করোনার ভুয়া রিপোর্টের নেপথ্যে

এক ব্যক্তির তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এক ব্যক্তির তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দফায় দফায় লকডাউনসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারির মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় সরকার। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসলেও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনার ভুয়া রিপোর্ট। চাকরি বাঁচাতে, বিদেশ ভ্রমণে বা অন্য প্রয়োজনে দরকার করোনা পরীক্ষার নেগেটিভ রিপোর্ট। আবার অফিস-আদালতে যোগদান করবেন না, অথবা ভ্রমণে যাবেন কিংবা সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন প্রকার সুযোগ-সুবিধার আশা করছেন, এমন ব্যক্তিরাও চান করোনার ভুয়া রিপোর্ট। এই সুযোগে এক শ্রেণির প্রতারক অর্থের বিনিময়ে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে জনস্বাস্থ্যকে যেমন হুমকির মুখে ফেলছেন, তেমনি বিদেশে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এসব প্রতারকদের।

সাহেদ- সাবরিনা কাণ্ড

গত বছরের ৬ জুলাই রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়নের ভ্রাম্যমাণ আদালত। করোনার রিপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে র‍্যাব বাদী হয়ে হাসপাতালটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ইতোমধ্যে ওই মামলায় সাহেদসহ ১০ জন গ্রেফতার হন। এ মামলায় রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তােরক শিবলী ঢাকার সিএমএম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।


ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম অভিযান শেষে বলেছিলেন, করোনা টেস্টের জন্য আসা রোগীদের বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহ করার কথা ছিল রিজেন্টের। কিন্তু তারা প্রায় ১০ হাজার জনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে, প্রত্যেকের কাছ থেকে তারা টাকা নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব নমুনার অর্ধেকের বেশি পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্রতারণা। রিজেন্ট সরকারকে জানিয়েছে তারা কোভিড-রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। এই বলে তারা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ক্লেইম করেছে। অথচ অনেক রোগীর কাছ থেকেও তারা দেড় লাখ-দুই লাখ, আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিল আদায় করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছি।

রিজেন্টকে কোভিড হাসপাতালের এই অনুমতি দেয়ার আগে শর্ত ছিল এখানে যারা ভর্তি হবেন, তাদের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআইআর, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট থেকে ফ্রি অব কস্ট (বিনামূল্যে) পরীক্ষা করাবে। আর রিজেন্ট বাসায় বাসায় গিয়ে ১০ হাজারের বেশি নমুনা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৬৪ জনের নমুনা আইইডিসিআরসহ অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থেকে টেস্ট করিয়েছে। বাকি নমুনাগুলো টেস্ট না করে ভুয়া রিপোর্ট করেছে। আমরা আইইডিসিআরে রিপোর্ট ক্রসচেক করে দেখেছি, রিজেন্ট এগুলো তাদের পাঠায়নি। ভুয়া রিপোর্টের জন্য সাড়ে তিন হাজার করে টাকা নিয়েছে। আমরা দেখলাম এ পর্যন্ত সে ৩ কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছে।


অন্যদিকে, জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে করোনার নমুনা পরীক্ষার জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। গত ১২ জুলাই দুপুরে সাবরিনাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

পরে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই আদেশে বলা হয়, ‘ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকাবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়্যারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট দেয়া এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ কারণে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।’

প্রতারণার শাস্তি

আইনজীবী লোকমান তাজ জানান, প্রতারণার মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় ৭ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। আর দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় ৩ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। 

তারপরেও কেন আসামিরা প্রতারণা করে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া, অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া কারণ হতে পারে। তবে শক্তিশালী চার্জশিট এবং জোরাল প্রমাণ থাকলে এসব অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে।

বিদেশে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন

গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ থেকে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে ইতালিতে যান কয়েকজন প্রবাসী। তবে দেশটির বিমানবন্দরে পরীক্ষা করা হলে তাদের করোনা পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ আসে। ফলে তাদেরকে ইতালিতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে করোনার জাল রিপোর্ট তৈরির বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপরই কয়েকটি দেশ বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। 


তখন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, জাল কোভিড-১৯ সনদ আমাদের দেশের ভাবমূর্তির জন্য একটি বিশাল আঘাত।

অব্যাহত প্রতারণা

এতোকিছুর পরেও করোনার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণা থামছে না। বৃহস্পতিবার (১০ জুন) বিদেশগামী যাত্রীদের ভুয়া করোনা রিপোর্ট সরবরাহের অভিযোগে চারটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

অভিযুক্ত ল্যাব চারটি হচ্ছে— সিএসবিএফ হেলথ সেন্টার, স্টিমজ হেলথ কেয়ার, আল জামী ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং মেডিনোভা মেডিক্যাল সার্ভিসেস লিমিটেডের মিরপুর শাখা।   

এসব প্রতিষ্ঠানকে নমুনা সংগ্রহ ও করোনার সনদ দেয়ার কার্যক্রম স্থগিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতর বলছে, এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালকের পক্ষ  থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিককালে আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশগামী যাত্রীদের ভুয়া কোভিড-১৯ রিপোর্ট প্রদানসহ (যেমন- পজিটিভ রোগীকে নেগেটিভ সনদ প্রদান, নমুনা সংগ্রহ ব্যতিত নেগেটিভ সনদ প্রদান, প্রতারণার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নমুনা সংগ্রহ বুথের নামে দালাল নিয়োগ ইত্যাদি) বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা ডিএইচআইএস-২ ডাটাবেজ যাচাইয়ে ও প্রাথমিক তদন্তে/অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়।’

চিঠিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনাকাঙ্ক্ষিত, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ অবস্থায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত আপনার প্রতিষ্ঠানে ও প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন অন্যান্য বুথগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহসহ বিদেশগামী যাত্রীদের আরটি-পিসিআর পরীক্ষা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার জন্য মহাপরিচালকের  অনুমোদনক্রমে নির্দেশ প্রদান করা হলো।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু অর্থলোভী প্রতারক জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের প্রতারণা করোনা নিয়ন্ত্রণের সফলতা ম্লান করে দিচ্ছে। তারা বুঝতে চাইছে না যে, তাদের দেয়া ভুয়া করোনা রিপোর্টের কারণে সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যাবে। অচিরেই এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও তারা এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাবে। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh