অর্থ নয়, নীতির মানুষ: সমাজ-দার্শনিক অধ্যাপক আনিসুর রহমান

যেসব জায়গায় পড়াশোনা করলে কিংবা পড়ালে সচরাচর আমাদের পা মাটিতে পড়ে না, চিন্তার চোখও নিজের মাটির শক্তি দেখে না, সে রকম পৃথিবীখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়েছেন, পড়িয়েছেন এবং কাজ ও গবেষণাও করেছেন। অথচ নিজের মাটি থেকে উৎপাটিত না হয়ে তিনি ক্রমে অধিকতর মাটি সংলগ্ন হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন; পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে; গবেষণা করেছেন ইয়েল ও সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। চিন্তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায়, বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু দিন যত গেছে, তাঁর নিরীক্ষাধর্মী কাজ ততই বেড়েছে বই কমেনি। যে নীতি ও আদর্শকে মানুষের মঙ্গল বলে ভেবেছেন, আজীবন তাতে নিরাপোষ থেকেছেন সুনম্রভাবেই।

ক্লাসরুমে, গবেষণার মাঠে, কর্মক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী চিন্তা আর মানুষের আত্মশক্তির সৃজনশীলতার উপর জোর দিয়ে নিজের তৈরি করা পথেই চলেছেন আজীবন। তাঁর লেখালেখির একটা বড় অংশ মানুষের আত্মিক শক্তির জাগরণের ওপর ভর করে অর্থনীতি-সমাজক্ষেত্রে জাতীয় নীতিগ্রহণের প্রণোদনায় ভরা। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম অর্থনীতিবিদ, যিনি মুক্তিযুদ্ধের পরপর লিখিতভাবে সরকারের সর্বত্র কৃচ্ছ্র পালনের সুচিন্তিত প্রস্তাবনা দিয়েছেন। ভূমি সংস্কারের মতো জটিল অথচ অতিপ্রয়োজনীয় কাজটি করার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে লিখিতভাবে প্রস্তাবনা পেশ করেছেন নিজ তাগিদেই। অর্থনীতির কঠিন-কঠোর জগতের বাইরে তিনিই এ দেশের প্রথম অর্থনীতিবিদ যিনি ভিন্নধারায়, অধিকতর শুদ্ধতার সঙ্গে, বাণী বুঝে রবীন্দ্রসংগীত গাইবার উপর জোর দিয়েছেন এবং সে ধারায় রবীন্দ্রসংগীত চর্চাও করেছেন বিপুলতরভাবেই।

অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক, সমাজ-দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, অধ্যাপক আনিসুর রহমান (জন্ম : ১৯৩৩)। আজকের দিনে জনারণ্যে খুব চেনা মানুষ হয়তো নন, কিন্তু জাতীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এক অগ্রণী পুরুষ। যে প্রোপাগান্ডা আর স্ব-প্রচারের হীনসংস্কৃতি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মহিমাকে ম্লান করে রেখেছে বহুকাল, তিনি সেই প্রচলিত পথে পা রাখেননি। নিজের মতো করে, নিজের পথ তৈরি করে, নিজের চিন্তা আর কর্মকে ছড়িয়ে চলেছেন আজ অবধি। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও 

সমাজ-দর্শনের প্রশ্নে তাই তাঁর অবস্থান একেবারেই মৌলিক এবং নতুন চিন্তার দাবি রাখে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি শিক্ষক সমিতির জাতীয় সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধে তিনি পরিষ্কার করে উচ্চারণ করেছেন, ‘জাতির উপরিকাঠামো যখন ধসে যায় এবং বিভিন্ন নতুন ধরনের স্রোত তার উপর দিয়ে বইতে থাকে, তখন অর্থনীতির গতানুগতিক বুলির কোনো কার্যকারিতা থাকে না। অর্থনীতির গতির উপরেও তখন ‘অনর্থ’কারী শক্তিসমূহ কাজ করে, যা গতানুগতিক অর্থনীতিশাস্ত্রের অন্তর্নিহিত ধারণাবলির বাইরে। এই সময়ে এই জন্য অর্থ ও ‘অনর্থ’ সব নীতিরই একত্রে বিশ্লেষণ প্রয়োজন, হয়তো অনর্থ নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। 

বাংলাদেশের বর্তমানে এই অবস্থা। তার উপরে দেশের পরিবেশ জনসংখ্যার চাপে এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার লালসার কবলে পড়ে মারাত্মক রকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে। যার ফলে অর্থনীতি তথা দেশটিই জীবন সংকটের সম্মুখীন। গতানুগতিক অর্থনীতি এই প্রশ্নে নিরক্ষর।

আমরা অ্যাংলো-মার্কিন অর্থনীতি তত্ত্বে শিক্ষিত, কিন্তু অ্যাংলো-মার্কিন অর্থনীতি মানুষের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কোনো সংস্কৃতির সঙ্গেই পরিচিত নয় বলে আমাদের উন্নতির জন্য কোনো দিকনির্দেশই করতে পারেনি। রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমরা যান্ত্রিকভাবে অ্যাংলো-মার্কিন গণতন্ত্রের ফর্মুলা আঁকড়ে ধরে আছি, যে গণতন্ত্রে জনগণ বারবার প্রতারিত হয়েই আসছে। দেশের মঙ্গলের জন্য এরূপ বিজাতীয় শিক্ষার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ব ইতিহাসের স্বাধীন মূল্যায়ন করে মৌলিক চিন্তার আলোড়ন প্রয়োজন।

জাতীয় চিন্তাকাঠামো পরিবর্তনের এই আহ্বান আজও সমানভাবে জরুরি।

দুই

শ্রেণিকক্ষে একদম আলাদারকম, ব্যতিক্রমী ধারার শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক আনিসুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে এই শিক্ষক সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ লিখেছেন, ‘অধ্যাপক মো. আনিসুর রহমানকে আমরা শিক্ষক হিসেবে পাই। প্রথম দিনের ক্লাসে তিনি আমাদের বলেছিলেন, তোমাদের কোনো টেক্সট বই নেই। তোমরা মাইক্রো ইকোনমিক্স শিখবে কৃষকদের কাছ থেকে। আর যদি টেক্সট বইয়ের দরকার হয়, এই বলে আমাদের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ঘরানার বিশিষ্ট ও জনপ্রিয় অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন এবং ইটওয়েলের লেখা একটি বইয়ের নাম জানিয়ে দেন... স্যার একদিন বলেন, ‘ধরা যাক, একটা লোক পানিতে ডুবে যাচ্ছে। সাঁতার জানেন না। তাকে উদ্ধার করতে তুমি ঝাঁপিয়ে পড়লে। তারপর তার চুলের মুঠি ধরে তাকে ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে ঠেলে তাকে তীরে তুললে। লোকটা বেঁচে গেল। এটাকে কি উন্নয়ন বলা যাবে? এক অর্থে উন্নয়ন, কারণ তিনি মারা যাননি। কিন্তু ওই লোকটাকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, আপনি কি এভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন? তিনি হয়তো বলবেন, ঠিক এভাবে নয়। অন্য একটা পথও তো ছিল। এটাকে এভাবে বলতে পারি, ধরা যাক, তুমি উদ্ধারের জন্য তার কাছে সাঁতরে গেলে। তাকে বললে, আমার এই হাতটা ধরেন এবং আমার সঙ্গে সঙ্গে তীরে চলেন। আমরা একসঙ্গে যাব। এটাই কিন্তু বেশি গ্রহণযোগ্য।’

এই যে মানবিকভাবে, সহমর্মী হয়ে মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করতে চাওয়ার ভাবনা, এই কল্যাণবাদী অর্থনীতির চিন্তাটাই ক্লাসরুম থেকে পরিকল্পনা কমিশন সর্বত্র বয়ে নিয়ে চলেছেন অধ্যাপক আনিসুর রহমান। সে কারণে জাতির মূল চ্যালেঞ্জ কী, সে প্রশ্নেও তিনি আমাদের প্রচলিত অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তকদের সাথে একমত নন। বরং তিনি ভাবেন, ‘আমাদের জনগণের সৃষ্টিশীল সত্তাকে অস্বীকার করে, এ সত্তাকে আত্মচরিতার্থের জন্য মুক্তি না দিয়ে, অসাধ্য সাধন করতে আহ্বান না করে আমরা তাদের দারিদ্র্যকেই তাদের প্রধান পরিচয় ও জাতীয় সমস্যা বলে চিহ্নিত করে এই দারিদ্র্য বিমোচনের আশ্বাস দিয়ে দিয়ে তাদের অপমানিত করছি। এই অপমান যে নিজেদেরই করছি তাও আমরা বুঝতে পারছি না। কারণ মানুষের পরিচয়কে খাটো করলে মানুষকুলের সদস্য হিসেবে নিজেরাও খাটো হয়ে যাই। 

জাতির কাছে চ্যালেঞ্জটা দারিদ্র্য বিমোচনের নয়, আমরা যে মানুষ এই বোধটি ফিরিয়ে আনার। মানুষের সবচেয়ে মৌলিক মানবিক চাহিদা মেটাবার চ্যালেঞ্জ। জাতি হিসেবে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে শুরু করার চ্যালেঞ্জ।’ [১]

তিন

অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমানের জীবনের এক মোড় ফেরানো ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ২৮ মার্চ ১৯৭১, আজকের খ্যাতিমান ফ্যাশনশিল্পী বিবি রাসেলের বাবা মোখলেছুর রহমান সিধু ভাইয়ের সহায়তায় আরেক অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের সঙ্গী হয়ে নাম বদলে (আনিসুর রহমান হন ‘আবদুর রশিদ’ এবং রেহমান সোবহান হন ‘দীন মোহাম্মদ’) জীবন-মৃত্যুর দোলায় দুলতে দুলতে বহু ভয়ংকর ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতের দিল্লিতে পৌঁছান বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, বন্ধু অমর্ত্য সেনের দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্সের কোয়ার্টারে। অমর্ত্য সেনের কল্যাণে আনিসুর রহমান ও রেহমান সোবহান দ্রুতই দেখা পান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. অশোক মিত্র এবং ইন্দিরা গান্ধীর সেক্রেটারি পি. এন হাকসারের সঙ্গে। এই দুজনের সঙ্গে তাদের মিটিংয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল ঘটে। এরপর আনিসুর রহমান হার্ভার্ডে চলে যেতে মনস্থ করেন। সে বিষয়ে তাঁর নিজের বয়ান হচ্ছে, ‘তত দিনে তাজউদ্দীন মুজিবনগরে চলে এসেছেন এবং প্রায়ই কলকাতায় আসতেন। আমি তার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি হার্ভার্ডে গিয়ে সেখানে একটা ফ্যাকাল্টি পজিশন নিয়ে সেখানে আমার কন্টাক্টদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করতে পারি কিনা। তাজউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন এবং বললেন যে আমি ভারতে থেকে মুক্তিযুদ্ধের যতটা কাজে লাগব হার্ভার্ডে আমার কন্টাক্টদের মাধ্যমে তার চাইতে বেশি কাজে লাগব।’ [২]

মুক্তিযুদ্ধ আনিসুর রহমানের সমাজ ও অর্থনীতি চিন্তায় গভীরতর প্রভাব ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। তারপর সরকারের আমন্ত্রণে নিজস্ব শর্তে দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন। এই কমিশনে কাজ করার সময় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অর্থ-পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রনৈতিক কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়। কখনো কখনো তাঁদের সঙ্গে মতৈক্য ও মতান্তরও ঘটে। সেসব স্মৃতি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের সাক্ষীও বটে। এসব অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেছেন তাঁর আত্মজৈবনিক জীবনকথা ‘পথে যা পেয়েছি’ গ্রন্থে।

৪ অক্টোবর ১৯৭৩, তিনি পরিকল্পনা কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন। তার আগের দিন ০৩. ১০. ১৯৭৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকে একটি চিঠিতে তার পদত্যাগের বিষয়ে অবহিত করেন। 

চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু, পরিকল্পনা কমিশনের অবৈতনিক সদস্য হিসেবে আমার দায়িত্বভার শেষ করার প্রাক্কালে আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু ভাবপ্রবণতার জন্য করিনি।

আপনি জানেন পরিকল্পনা কমিশনের কাজে আমি তৃপ্তি পাইনি। ছাত্রদের নিয়ে কিছু কাজ করে আশা পাচ্ছিলাম, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে মর্মন্তুদ ঘটনাবলি ঘটেছে তাতে বিরাট ধাক্কা খেয়েছি। ছাত্রদের সমাজের কাজে অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা করে যাব। কিন্তু আরও গভীরভাবে নিজেকে ও গ্রাম-বাংলাকে চিনতে চাই, তাই পুরোপুরি 

বাস্তব-সমাজ গবেষণা নিয়ে কিছুকাল থাকব।

আপনার স্নেহ মনে রাখব। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখেছি হতভাগ্য দুখী মানুষেরা আপনার দিকে চেয়ে আছে-ভাত, কাপড়ের চাইতেও তারা চায় আশ্বস্ত হতে যে, আপনি তাদের সাথেই আছেন। যে কোনো ব্যাপারে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে ডাকবেন। 

সরকারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। অনেক বেয়াদবি করেছি, ক্ষমা নিশ্চয়ই করবেন।

ইতি-আনিস।’ [৩]

চার

এরপর অধ্যাপক আনিসুর রহমান সত্যি সত্যিই গ্রাম-বাংলাকে নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করার মিশন নেন। ১৯৭৪ সালে কঠিন খাদ্যাভাব ও ভয়াবহ বন্যার সময় দেশের মানুষের দুর্দশা দেখার মধ্যেও তিনি মানুষের আত্মশক্তির চেহারা খুঁজতে থাকেন। এই আর্থ-সামাজিক-অর্থনৈতিক ও মনোজাগতিক অনুসন্ধানে অধ্যাপক আনিসুর রহমানের একটি অভিজ্ঞতা তাঁর ভাবনার জগৎ সম্পর্কে আমাদের কিছুটা আভাস দেয়। এই ঘটনাটি তিনি লিখেছেন তাঁর একটি অসামান্য বই ‘অপহৃত বাংলাদেশ’-এ।

‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে একটি রিলিফ টিমে বিশ জন ছাত্র এবং আমরা দুইজন শিক্ষক ছিলাম (আনিসুর রহমান, স্বপন আদনান)। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কিছু রিলিফসামগ্রী, যথা-আটা, দেশলাই, কিছু কাপড়, ওষুধ ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয়। এবং একটি অগ্রিম পার্টি যেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার খুব ভেতরে কিছু গ্রাম চিহ্নিত করে আসে যেখানে কোনো রিলিফ যাচ্ছিল না। আমরা ট্রেনে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়ে সেখান থেকে নৌকা করে সেই গ্রামগুলোতে রিলিফ বিতরণ করতে যাই।

বন্যায় ভাসমান গ্রামগুলোর কাছে যেয়ে বুঝতে পারি আমরা যা এনেছি তা সমুদ্রে জলবিন্দুরই মতো। গ্রামের পর গ্রাম বন্যায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বহু ঘর অর্ধেকের বেশি পানির নিচে। কোনো কোনো জায়গায় মানুষ ও সাপ বাঁচার জন্য একই গাছে ঝুলে আছে; মানুষ অনাহারে মরতে শুরু করেছে, অনেক পরিবার থেকে সমর্থ মানুষ খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে আর ফেরেনি, এ রকম অবস্থায় আমরা খুবই সামান্য রিলিফসামগ্রী যা এনেছি তা কাকে দেব?

আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, এই সমস্যা সমাধানের কোনো যোগ্যতা, এমনকি অধিকারও আমাদের নেই। স্থানীয় অধিবাসীরাই কেবল এই সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং কেবল তাদেরই এই দায়িত্ব নেবার অধিকার আছে। 

আমরা একটি গ্রামে নৌকা ভিড়াই। শত শত লোক, ছেলেমেয়ে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বাচ্চারা নৌকার দিকে ছুটে আসে ‘রিলিফ এসেছে’, ‘রিলিফ এসেছে’ বলে। আমরা নৌকা থেকে নেমে আমাদের পরিচয় দিয়ে তাদের বলি যে, আমরা অতি সামান্যই এনেছি এবং চারদিকে এত গ্রাম বন্যাবিধ্বস্ত, তাই যা এনেছি তাও সব তাদের গ্রামে দিতে পারব না। হয়তো তাদের গ্রামে তিন-চারটা মাত্র পরিবারকে কিছু সাহায্য করে আমাদের অন্য গ্রামে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমরা তো জানি না ওই তিন-চারটা পরিবার কারা। গ্রামবাসীরাই জানে। তারা সবাই কি একমত হয়ে আমাদের বলতে পারবে কোন তিন-চারটা পরিবারকে কিছু সাহায্য দিয়ে আমরা চলে যেতে পারি?

আমাদের প্রশ্নটা তাদের বোঝাতে বেশ কিছু সময় লেগেছিল। হয়তো আমাদের কথা শোনারও তাদের ধৈর্য ছিল না। বহু বাবা-মা তাদের নেংটা আধা নেংটা ছেলেমেয়েদের আমাদের দিকে ঠেলে দিয়ে বলে, ‘দ্যাহেন স্যার, পোলাডা মাইয়াডা দুই দিন তরি না খাওয়া।’ আমরা জবাব দিয়েছিলাম, ‘আমাদের দেখতে খুবই কষ্ট হচ্ছে চাচা। কিন্তু এমন পরিবারও হয়তো এ গ্রামে আছে যার বাচ্চার তিন দিন, কি চার দিন না খাওয়া। তাহলে তো তাদের কথাই আপনারা আমাদের আগে বলবেন। তাই না?’

কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর তাদের বোঝাতে পারি আমরা কী চাচ্ছি। একটা ভীষণ কঠিন সমস্যার সমাধানে তাদের কাছে সাহায্য চাইছি। সমুদ্রে জল-বিন্দুসম রিলিফসামগ্রী বিতরণের এই সমস্যাটি তাদের নিজেদেরই সমস্যা বলে গ্রহণ করতে আহ্বান করছি এবং এই সমস্যার সবচেয়ে মানবিক সমাধান তারা দিতে পারবে এই চ্যালেঞ্জ তাদের করছি।

আস্তে আস্তে কলরবের সুর পাল্টাতে থাকে। আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয় তাদের মধ্যে। কোন পরিবারে অনাহার দীর্ঘতম?

প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ করে উত্থাপন করি, ‘যদি এই গ্রামে একটিমাত্র পরিবারকে সাহায্য করে আমরা অন্য গ্রামে চলে যাই তাহলে সেই পরিবারটি কারা? আপনারা তো তাদের জানেন। আপনারা সবাই একমত হয়ে তাদের চিহ্নিত করতে পারবেন না?’

কলরব এখন ফোকাসড হয়ে সুশৃঙ্খলিত হয়ে আসে। কয়েকটি পরিবারের নাম নাড়াচাড়া করে একটি পরিবারের কথা সবাই আমাদের বলে, ‘আপনারা এই পরিবারডারে সাহায্য করি যাইতে পারেন, আমরা একমত।’

আমরা তবু সেই পরিবারটির নাম সবার কাছে ঘোষণা করে বলি, ‘এই প্রস্তাবএই পরিবারটিকে সাহায্য করে আমরা যদি চলে যাই আপনার কি বলবেন যে, আমরা অন্যায় করেছি?’

‘আমরা রাজি।’

সেই পরিবারটিকে নৌকা থেকে রেশন নেওয়ার জন্য একটা স্লিপ দিয়ে বলি, ‘যদি আর একটা পরিবারকে সাহায্য করতে পারি তা হলে সেটি কোনটি?’ ঠিক তেমনিভাবে সবাই আলোচনা করে আর একটি পরিবারকে দেখিয়ে দেয়।

এমনিভাবে চারটিমাত্র পরিবারকে রেশনের স্লিপ দিয়ে আমরা বলি, ‘এবার আমাদের অন্য গ্রামে যেতেই হবে। আপনারা আমাদের দেখিয়ে দিতে পারবেন কি আশপাশের কোন গ্রামে আমরা যাব, যেখানে আপনাদের মতো কিংবা আরও বেশি খারাপ অবস্থা?’

সবাই আমাদের দেখিয়ে দেয়, ‘হেই গ্রামে যান।’

সবাই আমাদের সঙ্গে নৌকা পর্যন্ত আসে। আমাদের বলে, ‘আপনারা অন্যরহম রিলিফের টিম। আল্লায় আপনাগো রহম করুক।’

অধিকাংশ গ্রামবাসীকেই অনাহারে রেখে আমরা পরবর্তী গ্রামের দিকে নৌকা ঠেলি।

এইভাবে সাত-আটটি গ্রামে আমাদের রিলিফ অপারেশন চলে। প্রতিটি গ্রামে একই অভিজ্ঞতা। বন্যায় বিধ্বস্ত অনাহারী গ্রামবাসী। প্রথমে সকলেই ছুটে আসে রিলিফ এসেছে বলে। আমাদের চ্যালেঞ্জ বুঝতে কিছু সময় লাগে। নিজেদের ছেলেমেয়েদের সামনে ঠেলে সবাই আমাদের কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করে অন্যদের ডিঙিয়ে রিলিফ পাওয়ার আশায়। কিন্তু কৃপাদৃষ্টি না দিয়ে আমরা তাদের দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টি ফেলি। যখন চ্যালেঞ্জটা তারা বুঝতে পারে তখন আস্তে আস্তে কলরবের ফোকাস ঘুরে যায়। সবাই একমত হয়ে আমাদের দেখিয়ে দেয় কোন পরিবারগুলো সবচেয়ে বিপর্যস্ত, যাদের সবচেয়ে আগে রিলিফ দরকার।’’

পাঁচ

আনিসুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান (হাফিজ) মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচ, তিনিও অর্থনীতির শিক্ষার্থী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, পরে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পাস করে সিভিল ব্যুরোক্র্যাট হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। পেশাজীবনে হাফিজুর রহমানের নীতিপরায়ণতার কথা কিংবদন্তির মতো লোকের মুখে মুখে ফিরত বলে আত্মজীবনীতে লিখেছেন আনিসুর রহমান। সম্ভবত বাবার সেই গুণ আনিসুর রহমানকেও দারুণভাবে সঞ্চারিত করে থাকবে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের ভেতরের শক্তির অধিকতর গুণমুগ্ধ করে তোলে। আনিসুর রহমান তাঁর এসব অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, ভাবনা ও বিশ্লেষণের কথা নিয়ে অনেক ধরনের গ্রন্থ রচনা করেছেন। আমরা আজকাল প্রায়ই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে যে অন্তরের জাগরণকে-কাল্পনিক আদর্শবাদকে, নিয়ে মুখে ফেনা তুলি, সম্ভবত আনিসুর রহমানই একমাত্র মানুষ, যিনি তার লেখায় সেটাকে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। মুক্তিযুদ্ধ মানুষের অন্তরলোকের কী পরিবর্তন ঘটিয়েছিল, বাস্তবে আমরা জনস্বার্থে কিংবা পরার্থপরতায় অথবা সমষ্টির মঙ্গল আকাক্সক্ষায় তার কতটা ব্যবহার করতে পেরেছি, সেই রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কথক অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান। তিনি সোজা কথা বাঁকা করে বলেননি। ভয়ে, জড়তায়, সুবিধাবাদের আশ্রয়ে ইতিহাসের সত্যকে নানা মোড়কে ভরে নানা আলো-ছায়ায় পরিবেশন করেননি। এ কথা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না, তিনিই আমাদের দেশের একমাত্র নিরীক্ষাধর্মী অর্থনীতিবিদ, যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের পতন-পচনের কথা হিম্মতের সঙ্গেই বলতে পেরেছেন, নিজের বিবেকের সাথে বেইমানি না করেই। বঙ্গবন্ধু, এমনকি তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষের শক্তিমত্তা বুঝতে হলেও আনিসুর রহমানের লেখার কাছেই আমাদের ফিরতে হবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের দিনে তিনি বাংলাদেশের নতুন জেনারেশনের কাছে অত পরিচিত নন, তার মিডিয়াবিমুখ স্বভাবের কারণে। তার লেখাও প্রায় অপঠিত। কিন্তু আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের পঠন-পাঠনের আয়োজনে তার রচিত গ্রন্থগুলোকে পাশে ঠেলে রাখবার জো নেই। তার বইগুলো স্ব-নামেই ব্যখ্যাত-‘উন্নয়ন জিজ্ঞাসা’, ‘অপহৃত বাংলাদেশ’, ‘পিপলস সেলফ ডেভেলপমেন্ট’, ‘অসীমের স্পন্দন-রবীন্দ্রসংগীত বোধ ও সাধনা’, ‘যে আগুন জ্বলেছিল-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ’, ‘সঙ্গস অব টেগোর, ফিলসফি, সিলেক্টেড ট্রানশ্লেশনস, পেইন্টিংস’, ‘পার্টিসিপেশন অব দি রুরাল পুয়োর ইন ডেভেলপমেন্ট’, ‘মাই স্টোরি অব ১৯৭১’, ‘একুশে ও স্বাধীনতা : বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং সমাজবাস্তবতা’, ‘পথে যা পেয়েছি-১’, ‘পথে যা পেয়েছি-২’, ‘দ্য লস্ট মোমেন্ট : ড্রিমস উইথ অ্যা নেশন বর্ন থ্রু ফায়ার’ ইত্যাদি।

ছয়

নব্বইয়ের কোঠায় পা রাখা অর্থনীতিবিদ, সমাজ-দার্শনিক আনিসুর রহমানের চিন্তা এখন আমাদের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক, কেননা সারা বিশ্বে প্রচলিত উন্নয়ন চিন্তা প্রকৃত অর্থে মানুষের মুক্তি দিতে সমর্থ হচ্ছে না। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র নিয়েও চলছে বহুবিধ বিতর্ক। বেশি উন্নয়ন কম গণতন্ত্র, না কম উন্নয়ন বেশি গণতন্ত্র, সেই বিতর্কও চলছে হরহামেশা। প্রতিদিন আমরা দেখছি, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যারা কাজ করছেন, তারা যেভাবে ভাবছেন, গণমানুষের ভাবনার সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক। যারা ভাবছেন, যারা পরিকল্পনা করছেন, যাদের জন্য করছেন-ভাবছেন, তারা প্রকৃতই দুই মেরুর বাসিন্দা। ফলে সদিচ্ছা থাকলেও জ্ঞানগত ও প্রক্রিয়াগত একটা ব্যবধান ঘুচছে না। সেটা একাডেমিক জগতেও, বাস্তব কর্মজগতেও। উন্নয়ন ডিলেমার এই ব্যবচ্ছেদ জ্ঞান ও স্বপ্ন দিয়ে সঠিক পথ পাচ্ছে না। সম্ভবত সে জায়গাতেই আমরা আনিসুর রহমানের সমাজ-দর্শনগত ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। সেখানেই তিনি অধিকমাত্রায় প্রাসঙ্গিক। 

কেননা তিনি বলছেন, ‘উন্নয়নের অর্থ মানুষের সৃষ্টিশক্তির মুক্তি এবং এই মুক্তির পরিকল্পনাই হলো উন্নয়ন পরিকল্পনা। কতগুলো রেলওয়ে ওয়াগন আমদানি করতে হবে, কত মাইল রাস্তা তৈরি করতে হবে এবং কতখানি জমি দেশি ধানের চাষ থেকে উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষে আনতে হবে, এগুলো সব উন্নয়ন অ্যাকাউন্টিংয়ের কাজ, যে কাজ দক্ষ অ্যাকাউন্ট্যান্টরা করবেন। পরিকল্পনাবিদের কাজ মানুষের আত্মা যে দরজায় আঘাত করছে, তা কী করে খোলা যায় তার পরিকল্পনা করা। গ্রামে যেতে হবে নিজেদের শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে এবং সত্যিকার উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য যে পরিসংখ্যান প্রয়োজন তা সংগ্রহ করতে-মানুষের এবং তার মন ও মানসের পরিসংখ্যান। আট থেকে দশজনের গ্রুপে ভাগ হয়ে যান, র‌্যানডমভাবে তিনটি গ্রাম বেছে নিন এবং প্রতিটি গ্রামে এক মাস করে থাকুন। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মেঝেতে একটি মাদুর পেতে নিন, মশা সহ্য করতে না পারলে একটি মশার কয়েল রাখুন-এর বেশি নয়। গ্রামে গ্রামবাসীদের মতো থাকুন, তাঁদের সঙ্গে দিনে কয়েক ঘণ্টা করে মাঠে কাজ করুন, কাজ করতে করতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন, অন্য সময় কথা বলুন তাঁদের একেক জনের সঙ্গে এবং তাঁদের একেকটি গ্রুপের সঙ্গে। সন্ধ্যার পর যতক্ষণ সম্ভব বাইরে থাকুন। রাত্রি যখন গভীর হতে থাকবে, তখন দিনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গ্রামের সামাজিক মানস আপনার কাছে প্রতিভাত হতে থাকবে। তখন, কেবল তখনই, বাংলার চাষির সম্ভাবনা আপনার কাছে ধরা পড়বে। এভাবে তিনটি গ্রামে থাকুন এবং আর একটি মাস একটি শিল্পাঞ্চলে থাকুন, শ্রমিকদের সঙ্গে। এই শ্রমিকেরাই-কোনো ফ্যাক্টরি বা মেশিন নয়-আরও যথাযথভাবে বলতে হলে এই শ্রমিকদের মন ও মানসই আমাদের শিল্পের ইতিহাস সৃষ্টি করবে। এই মন ও মানসকে, এর ভেতরে যে শক্তি আর কল্পনা লুকানো আছে, তাকে স্টাডি করুন-সে যখন সকালে ফ্যাক্টরিতে যায়, তখন তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এবং তার অপ্রস্তুত কথাবার্তা শুনতে শুনতে, ফ্যাক্টরিতে সে যখন কাজ করে তখন তার কাজে একটি হাত এগিয়ে দিয়ে আবার তার কথা শুনতে শুনতে এবং তারা ইতিহাস সৃষ্টি করতে কোথায় বাধা পাচ্ছে তার খোঁজ করুন।

চার মাস পর ফিরে এসে খসড়া পরিকল্পনাটি আর একবার দেখুন। আপনারা তখন এটিকে বদলাতে চাইবেন, আর যতখানি বদলাতে চাইবেন, তা আপনাদের আজকের অক্ষমতার পরিমাপ দেবে।’ [৪]

সাত

বাংলাদেশ আজ রাজনীতি ও সমাজ চিন্তার এক দৈন্য দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। তার সংকট যতটা দেখা যাচ্ছে, অদৃশ্য তার চাইতে অনেক বেশি। কেননা নৈতিকতার সংকট এখন শুধু রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিরই নয়, সেটা চিন্তার মৌলিক জায়গাতেও আঘাত করেছে। ফলে যাদের জন্য আমরা উন্নয়ন করছি বলে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছি, সেই উন্নয়নে তাদের নিজেদের কোনো ভাবনা-বক্তব্য-চিন্তার জায়গা নেই, নেই তাদের আস্থাও। ফলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন হচ্ছে তাদের প্রকৃত অংশগ্রহণ ছাড়াই। যারা পরিকল্পনা করছেন, তাদের কোনো দুরভিসন্ধি যদি নাও থাকে, তবুও জনমানুষের ভাবনা আর আত্মজাগরণের শক্তি সম্পর্কে শ্রদ্ধা-বিশ্বাস ছাড়াই, তারা যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন, তা যাদের জন্য করা হচ্ছে তাদের মনে জায়গাও পাচ্ছে না। এই সংকট আমাদের উন্নয়নের ব্যয়ই শুধু বাড়াচ্ছে না, সামাজিক বিশ্বাসের জায়গাতে বড় সংকট তৈরি করছে। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বিশ্বাসের মতো সামাজিক পুঁজির ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে জাতির মনস্তত্ত্বে একটা বড় ক্ষত তৈরি করছে। এই যে বিপদ আমরা প্রতিনিয়ত বুঝে অথবা না বুঝে আহবান করছি, এই বিপদের কথা প্রথম বড়ভাবে বুঝেছিলেন অর্থনীতিবিদ, সমাজ-দার্শনিক আনিসুর রহমান। আবার এই বাড়ন্ত জাতীয় সংকট থেকে মুক্তির নিজস্ব পথও বাতলে দিয়েছেন তিনি তার লেখায় ও কথায়। সে কারণেই অধ্যাপক আনিসুর রহমানকে নতুন করে আবিষ্কার করাটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। 


লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক


তথ্যসূত্র

১। অপহৃত বাংলাদেশ। মোঃ আনিসুর রহমান। দি ইউনিভার্সটি প্রেস লিমিটেড। ১৯৯৩। পৃষ্ঠা : ১৫৬

২। পথে যা পেয়েছি-১। মোঃ আনিসুর রহমান। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। জুলাই ২০০২। পৃষ্ঠা : ১০৭

৩। পথে যা পেয়েছি-২। মোঃ আনিসুর রহমান। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। জুলাই ২০০৪। পৃষ্ঠা : ৯৫-৯৬

৪। অপহৃত বাংলাদেশ। মোঃ আনিসুর রহমান। দি ইউনিভার্সটি প্রেস লিমিটেড। ১৯৯৩। পৃষ্ঠা : ৮৯-৯০

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //