রবীন্দ্র সৃষ্টিতে বিচিত্র মনের মানুষ

ভাবুক, শিল্পী এবং কর্মী সত্তার বিস্ময়কর মিলন ঘটেছিল যে মানুষটির মধ্যে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর মধ্যে চিন্তা-ভাবনা ও চিত্রণকুশলতা এই দুয়েরও অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। তিনি নিজে প্রতিভা ও সৌন্দর্যের অপরূপ ধারকরূপে হয়ে উঠেছিলেন এক দেবদুর্লভ ব্যক্তিত্ব। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই মানুষ সাহস ও বীর্যবত্তা নিয়ে যিনি জীবনের সমস্ত দায়িত্বের মুখোমুখি হতে পারেন। তিনি সংসারের কোনো দায়িত্বকেই অস্বীকার করেননি। এমন মানুষটির দৃষ্টিতে বিভিন্ন স্বভাবের মানুষ কীভাবে ধরা দিয়েছিল তা অনুধাবন করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা তাঁর সৃষ্টির ভুবনে উঁকি দেব। বিশেষত তাঁর ছোট গল্পের মাঝে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফেলে আমরা তাঁর মানব-অবলোকন প্রক্রিয়া ও জীবন-দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করব।

মানবজীবনকে কীভাবে দেখেছিলেন রবি-কবি? তিনি বলেছিলেন-

মহাবিশ্ব জীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে

নির্ভয়ে ছুটিতে হবে সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা।

সত্যকে জীবনের ধ্রুবতারা মেনে নিয়ে চলে যেসব মানুষ তাদের তিনি দেখেছেন মানব যাত্রী রূপে। তিনি বলেছেন-

চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে

ঝড়-ঝঞ্ঝা বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে

অন্তরপ্রদীপ খানি।

অন্তর প্রদীপের আলোতে জীবনের পথ দেখে নিয়ে এগিয়ে চলা মানুষদের তিনি বিবিধ রূপে দেখেছেন এবং সেসব রূপের চিত্রায়ন করেছেন নিপুণ হাতে। আমরা তাঁর ছোট গল্প থেকে খুঁজে নিয়ে তেমন কিছু মানুষের চরিত্র বোঝার চেষ্টা করব। সুখী ও দুঃখী মানুষের চিত্র তিনি এঁকেছেন ‘রাজপথের কথা’ গল্পে ‘প্রতি পদক্ষেপে সুখের ছবি আঁকিয়া আঁকিয়া চলে; সে প্রতি পদক্ষেপে মাটিতে আশার বীজ রোপিয়া রোপিয়া যায়’ ... কে সে? রবীন্দ্র-দৃষ্টিতে সে সুখী মানুষ। অন্যদিকে রাজপথের জবানিতে তিনি দুঃখী মানুষকে চিনিয়েছেন এভাবে : “তাহার পদক্ষেপের মধ্যে আশা নাই, অর্থ নাই... দক্ষিণ নাই, বাম নাই তাহার চরণ যেন বলিতে থাকে, ‘আমি চলিই বা কেন? থামিই বা কেন’- তাহার পদক্ষেপে আমার শুষ্ক ধূলি যেন আরও শুকাইয়া যায়।” এই কাহিনীতে নির্দিষ্ট মানবচরিত্র তিনি তুলে ধরেননি; কিন্তু মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ কীভাবে ছাপ ফেলে যায়, কীভাবে মানুষের জীবন-ধারায় ভিন্নত্ব এনে দেয় তার সুস্পষ্ট ছবি তিনি তুলে ধরেছেন পাঠকদের সামনে, সুখ ও দুঃখের দোলাচলে ঘুরতে থাকা মানুষের জীবন কিরূপ তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজপথের উক্তিতে আর পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে পড়েন কাহিনী-স্রষ্টার মুন্সিয়ানায়।

‘পোস্ট মাস্টার’ গল্পের মাধ্যমে পাঠকদের পরিচয় ঘটে শহর ও পল্লীজীবনে বেড়ে ওঠা দুটি ভিন্নধর্মী মানব হৃদয়ের সঙ্গে। সে দুটি হৃদয় যথাক্রমে বুদ্ধি-নামক চালিকাশক্তির তাড়নায় হৃদয়দৌর্বল্যকে জয় করে বলতে পারে: ‘জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার!’ রতন নামের গ্রাম্য বালিকাটির করুণ মুখখানি তাকে ক্ষণিকের জন্য দুর্বল করে তুললেও তার কাছে ফেরাতে পারে না। রতনকে সঙ্গে নিয়ে শহরে ফিরে যাওয়ার ভাবনা থেকে তার বুদ্ধি-চলিত জীবন তাকে মুক্ত করে। অন্যদিকে রতন বুদ্ধিহীন মানব হৃদয়ের ধারক বালিকা। সে ‘দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে সেই বন্ধনে পড়িয়া কিছুতেই দূরে যাইতে পারিতেছিল না।’ সেই হৃদয়চলিত জীবন-দর্শন পরিস্ফুট হয় কাহিনীকারের কলমে : ভ্রান্তি ঘোচে না, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান মাথায় ঢোকে না। প্রবল প্রমাণ অবিশ্বাস করে মিথ্যে আশাকে জড়িয়ে ধরে... একসময় চেতনা ফেরে। তথাপি আবারও ভ্রান্তিপাশে ধরা পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়। কত শত ভুলের সুতো দিয়ে সেলাই করা কাঁথার মতো হৃদ-তাড়নায় ছুটে ছুটে বেড়ানো মানুষের জীবন!

‘গিন্নি’ গল্পে চিত্রিত হয়েছে অশ্রুতপূর্ব শাস্তি-প্রনেতা এক শিক্ষকরূপী মানুষের চরিত্র-শিবনাথ পণ্ডিত। তিনি তাঁর ছাত্রদের বিচিত্র নাম দিয়ে শাস্তি দেওয়ার সুখানুভূতি উপভোগ করেন। তিনি শশি শেখরের নাম দেন ‘ভেট কি’, আশুকে বলেন ‘গিন্নি’। আদর করে প্রিয়জনকে নানা নামে ডাকার রীতি প্রচলিত আছে সমাজ-সংসারে সবই জানে; কিন্তু শিবনাথ পণ্ডিত মানুষটির শাস্তি-দান রীতি কত ভয়ানক তা গল্পকার বুঝিয়ে দিলেন গল্প শোনানোর ছলে গভীর জীবন-সত্য উদ্ঘাটন করে : ‘নাম জিনিসটা যদি চ শব্দ বৈ আর কিছুই নয়; কিন্তু সাধারণ লোকে আপনার চেয়ে আপনার নামটা বেশি ভালোবাসে; নিজের নাম রাষ্ট্র করিবার জন্য লোকে কী কষ্টইনা স্বীকার করে... এবং আপনার চেয়ে আপনার নামটাকে বড় মনে করে’। শিবনাথ পণ্ডিত ছাত্রদের সেই গভীর ভালোবাসার স্থানে ক্ষত সৃষ্টি করে কত আঘাত দিতেন এবং নিজে আনন্দ পেতেন সে কাহিনী পাঠে পাঠকদেরও চৈতন্য মুক্তি ঘটে। মানব মনের অন্ধকার কুঠুরির আবিষ্কারে পাঠক-মন নড়ে-চড়ে বসে। আশু নামের নিতান্তই নিরীহ শান্ত-চরিত্রের বালক জীবনে তার শিক্ষক-মানুষটির ভূমিকা জেনে পাঠক-হৃদয় ভারাক্রান্ত হয় এবং সেই সঙ্গে মানব-মনের নিষ্ঠুর, ক্রুর প্রকৃতি জেনে সাবধানতা অবলম্বনে সচেতন হয়ে উঠতে পারে।

শিবনাথ পণ্ডিত নামে পণ্ডিত কিন্তু আসলে পণ্ডিত মানুষ ছিলেন না। প্রকৃত পণ্ডিত মানুষ কেমন হতে পারেন তার দৃষ্টান্ত পাই আমরা ‘তারা প্রসন্নের কীর্তি’ গল্পে। সংসার জীবনে নিতান্তই অনভিজ্ঞ তারা প্রসন্ন কেবল লিখেই চলেছেন জ্ঞান-গর্ভ রচনাদি; কিন্তু কখনো সেসব প্রকাশ করার কথা ভাবেন না। শেষে সংসার অচল হওয়ার দশা প্রাপ্ত হলো। সরল-স্বভাবা, সুপণ্ডিত স্বামীর প্রতি ভক্তিমতী গৃহিণীর পরামর্শে তিনি অতঃপর অর্থোপার্জনের আশায় রচনাগুলো প্রকাশকদের কাছে নিজ অর্থ ব্যয়ে পাঠাতে শুরু করলেন। অর্থপ্রাপ্তি ঘটে না তাতে; কেবল সমালোচকদের লিখনী মুখর হয়ে ওঠে। বিচিত্র অর্থহীন ভাষায় প্রকাশ লাভ করে তাদের প্রশ্বস্তি-বাক্যাদি। মুদ্রার বদলে তারা প্রসন্ন হাতে পান ‘মুদ্রাঙ্কিত’ এমন বাক্য সমন্বিত পত্র : ‘আপনার এই চিন্তাশীল গ্রন্থে দেশের একটি মহৎ অভাব দূর হইয়াছে।’ অর্থ প্রাপ্তি না ঘটলেও লেখক মানুষটি বই পাঠিয়ে দিয়ে ‘চিন্তাশীল গ্রন্থ’ সম্পর্কে ভাবতে বসে এমন মন্তব্যের অর্থ খুঁজে থৈ পান না। সংসার চলবে কিসে?- এমন কঠিন প্রশ্নেরও জবাব খুঁজে পান না তিনি। কাহিনীর পরিণতি ঘটে পণ্ডিত-পত্নীর করুণ মৃত্যুতে। সরসতার মোড়কে পাঠকদের উপহার দেওয়া এমন একটি করুণ রসের গল্প আদতে সংসার-জীবনে জ্ঞান-পিপাসু পণ্ডিত মানুষদের অসারতাকে মূর্ত করে তুলেছে। এমন তাত্ত্বিক মানুষদের ব্যবহারিক জীবনের বিড়ম্বনাব- কঠোর বাস্তব সত্য। স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানব-চরিত্র সৃজন নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন এই গল্পে।

‘রামকানাইয়ের নিবুর্দ্ধিতা’ গল্পে পাঠকরা যেমন সরল-হৃদয়, সত্যনিষ্ঠ মনুষ্য-চরিত্রকে জানতে পারেন তেমনই পাশাপাশি সংসারী চতুর মানুষদের প্রকৃতিও সম্যক চিনে নিতে পারেন। রামকানাই মানুষটি ‘সত্যকে ধ্রুবতারা’ মেনে আদালতে সত্যকথা প্রকাশ করেন নিজের তথা পরিবার-পরিজনদের স্বার্থকে বিঘ্নিত করছেন জেনে-বুঝেই, আপন স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ী। সে সত্য জেনেও চাতুর্য-প্রকাশে তৎপর স্বার্থপর মানুষরা যে যার মতো নিজেদের কৃতিত্ব আদায়ের লক্ষ্য সিদ্ধ করতে অকপটে মিথ্যা কথা উচ্চারণ করে গেল। তাদের মধ্যে সকলকে ছাপিয়ে গেল বিবাদী পক্ষের উকিল। বললে, লোকটাকে কেমন চেপে ধরেছিলুম তাই...। আর মর্মান্তিক মন্তব্য শুনতে পাওয়া যায় সত্যোচ্চারণকারী মানুষটির নিজ-সন্তান ও তার বন্ধুদের মুখে : ভয় পেয়েছে বুড়ো তাই...। গল্পের শেষে গল্পকার পাঠকদের জানালেন সংসারে অনাবশ্যক এই মানুষটি অতঃপর ইহলোক ত্যাগ করলেন। স্রষ্টা মানুষটি এমন নিষ্ঠুর নিয়তির কথা শুনিয়েও সরসতা বিতরণে পাঠকদের বঞ্চিত করেন না। জানা গেল, তাঁর বয়ানে, রামকানাইয়ে মৃত্যুর পর ‘কেউ কেউ বললে, আর কিছুদিন আগে গেলেই ভালো হতো কিন্তু তাদের নাম করতে চাইনে।’ রামকাইয়ের ‘নির্বোধ’ চরিত্র লেখকের এই টিপ্পনীতে অধিকতর প্রকট হয়ে ওঠে।

‘ব্যবধান’ গল্পের বনমালী ও হিমাংশু মালী সম্পর্কে দুই ভাই। তারা দু’জনেই গাছপালা-প্রেমিক; কিন্তু তাদের সেই প্রেমিক চরিত্রের প্রকৃতি পৃথক। গল্পকার সেই পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তোলেন চরিত্র-চিত্রণের কুশলতায়। প্রবীণ বনমালী হৃদয়ের শখ মেটাতে গাছপালার পরিচর্যা করেন। তিনি গাছপালাদের অচেতন জীবন রাশি গণ্য করে, মানুষের শিশুর চেয়েও অসহায় ভেবে নিয়ে যত্ন করেন। অন্যদিকে নবীন হিমাংশু মালী বুদ্ধির শখ নিয়ে বাগান রক্ষণা-বেক্ষণে মনোযোগী হতো। সে অঙ্কুর গজানো, কিশলয় দেখা দেওয়া, কুঁড়ি ধরা, ফুল ফোটা- এসবই গভীর আগ্রহ সহকারে নিরীক্ষণ করত। প্রকৃতি-প্রেমিকদের মধ্যে এমন ভিন্নত্ব স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ধরা পড়া এবং তাঁর সেই দেখা চিত্রিত হয়ে রূপ নেয় এমন গল্পে যার স্বাদ ভিন্নতর।

দৈব ও ঈশ্বর বিশ্বাসী সৎ, সরল, অশিক্ষিত মানুয় রাইচরণ। স্রষ্টার সৃজন- নৈপুণ্যে সেই মানুষটি পাঠকদের অকপট শ্রদ্ধা কেড়ে নেয় গল্পের দুনিয়ায় অসংখ্য চরিত্র-মাঝে হারিয়ে না গিয়ে। সে বিশ্বাস করেছিল, ঈশ্বরই তার জমি প্রভুর হারিয়ে যাওয়া শিশু ‘খোকাবাবু’কে তার ঘরে খোকা করে পাঠিয়েছে। সে তাই নিজের সন্তানকে দূরে দূরে রেখে পিতৃহৃদয়ের সকল দুর্বলতাকে জয় করে মনিবের কাছে নিয়ে গিয়ে বলে যে, সেই শিশুই তাঁর হারিয়ে যাওয়া সন্তান। মনিব তাকে ভুল বোঝে। শিশু চুরির অপরাধে অপরাধী ভাবে। সে প্রভুর কাছে থাকতে চায় সন্তানের সংস্পর্শে থাকতে পারবে ভেবে। তার সে আর্জি খারিজ করে দেন মনিব। মনের দুঃখে সে বিদায় নেয়। ধনবান মনিব তার গাঁয়ের ঠিকানায় কিছু অর্থ পাঠিয়ে দেন। সে অর্থ ফেরত আসে। সংসার জীবনের বিচিত্র ধরনের চরিত্রদের মাঝে রাইচরণের মতো এমন প্রভুভক্ত, নির্লোভ চরিত্র বিরল। ‘খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাইচরণ তাই সামান্য হয়েও অসামান্য; সাধারণের মাঝে অসাধারণ একটি মানুষ।

রবীন্দ্র-দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে বেশ কিছু স্বতন্ত্র স্বভাবা মানবী-চরিত্র। ‘অনধিকার প্রবেশ’ গল্পের জয়কালী তাদের মাঝে অর্কষণীয় নানা দিক দিয়ে বিচারে। একাধারে তিনি কঠিন, উন্নত, স্বতন্ত্র সকলের কাছে। অন্যদিকে তিনি রাধানাথ জীউর মন্দিরের রক্ষয়িত্রী হিসাবে সুকোমল, সুন্দর, অবনম্র। স্ত্রীচরিত্র হিসাবে তিনি অনন্যা মানবীকুলে তো বটেই সমগ্র মনুষ্য সমাজেও। তিনি অন্যায়কারীর প্রতি যতখানি নিষ্ঠুর হতে পারেন ততধিক কোমলপ্রাণ হতে পারেন অসহায় প্রাণীদের প্রতি। তাই যে মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার কাজে তিনি কঠোরস্বভাবা রূপে পরিগণিত হয়েছিলেন সকলের কাছে, সেই মন্দিরের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করা প্রাণ ভয়ে শংকিত একটি শুকরকে তিনি রক্ষা করলেন নিজেকে মিথ্যা ভাষণের অপরাধী সম্পন্ন করেও। এমন একটি বলিষ্ঠ আত্ম-প্রত্যয়ী চরিত্র-চিত্রণের পশ্চাতে স্রষ্টার মনুষ্য-চরিত্র পাঠের দক্ষতাই যে ক্রিয়াশীল হয়েছে তা গল্প পাঠশেষে পাঠক মাত্রেরই উপলব্ধিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরিবারের নাগপাশ ছিন্ন করা বিদ্রোহী দুই মানবীকে তাঁর রচিত একই গল্পে মেলে। তাদের একজন পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছে; কিন্তু অন্যজন তাদের নজর এড়িয়ে গেছে। তারা হলো স্ত্রীর পত্র গল্পের মৃণাল ও বিন্দু। মৃণাল বহুল-আলোচিত চরিত্র। বিন্দুর চরিত্র নিয়ে কেউ কথা বলার আগ্রহ দেখায় নি। অথচ বিন্দু, অতি সাধারণ একটি দরিদ্র ঘরের কন্যা, পাগল স্বামীকে বরণ করে নিতে না পেরে মৃত্যুকে বেছে নেয়। দুর্ভাগ্যকে সে নিয়তি বলে মেনে নিতে পারেনি দুস্থ বাঙালি সমাজের আর দশ জনের মতো। সে তাই বিদ্রোহ প্রকাশ করেছে তার নিজের সাধ্যায়ত্ত পন্থায়। অন্যদিকে বাহবা কুড়ানো মৃণালকে বস্তুত পথ দেখিয়েছে বিন্দুই। তার জীবনের বন্ধন দশাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে বিন্দুর বিদ্রোহ। তারপর সে ঘর ছেড়েছে। মেয়েদের ঘরের বদ্ধাবস্থার প্রতি কটাক্ষ হেনেছে। বিদ্রোহী হয়েছে। বলতে পেরেছে অকুণ্ঠ স্বরে : ‘তোমাদের ঘরের বউয়ের যতটা বুদ্ধির দরকার বিধাতা অসতর্ক হয়ে আমাকে তার চেয়ে অনেকটা বেশি দিয়ে ফেলেছে...।’ স্রষ্টার হাতে দুটি চরিত্রই বিদ্রোহী রূপে চিত্রিত হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যবশত দুর্ভাগা বিন্দু পাঠকদের দৃষ্টিতে ধরা পড়েনি তার যথাযথ মর্যাদায়। তবুও বিন্দু-চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে গল্পকার রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি অভিনন্দন যোগ্য।

শেষ করা যাক অপরিচিতা কাহিনীর কল্যাণীর কথা বলে। সমাজ-সংসারে এই মেয়েরা আজও সংখ্যায় এত নগণ্য যে দৃষ্টিগোচর হয় না। তবুও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া যায়নি। গল্পের নায়ক চরিত্র কল্যাণীর হৃদয়ে একটুখানি মাত্র জায়গা পাওয়ার জন্য কাতর হয়েও ব্যক্তিত্বহীন হওয়ার অপরাধে অস্বীকৃতি প্রাপ্ত হয়। কল্যাণী বলে- ‘আমি বিবাহ করিব না। দৃঢ়প্রত্যয়ী সেই স্বর আজও মানবী কণ্ঠে তেমন উচ্চারিত হতে শোনা যায় না। বিবাহকে আজও মানবী জীবনে মোক্ষম বলে গণ্য হতে দেখা যাচ্ছে সমাজ-সংসারে। কল্যাণী সেই সমাজ-সত্যকে, নিজ-সম্মানকে বিকিয়ে দিয়ে, মেনে নিতে পারে নি। দেনা-পাওনা গল্পের নিরুপমা-স্রষ্টার হাতেই এমন কল্যাণী সৃষ্টি পাঠক সমালোচকদের ভাবায়। সমাজে অপরিচিতা হলেও তাকে তিনি শেষ পর্যন্ত চিনেছেন এবং মেনে নিয়েছেন জেনে তাঁকে তাঁর ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে দিতে হয়। কল্যাণীর মতো বিরল দর্শন মেয়ে-মানুষ সৃষ্টি করে তিনি সাহসী স্রষ্টার ভূমিকা অর্জন করে নিয়েছেন।

জীবন পথে চলতে চলতে সহযাত্রী মানুষদের বিবিধ রূপ দেখে স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে তাদের চিত্রিত করে তুলে ধরেছেন। তাঁর ছোটগল্পের ভুবনে তাদের সন্ধান মেলে। কতিপয় চরিত্রের কথা বলা গেল। এবার কবি-রবির মনের কথা দিয়ে উপসংহার টানা যাক। মানুষ সম্পর্কে তিনি বলেন,

হ’ক না তারা কেহ বা ভালো

কেহ বা ভালো নয়,

এক পথের পথিক তারা

লহো এ পরিচয়।

এক কথায় বলা চলে, জীবনপথে সহযাত্রী মানুষের কথা মনে রেখে চলতে পারে যারা, তারাই মানুষ। এই মানুষের প্রকাশ ঘটে বিবিধ রূপে আর রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে ধরা পড়েছে সেই সব রূপের বিচিত্রতা যার অনবদ্য প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিতে। 

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ভিক্টোরিয়া কলেজ, কলকাতা। 

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //