ইসরায়েলের প্রলয়নৃত্যে ধ্বংস গাজার ‘শাবাবিক’ চিত্রশালা

যুদ্ধ সভ্যতাকে নছনছ করে দেয়। ঐতিহ্য বিনাশে যুদ্ধের ভূমিকা অপরিসীম। আর যদি নেশা থাকে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূলের-তাহলে সে ক্ষতির বর্ণনা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনটিই ধারাবাহিকভাবে করে যাচ্ছে ইসরায়েল। তার প্রমাণ মিলল বিশ্ববাসীর সামনে আরও একবার।

গাজার শিল্পীদের আঁকা ২০ হাজার ক্যানভাস ছিল ‘শাবাবিক’ সংগ্রহশালায়। আল-শেফা হাসপাতালে ইসরায়েলি বাহিনী স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সদস্যদের ধরতে হামলা চালায়। হাসপাতালটির সঙ্গে সঙ্গে দুসপ্তাহ ধরে অভিযান চালিয়ে ধ্বংস করে ‘শাবাবিক’ চিত্রশালাটিও। 

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলি বাহিনী আল-শেফা হাসপাতালে দুই সপ্তাহের অভিযানের সময় কাছাকাছি ‘শাবাবিক’ (জানালার আরবি প্রতিশব্দ) নামে গাজার একটি বিখ্যাত ভিজ্যুয়াল আর্ট সেন্টার ধ্বংস করে। 

সমসাময়িক শিল্পের জন্য শাবাবিক কেন্দ্রে ২০ হাজারেরও বেশি শিল্প কর্ম ছিল। আর্ট নিউজপেপারের সার্ভি গেরানপায়েহ রিপোর্ট করেন যে, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের কারণে মার্চের শেষের দিকে এটি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। আক্রমণটি ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আল-শেফা হাসপাতালের দ্বিতীয় অবরোধ, যা আগে গাজার বৃহত্তম স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ছিল। কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে আসছেন যে হামাস হাসপাতালটিকে একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেটা কিনা ব্যাপক বিতর্কের বিষয়।

হাসপাতালের পাশেই ছিল শাবাবিক ফর কনটেম্পরারি আর্ট সেন্টার। নভেম্বরে পূর্ববর্তী অবরোধের সময়, কেন্দ্রটি তার তৃতীয় তলায় কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল; কিন্তু গত মাসের অপারেশন পুরো বিল্ডিংকে সমতল করে দিয়েছে। 

গত ১৫ বছর ধরে, সমসাময়িক শিল্পের জন্য ‘শাবাবিক’ গাজার শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ডিসেম্বরে ইসরায়েলি বাহিনী এই অঞ্চলের আরেকটি ভিজ্যুয়াল আর্ট ভেন্যু ধ্বংস করে, যার নাম এলটিকা গ্রুপ ফর কনটেম্পরারি আর্ট।

‘শাবাবিক’ ২০০০ সালের শুরুর দিকে তৈরি করা হয়েছিল। যখন তিনজন শিল্পী-শরীফ সারহান, বাসেল এল মাকোসুই এবং মাজেদ শালা-ইভেন্টগুলো সংগঠিত করা শুরু করেছিলেন। আর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সালে গাজা শহরে একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় কেন্দ্রটি চালু করেন। চারুকলা কেন্দ্র পরিচালনা করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। হামাস যখন ২০০৭ সালে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ইসরায়েল ও মিশর ভূখণ্ডের সীমানায় কঠোর অবরোধ আরোপ করে। সে সময় মৌলিক জিনিসপত্রের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় আর্টসামগ্রী পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবু তার মধ্যে কর্তৃপক্ষ সেমিনার, প্রদর্শনী ও কর্মশালার আয়োজন করে। এটি যুদ্ধ ও অবরোধের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের সমর্থন করার জন্য শিল্প-কেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিরও আয়োজন করে।

২০১৮ সালে কেন্দ্রটি আল-কাত্তান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সুইডিশ সরকারের কাছ থেকে তহবিল পায়। এর ফলে আর্ট নিউজপেপার অনুসারে, শাবাবিক গাজার প্রথম শিল্পী আবাসিক প্রোগ্রাম চালু করেছে। কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রটি ৫০০টিরও বেশি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছে।

ধ্বংসের সময়, স্থানটি ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম এবং ফটোগ্রাফে পূর্ণ ছিল। তাদের মধ্যে সহ-প্রতিষ্ঠাতা সারহানের তৈরি প্রায় ৫,০০০ আর্টপিস ছিল, যা ৩০ বছরের কাজের প্রতিনিধিত্ব করে। সারহান বলেন, ‘আমার সমস্ত শিল্পকর্ম, আমার সংরক্ষণাগার, আমার সমস্ত স্মৃতি এই জায়গায় রয়েছে। আমার স্ত্রী এটাকে আমার দ্বিতীয় বাড়ি বলেছিল; কিন্তু আসলে এটা ছিল আমার প্রথম বাড়ি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি সেখানে থাকতাম।’


সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //