দুই কোম্পানির ২ ডোজ টিকা নেয়া বেশি কার্যকর

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন

দেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ যতো মানুষ নিয়েছেন তারা সঠিক সময়ে একই টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। আবার দ্বিতীয় ডোজের টিকা অন্য কোম্পানির নিলে টিকার কার্যকারিতা থাকবে কিনা তা নিয়েও অনাস্থা রয়েছে। তবে সম্প্রতি জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রাথমিক ফলে প্রথম ডোজে আস্ট্রাজেনেকা টিকা নেয়ার পর দ্বিতীয় ডোজে বায়োনটেক-ফাইজারের টিকা নেয়া ব্যক্তিদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একই কোম্পানির টিকা নেয়া ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি দেখা গেছে৷

তবে এই গবেষণার তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি৷ সেটা করার আগে সারলান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আরো কিছু তথ্য সম্পর্কে জানতে চান৷ যেমন প্রাথমিক ফলাফলে ব্যক্তির বয়স ও লিঙ্গ কোনো ভূমিকা রেখেছে কিনা, তা জানতে চান তারা৷

গবেষণা শেষ না হলেও এখনই প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করা সম্পর্কে গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক মার্টিনা সেস্টার বলেন, প্রাথমিক ফলাফলে তারা অবাক হয়েছেন৷ সে কারণে আমরা এখন আমাদের পাওয়া তথ্য শেয়ার করছি৷ 

প্রায় ২৫০ জন ব্যক্তি গবেষণায় অংশ নেন৷ এর মধ্যে একদল অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, একদল নিয়েছেন বায়োনটেক-ফাইজারের দুই ডোজ আর তৃতীয় একদল প্রথম ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও দ্বিতীয় ডোজে বায়োনটেক-ফাইজার নিয়েছেন৷ গত জানুয়ারিকে জার্মানিতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা অনুমোদন পাওয়ার পর সবাই সেটা নেয়া শুরু করেছিলেন৷ কিন্তু এপ্রিলে কয়েকজনের রক্ত ক্লট জমার খবর আসার পর কিছুদিন শুধুমাত্র ৬০ এর বেশি বয়সিদের অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল৷ ঐ সময়টায় অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে বায়োনটেক-ফাইজার বা মডার্নার টিকা দেয়া হয়৷

গবেষকরা দুটি বিষয় জানার চেষ্টা করেছেন৷ এক, টিকা পাওয়ার পর কী পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে৷ দুই, এসব অ্যান্টিবডি কতখানি কার্যকর৷ প্রাথমিক ফলাফল বলছে, বায়োনটেক-ফাইজারের দুই ডোজ নেয়া এবং বায়োনটেক-ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা মিলিয়ে দুই ডোজ নেয়া ব্যক্তিদের শরীরে অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই ডোজ নেয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুন বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে৷

আর অ্যান্টিবডির কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বায়োনটেক-ফাইজারের দুই ডোজের চেয়ে বায়োনটেক-ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার মিশ্রণে ‘কিছুটা ভালো' ফল পাওয়া গেছে বলে অধ্যাপক সেস্টার জানান৷

স্পেনের গবেষণা

জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে একই বিষয়ে স্পেনের মাদ্রিদের কার্লোস তৃতীয় হেল্থ ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণার প্রাথমিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল৷ ৬৬৩ জন অংশগ্রহণকারীর উপর করা ওই গবেষণার ফলাফলেও জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মতোই তথ্য পাওয়া গেছে৷ তবে স্পেনের গবেষণার ফলও এখনো চূড়ান্ত নয়৷

ভবিষ্যতে বায়োনটেক-ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা মিলিয়ে টিকা দেয়া যাবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন জার্মানির অধ্যাপক সেস্টার৷

যুক্তরাজ্যের গবেষণা

যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এই টিকা নিয়ে নতুন গবেষণা হয়েছে দেশটিতে। এই গবেষণার অংশ হিসেবে দেশটির স্বেচ্ছাসেবীদের প্রথম ডোজ হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানের টিকা এবং দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে আরেক প্রতিষ্ঠানের টিকা দেয়া হচ্ছে। দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের টিকা দেয়ার পরও তা কার্যকর কি না, এটা জানতেই এমন পদক্ষেপ। 

যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষার পাশাপাশি দেশটিতে নিয়মিত কার্যক্রমও চালু রয়েছে। চলমান টিকাদান পদ্ধতিকে আরো সহজ এবং নির্বিঘ্ন করার জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুটি আলাদা টিকার মিশ্রণের ফলে হয়তো আরো ভালো সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট কমিটি অন ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশনের (জেসিভিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকা কর্মসূচিতে প্রথম ডোজ অংশ হিসেবে যে ব্যক্তি ফাইজার-বায়োএনটেকের পেয়েছেন কিংবা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পেয়েছেন, তাঁকে ওই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া উচিত হবে। এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনাও কম। যদি কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটা না জানা যায়, তিনি প্রথম ডোজ হিসেবে কোন টিকা পেয়েছেন, তবেই অন্য টিকা দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া টিকার সংকট দেখা দিলে অন্য প্রতিষ্ঠানের টিকা দেওয়া হতে পারে। বিজ্ঞানীদের এই পরীক্ষা চালানোর পেছনে কারণ রয়েছে। তা হলো, ইবোলার ক্ষেত্রে সুরক্ষা বাড়াতে এমন টিকার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছিল।

যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন ইভালুয়েশন কনসোর্টিয়াম (এনআইএসইসি) দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ রিসার্চের আট কেন্দ্রে এই গবেষণা চালাচ্ছে। বিবিসির খবর, এতে অংশ নেবেন ৮০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবী। এই স্বেচ্ছাসেবীদের বয়স ৫০ বছরের বেশি।

এই স্বেচ্ছাসেবীরা প্রথমে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা পাবেন। এরপর ১২ সপ্তাহের ব্যবধানে অক্সফোর্ডের টিকা পাবেন। অনেকের ক্ষেত্রে এর উল্টোটাও হতে পারে। এছাড়া যুক্তরাজ্য যদি এর মাঝে আরো টিকার অনুমোদন দেয়, তবে সেই টিকাগুলোও এই পরীক্ষায় ব্যবহার করা হবে।

নতুন এই গবেষণা প্রসঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রধান পর্যবেক্ষক ম্যাথিউ স্নাপ বলেন, এটা অসাধারণ একটি গবেষণা। যুক্তরাজ্য ও বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে এই গবেষণা। প্রাণীর দেহে এই পরীক্ষা অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষেত্রে ভালো সাড়া দিয়েছে। গবেষণার জন্য ওই স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর গভীরভাবে দৃষ্টি রাখা হবে। 

স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিরোধক্ষমতা কেমন সাড়া দেয়, এ জন্য নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা হবে।

তবে সময়সাপেক্ষ এই গবেষণা। সময় লাগবে ১৩ মাস। এ গবেষণা থেকে আরো কিছু তথ্য জানা যাবে। এগুলো হলো করোনার নতুন ধরনের ক্ষেত্রে টিকা কেমন কাজ করে, ৪ সপ্তাহ ও ১২ সপ্তাহের ব্যবধানে টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করা হলে কেমন সাড়া দেয়, সেটাও জানা যাবে এই গবেষণা থেকে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh