ভূ-রাজনীতির ফাঁদে ভ্যাকসিন

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে শুরু থেকে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্যণীয়। সিদ্ধান্তহীনতা এবং বিশৃঙ্খলা টিকা প্রাপ্তিকে বিলম্বিত করেছে। যদিও টিকা কেনার পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে; কিন্তু সর কারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের অযাচিত প্রভাব অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ করেছেন। চীন থেকে সিনোফার্মের টিকা এনে শুরু হচ্ছে গণটিকা কর্মসূচি। বিলম্বিত টিকা কার্যক্রম বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 

করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী টিকা খুবই কার্যকর হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বিশ্বের ৯০ শতাংশ ধনী দেশ ২০২২ সাল নাগাদ মহামারির পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। টিকা ছাড়া আর কোনো ম্যাজিক নেই। গরিব কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কোনো কোনো দেশ ২০২৩ সাল নাগাদ টিকা পাবে। ফলে মহামারির পরের বিশ্বে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংক এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ যখন টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে; ঠিক তখন এদেশে মহামারির ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে করেনাভাইরাসের ঢেউ গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশকে বেশ কাবু করে ফেলছে। 

মহামারির সময়ে টিকা নিয়ে কূটনীতি এখন সবার চোখে পড়ছে। ধনী দেশগুলোতে বিশ্বের মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ বাস করে; কিন্তু তারা বর্তমানে মোট টিকার ৫০ শতাংশ নিয়ে গেছে। টাকা কিংবা ক্ষমতার দাপটের কূটনীতির জেরে গরিব দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ টিকা পাচ্ছে না। মহামারির এ পর্যায়ে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-সহ ধনীরা নানান অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা নির্বিকার। 

বাংলাদেশের টিকাপ্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তার একটা বড় কারণ এদেশে টিকা উৎপাদনে কোনো সক্ষমতা নেই। আর আগে থেকে কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন কারখানা ১৯৫৮ সালে স্থাপিত হয়েছিল; কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ হস্তক্ষেপের কারণে এই কারখানার মানোন্নয়ন হয়নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে আসে। কয়েক বছর আগে টিকার কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ নিজস্ব টিকা কারখানা স্থাপন করে সফল হলেও তা বন্ধ করে ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজকের মহামারির সময়ে বাংলাদেশের জন্য বিপুল অর্থ সাশ্রয় শুধু নয়; বিদেশে টিকা রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব হতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের বৈদেশিক সূত্রের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। জনস্বাস্থ্য খাত তার অন্যতম।

বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা না করার বড় নজির হলো দেশীয় টিকা বঙ্গভ্যাক্সকে সহায়তার ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতা। সংকটকালেও টিকা উৎপাদনে বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানি গ্লোবের প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। যে সময় ও টাকা সেরামের পেছনে অপচয় করেছে বাংলাদেশ; তার কিয়দংশ গ্লোবের পিছনে দিলে এই টিকা আজকে বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতো বলে অনেকে ধারণা করেন। বঙ্গভ্যাক্স বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হলে বিশ্বে বাংলাদেশে সার্বিক অবস্থান সুসংহত হতো। নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্কসমূহ আজকাল এই আলোচনাও করছেন যে, সংক্রমক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই দেশের নিরাপত্তা প্রস্তুতির অংশ। টিকা উৎপাদন করে জাতিকে জীবাণু হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভাইরাসের এবারের হামলা আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সতর্কবার্তা।

ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রথমে বাংলাদেশে টিকা বিক্রিতে আগ্রহী হয় চীন। এই খবর ছড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহামারির চরম খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশে উড়ে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারত থেকে টিকা দেবার আগ্রহের কথা জানালে বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়। সরকার নিজের অর্থ বেসরকারি বেক্সিমকো কোম্পানিকে দিয়ে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক, সেরাম ইনস্টিটিউট যারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন করে; বাংলাদেশকে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করবে। তবে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে টিকা পুশ করার সক্ষমতা বিবেচনায় সেরাম প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা দেবে। সেরামের টিকার চালান আসায় বাংলাদেশ টিকা কার্যক্রম শুরু করে। ৭০ লাখ ডোজ টিকা আসার পর পরই ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। টিকা রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত। বাংলাদেশ বিপাকে পড়ে। বাংলাদেশকেও টিকা কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়। এমন কি বাংলাদেশের ২৮ লাখ মানুষ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে পারেনি। ভারতের কাছে অনুরোধ করেও এই জরুরি প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারেনি বাংলাদেশ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকা কেনার পক্ষে যুক্তি হলো, এই টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদন করেছে। এই টিকার দাম কম। প্রতি ডোজের দাম পাঁচ ডলার। চীনের টিকার দাম প্রতি ডোজ কমপক্ষে ১০ ডলার। আরেকটা কারণ হলো, ভৌগোলিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী হিসেবে এদেশের ওপর ভারতের প্রভাব বেশি। তাই বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে টিকা কিনেছিল।

একক উৎসের ওপর নির্ভর করা বাংলাদেশের টিকা কূটনীতির সবচেয়ে বড় ভুল। ভারতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্য রফতানি বন্ধ করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ভারতে চাল কিংবা পিঁয়াজের সংকট দেখা দিলে দেশটি বিভিন্ন সময়ে রফতানি বন্ধ করেছিল। তখন চীনাদের সঙ্গে দর কষাকষি করলে কম দামে টিকা পাওয়া সম্ভব ছিল। ভারত টিকা দিতে অস্বীকার করার পরও সময় অপচয় হয়েছে। বাংলাদেশ তাকিয়ে ছিল কোভ্যাক্সের দিকে। কোভ্যাক্স গরিব দেশগুলোকে টিকার সরবরাহ দেওয়ার বৈশ্বিক উদ্যোগ ছিল। কোভ্যাক্সের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয় সেরামের টিকা রফতানি বন্ধের কারণে। 

টিকাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তার কারণে ডব্লিউএইচও চীনের সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক্সের টিকা জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়। বাংলাদেশও কোনো উৎসের সন্ধান না পেয়ে শেষ অবধি চীনের টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি ডোজ ১০ ডলার করে বিক্রিতে রাজি হয় চীন। শর্ত হলো, টিকার দর গোপন রাখতে হবে। কারণ চীন একেক দেশের কাছে একেক দরে টিকা বিক্রি করে; কিন্তু বাংলাদেশের এক আমলা দর প্রকাশ করে দেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রীলঙ্কায় শুরু হয় আন্দোলন। চীনের কাছ থেকে প্রতি ডোজ ১৫ ডলার দরে চীনের টিকা কিনেছে শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কার জনগণ বিক্ষোভে নামে। কেন বেশি দরে টিকা কিনলো সরকার। চীনকে চাপ দেয় প্রতি ডোজ ১০ ডলার দরে টিকা দেবার জন্য। চীন এবার বেঁকে বসে। বাংলাদেশে টিকা বিক্রি করবে না। শর্ত ভেঙে দাম প্রকাশ করে দেওয়ায় এই বিপত্তি। চীন বলছে, বাংলাদেশকেও ১৫ ডলার দরে টিকা কিনতে হবে। 

বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি দেবার পাশাপাশি ১০ ডলার দরে টিকা দেবার অনুরোধ করে। চীন রাজি ছিল না। পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী চীনের কাছে বার্তা পাঠান যে, চীন ১০ ডলার দরে টিকা দিতে অপারগ হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে টিকা কিনবে বাংলাদেশ। তারপর চীন টিকা বিক্রিতে রাজি হয়। এখন প্রতি ডোজ ১০ ডলার দরে প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে সিনোফার্মের টিকা বাংলাদেশে আসবে বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য বজায় রেখে স্বার্থ সুরক্ষা করার কৌশল রপ্ত করা; কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগানোর বদলে এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকেই উল্টো চাপে ফেলছে। টিকার ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়টা বেশি জরুরি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //