বাড়ছে সংক্রমণ, কমছে সচেতনতা!

রাজশাহীতে লকডাউনেও রাস্তায় মানুষের ভিড়। ছবি : স্টার মেইল (ফাইল)

রাজশাহীতে লকডাউনেও রাস্তায় মানুষের ভিড়। ছবি : স্টার মেইল (ফাইল)

দেশের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন ও বিধিনিষেধেও কমছে না করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু। বরং, অনেক স্থানেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২১ জুন) গোটা দেশে করোনায় মারা গেছেন ৭৮ জন। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। লকডাউন বা বিধিনিষেধ জারির পরও নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হচ্ছেন মানুষ। কেউ কেউ মাস্ক পর্যন্ত পরছেন না।

বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা বলছেন, লকডাউন বাস্তবায়নে নজরদারির অভাবেই এমনটি হয়েছে। সঙ্গে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও দায়ী। তাই শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি। অনেকে ঢিলেঢালা এসব লকডাউনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজশাহী, দিনাজপুর, নাটোর ও সাতক্ষীরায় ঢিলেঢালা লকডাউনে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং লকডাউন-পরবর্তী সংক্রমণ, আক্রান্তের হার ও মৃত্যু বেড়েছে। 

নড়াইলে অবশ্য সাতদিনের লকডাউন কিছুটা কাজে এসেছে। সংক্রমণ আগের তুলনায় কমেছে খানিকটা। নোয়াখালীতে লকডাউনের পর সংক্রমণের হার কমলেও মৃত্যু কমেনি, তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যুহার তুলনামূলক কমেছে। মানুষকে সচেতন করতে শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে মাইক হাতে রাস্তায় নামেন একজন ওসি। তবু সাধারণ মানুষ নির্বিকার। পথেঘাটে জনসমাগম হচ্ছে, সবকিছু চলছে আগের মতোই।  

রাজশাহীতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১১ জুন থেকে সাতদিনের লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ১৭ জুন রাত ১২টায় এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, এ পর্যন্ত রাজশাহীতে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সংক্রমণ ওঠানামা করলেও মৃত্যুর হার একই থেকে গেছে। ফলে সর্বাত্মক লকডাউন আরও সাতদিন বাড়ানো হয়েছে, যা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

সাতক্ষীরায় ৫ জুন থেকে লকডাউন চলছে, কিন্তু করোনার সংক্রমণ কমছে না; বরং লকডাউন শুরুর আগের চেয়ে সংক্রমণের হার বেড়েছে। মে মাসের শেষ সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের গড় হার ছিল ৪১ শতাংশ। লকডাউন চলাকালে ১৩-১৯ জুন পর্যন্ত সংক্রমণের হার গড়ে ৫২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছিল। লকডাউন দেয়ার আগে ৩ জুন পর্যন্ত জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন ও করোনা উপসর্গ নিয়ে ২২২ জনের মৃত্যু হয়। সেখানে ১৭ দিনের ব্যবধানে ১৯ জুন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু দাঁড়ায় ৬০ জনে; আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু দাঁড়ায় ২৭০ জনে।

দিনাজপুর জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি ১৫ থেকে ২১ জুন রাত পর্যন্ত এক সপ্তাহের লকডাউন দিয়েছিল। এই এক সপ্তাহেও করোনার সংক্রমণ স্বাভাবিক না হওয়ায় দিনাজপুরে আরও এক সপ্তাহের লকডাউন দেয়া হয়েছে।

প্রথম লকডাউন ঘোষণার আগের সপ্তাহে জেলায় ১ হাজার ৩৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয় ৩২০ জনের। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৮৫। প্রথম দফা লকডাউন শেষ হয়েছে গত সোমবার (২১ জুন)। লকডাউন চলা অবস্থায় জেলার করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত জেলায় ১ হাজার ৭৯৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ৭২৫ জনের। শতকরা হিসাবে ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। 

করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, শনাক্ত না করে রোগী রেখে দিলে সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। যে পরিবারে কারও করোনা শনাক্ত হচ্ছে, ওই পরিবারের বাকিদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না। লকডাউনে শুধু যানবাহন বন্ধ রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকছে। ফলে লকডাউন ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যবিদরা জানিয়েছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাব বেশি পড়বে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে। সংকট মোকাবিলায় লকডাউন, আইসোলেশন, টেস্ট বাড়ানোসহ টিকা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। 

সরকারও বিষয়টি স্বীকার করছে। সেই সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনভাবে কাজ করার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) তথ্যমতে, ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি নমুনার মধ্যে ৪১টিতেই ভারতীয় ধরন পেয়েছে।

গবেষকরা গত ২৫ মে থেকে ৭ জুনের মধ্যে ঢাকার ৬০ জন কোভিড রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্স করেছে। এতে শতাংশের হিসেবে ৬৮ শতাংশ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট, ২২ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন। বাকি নমুনাগুলো অন্যান্য ধরনের। 

এর আগে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইডিএসএইচআই) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে করোনা ভাইরাসের ৫০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে। গত ৩ জুন এ বিষয়ে তারা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ৪০টিতেই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়ে। 

করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে ও ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখতে আশপাশের ৭ জেলায় নতুন করে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। লকডাউন চলবে আজ মঙ্গলবার (২২ জুন) সকাল ছয়টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত। এ অবস্থায় ঢাকা থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যাবে না, ঢাকায়ও কোনো বাস প্রবেশ করবে না বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু এখানেও বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা থাকলেও মঙ্গলবার (২২ জুন) সকালে সৌদিয়া, এস আলম, সরকার ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহনসহ আরো কয়েকটি পরিবহনের বাস চলাচল করতে দেখা গেছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh