শোক শঙ্কা কান্নায় ভারী হাসপাতাল

কোথায় অক্সিজেন?

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফাইল ছবি

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফাইল ছবি

করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেনের তীব্র সংকট। রোগীদের অক্সিজেনের জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। অনেকের ছয় হাসপাতাল ঘুরেও মিলছে না অক্সিজেন। 

অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বুধবার (৩০ জুন) সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নয়জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে দুইজন করোনা পজিটিভ ছিলেন এবং বাকিদের করোনার উপসর্গ ছিল। হাসপাতালের আইসিইউতে তিনজন এবং ওয়ার্ডে ছয়জন মারা গেছেন।

হঠাৎ হাসপাতালে অক্সিজেনের সংকট দেখা দিলে এই বিপর্যয় ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে মৃতদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল থেকে এক রোগীর স্বজন মুকুল সরদার জানান, ‘রাত ৯টার দিকে একযোগে ৮-৯ জন মারা গেছে বলে হাসপাতালে হৈ চৈ পড়ে যায়। তবে বিস্তারিত কেউ কিছু বলছেন না।’

দেশে করোনার নতুন ‘হটস্পট’ খুলনা। প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে শয্যাসংকটের পাশাপাশি অক্সিজেনের সংকটও দেখা দিচ্ছে। অক্সিজেনের প্রয়োজন, এমন অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।  

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় জেলা নওগাঁ। বর্তমানে করোনার হটস্পট হিসাবে পরিণত হয়েছে জেলাটি। প্রতিদিন করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরো অবনতি হচ্ছে।  নওগাঁর তিনটি উপজেলা ও সদর হাসপাতালে হাইফ্লো অক্সিজেন সাপ্লাই চালু থাকলেও বাকি আটটি উপজেলায় অক্সিজেন সাপ্লাই নেই। এজন্য করোনায় আক্রান্ত জটিল রোগীদের রাজশাহী কিংবা বগুড়ার হাসপাতালে পাঠাতে হয়। 

সিলেটের করোনার বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল এখন ‘ওভারলোডেড’। ওই হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মিজানুর রহমান বলেন, করোনা রোগীদের বেলায় সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে। সেখানে ৯৬ জন রোগী থাকলেও অক্সিজেন সরবরাহের জন্য পোর্ট আছে ৬৩টি। অন্যদের সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন ওয়া হচ্ছে, যদিও সেটা যথেষ্ট নয়। তাই রোগীর সংখ্যা বাড়ার আগে এখনই বিকল্প ব্যবস্থায় যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। 

কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের অক্সিজেন সংকটের কারণে গত বুধবার (২৯ জুন) রোগী পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে যশোরে। পটুয়াখালীর দশমিনায় ৫০ শয্যার হাসপাতালে মাত্রাতিরিক্ত অক্সিজেন সংকট। অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা যাচ্ছে। নওগাঁর পত্নীতলায় অক্সিজেন সংকট প্রকট। যশোরের শার্শায় গুরুজবাগান হাসপাতালটি ৫০ শয্যার। সেখানে অক্সিজেনের সংকট। সেখানকার রোগীরা যশোরে দৌড়াচ্ছেন। এমন অবস্থা এখন সারাদেশের জেলা-উপজেলায় দেখা দিয়েছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, করোনা রোগীদের উপসর্গের মধ্যে শ্বাসকষ্ট অন্যতম। যেসব রোগীর শ্বাসকষ্ট সহনীয় মাত্রায় থাকে, তাদের শ্বাস গ্রহণের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যাদের শ্বাসকষ্টের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাদের শ্বাসযন্ত্র সচল রাখতে বাইরে থেকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়। সাধারণ রোগীদের জন্য আইসিইউতে যে অক্সিজেন দিতে হয়, তার পরিমাণ এক মিনিটে ৫/৬ লিটার। কিন্তু করোনা রোগীর জন্য যে অক্সিজেন প্রয়োজন তার পরিমাণ মিনিটে ৭০/৮০ লিটার। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোভিড পরিস্থিতির আগে দেশে দৈনিক ১০০ টন মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেনের চাহিদা ছিল। কোভিড রোগীদের সংখ্যা বাড়ায় হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ’র চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেছে।

জানা যায়, সরকার এখনো ২৯টি জেলায় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা পৌঁছে দিতে পারেনি। যেসব হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা আছে, সেসব হাসপাতালে সমস্যা কম। কিন্তু দেশের সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহের সুযোগ নেই। ফলে সিলিন্ডারের মাধ্যমে রোগীকে অক্সিজেন দিতে হয়। 

দেশে অক্সিজেনের সংকট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতরও। সোমবার (২৮ জুন) দুপুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা.রোবেদ আমিন বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে অক্সিজেনের সংকট দেখা দিতে পারে। তাই সংকট মোকাবেলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এরইমধ্যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে তারা। 

মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, বর্তমানে অক্সিজেন সংকট প্রকট। দেশে অক্সিজেন উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। পিএসএ জেনারেটর স্বল্প জায়গায় বসিয়ে দিলেই হতো। সময়মতো এটা করা উচিত ছিল। তবে এখন যেভাবে করোনা রোগী বাড়ছে, তাতে আর উৎপাদন করার সময় নেই। দ্রুত অক্সিজেন বিদেশ থেকে আনতে হবে। 

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এই মুহূর্তে করণীয় হলো ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সেখানে সেবা দেয়া। আইসিইউয়ের প্রয়োজন হলে সেখান থেকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া। দেশে অক্সিজেন তৈরি করা যেত, সময়মতো এটা বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। কিন্তু করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এক বছর আগে। কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।  এ প্রসঙ্গে বিএমএ মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, আমরা যথেষ্ট সময় পেয়েছি। কিন্তু  সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার অভাব ছিল। যার যে কাজ তাকে সেখানে দেয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কেউ কেউ নিজে বাদশা ভাবেন। এই কারণেই এই অবস্থা। 

দেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার যে অবস্থা, তাতে করোনা সংক্রমণ কোনো কারণে অনেক বেড়ে গেলে বা ভারতের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার কিছুটা উন্নতি হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো এটি যথেষ্ট নয়।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //