চট বিছিয়ে ধানের দুটি বস্তার গায়ে হেলান দিয়ে বসেছিল; কিন্তু পা দুটি ছড়াতে না ছড়াতেই গভীর ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপর কেমন করে ও আবার এই শত্রুপুরীতে প্রবেশ করল? লোলুপ চোখে লোকটা নিশ্চয় বাড়ির প্রতি আনাচে-কানাচে ওকে খুঁজেছে, দেখতে পেয়ে বলিষ্ঠ বাহুতে ওকে বয়ে এনেছে এই শত্রুপুরীতে, তারপর বৈরী নির্যাতনে মিটিয়ে নিয়েছে নিজের প্রয়োজন।

নিজের স্বপ্নীল আবেশটুকুকে আরও স্পষ্ট করে উপলব্ধি করতে পারার আগেই তন্দ্রাচ্ছন্নতার একটা বিশৃঙ্খল জোয়ার ওর বিবশ দেহটাকে সম্পূর্ণ তলিয়ে দিয়েছে।

‘এখনো ওঠার সময় হলো না?’ চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করার ভঙ্গিতে শাশুড়ি বলে উঠল, ‘মাড়ি ফোটাবি কখন?’

বুড়ির চিল-চেঁচানি শেষ হবার আগেই সুনি লাফিয়ে উঠল। এক হাতে চোখ রগড়ে অন্য হাতে স্বামীর ছাড়িয়ে নেওয়া কাপড়-চোপড় পরতে লাগল। ভোরের দিকে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না-কি? ওর অবস্থাটা ঠিক সেনাপতির আদেশের অপেক্ষার উৎকীর্ণ হয়ে থাকা সৈনিকের মতো। তাই ঘুমের মধ্যেও শাশুড়ির গলা শুনে ওকে আতঙ্কিত হয়ে উঠতে হয়।

সুনি যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখনো ভালো করে ভোর হয়নি। মরা মানুষের চোখের মতো ভুতুড়ে চাঁদটা আবছা কুয়াশার মধ্যে অনেকটা ডুবে গেছে।

সোজা রান্নাঘরে এসে সুনি আগুন জ্বালাল, তারপর গত রাত্রেই প্রস্তুত করে রাখা পাত্রটা উনুনে চাপিয়ে দিল। গ্রীষ্মকাল, তবু নিশান্তিকার হাওয়ায় একটা হিমেল ভাব রয়েছে; তাই আগুনের উত্তাপটুকু ওর ভালোই লাগল। দেবদারুর শুকনো ডালপালা থেকে নেচে ওঠা রক্তিম শিখাগুলোর দিকে ও নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইল। অস্বচ্ছন্দ ভরা রাতটা শেষ হলো, সুনির জন্য শুরু হলো নানান কাজে ঠাসা আর একটা দিন।

মাড়ি ফোটানোর পর, সকালে ভাত রান্নার জন্য ওকে জল আনতে যেতে হলো। কলসিটা মাথায় সবিয়ে দু’হাত দিয়ে ধরে রাখার সময় ভোরে হিমেল হাওয়া ধীরে ধীরে নেমে এসে ওর বাহুসন্ধি দুটিকে একেবারে বিবশ করে দিলো। ঝরনার ধারে কলসিটা নামিয়ে রেখে সুনি আড়মোড়া ভাঙল। পাহাড় আর শৈলশিরাগুলো কুয়াশায় ঢেকে গেছে, যেন কোনো স্বপ্নের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাষিদের খুশিতে উপচে দিয়ে গত কয়েক দিনে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে, ধানের ক্ষেতগুলো ভরে রয়েছে কানায় কানায়; শুভ্র কুয়াশায় জমাটবাঁধা পারার মতো ঐগুলো ঝিকমিক করছে। সবুজ ধানের চারাগুলো যেন ঘুমন্ত চোখ ডলছে। এই রকম একটা স্থবির দৃশ্যের মধ্যে কেবল ঝরনাকেই যা মনে হচ্ছে জেগে রয়েছে, বয়ে চলেছে মিষ্টি একটা ঘুমপাড়ানিয়া সুরে। ভালো করে দেখবে বলে সুনি পাড়ের আরও কাছে এগিয়ে গেল। পানি সম্পূর্ণ জেগে ওঠা চোখের মণির মতো স্বচ্ছ। কলসিটা ও ঝুপ করে স্রোতের মধ্যে ডুবিয়ে দিলো, নদীর বুকের ক্ষতটাকে বুজিয়ে দেওয়ার জন্য চারপাশ থেকে বৃত্ত রচনা করে ধেয়ে এলো স্রোত। ক্ষত তেমন মারাত্মক নয় বুঝতে পেরে, পানির বুকে আরও কয়েক গভীর বৃত্ত রচনা করে স্রোতটা আবার ফিরে গেল। সুনি পানি ভরতে লাগল।

প্রথম কলসিটা ভরার পর ও দ্বিতীয় কলসিটাও ভরল... আর তখনই চোখে পড়ল এক ঝাঁক চাঁদা মাছ খেলতে খেলতে চলে গেল ওর হাতের সামনে দিয়ে। ওদের এই উচ্ছল বেপরোয়া ভঙ্গিটাকে সুনি হিংসে করে। বহুদিন চুপিসারে সুনি ওদের ধরার চেষ্টা করেছে; কিন্তু ওরা খুব সহজেই পালিয়ে গেছে। আজও কয়েকবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। কয়েকটা পাথর তুলে নিয়ে ঝাঁকগুলোর দিকে এলোপাতাড়ি ছুড়ল। তাতে শুধু ছিটকে আসা পানিতে ওর মুখ আর পোশাকই ভিজল। সুনির কান্না পেয়ে গেল। পাথর কোনো কার্যকরী অস্ত্র নয় দেখে ও আবার পানির মধ্যে হাত ডুবিয়ে মাছ ধরতে লাগল। এবার হতভাগ্য একটা চাঁদা ওর আঁজলার মধ্যে বন্দি হলো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানি চলে যেতেই মাছটা ওর তালুর মধ্যে লাফাতে লাগল। সুনি বেশ মজা পেল। একটু পরেই বেচারি একেবারে নেতিয়ে পড়ল, সুনি ওটাকে ছুড়ে ফেলে দিল মাটিতে। দু-একবার ছটফট করেই মাছটা মরে গেল। সুনিশ্চিত হবার জন্য সুনি আঙুল দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেটা বেঁচে ছিল, লাফাচ্ছিল, এখন সেটা মৃত্যুলীন। নিজের এই দুষ্কৃতির জন্য সুনি আতঙ্কে শিউরে উঠল। কেবলই মনে হতে লাগল মৃত মাছটার আত্মা ওর চারপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাড়াতাড়ি জল নিয়ে ও ঘরে ফিরে চলল; কিন্তু সারাক্ষণই ওর মনে হতে লাগল- পেছন থেকে কে যেন ওর চুল টেনে ধরছে।

প্রাতঃরাশ শেষ হতে না হতেই ওকে জাঁতায় যব পেষাইয়ের কাজে বসতে হলো। কোমর পিঠ ধরে এসেছে, হাত দুটি ব্যথায় ভারি হয়ে উঠেছে, তবু ওকে পেষাইয়ের কাজ করতে হলো।

স্বামীর সঙ্গে ক্ষেতে যারা ধানের চারা রুইছে, সেই মজুরদের জন্য দুপুরের খাবার রান্না করে ওকে মাঠে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। ভাত আর তরকারি বোঝাই কাঠের বারকোশটার ভার মাথায় এমন ভাবে চেপে বসে, মনে হয় কচ্ছপের মতো ও বোধহয় মাটির নিচে সেঁধিয়ে যাবে। ওর সারাশরীর যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে যায়। মাথায় ভারী বোঝা নিয়ে টলমলে পায়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।

মেঘবিহীন ঝকঝকে নীল আকাশ থেকে নিদাঘের নগ্ন সূর্যটা ঝরিয়ে চলেছে একটা জ্বলন্ত উত্তাপ। বাচ্চাদের মতো জল ছিটিয়ে মাটির সন্তানেরা ধরিত্রীর উর্বর বুকে রোপণ করে চলেছে আগামী দিনের স্বপ্ন। ঝুঁকে পড়ে কাজ করার সময়, পিঠের কাছে পোশাকের ফাঁক দিয়ে স্পষ্টই চোখে পড়ছে রোদে পোড়া তামাটে চামড়া। কপাল থেকে ঘামের ফোঁটাগুলো মুছে নেওয়ার ফলে চোখেমুখে লেগে রয়েছে ঘন লালচে মাটির ছোপ। যন্ত্রণায় হাড় পর্যন্ত টাটিয়ে ওঠা সত্ত্বেও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চারাগুলো সব পুঁতে ফেলা যায়, সেই সংকল্প নিয়ে ওরা হাত চালিয়ে যাচ্ছে আর উচ্ছল সুরে উপছে ওঠা ফসলের গান গাইছে।

দুপুরের উলঙ্গ সূর্যটা ঢেলে চলেছে তার জ্বলন্ত উত্তাপ। পায়ে মাড়ানো সবুজ ঘাসগুলো আবার মাথা তুলে আলোর উজ্জ্বল বর্শাফলকের মাঝে হাসছে। আনন্দ আর গানে জীবনকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে তোলার জন্য চলেছে মানুষের এক দুর্মর প্রচেষ্টা। সংক্ষেপে বলা যায়, এটা এমনই একটা জগৎ যেখানে উপছে উঠছে শৌর্য, যেখানে ভঙ্গুর শারীরিক অসুস্থতাকে অবজ্ঞার চোখেই দেখা হয়। অথচ সুনি এমনই দুর্বল, ঘরের বাইরে চোখ-ধাঁধানো এই আলোর সমুদ্রে বুক ভরে স্বচ্ছ বাতাসটুকুও নেবার ক্ষমতা ওর নেই। সারা শরীর ঝিমঝিম করছে, মাথাটা ঘুরছে। যদিও মেঘে নেয়ে উঠেছে, তবু কেমন যেন শীত-শীত লাগছে। সুনি লাফিয়ে সবে যখন একটা গর্ত পেরুতে যাবে, পানিতে সূর্যের আলো এমন ঝিকমিক করে উঠল যে ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তখন হঠাৎই সকালে যে চাঁদা মাছটাকে মেরেছিল, সেটা বিরাট একটা তিমির আকার ধারণ করে ওর পথ আগলে দাঁড়াল, নিজের মনে সচকিত আর্তনাদ করে সুনি যে মুহূর্তে পালাবার চেষ্টা করল, ওর মনে হলো চুলের মুঠি ধরে কে যেন ওকে ঘোরাচ্ছে। পর পর কয়েকটা ভয়ংকর মেঘ গর্জন শুনতে শুনতে ও মূর্ছা গেল। একটু পরে নিজেকে সামলে নিল বটে, তবুও ওর চেতনা তখনো স্বচ্ছ হয়নি। বিহ্বল একটা অবস্থার মধ্যে ও কেবল এইটুকু স্মরণ করতে পারল- মাথায় খাবারের পাত্র নিয়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল, পানিতে সূর্যের আলো পড়ে ঠিকরে উঠছিল আর চাঁদামাছের মৃত আত্মাটা ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিল; কিন্তু খাবারের পাত্রটা গেল কোথায়? চারদিকে চোখ মেলে তাকাতেই সুনি ভয়ে আঁতকে উঠল, দেখল শত্রুপুরীর সেই ঘরটাতেই ও শুয়ে রয়েছে। চকিতে ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে এলো। আয়ত দু’চোখে তখনো জড়িয়ে রয়েছে ভূতে-পাওয়া মানুষের মতো একটা বিহ্বল আতঙ্ক।

উঠোনে শুকোতে দেওয়া গম মেলতে মেলতে শাশুড়ি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকাল। ভাত-তরকারি নষ্ট করে ফেলার জন্য সুনিকে যাও বা ক্ষমা করা যায়; কিন্তু অল্প কয়েকটা অবশিষ্ট থাকা চিনা মাটির বাসন ভেঙে ফেলার দুঃখ বুড়ি কিছুতেই ভুলতে পারছে না। অথচ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া এই এই সবে সামলে ওঠা কিশোরী বউটিকে সে গায়ের ঝাল মিটিয়ে কিছু বলতেও পারছে না।

‘এখনই উঠে আসার দরকার ছিল কি? শুয়ে থাকলেই তো পারতিস? যা যা, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়!’ মনে হলো নরম করে বলতে পারার জন্য শাশুড়িকে রীতিমতো কষ্ট করতে হলো।

সুনি তবু টলমলে পায়ে উঠোনে নেমে এলো।

‘বললাম না ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে!’ এবার শাশুড়ির গলার স্বর আরও চড়ে উঠল।

সুনি বলল, ‘না না, আমি ঠিক আছি।’

ওর কাছে শত্রুর ঘরে ঢোকার চাইতে মরা ঢের ভালো।

‘ফের আমার মুখের ওপর চোপা! এ সংসার কি তোর নিজের খেয়াল-খুশি মতো চলবে না-কি?’ ভেতরের বিদ্বেষটাকে আর কিছুতেই চাপতে না পেরে বুড়ি পাখাটা নিয়ে তেড়ে এলো সুনির দিকে।

‘নির্লজ্জ, বেহায়া কোথাকার! আমার কেনা সাধের বাসনগুলো ভেঙেও তোর স্বস্তি হয়নি? এখন এসেছিস কাজ দেখাতে!’ পাখার বাঁট দিয়ে বুড়ি অন্ধের মতো সুনির মাথায় পিঠে পায়ে মারতে লাগল। সুনি কিন্তু কোনো ব্যথা অনুভব করল না, বরং ক্লান্ত শ্রান্ত দেহটাতে কেমন যেন অপার্থিব একটা তৃপ্তিই অনুভব করল। ‘এমন ঢ্যাঁটা মেয়ে আমি বাপের জন্মেও দেখিনি! চোখে এক ফোঁটা জল নেই!’ ক্লান্ত না হয়ে ওঠা পর্যন্ত বুড়ি সমানে পিটিয়ে গেল, তারপর পাখাটা এক সময়ে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘দূর হ আমার সামনে থেকে! যা, রান্নাঘরে গিয়ে ভাত বসা।’

শাশুড়ির নির্দেশ মতো রান্না ঘরে গিয়ে সুনি চাল ধুতে বসল।

একটু পরেই সূর্য অস্ত গেল। ঘুপসি রান্না ঘরটায় এমন আঁধার ঘনিয়ে উঠল মনে হলো যেন রাত। আতঙ্ক জড়ানো ভয়ংকর আর একটা রাত হাঁ-মুখ করে তেড়ে আসছে ওর দিকে। সূর্যাস্তের পর থেকে এই ভয়টাই ওকে সব চাইতে বেশি করে পেয়ে বসে। রাতের আতঙ্কের থেকে মুক্তি পাবার পরিকল্পনা ওর প্রতিবারেই ব্যর্থ হয়েছে, তবু ক্ষীণ একটা আশাকে ও আগলে রেখেছে বুকের নিভৃতে। এখন নতুন কোনো পরিকল্পনার হদিস না পেয়ে ও নিজের মনেই বিলাপ করতে লাগল : বাবা-মা’রা রয়েছে কত যোজন মাইলই না দূরে, কি দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যেই না কাটছে ওর দিন আর রাত্রি, আজ কি নির্মমভাবেই না শাশুড়ির হাতে মার খেতে হলো! অতল দুঃখে ওর গলার স্বর বুজে এলো, চোখের কোল থেকে নেমে এলো অশ্রুধারা। সেই অঝর অশ্রুধারা মুছতে গিয়ে ওর হাত দুটি কেবলই ভিজে উঠতে লাগল। ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কে যেন ওর কাঁধ ধরে নাড়া দিল। কিছু না ভেবে সুনি মুখ ফেরাল, আর তখনই মনে হলো হৃৎপিণ্ডটা বুঝি এখুনি ছিটকে বেরিয়ে আসবে। দেখলো ঝুঁকে পড়ে স্বামী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। লোকটা মাঠ থেকে কখন ফিরে এসেছে ও টেরই পায়নি। স্বভাবের পক্ষে বেমানান হওয়া সত্ত্বেও তার রোদে-পোড়া, কাদামাখা মুখখানায় নিশ্চয় ফুটে উঠেছিল কোনো কোমল অভিব্যক্তি; কিন্তু শিকারি বাজের থাবায় বন্দি ছোট্ট একটা ভীরু পাখিরই মতো দম বন্ধ হয়ে আসা সুনির সেই কোমল অভিব্যক্তিকে তারিফ করার কোনো মানসিকতাই তখন ছিল না।

‘এই, কাঁদছ কেন? চুপ কর। কেঁদো না।’ বিশাল চেহারার লোকটা পাশে বসে ওকে সান্ত্বনা দিল, সরার মতো চওড়া হাতে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিল, তারপর চলে গেল।

স্বামীকে দেখে সুনি আরও বেশি কুঁকড়ে গেল। বুকের ওপর চেপে বসা সেই ভারী পাথর, দেহটাকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলা সেই লোহার মুগুরের আতঙ্কই ওর চোখের জলের উৎসধারাটাকে একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে; ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে রাতটাকে এড়িয়ে চলার যা কিছু ফন্দি। না, ও যে ঠিক রাতটাকে ভয় পায় তা নয়, ভয় পায় শত্রুপুরীর ওই ঘরটাকে। চোখের পানি মুছিয়ে দেবার পর লোকটা কি সোজা গিয়ে ঢোকেনি ওই ঘরটাতে? ওই ঘরটা ছাড়া তো আর এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে লোকটা ওর ওপর অমন করে নির্যাতন করতে পারে! আচ্ছা, কোনোভাবেই কি ওই ভয়ংকর ঘরটা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না? এতদিন পর্যন্ত ঘরটাকে এড়াবার সব চেষ্টাই ওর ব্যর্থ হয়েছে, তবু কোনো না কোনো উপায় ওকে খুঁজে বার করতেই হবে।

হাঁড়িতে ভাত ফুটে এসেছে। সরাটা তোলার সময় হঠাৎই ওর নজর পড়ল উনুনের পাশে রাখা দেশলাই-বাক্সটা তুলে নেওয়ার সময় স্পষ্টতই ওর হাত কেঁপে উঠল। তবু কোনো দিকে না তাকিয়ে ওটাকে ও লুকিয়ে ফেলল বুকের মধ্যে। আশ্চর্য, কেন এই পরিকল্পনাটা এত দিন ওর মাথায় আসেনি! সুনি নিজের মনেই মুচকি মুচকি হাসল।

সেই রাতেই খিড়কির দিকের চালায় আগুন ধরে গেল। দেখতে দেখতে খড়ের চালের সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। সুনি তখন ঘরের বাইরে কাঁটা-ঝোপটার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর মুখখানা কখনো এমন আশ্চর্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি, খুশিতে দুলে উঠছে বুক, উদ্বেল আনন্দে নেচে উঠছে সারা শরীর।

ভাষান্তর : শাহরিয়ার আদনান

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //