নজরুলের জেলজীবন

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সাম্যবাদের কবি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি, বিদ্রোহের কবি। কেউ কেউ তাকে স্বাধীনতার কবি বলেও উল্লেখ করেছেন। ভারতের আজাদি আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের কবিতা ও গান অনুপ্রেরণা দিয়েছে, সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে।

কবির বড় হওয়ার সময়টাতে বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা আন্দোলন। নজরুলের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে কলকাতায় কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাহচর্য তাকে মানবধর্মের পথে ধাবিত করে এবং সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত হন। পত্রিকা এবং লেখালেখির কারণে নজরুলকে দুই বার কারাগারে যেতে হয়। প্রথম বার ১৯২৩ সালে কারাগারে যান ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এবং ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ কবিতার জন্য। সে সময় এক বছরের জেল হয়, কিন্তু জেল খেটেছিলেন এগারো মাস। দ্বিতীয় বার ১৯৩০ সালে ‘প্রলয় শিখা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুলের সম্পাদনায় ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ হয়।

ধূমকেতুতে কখনো লেখেন সম্পাদকীয়, কখনো কখনো কবিতা, আবার কখনো প্রবন্ধ। ধূমকেতুর একটি সংখ্যায় কবি নজরুল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজটরাজ বুঝি না, কেননা এ কথাটার মানে এক এক মহারথী এক একেক রকমভাবে করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশিদের অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, শাসনভার থাকবে ভারতীয়দের হাতো। তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা পুঁটলি বেঁধে সাগর পাড়ি দিতে হবে।’ নজরুলের এমন লেখা সম্পর্কে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ বলেন-অনেকে হয়তো নিজেদের বৈঠকখানায় বসে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু নজরুলের মতো এমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় খবরের কাগজে কেউ দেশের স্বাধীনতার কথা তুলে ধরেছিলেন তা আমার জানা নেই। নজরুল ধূমকেতুতে একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। কবিতার কিছু পঙ্ক্তি এ রকম...‘আর কতকাল থাকবে বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী ব্যক্তি চাড়াল।/দেব শিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,/ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?/মাদিগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকিনাকি/খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।.../অনেক পাঁঠা মোষ খেয়ছিস রাক্ষুসী তোর যায়নি ক্ষুধা/আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত সুধা ।/.../ময় ভূখাহুমায়ি বলে আয় এবার আনন্দময়ী/কৈলাস হতে গিরি রাণীর মা দুলালী কন্যা আয়!/আয় উমা আনন্দময়ী।’

ঊনআশি পঙ্ক্তির দীর্ঘ কবিতা। ভীরুদের প্রতি প্রচণ্ড ধিক্কার ও ব্রিটিশদের প্রতি দুর্বার ঘৃণা আর দেশপ্রেমীদের বিদ্রোহের ডাক। সরকারের টনক নড়ল। পুলিশ আসল ধূমকেতু অফিসে। পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হলো। কবিতা নিষিদ্ধ হলো। কবির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা হলো। অনেকেই তাকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তিনি রাজি হলেন না। পরে অবশ্য কলকাতা পুলিশের চোখের আড়াল হয়েও রেহাই পাননি। কুমিল্লার ঝাউতলা থেকে গ্রেপ্তার হলেন। নিয়ে আসা হলো কলকাতায়। বিচারে রায় হলো এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কবিতা লেখার জন্য কোনো বাঙালির এই প্রথম কারাবরণ। বিচারাধীন অবস্থায় কয়েক মাস ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে। আদালতে রাজবন্দি হিসেবে নজরুল যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা পরবর্তী সময় ‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’ নামে খ্যাত। পরে বদলি করা হয় আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে কলকাতায়। জেলে বসে লেখেন বিখ্যাত কবিতা ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’।

‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে/মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে/আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে/...বাঁধ ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার ভাঙ্গা কল্লোলে!’ কল্লোল পত্রিকায় ছাপা হলো আটচল্লিশ পঙ্ক্তির এই কবিতা।

মাস কয়েক পর নজরুলকে বদলি করা হলো হুগলি জেলে। হুগলি জেলে নজরুলের রাজবন্দির মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হলো। রাখা হলো সাধারণ বন্দি হিসেবে। হুগলি জেলে নজরুল একটা গান রচনা করলেন রবীন্দ্রনাথের একটা দেশাত্মবোধক গানের প্যারোডি করে-

‘তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে/আমার এ গান তোমারি ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে।/রেখেছ শান্ত্রী পাহারা দোরে/আঁধার-কক্ষে জামাই-আদরে/বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে।/তুমি ধন্য ধন্য হে ॥’

হুগলি জেলে বসেই নজরুল লিখেছিলেন শিকল পরার গান।

‘এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল/এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।’

হুগলি জেলে নজরুল অনশন শুরু করেন। কেউ তার অনশন ভাঙাতে পারেননি। ক্রমশ স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগল। শেষে ৩৯ দিনের মাথায় বিরজা সুন্দরী দেবীর অনুরোধে অনশন ভেঙেছিলেন কবি।

এরপর কবিকে পাঠানো হলো বহরমপুর জেলে। সেখানে রাজবন্দির মর্যাদা দেওয়া হলো। এখানে কবির পরম সঙ্গী হলেন নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কবি সঙ্গীতবহুল ছোট একটা নাটক লিখেছিলেন এ জেলে বসে। এক বছরের মেয়াদ শেষ হলে বহরমপুর জেলে থেকে মুক্তি পান ১৫ ডিসেম্বর। তাকে জেল খাটতে হয়েছিল বারো মাসের পরিবর্তে এগারো মাস।

নজরুলকে দ্বিতীয় বার কারাদণ্ডের আদেশ হয় প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৩০ সালে। বিশেষ করে প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থের নবভারতের হলদিঘাট ও যতীন দাস কবিতার জন্য। তবে সে বার নজরুলকে জেল খাটতে হয়নি। হাইকোর্টে আপিল করলে কারাদণ্ডের আদেশ স্থগিত হয়। প্রলয় শিখা ব্রিটিশ শাসকদের বিচলিত করে ফেলে। বইটির ২০টি কবিতায় প্রতিবাদের ঝড় ছিল। এর মধ্যে ‘নবভারতের হলদিঘাট’ ও ‘যতীন দাস’ নামের দুটি কবিতা শাসকদের কাছে বেশি আপত্তিকর লেগেছিল। আইন অমান্য আন্দোলন নিয়ে গান্ধী ডারউইন চুক্তির আওতায় সব রাজবন্দির সঙ্গে নজরুলও মুক্তি পান।

প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থে কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়।

‘ভাঙ্গি মন্দির ভাঙ্গি মসজিদ/ভাঙ্গিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত/একই মানবের একই রক্তমেশা/কে শুনিয়ে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।’

একইভাবে যতীন দাস কবিতায় নজরুল লিখেছেন-

আসিল শরৎ সৌরাশ্বিন/দেবদেবী যবে ঘুমায়ে রয়/পাষাণ স্বর্গ হিমালয় চুড়ে/শুভ্র মৌলি তুষারময়।/./মহিষ-অসুর-মর্দিনী মাগো/জাগো এইবার খড়্গ ধরো/দিয়াছি যতীন অঞ্জলী/নব- ভারতের আঁখি ইন্দিবর।

প্রলয় শিখা কাব্যগ্রন্থের উল্লেখিত কবিতা দুটি ব্রিটিশ শাসকদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। যার ফলে কবির বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের আদেশ হয়। অবশ্য এই কারাদণ্ড থেকে শেষ পর্যন্ত নজরুল মুক্তি পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বার কারাদণ্ডের আদেশ হলেও কারাবরণ করতে হয়নি।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //