কবি ও কবিতা নিয়ে প্লেটোর এত ডর কেন?

গ্রেকো-রোমান রাষ্ট্রচিন্তক ও দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী প্লেটো। গ্রিসের প্রচলিত দার্শনিক-বাজারে তাঁর সুনাম যেমন সেই আমলে ছিল, তেমনি এই নয়া জমানায়ও তার সামান্য হেরফের ঘটেনি। এমনকি এই নয়া জমানায় প্লেটো নানা প্রসঙ্গে আরও জীবন্ত হয়ে উঠছেন ক্রমে। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বইয়ের অহরহ অনুবাদকরণ, আর বাজারে তার কাটতি এর উজ্জ্বল উদাহরণ।

কেবল গ্রেকো-রোমান চিন্তকদের হিসেবে নয়, বৈশ্বিক দর্শন ও দার্শনিকদের হিসেবেও প্লেটোর অবস্থান হবে প্রথম সারিতে। প্লেটো নানান জ্ঞানকাণ্ডের হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর দার্শনিক আইন জারি রেখেছেন নানা বিষয়ে। সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে তাঁর চলাচল থাকলেও তাঁর প্রধান চিন্তা আবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্রচিন্তাকে ঘিরে, ঘুরেফিরে।

এই রাষ্ট্রচিন্তা প্রকল্পে সাহিত্যের হিসাবটাও বাদ যায়নি। এর মধ্যে কবি ও কবিতা অন্যতম। কারণ সাহিত্যের সৃষ্টির হিসাবটা কবিতার সঙ্গেই প্রাথমিকভাবে জড়িত। প্লেটো তাঁর দার্শনিক হিসাব-নিকাশে, কিংবা রাষ্ট্রচিন্তায় কবিদের রাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে চেয়েছেন, কবিতাকে অকেজো জিনিস হিসাবে বিবেচনা করতে চেয়েছেন; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্লেটো নিজে একজন কবি। তাঁর লিখিত কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। তাহলে কেন তিনি কবিদের নির্বাসনের ব্যাপারে ফতোয়া জারি করলেন? এই ফতোয়ার ব্যাপারটা নির্দিষ্ট কারণেই ঘুরপাক খেয়েছে। এর পিছনে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানান বদল-প্রক্রিয়ায়ও কাজ করেছে। গৌতম বুদ্ধের ভাষায় বলতে হয়, ‘সকল কিছ্ইু বদলায়, কিছুই না বদলাইয়া পারে না।’

এই সমস্যার আলাপ শুরু করা যাক ভারতীয় প্রাচীন সমাজের গঠনগত বিষয়-আশয় দিয়েই। মেগাস্থিনিস প্রাচীন ভারতের সামাজিক ইতিহাস লেখার সময় আর্য সমাজের চতুর্বর্ণকে নয়, সাতটি প্রধান পেশাকে হিসাবে ধরে সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের ইতিহাস নির্মাণ করেছিলেন। এই শ্রেণিবিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম শ্রেণিতে ছিল দার্শনিক। মূলত যাদের কাজ ছিল জ্ঞান ও জ্ঞানকাণ্ডের নানান বিষয়ের সঙ্গে। যে জ্ঞানকাণ্ড কেবল তাদের নিজেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তা রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রে বসবাসরত জনগণের জন্যও হবে কল্যাণকর-ব্যাপারটা ছিল এমনই। জ্ঞানতাত্ত্বিক নানান বিষয়েও ফতোয়া জারি করতেন এই সমস্ত দার্শনিক। প্লেটোও গ্রিসের কল্যাণ রাষ্ট্র অর্থাৎ আদর্শ রাষ্ট্রের ব্যাপারে তাঁর বিখ্যাত পুস্তক রিপাবলিক রচনা করেছেন। তাঁর অন্যান্য রচনাও এই একই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিল। এই গ্রন্থটাই সেই সময়ের অস্থিতিশীল গ্রিসের নানান সমস্যার সমাধান-আলোকবর্তিকাস্বরূপ কাজ করেছে। অর্থাৎ গ্রিসের অন্যান্য দার্শনিকও যে রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেননি, ব্যাপারটা এমন নয়- করেছেন; কিন্তু চিন্তার হেরফের এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ। পার্থক্যটা তো এইসব কারণেই তৈরি হয়।

মেগাস্থিনিসের বর্ণিত ভারতীয় দার্শনিকদের মতো গ্রিক দার্শনিকরাও নানান কারণে তাদের রাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধ ছিল। কারণ তাদের শ্রেণিগত অবস্থান। ‘প্লেটোদের’ যে অবস্থানে গ্রেকো-রোমান রাষ্ট্র রেখেছিল, সেই অবস্থানে থেকে গ্রেকো- রোমান রাষ্ট্রের উন্নয়নকল্প ছিল তাঁদের জন্য একটি জরুরি বিষয়। প্লেটোর রিপাবলিক ছিল সেই চিন্তারই ফসল। প্লেটো যে সময় গ্রিসে জন্মেছেন, সেই সময় নানান শ্রেণি এবং তাদের মধ্যকার মতাদর্শগত পার্থক্যের জন্য ঠিকঠাক রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে তৎপরবর্তীকালে প্লেটোর রিপাবলিক রচনা নানান দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পুস্তক রচনার নানান গুরুত্বপূর্ণ কারণও ছিল। এই পুস্তকের ভিত্তিতেই গ্রিসের রাষ্ট্রীয় বিষয়-আশয় অনেকাংশে পরিচালিত হতে থাকে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কেবল রিপাবলিককে হিসেবের মধ্যে ধরা যৌক্তিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এই রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে প্লেটো নানান বিষয়ে মতামত ও যুক্তি পেশ করেছেন। তার মধ্যে শিল্প-সাহিত্যও বাদ যায়নি। ফলে এই রাষ্ট্রে কবিদের অবস্থান কী হবে, এই বিষয়ে প্লেটোর মতামত সোজাভাবে বিশ্লেষণ করলে হবে না। কারণ অনেকেই এই কথা বলে বেশ আরাম পায় যে, প্লেটো, যিনি কিনা একজন কবি ছিলেন, তিনি কেন কবিদের নির্বাসনের ব্যাপারে ফতোয়া জারি করবেন? এই বিষয় তা তাঁর নিজের চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিকতার নির্মাণ করে। তবে বাস্তবে এই বিষয় প্লেটো টিকিয়ে রাখতে পারেননি, তা সম্ভব ছিল না।

প্রশ্নটা এখানেই লুকিয়ে আছে। প্লেটো কেন কবি হয়েও কবিদের তাড়াতে চাইলেন। এর রয়েছে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রনৈতিক কারণ। কারণ কবিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘর্ষের হিসাবটা নয়, হিসাবটা রাষ্ট্রের সবকিছু ঠিকঠাক চালিয়ে নেওয়া। রাষ্ট্রকে নির্ঝঞ্ঝাট চালিয়ে নেওয়া। যেটা কবিদের আবেগের সঙ্গে ঠিক যায় না। কেবল আবেগ নয়, অনুকরণ-সূত্র এবং তার সঙ্গে রূপকী নানান বিষয়ও এইক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু কারণ কী কেবলই সেই আবেগ আর অনুকরণ-সূত্র? আর কিছুই নেই এর পিছনে? আবেগ আর অনুকরণের সম্পর্কটা ধরে এই আলাপ চালিয়ে নেওয়া কষ্টকর হবে। কারণ শুধু আবেগের ভেলায় গ্রিক রাষ্ট্রের আর্থ-উৎপাদনের বিষয়টা ঠিক চলবে না। সেই আর্থ-উৎপাদন ঠিকমতো চালিয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকেও ঠিকঠাক চলতে হবে। রাষ্ট্রের আর্থ-উৎপাদন কাঠামোকেও চলতে হবে।

প্লেটো যে রিপাবলিক লিখেছিলেন তার পেছনে কেবল দার্শনিক উদ্দেশ্যই বিরাজমান ছিল- ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় নানান বিষয়-আশয়ও সম্পৃক্ত ছিল। ফলে প্লেটোর নৈতিকতা ও আদর্শ রাষ্ট্রের বিষয় কেবলই দার্শনিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, একইসঙ্গে এই বিষয় রাষ্ট্রনৈতিক নানান বিষয়ের সঙ্গেও জড়িত। কারণ তাঁর পুস্তকসমূহ কেবলই বায়বীয় উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত হয়নি, এর পেছনে রাষ্ট্রিক নানান বিষয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই যে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে বারবার কথা বলা হচ্ছে এই বিষয়ই তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের বসবাসের প্রধানতম অন্তরায়। কারণ গ্রীক রাষ্ট্রগুলো যখন নানান ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছিল ঠিক সেই সময় প্লেটো রিপাবলিকসহ আরো নানান রাষ্ট্রচিন্তাবিষয়ক পুস্তক রচনা করেন। ফলে যে সুসংবদ্ধ রাষ্ট্রচিন্তা প্লেটো নির্মাণ করেছিলেন, সেই নির্মাণ-হিসেবের বিপরীতে কবিতার হিসেব ছিল দোষের বিষয়-কারণ। অর্থাৎ প্লেটোর রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীতে অবস্থান করবে কবিদের চিন্তা।

প্লেটো কেবলই একমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। কারণ কবিদের সকল কবিতাই কি দূষণীয়? এমনকি ভাবাদর্শগত কবিতার বেলায় প্লেটোর এই কথা আর খাটে না। তবে প্লেটো, কবিতা বিষয়ে যে ‘অনুকরণ-সূত্র’ তৈরি করেছিলেন, তা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। কারণ হাল আমলে কিংবা একটু পিছিয়ে গেলেও নতুন রাষ্ট্র নির্মাণে কিংবা রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়ক ‘জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের’ সম্পূর্ণতা দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কবি এবং কবিতা। ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা অন্যান্য দেশ, যাদের তৃতীয় বিশ্বের হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়, এই চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এমনকী উন্নত রাষ্ট্রে ‘পোয়েট লরেট’-এর মতো বিষয় তো আছেই। ফলে প্লেটোর চিন্তা সবসময় প্রযোজ্য নয়। এই সূত্রে একথা বলে নেওয়া উচিত যে, কবিতা আর কবিদের ব্যাপারে কিছু ইতিবাচক চিন্তাও প্লেটোর রয়েছে।

গ্রিসের সেই সময়কার রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এবং প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের কাঠামোয় যে তিনটি উপাদান রয়েছে-১. যুক্তিবোধ, ২. সাহস, ৩. ভোগস্পৃহা-নিয়ে গঠিত সেই তিনটি উপাদানের সঙ্গে কোনোভাবেই কবির আবেগ আর অনুকরণের মিলমিশ সম্ভব নয়। কারণ আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে গিয়ে সবকিছুর উদ্ভবের পেছনে ব্যক্তির মানসজাত ক্রিয়াকলাপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন প্লেটো। ফলে আবেগ এবং অনুকরণের ব্যাপারটাও ব্যক্তির মানসজাত বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়। আর প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদানের সঙ্গে কবিদের চিন্তাজগতের ‘প্রচলিত ছাঁচের’ রয়েছে এক বিস্তৃত বৈপরীত্য। এরই ফলে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের অবস্থানটা একেবারেই অযৌক্তিক বলে প্লেটো রায় দিয়েছেন। যা প্রাথমিক ভাবনায় অবান্তর মনে হতে পারে; কিন্তু প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশ সম্পাদিত হওয়ার জন্য এর রয়েছে কার্য-কারণ সূত্রের বৈধতার বিষয়।

আদর্শ রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদানের ভিত্তিতেই যেমন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টা নির্মিত হয়, তেমনি করে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টাও আদর্শ রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। এই বিষয় দুটি একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিভাবক শ্রেণি, যোদ্ধা শ্রেণি এবং উৎপাদক শ্রেণি- এই তিন শ্রেণির হিসেবের মধ্যে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের শ্রেণি বিষয়টার গঠন-কাঠামো নিহিত ছিল। ফলে এই গঠন-কাঠামো অনুসারে কোনোভাবেই অনুকরণ কিংবা আবেগতাড়িত হওয়ার ফুরসত ছিল না। নীতিগতভাবেও বিষয়টা বৈধতা পায় না। তা যদি পেতো, তবে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের ভিতটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। একইসঙ্গে আদর্শ রাষ্ট্র এবং এর ভিতটাও কাটা পড়ে যেত এই একই প্রক্রিয়ায়। ফলে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে কবির নির্বাসন অপরিহার্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান এবং শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে এই রাষ্ট্রের আর্থ-উৎপাদনের সম্পর্কটাও নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎপাদক শ্রেণির বিষয়টা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ এমন এক ভৌগোলিক সীমানায় গ্রিসের অবস্থান ছিল, যে সেইখানে আর্থ-উৎপাদন প্রক্রিয়া ঠিকমতো চালু রাখতে হলে দাস শ্রেণি, প্লেটো যাদের উৎপাদক শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, ব্যতীত আর কোনো পথ খোলা ছিল না। এই সূত্রে স্মরণ করা যেতে পারে যে, অভিভাবক শ্রেণির মধ্যে প্লেটোর নিজেরই অবস্থান ছিল। এবং তাঁর সমস্ত কার্যক্রম ওই শ্রেণির সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মিলমিশ খায়। এবং এই শ্রেণি বলে নয়, যোদ্ধা শ্রেণিও কোনো ধরনের উৎপাদন কার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। রাষ্ট্রের কার্য-প্রক্রিয়া ঠিকঠাক চালানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত অভিভাবক শ্রেণি। আর শত্রু প্রতিহত করা সহ রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বিধানের বিষয় দেখভাল করতো যোদ্ধা শ্রেণি; কিন্তু উৎপাদনের পুরোটাই সম্পাদিত হতো উৎপাদক শ্রেণির হাতে। আর্থ-উৎপাদনের এই ধারা কবির নির্বাসনের জন্য জরুরি বিষয়। কারণ প্লেটো যে সমস্ত দোষ দিয়েছেন কবিদের সেই ‘দোষসমূহ’ এই আর্থ-উৎপাদন কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে।

বিষয়টা ভারতীয় কাস্টের হিসেব-নিকেশের সঙ্গে নানান কারণে সাযুজ্যপূর্ণ। কারণ ভারতীয় কাস্টেও ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় বাদে বাদবাকি অন্য দুটো শ্রেণি-বৈশ্য ও শূদ্র-উৎপাদনকার্যে নিয়োজিত ছিল। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে ভারতীয় বৈশ্য ও শূদ্রের বিষয়কে এক করে উৎপাদক শ্রেণি হিসেবে একত্রিত করে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া আর বাদবাকি প্রক্রিয়া প্রায় সমানতালে এগিয়েছে। কেবল প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের ছাঁচের, যা বিবেচিত হয় ‘প্রথম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে, বিপরীতে ভারতে বিদ্যমান ছিল ভূমিভিত্তিক সামন্ততন্ত্র। বাস্তবে ব্যাপারটা ভূমি-ব্যবস্থা এবং উৎপাদন-ব্যবস্থার সঙ্গেই সম্পর্কিত; তবে ভারতে কেন কবিদের নির্বাসনের বিষয় দেখা যায় না? বরঞ্চ আরো কবিদের রাজাদের সভাসদ হিসেবে গ্রহণ করা হতো। এর মূল কারণ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। এবং একই সঙ্গে ভারতে বিস্তৃত উর্বর ভূমি ছিল সহজলভ্য। আর এই ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার কাছে গ্রিসের উৎপাদনের হিসেবটা একেবারেই নগণ্য। ফলে এই কারণে ভারতে যেখানে কবিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাখা হয়েছিল, তার বিপরীতে গ্রিসে কবিদের বিতাড়নের ব্যাপারে ঘোষণা দেন প্লেটো।

সত্যেন সেনের পাপের সন্তান ও অভিশপ্ত নগরী উপন্যাসে গ্রিসের দাস বিদ্রোহের কথা উল্লেখ আছে। সাহিত্যের মতো ইতিহাসও এই সত্যকে স্বীকার করেছে। অর্থাৎ গ্রিসে উৎপাদক শ্রেণি যে সবসময় ‘উচ্চ শ্রেণির’ সবকিছু সবসময় মেনে নিয়ে বসে থাকত, ব্যাপারটা তেমন নয়। শ্রমজীবী শ্রেণি তাদের নিজেদের ওপর চালানো নানান শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পোষণ করত। ফলে যে টোটালটারিয়ান রাষ্ট্র, যা প্লেটোর ভাষায় আদর্শ রাষ্ট্র, সেখানে নিম্নবর্গের যে কোনো বিদ্রোহই এই রাষ্ট্রের জন্য শঙ্কাস্বরূপ। কারণ উৎপাদক শ্রেণি যদি কোনো ধরনের উৎপাদনে না যায়, তবে এই রাষ্ট্রের অভিভাবক কিংবা সৈন্যরা তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা পাবে না, রাষ্ট্রও ঠিকঠাক চলবে না। ফলে প্লেটোর মতো ‘অকেজো লোকজন’, অকেজো বলছি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের উৎপাদনে হিসেবে, যে কোনো বিদ্রোহের বিপক্ষে কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ যে কোনো সামান্য বিদ্রোহই স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে সমগ্র রাষ্ট্রে। আর কবিতার এই গুণ আছে। মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করার। মানুষকে বিদ্রোহী করার। বিদ্রোহী চেতনার উন্মেষের বিষয়ও কবিতায় স্পষ্ট হয়। আর কবিদের স্বাধীনচেতা স্বভাব এইক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ফলে প্লেটোর ‘কবি তাড়ানো প্রকল্পের’ ভিত একেবারেই অমূলক নয়।

জাতীয়তাবাদী প্রকল্প এবং তার সঙ্গে কবিতার হিসেব-ব্যাপারটা এই যুগে বেশ স্পষ্ট, এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিষয়টা মেইনস্ট্রিম শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিশেষ হয়ে ওঠে; কিন্তু প্লেটোর সময় এই বিষয় ততটা বড় হয়ে বেড়ে ওঠেনি। তবুও প্লেটো সেই সময়ই, এই বিষয় বোধহয় আন্দাজ করতে পেয়েছিলেন। কারণ ‘অনুকরণ-সূত্রে’ নির্মিত কবিতার বিষয়ে যে বিরোধিতা প্লেটো করেছেন, সেই বিষয় কেবলি একটা ‘মেন্দামারা’ বিষয় নয়। আর জাতীয়তাবাদী প্রকল্প কেবল গণতন্ত্রের নির্দিষ্ট ছাঁচেই আবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরো নানান বিষয়-আশয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে। যার মধ্যে নাগরিকদের হকের বিষয় অন্যতম। তবে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে সকল নাগরিক কী তাদের ‘নাগরিক হকের’ বিষয়ে সমান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল? তা কিন্তু হয়নি। ফলে জাতীয়তাবাদী চিন্তা-প্রকল্পে, মৌলিক অধিকার-প্রাপ্তির বিষয়টা এইক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এই বিষয়টি সাধারণ জনগণের বোধের মধ্যে প্রবিষ্ট করানোর দরকার আছে। কবিতা এই কাজটা করতে পারে। কারণ কবিতাই বোধহয় শিল্পের এমনই এক রূপ, যেখানে নানান রেটোরিকে সত্য কথাটা সত্য করে বলা হয়। এর হেরফের যে একেবারেই হয় না, তা বলছি না। তবে সত্যের হিসেবটাই প্রধান। এই যে জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের কথা বলতে গিয়ে মৌলিক অধিকার-বঞ্চিতের যে কথা বললাম, তা অনেকের কাছে ফাঁপা লাগতে পারে, তাদের জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথাটা বলা হলো। আশা করি মিলিয়ে নিতে কষ্ট হবে না। 

একটি রাষ্ট্রের নানান সুবিধার বিষয় থাকে যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবার পাওয়া দরকার, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে পাওয়া সম্ভব ছিল না। যদি শিক্ষার কথাই বলা হয়, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিই কেবল শিক্ষার অধিকার পেয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় কাস্ট সিস্টেমের ‘লোকজন’ যেমন সবাই সব অধিকার পায় না, তেমনি করে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাজিত লোকজনও সবাই মৌলিক অধিকারের সবটুকু পায়নি। ফলে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে যে রাষ্ট্রের কথা প্লেটো বলেছেন, সেই রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটা অবান্তর। এ আদর্শ রাষ্ট্র প্লেটোর হিসেবেই ‘আদর্শ রাষ্ট্র’। কারণ গণতন্ত্রের যে লেবাস প্লেটোর এই আদর্শ রাষ্ট্রে দেখা যায়, তার হিসাবটা প্লেটোর ‘ভিন্ন হিসেবে’ সত্য। আদর্শ ও ন্যায্যতার হিসেবে সত্য নয়। এমন এক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদী, তা অবশ্যই মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে সজাগ, চিন্তা-প্রকল্পের ভয়টা একটু বেশিই থাকে। আর এই চিন্তা-প্রকল্পের পেছনে কবি ও কবিতা বিশেষভাবে প্রভাবশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ফলে এই বিষয় প্লেটোকে বেশ ভাবিয়েছে। অর্থাৎ প্লেটো নীতিগত দিক থেকে কতোটা আগে আছেন সেটা কোনো বিষয় নয়, মূল হলো প্লেটো কবি, কবিতা আর জাতীয়তাবাদী প্রকল্প নিয়ে যে চিন্তা করতে পেরেছেন- এই বিষয়টাই নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

যেহেতু এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর্থ-উৎপাদনে হিসেবটা মেলানো, তার সঙ্গে কবি ও কবিতার হিসাব-নিকাশটার সমাধান করা; কিন্তু সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, সম্পদ সঞ্চয়-ইত্যকার বিষয়ে আদতে অভিভাবক শ্রেণি এবং যোদ্ধা শ্রেণি বাদে আর কারো তেমন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ বিধিবৈধভাবে এই দুই শ্রেণি ব্যতিত আর কোনো শ্রেণি অর্থ-সম্পদের সঙ্গে সেইভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেনি। সেই বৈধতা প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র দেয়নি। যদিও পুরো আর্থিক প্রক্রিয়াটি গড়ে উঠেছিল উৎপাদক শ্রেণির হাতে। এবং উৎপাদক শ্রেণিই প্রায় সবকিছুর জোগানদাতা হিসেবে কাজ চালিয়ে প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রকে চালিয়ে সামনে নিয়ে গেছে।

ওপরের কথা থেকে এই বিষয় স্পষ্ট হয় যে, প্লেটো যে কবিদের তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে চান- এই বিষয়টি এমনি এমনি প্লেটো বলেননি। কারণ প্লেটো নিজেও একজন কবি ছিলেন, কবিতা লিখেছেন। মূলত রাষ্ট্র এবং এর আর্থ-উৎপাদন কাঠমো নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা হলো মানুষের প্রথম কাজ। এই কাজ সম্পূর্ণ হলেই মানুষ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিষয়ে ভাবে। এই বিষয় একটু কট্টর হলেও শেষমেশ সত্যিটা এমনই। প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র এই অবসরের বিষয়েই আঙুল নির্দেশ করেছে। ফলে প্লেটো কবি ও কবিতা সম্পর্কে বিভিন্ন দোষারোপ করে যে কবি ও কবিতা-বিরোধী আইন  করেছিলেন তার কারণ ওপরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে কেবল আবেগের বশে প্লেটোকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। এর কারণ উদ্ঘাটন করাও জরুরি বিষয়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //