নজরুল পাঠ কেন প্রাসঙ্গিক

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়, একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ। এই ধরনের সুবিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে যে কাজ তা কোনো কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা যায় না। কালের সীমানা অতিক্রম করে নজরুল পৌঁছেছেন সাহিত্য বোদ্ধা থেকে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে। কাজী নজরুল ইসলামের সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখনীর মাধ্যমে সংস্কারের ধরনই মূলত তাকে টিকিয়ে রেখেছে সাহিত্যের ধ্রুবতারা হিসেবে।

পৃথিবী অতি দ্রুত পুঁজিবাদের দখলে চলে যাচ্ছে। বৈষম্য শব্দটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছেয়ে গেছে। ঠিক এর বিপরীত চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছেন। নজরুল ইসলামের ছিল একটি সুশৃঙ্খল সমাজ চিন্তা। তিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে এই সমাজ, সমাজের মানুষ এবং পারস্পরিক চেতনাবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, সেটি তাকে তার কবিতায় প্রভাবিত করেছে। আশ্চর্য বিষয় হলো, সেই সময়ে তিনি যা চেয়েছিলেন আজও অগণিত মানুষ সেটাই চাইছে। খুব ক্ষুদ্র করে হলেও সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। এই যে পরিবর্তন সেটি কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তা চেতনার ফসল।

কাজী নজরুল ইসলাম বর্তমান সময়েও তাই একই রকম প্রাসঙ্গিক। একটি বিপরীত স্রোতে চলতে থাকা সমাজ ব্যবস্থাকে তিনি আমূল পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে সকলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থাকবে। আজও যখন নজরুল পাঠ করছে কোন যুবক বা যুবতী তার মনেও এ ধরনের একটি সমাজ ব্যবস্থা চিত্রায়িত হচ্ছে। ধনী-গরিবে ভেদাভেদ হবে না। কুলি-মজুরদের নিচু চোখে দেখা হবে না। অর্থাৎ সমাজ হবে সহাবস্থানপূর্ণ। অবশ্য কবি নিজেই সেকথা বলে গিয়েছেন। নজরুল তার ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় লিখেছেন : তিনি ভবিষ্যতের ‘কবি’ নন, বর্তমানেরই ‘কবি’। এই যে পৃথিবী আজ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে পূর্ণ সেই বিষবাষ্প থেকে তিনি সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। সেটি তার ব্যক্তিগত জীবন ও কবির কর্ম চর্চায় স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। কবির কবিতায় সেই ডাক গভীরভাবে ধ্বনিত হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি ডাক দিয়েছিলেন : ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন,/কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ এই যে মানুষ তত্ত্ব তা কবির হৃদয়কে আলোড়িত করে রেখেছিল আমৃত্যু। সেখান থেকে তিনি কোনো অবস্থাতেই পিছপা হননি। মজলুমের পক্ষে দাঁড়াতে শাসকের রক্তচক্ষুকেও উপেক্ষা করেছেন। 

নজরুলের অসংখ্য কবিতা আসলে প্রেরণার বীজমন্ত্র। হৃদয়ে আওড়ালেই শক্তি আসে। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে বাংলার হিন্দু মুসলমানের পক্ষ থেকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মনুষ্যত্বের সত্যকে তুলে ধরতে গিয়ে নজরুল হিন্দু মুসলমানের ঐক্য কামনা করে বলেছেন, ‘কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’ কবি ছিলেন একজন নিখাদ প্রেমিক। তিনিই বলেছেন, মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ তূর্য। কবিতায় তিনি কখনো সমাজের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন আবার কখনো প্রেম ছড়িয়েছেন। প্রেম তো যুগে যুগে প্রবহমান ধারা। সেখানেও তার মন্ত্র প্রবহমান। কবি যে বৈষম্যমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই সমাজ প্রতিষ্ঠায় আজও সংগ্রাম করতে হচ্ছে। যতদিন সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন কবির স্বপ্ন পূর্ণ হবে না। আর কবিও তত বেশি প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //