দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতি

চীনের উদ্ভাবিত করোনাভাইরানের টিকা সিনোভ্যাক। ফাইল ছবি

চীনের উদ্ভাবিত করোনাভাইরানের টিকা সিনোভ্যাক। ফাইল ছবি

গত বছরের জুলাইয়ে কভিড-১৯ মহামারি পুরো বিশ্বে তীব্র আকার ধারণ করে। এমন একটি সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা দেন ‘বিশ্বের জনমানুষের কল্যাণে’ তাদের দেশের পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে। 

এই লক্ষ্যপূরণে প্রেসিডেন্ট জিনপিং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। প্রচুর ভর্তুকি বরাদ্দ দেন এবং ১৭টি ভ্যাকসিন প্রকল্পে কাজ করার জন্য ২২টি  কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করেন। 

চীনের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ শি’য়ের বক্তব্যে বেশ আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং তারা প্রত্যাশা করেছিলেন বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ককে পুঁজি করে যতটা আগে সম্ভব চীনের এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। গত জুলাইয়ে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে ঘোষণা দেন চীনের সহযোগিতায় ডিসেম্বরের মধ্যে তার দেশ ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে’। 

কিন্তু চীনের বড় অংকের তহবিল বিনিয়োগ এবং উচ্চ প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও এই ভ্যাকসিন কার্যক্রম প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি। অন্তত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে দেশটি সাফল্যের দেখা পায়নি। বরং বণ্টন, কার্যকারিতা ও দাম নির্ধারণ নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হওয়ায় চীনের তৈরি ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে এ অঞ্চলে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। 

বিপরীতে অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তা সরবরাহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতি শিগগিরই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

নিউ হেলথ সিল্ক রোড  

কভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্বে চীনবিরোধী মনোভাবের বিষয়টি বুঝতে পেরে নিজেদের মানবতার ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের তৎপরতা শুরু করে দেয় বেইজিং। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্যের বড় ধরনের সংকট মোকাবেলায় সীমিত সক্ষমতার দরিদ্র দেশগুলোর দিকে চীন গুরুত্ব দিতে থাকে। বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এবং টেস্ট কিট সরবরাহে প্রাথমিক সফলতার পর কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করে চীন। 

গত বছর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ১৮টি দেশে পরীক্ষামূলকভাবে চীনা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়া চীনা ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যল ট্রায়ালের শীর্ষ কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে চীনের বেশ কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি যুক্ত ছিল। 

ইউরোপ থেকে এশিয়া সবক্ষেত্রে প্রশংসা পেয়ে চীন তাদের বিদেশি সহায়তা কর্মসূচিকে নতুন ‘হেলথ সিল্ক রোড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যা তাদের বিশ্বব্যাপি বহুমুখি বিনিয়োগ প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ। চীনের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিনামূল্যে এবং ভর্তুকি সহকারে ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে বিআরআই প্রকল্পে অংশ নেওয়া দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। 

মহামারির এই একবছরের মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের ৬৯টি দেশে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে চীন এবং ২৮টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যাকসিন রফতানি করেছে চীন। দুটি দিক বিবেচনা করে চীন তাদের এই ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে চীনকে দায়ী করা হয়। এখান থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার দিক বিবেচনা করেই এই স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে চীন। 

২০১৯ সাল পর্যন্তও বৈশ্বিক ওষুধ শিল্পে চীনের ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য। জাতিসংঘের সংগৃহীত ওষুধে ২ শতাংশেরও কম অবদান রাখতে সক্ষম হতো দেশটি। বিপরীতে চীনের প্রতিবেশী ভারত জাতিসংঘের এ ধরনের ওষুধ সংগ্রহ কার্যক্রমে ২২ শতাংশ এবং বিশ্বে ভ্যাকসিন রফতানিতে ৬০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে শেয়ার বাড়াতে কাজ করবে চীনের কভিড-১৯ ভ্যাকসিন এবং এই ভ্যাকসিন বিক্রি করে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উপার্জনে সক্ষম হবে দেশটি। 

বিলম্ব এবং সংশয়  

চীন তাদের মিত্র দেশগুলোতে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসের (আসিয়ান) কার্যত নেতা ইন্দোনেশিয়াই প্রথম চীনের সিনোভেক ভ্যাকসিন পায়। ডিসেম্বরের শুরুতে ১২ লাখ ডোজ এবং এ মাসের শেষের দিকে ১৮ লাখ ডোজ টিকা দেশটিতে পৌঁছায়। জানুয়ারি থেকে চীনের পাঠানো উপকরণ দিয়ে চীনা ভ্যাকসিন তৈরি শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিয়ো ফার্মা।  

তবে ইন্দোনেশিয়া বাদে এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ভ্যাকসিন তুলনামূলক অনেক কম পরিমাণে এবং বিলম্বে পৌঁছায়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে কম্বোডিয়াকে ছয় লাখ এবং লাওসকে তিন লাখ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করাা হয়। এর দুই সপ্তাহ পর থাইল্যান্ডকে দেওয়া হয় দুই লাখ টন। একই মাসের শেষের দিকে ফিলিপাইনকে ছয় লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দেরিতে এই ভ্যাকসিন পৌঁছায়। 

অন্য দিকে মিয়ানমারকে তিন লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো দেওয়া হয়নি। গত জানুয়ারিতে দেশটিতে ১৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পাঠায় ভারত। 

অন্যান্য পশ্চিমা কোম্পানির মতো চীনের ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারীরাও বিলম্বে উৎপাদন ও সক্ষমতার ঘাটতির মতো বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। জানুয়ারিতে সিনোভ্যাক তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ভ্যাকসিন তৈরিতে সক্ষম হয়। এ অবস্থায় সিনোভ্যাকের তুলনায় কম সক্ষম কোম্পানিগুলো কীভাবে চাহিদা পূরণ করবে তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। 

এছাড়া চীন তাদের একশ কোটি জনগোষ্ঠীকে সবার আগে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা বাস্তায়নের কারণে অন্যান্য দেশে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে। চীনের ভ্যাকসিনগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চীনের ভ্যাকসিনের শেষ পর্যায়ের ক্লিনিক্যল ট্রায়ালের ফল প্রকাশ না করা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সমালোচনা রয়েছে। তবে অন্য দেশে ক্লিনিক্যল ট্রায়ালে দেখা গিয়েছে, সিনোভ্যাকের কার্যকারিতা হার মাত্র ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা অন্য দেশের ভ্যাকসিনের ৯০ শতাংশ কার্যকারিতার তুলনায় অনেক কম।

প্রতিবেশী ভিয়েতনামের মতো চীনের সঙ্গে সমুদ্র নিয়ে বিবাদে থাকা ফিলিপাইনও দেশটির তৈরি ভ্যাকসিন নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি চীনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মিত্রদেশও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে শুধু চীনের ওপর নির্ভর করছে না। এর মধ্যে কম্বোডিয়া জাতিসংঘের পরিচালিত কোভ্যাক্স স্কিম থেকে ১০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পেতে বিনিয়োগ করেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডও বিভিন্ন উৎস থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করছে; তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত এবং রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎসেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া জাতিগতভাবে চীনাগরিষ্ঠ সিঙ্গাপুরও প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। 

ভ্যাকসিন প্রতিযোগিতা  

অন্যান্য শীর্ষ দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কারণে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন কূটনীতিতে চীনের প্রাথমিক অগ্রগামিতা অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাইডেন প্রশাসন তার পূর্বসূরির ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মনোভাব থেকে সরে এসেছে। তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পুনরায় সহায়তা দিচ্ছে, পাশাপাশি জাতিসংঘের কোভ্যাক্স স্কিমে দ্বিগুণ ভ্যাকসিন দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের এই কর্মসূচির আওতায় দরিদ্রতম দেশগুলোতে ২০০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

ভ্যাকসিন উৎপাদনে চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া। দেশটি তাদের তৈরি স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অনেক স্বচ্ছতা বজায় রেখেছে এবং এক্ষেত্রে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে।- আল জাজিরা

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh