অর্থ পাচার রোধ

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

অর্থ পাচার রোধে দেশে বিভিন্ন ধরনের আইন আছে। বর্তমান আইনে পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে অর্থ পাচার বন্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকতে হবে, যার অনুপস্থিতি বিদ্যমান। ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে টাকা পাচার ও তার শাস্তির ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে বলা আছে।

কীভাবে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং অপরাধীর শাস্তির কথা বলা আছে। এর সঙ্গে জড়িতদের ৪-১২ বছর কারাদণ্ডের বিধানও আছে; কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই। আর এই কাজের সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। ফলে টাকা পাচার বাড়ছে। আর আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনের কারণ এর সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী জড়িত। তাই অর্থ পাচারও বন্ধ হচ্ছে না। 

জানা গেছে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে দেশে আইনের কমতি নেই। রয়েছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন। দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তথ্যের আদান-প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্যও হয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ, এনবিআরের সিআইসিসহ বিভিন্ন সংস্থা অর্থ পাচার রোধে কাজ করে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণও আছে তাদের। এরপরও অর্থ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। কারণ দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে অর্থ পাচার রোধ করা যাবে না। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থই সংশ্লিষ্টরা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গত ১৭ জুন প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের পাঁচ হাজার ২৯১ কোটি টাকার সঞ্চয় রয়েছে।

এদিকে দেশ থেকে অর্থ পাচারের ব্যাপারে হাজারের বেশি ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এসব প্রতিবেদন ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৮টি ঘটনা চিহ্নিত করে বিএফআইইউ। এছাড়াও ২০১৬-১৭ সালে ১২১টি, ২০১৭-১৮ সালে ৬৭৭টি, ২০১৮-১৯ সালে ৫২টি এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১৬টি ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থ পাচার করে বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়া সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাড়ি করেছেন। সেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা ১৪ থেকে ১৫ হাজারের মতো। তারা সেখানে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগও করেছেন। 

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের বিশাল পরিমাণ সম্পদ আটক করা হয়েছে বিদেশে। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থ পাচার হয় মূলত আন্ডার ইনভয়েস ও ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক থাকলে অর্থ পাচার প্রক্রিয়া অন্তত সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব হতো। তাদের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।

বলা হয়েছে, আমদানি-রপ্তানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধানত এই অর্থ পাচার করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর আগে এই সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জিএফআইর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৮৯৭ কোটি ডলার। এই হিসাবে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে পাচারের পরিমাণ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে এক দশকে পাচারের পরিমাণ পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থ পাচার ও পাচার রোধের উপায় নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। অর্থ পাচার রোধে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত থাকার পরও তা বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থ পাচার বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও, প্রস্তাবিত বাজেটে তা অস্পষ্ট। ফলে অর্থমন্ত্রীকে বিষয়টি নিয়ে সংসদে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। 

গত ৭ জুন বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশে কারা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য তার কাছে নেই। বিরোধী দল বা কারও কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকলে তা জানাতে অনুরোধ করেছেন তিনি। 

সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, কারা দেশের টাকা নিয়ে যায়, সেই তালিকা আমার কাছে নেই। তিনি বলেন, পাচারকারীদের নামগুলো আমাদের দেন। তাদের ধরা আমাদের জন্য সহজ হবে। এখনো পাচারকারীদের অনেকেই জেলে আছে। বিচার হচ্ছে। আগে যেমন ঢালাওভাবে চলে যেত, এখন তেমন নেই।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি কর্মীরাই বাংলাদেশ থেকে বছরে ৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার করে। 

অর্থনীতিবিদ এবং এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচার রোধে বিভিন্ন কথা বলা হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। পাচারের সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী জড়িত। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের মতে, বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া টাকা পাচার বন্ধ করা যাবে না। দুর্নীতির মধ্যেও আবার রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি রয়েছে। এই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকার বেশির ভাগই দেশের বাইরে যায়।

বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত খতিয়ে দেখা। কারণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হার বাড়াতে ও অর্জনে এ দেশে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব না। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর আস্থা না থাকলে অর্থ পাচার হয়। পাচারকারীরা মনে করেন, বিদেশে অর্থ বিনিয়োগ অনেক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক। তাই এ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে। শুধু আন্ডার ইনভয়েস এবং ওভার ইনভয়েস (আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা) বন্ধ করে অর্থ পাচার ঠেকানো যাবে না। এমনিতে বিদেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কড়াকড়ি আছে। এ ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হলে ভালো হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, সপ্তমবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে রাখতে হলে, জাতীয় উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হতে হবে; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তা ২১ শতাংশের ওপরে যাচ্ছে না। 

তিনি মনে করেন, টাকা পাচার থামাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত হারে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে না। বাড়বে না কর্মসংস্থানও। তার মতে, দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার অর্থই হলো দেশকে বঞ্চিত করা। কেননা যে টাকা পাচার হচ্ছে, তা দেশে বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থান বাড়তো। এসব বিনিয়োগ থেকে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে বর্ধিত হারে দেশের চাহিদা মেটানো যেত; কিন্তু টাকা পাচার হয়ে যাওয়ায় এখন ওই হারে বিনিয়োগ হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না কর্মসংস্থানের। 

তিনি আরও বলেন, দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে; কিন্তু গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমছে। তার মতে, বিনিয়োগের পরিবেশ নেই, যে কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া অনেকেই এ দেশে টাকা রাখতে নিরাপদ মনে করেন না। পাশাপাশি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দেশে রাখা কঠিন। ফলে টাকা বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ দুর্নীতি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা দুর্নীতি সরবরাহকারী। আর এর সুবিধাভোগী নিজেরা এবং অন্য প্রভাবশালীরা। আমার ধারণা অর্থ পাচারের ৯০ ভাগই দুর্নীতির টাকা। বাকি ১০ ভাগ চলে যায় বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বলতার কারণে। তার মতে, বিদেশে অর্থ পাচারের দ্বিতীয় কারণ দেশে বিনিয়োগ পরিবেশটা দুর্বল। এ ছাড়া কিছুটা অনিশ্চয়তা এবং অনাস্থাও রয়েছে। এসব কারণে আংশিক বৈধ টাকা চলে যাচ্ছে অবৈধ ঠিকানায়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh