মুর্শিদাবাদনামা

ভ্রমণের কথা উঠলেই বাঙালির কেমন হিল্লি-দিল্লির কথা মনে হয়। গড়পড়তা বঙ্গ সন্তানের কথা বলছি। রামনাথ বিশ্বাস আর কজন হয় যে সাইকেলে বিশ্ব জয় করে শেষ অবধি ব্রাজিলের মেয়ের প্রেমে পড়ে সেখানেই থিতু হবেন।

সাধারণ, পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালির একসময় ছিল দেওঘর, কার্মাটর, মধুপুর, হাজারিবাগ, এখন অনেকেরই পকেটে রেস্ত এসেছে বলে সে কাশ্মীর, গুজরাট কিংবা মানালি যেতে চায়।

আর একটু যারা সচ্ছল, তারা হালে ছুটিছাটা হলেই হয় দুবাই, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ড ছুটছেন। উৎসব আসতে না আসতেই কাগজের পাতায় বড় বিজ্ঞাপন, চলুন পূজার ছুটিতে ফুকেট ঘুরে আসি। টিভি চ্যানেলেও সেই রঙিন হাতছানি ফুকেট কিংবা দুবাই, সিঙ্গাপুর ভ্রমণের।

কেল্লা নিজামতের ভেতরে অবস্থিত নবাব ওয়াসি আলি মির্জা নির্মিত ওয়াসিফ মঞ্জিল প্রাসাদ।

আজকাল এক স্টাইল হয়েছে প্যাকেজ ট্যুর। সাত দিনে চট্টগ্রাম সমুদ্র, সঙ্গে ঢাকা আর কুষ্টিয়ায় লালন শাহর মাজার বা চলুন যাই থাইল্যান্ডের সমুদ্র তীরে নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। আমি বাপু রাহুল সাংকৃত্যায়নের সাবেক শিষ্য। রাহুলজি বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র লোক যিনি ভবঘুরে শাস্ত্র লিখেছেন। সে বই যারা এখনো পড়েননি তাদের জন্য করুণা হয়।

আমি বাবা ওই দীঘা, পুরি, দার্জিলিং যাব শুনলেও কেমন ময়ূরের মতো নেচে নিই। আর এ তো চলেছি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার একদা রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে। মুর্শিদাবাদ শুনলেই কেমন যেন নবাবি বোলবোলার কথা মনে পড়ে। এটা অবশ্য আমাদের প্রায় সবার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। আশৈশব আমরা জেনে এসেছি ইতিহাস হচ্ছে শুধুই রাজরাজড়ার, নবাব বাদশাহর। আমরা সিরাজউদ্দৌলার, মীরজাফরের প্রাসাদ দেখতে ছুটি।

অথচ যে সাধারণ সিপাহি রাজায় রাজায় যুদ্ধে শহীদ হলেন, কখনো ভুলেও প্রশ্ন করেছি যে সে ছেলেটির নাম কী? কোথায় ছিল তার বাসা? আপনি প্রশ্ন তুলবেন যে অত বড় যুদ্ধে কতজনের প্রাণ গেছে তা কি আর এত বছর পর জানা যায়! পলাশীর যুদ্ধে প্রাণ কোনো পক্ষেই খুব একটা যায়নি। তর্জন গর্জন ছিল অনেক। শেষ অবধি লড়াইয়ের আগেই তো কেল্লাফতে।

হাজার দুয়ারী প্রাসাদ।

নবাব পক্ষের মোহনলাল, মীরমদন মারা যেতেই হাত গুটিয়ে মীরজাফর পুরো খেলাটা তুলে দিলেন ক্লাইভের হাতে। জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ, মীরজাফর সবার বিশ্বাসঘাতকতায় চিরকালের মতো নিভে গেল এদেশের স্বাধীনতার দীপ। চিরকাল ঠিক নয়, ১৯৪৭ সালের উপমহাদেশের ক্ষমতা হস্তান্তর অবধি। এক হিসেবে চিরকালই। কারণ পলাশীর যুদ্ধে যে সীমারেখা এদেশে, অখণ্ড বঙ্গে তো বটেই, তা তো আর কখনোই ফিরে এলো না।

সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে অনেক কথা শোনা যায়। ব্যভিচারী, দুর্বিনীত, অস্থির চিত্ত। সব ঠিক না হলেও কিছু সত্যি নিশ্চিত। অল্প বয়সে দাদু আলীবর্দী খাঁর নাতি হয়ে বিরাট সাম্রাজ্যের দায়িত্ব পেলে একটু আধটু মাথা না ঘোরাই তো আশ্চর্যের। এখনকার রাজনীতিবিদদের ছেলে-মেয়ে, ভাইপো-ভাইঝি-যারাই পারিবারিক পরিচয়ে ক্ষমতা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে কজন মাথা ঠিক রেখেছেন তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে।

কিন্তু সিরাজ একবগ্গা ছিলেন এক ব্যাপারে। আলীবর্দী খাঁ মৃত্যুর আগে নাতিকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, ইংরেজদের কখনো মাথা তুলতে দিও না। তাই দাদুর কথা মেনে সিরাজউদ্দৌলা যেটুকু সময় পেরেছেন সেটুকু সময় জীবন বাজি রেখে ইংরেজ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। আমাদের ট্রেন পলাশী স্টেশনে থামল। সেই সময়, সেই আমবাগান কিচ্ছু কোথাও আর নেই। কালের গর্ভে ব্যাটল অব পলাশী শুধু থেকে গেছে স্মৃতি হয়ে।

লালবাগে ভোর হচ্ছে। আজ মহরম। নবাব বাড়ি, ইমামবাড়া, কেল্লা নিজামতের ঘুম ভেঙেছে। কাল থেকেই মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে লোক ভিড় জমিয়েছে লালবাগে। এই কেল্লা নিজামতের গেট দিয়েই মীরজাফরকে নতুন নবাব পদে বসাতে ক্লাইভ ঢুকেছিলেন। তখন গেটের ওপরে ছিল নহবতখানা। কে জানে পলাশী যুদ্ধের পরদিন সানাইয়ের সুরে কোনো বিষাদ ছিল কিনা!

কেল্লায় ঢুকে সামনে আসিফ মঞ্জিল। উল্টো দিকে গঙ্গা। তার পাশে চমৎকার স্থাপত্যের ব্যান্ডস্ট্যান্ড, লোকমুখে এখন হাওয়া মহল। হাঁটতে হাঁটতে নতুন করে দেখছি পুরনো এক সাম্রাজ্যের ভগ্নাংশ।

আমার পথপ্রদর্শক ছেলেটি এক তরুণ অধ্যাপক ফারুক আবদুল্লাহ। ওর মতো ছবি তোলার দক্ষতা খুব কম দেখেছি। নবাব বাড়ির অলিগলি, অন্ধিসন্ধি ওর মুখস্থ। তাড়াতাড়ি পা চালাচ্ছি। ইমামবাড়া থেকে মিছিল বের হবে। দুধারে লোকজন। ছোটখাটো অজস্র হোটেল, চায়ের দোকান। লক্ষ্নৌ আর এই মুর্শিদাবাদ, মহরমের এত জমজমাট ভিড় ভারতের আর কোথাও হয় না। এমনিতেই এদেশে শিয়া সম্প্রদায়ের লোক কম। তার ওপর ইদানীং মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ কেউ এই তাজিয়া মিছিল পছন্দ করছেন না।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মিত সফেদ মসজিদ। 

এখন সকাল ৮টা। হাজারদুয়ারীর সিঁড়ি লোকারণ্য। ওই, ওই যে তাজিয়া বের হচ্ছে ইমামবাড়া থেকে। কালো পোশাক। আস্তে আস্তে মিছিল বলছে, হায় হাসান হায় হোসেন। কলকাতায় মহরমের মিছিলে উৎকট চেঁচামেচি থাকে। এখানে পরিবেশ ভাবগম্ভীর। নবাবি নেই। কিন্তু এখনো তার আভিজাত্য থেকে গেছে। দুলদুলকে নিয়ে মিছিল এগোচ্ছে।

পুলিশ, জনতা, মিডিয়া সব মিলিয়ে পুরোপুরি শোকের দিন হলেও, মেজাজ উৎসবের। কেল্লা, ইমামবাড়া, হাজারদুয়ারী, একটু দূরের মীরজাফরের প্রাসাদ, যাকে লোকে এখনো ঘেন্না করে। শীর্ণ ঘোড়ার গাড়ি চেপে যাওয়ার সময়ে বাবা ছেলেমেয়েকে দেখায়, এই দ্যাখ নেমকহারাম দেউড়ি। মীরজাফরের প্রাসাদ। একটা কথা পরিষ্কার, কী সে যুগে, কী এ যুগে বেইমানদের সামনে অনেক সময়, নানা কারণে লোকে হেঁ হেঁ করলেও পছন্দ মোটেও করে না।

এই বিপুল ঐশ্বর্যের মাঝে সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি কিন্তু কিছু নেই। শুধু গঙ্গার ওপারে সিরাজের কবর আর কেল্লা নিজামতের ভেতরে এক সাদামাটা সাদা মসজিদ। বলা হয়, সিরাজউদ্দৌলা বানিয়েছিলেন। এছাড়া বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাবের অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না সারা মুর্শিদাবাদে। সিরাজউদ্দৌলা শুধু থেকে গেছেন জনতার মনে। লোকগাথা, লোকবিশ্বাস আর পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।

মুর্শিদাবাদের রমরমা আঠারো শতকের প্রথম দিকে। তার আগে পাল, সেন যুগে, কিংবা তারও আগে মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধি থাকলেও নবাব আমলের মুর্শিদাবাদের লা জবাব। আয়তনে, জৌলুস ও আড়ম্বরে মুর্শিদাবাদের তুলনা করা যায় শুধুমাত্র লন্ডনের সঙ্গে। একথা বলেছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ। হাতির দাঁতের কাজ, কাঁসা, ডোকরা শিল্প আর পশমের জন্য মুর্শিদাবাদের খ্যাতি ছিল জগৎজোড়া।

পশমের কাপড় ছিল মসৃণ। এমন মসৃণ তা নিয়ে এক গল্প না বলে পারছি না। ঔরঙ্গজেব তখন দিল্লির বাদশাহ। একবার রাজসভায় তার মেয়ে গেছে আব্বুর রাজকার্য দেখবে বলে। প্রিয় কন্যাকে দেখে প্রথমে খুশি হলেও, পরক্ষণেই সবার সামনে বেশরম বলে মেয়েকে ধমক দিলেন। শাড়ির মধ্য দিয়ে নাকি মেয়ের শরীর দেখা যাচ্ছে।

মেয়ে তখন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বাবাকে বোঝাল, যে আমি একটা নয়, সাতটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে এসেছি। এমন ছিল মুর্শিদাবাদের পশম শিল্প। আগে নাম ছিল মকসদ্রাবাদ। ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে পাট গুটিয়ে এখানে এসে বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের অনুমতি নিয়ে দেওয়ান, একদা গরিব ব্রাহ্মণ সন্তান, পরে ইসলাম কবুল করা মুর্শিদকুলী খান বসতি স্থাপন করে নিজের নামে জায়গার নাম দিলেন মুর্শিদাবাদ।

সে নবাবি রমরমা, বলাই বাহুল্য আর নেই। তবুও যেতে যেতে পুরনো কিছু ঐশ্বর্য মাঝেসাঝে চোখে পড়ে। তবে প্রথমেই বলেছি, মুর্শিদাবাদ মানেই তো আর নবাব বাদশাহর দিনলিপি নয়। আমরা শুধু রাজরাজড়ার কথাই বলি ইতিহাসে। অথচ আসল ইতিহাসের কারিগরেরা চিরকাল আড়ালে থেকে যায়। যাদের শ্রম, অধ্যবসায়, নিষ্ঠায় গড়ে ওঠে বিশাল বিশাল সব স্থাপত্য, প্রাসাদ, অতল জলের দিঘি, তাদের কথা ইতিহাসে লেখা থাকে না।

মুর্শিদাবাদ গিয়ে নবাবি আমল দেখুন। পারলে ঘুরে আসুন জিয়াগঞ্জ, আজিমগঞ্জ, লালগোলা, জলঙ্গী, ডোমকল, জঙ্গিপুর, ভগবানগোলা, হরিহরপাড়া এবং অবশ্যই বহরমপুর সদর। লালবাগে লালনের বিরিয়ানি বা পলসন্ডার তড়কা না খেলে জীবন বৃথা। কাশিমবাজারের কুঠি ঘুরে আসতে পারেন। লালগোলায় থেকে যান। প্রিয়াঙ্কা হোটেলের দোতলার কোণের ঘর।

সামনে সন্ধ্যা বেলায় মাছের বাজার বসে। বর্ষাকাল হলে, কপালে লেখা থাকলে পদ্মার ইলিশ পেয়ে যেতে পারেন। ওপারে রাজশাহী। সময় পেলে কাহার পাড়া, শেখ পাড়া হয়ে সীমান্ত দেখে আসতে পারেন। জিয়াগঞ্জের জেলে সমবায়ে রাত কাটান। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। হাত বাড়ালেই নদী। ওপারে আজিমগঞ্জ। রানী ভবানীর রাজত্ব। সারারাত দুই গঞ্জ জেগে থাকে। 

এদিক সেদিক বেড়িয়ে একদিন বেলডাঙা যান। এ তল্লাটের সব থেকে বড় গো হাট বসে। গামছার জন্য বিখ্যাত। বহরমপুর গিয়ে ছানাবড়া খেতে ভুলবেন না। আসলে ভ্রমণ বলতে কিন্তু মন ভ্রমণ। এত সব প্রাসাদ, কেল্লা, মন্দির, মসজিদ দেখলেন ভালো। কিন্তু ফেরার পথে যে ছোট্ট, তিরতির করে বয়ে চলা নদী, তার ওপরে যে সূর্যাস্ত হচ্ছে তাই সারা জীবন আপনার মনে থাকবে। লেখক, আমার বন্ধু মুর্শিদাবাদের মেয়ে খালিদা খানুম একটা কথা মাঝেমধ্যে বলে- “মা মরলে বাপ তাউই, ছেলেগুলো বাপের বাউই ... সোজা বাংলায় মা বাপ মরলে ছেলে মেয়ে অনাথ।”

ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল কথাটা একদিক দিয়ে মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রে খুব সত্যি। মুর্শিদাবাদের পতনের মধ্য দিয়েই কিন্তু ভারতের অন্ধকার সময় নেমে আসে। এক অর্থে নবাবের হার তো অনাথ করেই দিয়েছিল। যে মুর্শিদাবাদের রমরমা দেখে স্বয়ং ক্লাইভ লন্ডনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই মুর্শিদাবাদ আজ দেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জেলা। মেয়েরা ঘরে ঘরে বিড়ি বাঁধে। ছেলেরা অল্প বয়সেই পেটের জ্বালায় অন্য রাজ্যে কাজ করে। এক হাজার বিড়ি বাঁধলে দৈনিক মজুরি ২৭৫ রুপি।

তবুও ফরাক্কা, সুতি, ঔরঙ্গাবাদ, সামশেরগঞ্জ, ধুলিয়ান, ফারাক্কা, যেখানেই যান বাড়ির দাওয়ায়, আমবাগানে, খেলার মাঠে শুধুই বিড়ি শিল্পের রমরমা। ফারাক্কায় গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছি। সন্ধ্যা নামছে। নৌকার মাঝি কুপি জ্বালাচ্ছে। দূরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি তাল গাছ এক পা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন যেন জল মাপছে। 

ফারাক্কায় এলেই মওলানা ভাসানীর কথা মনে পড়ে। উপমহাদেশের বোধহয় একমাত্র রাজনীতিক যিনি বড় বাঁধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তখন কেউ তাঁর কথা আমল দেয়নি। এখন কত কত লোক পরিবেশ প্রশ্নে বড় বাঁধ নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন। গরিব মওলানাকে কজন আর মনে রেখেছে! নবাবি আমলের আগে থেকেই মুর্শিদাবাদের আমের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়ায়।

ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় নাকি জলের তীব্র আকাল। মজা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা সংলগ্ন গ্রামগুলোতেও ছবি কিন্তু এক। গঙ্গাও শুকনো। যে কোনো মাঝিকে জিজ্ঞেস করলেই ব্যাজার মুখে বলবে, মাছ নেই। বৃষ্টিও কম। ফলে ইলিশ মাছের দেখা নেই। তবে আম গরমে ভালোই হয়েছে।

নিজামত আস্তাবল।

প্রাক নবাবি জামানার আগে আমের খ্যাতি ছিল চুনাখালি পরগনার। তারপর ঢাকা থেকে মুর্শিদকুলী খান সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পর ধীরে ধীরে পশম, কাঁসা ও অন্যান্য বহু বিষয়ের সঙ্গে আম উৎপাদনেও শ্রীবৃদ্ধি ঘটল তড়িৎ গতিতে। নবাবেরা ছিলেন সর্ব দিক দিয়ে আমের যথার্থ সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক। তারা এই স্বর্গীয় ফলের আস্বাদে এমন মজে গেলেন যে আস্ত একটা দপ্তর বানিয়ে ফেললেন।

আম গবেষণা, সংরক্ষণ ও ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলার জন্য। সেই দপ্তরের নাম ছিল আম্বারখানা। আর দপ্তরের আধিকারিকদের বলা হতো আমতারাস। শোনা যায় সারা মুর্শিদাবাদে তখন ২৫০ প্রজাতির আম পাওয়া যেত। তবে নবাবদের জন্য ছিল স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় কোহিতুর আম। আকবর বাদশাহর বাগান থেকে এই আম বাংলায় এসেছিল।

এ আমের আভিজাত্য ও গ্ল্যামার এতটাই বেশি ছিল তা তার নামকরণের মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার। কোহিতুর পাহাড়ের নামে এ ফল। কোহিতুর সেই পাহাড়, যেখানে হযরত মুসা দৈব আলো দেখেছিলেন। সে নবাবি জৌলুস নেই। তাদের সাধের কোহিতুর এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য। যা পাওয়া যায় তার দাম ১০০০ রুপি থেকে ১৫০০ রুপি। ফলে বলাই বাহুল্য তা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

পলাশীর যুদ্ধে মুর্শিদাবাদ জৌলুস হারিয়ে ফেলেছিল। আর ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলা ভাগের জেরে সে সর্বস্বান্ত হয়েছে। একদার সুন্দরী মুর্শিদাবাদের সারা অঙ্গে এখন ক্ষত। তার অর্থনীতি ঝাঁজরা। পাট উৎপাদন প্রায় ধুঁকছে। নদী দুভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় মাছের আকাল।

যে চালের খ্যাতি ছিল দুনিয়াজুড়ে। তাও এখন ইতিহাস মাত্র। যে জনপদ ছিল গমগমে। সে এখন বাতিল ঘোড়ার মতো অবহেলিত। যেখানে ছিল বাণিজ্যিকভাবে সফল এলাকা। সেখানে আজ স্মাগলারদের বাড়বাড়ন্ত। নদী ভাঙন এখানে ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে।

নবাব ওয়াসিফ আলী মীর্জা নির্মিত বেগম মহলের অডিয়েন্স রুমের ধ্বংসাবশেষ।

আজ যে সম্ভ্রান্ত চাষি, কাল সে আক্ষরিক অর্থেই পথের ভিখারি। যাই যাই, সূর্যের আলো চরাচরে ছড়িয়ে পড়েছে। আর একটু পড়েই অন্ধকার গভীর হয়ে নামবে। ডোমকলের টলটলি গ্রামে দাঁড়িয়ে রয়েছি। চারপাশটা বড্ড শান্ত। আচমকাই এক রিকশায় চোঙা ফুঁকতে ফুঁকতে দুটি যুবক খানখান করে দিল যাবতীয় নীরবতা। সামনে পদ্মা। ওপারে রাজশাহী।

মনে হচ্ছে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায়। ওপারের লোকজনকে স্পষ্ট দেখছি। এই আলো অন্ধকারের টলটলিতে দাঁড়িয়ে পদ্মা দেখতে দেখতে মন কেমন করে উঠছে। ওপারে যে বাংলা, এপারেও সেই বাংলা।

অথচ কত কাঁটাতার, বিডিআর, বিএসএফের লাল চোখ আর আইন কানুন, গাজোয়ারি। মুর্শিদাবাদ দেখতে গিয়ে শুধু নবাবি ঐতিহ্য বা ফেলে আসা অতীত নয়। বাস্তবের এই যন্ত্রণাকেও জানতে হবে। দেখতে হবে। অনুভব করতেও হবে। না হলে কোনো জনপদের প্রাণ স্পর্শ করা আপনার পক্ষে অসম্ভব।  

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2023 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //