উন্নয়নের থাবায় জনগণের কাঁধে জিডিপির মুলো!

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আগেই বেড়েছিল। মহামারি কোভিডের আঘাত হানার পর থেকে বাজার আর নিয়ন্ত্রণে নেই। এই মহামারিতে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। মধ্য আয়ের মানুষ নিম্ন আয়ের কাতারে নেমে এসেছে। আর একেবারে হত-দরিদ্ররা পথের ভিখারি হয়ে গেছেন। এ অবস্থায় পণ্যমূল্য প্রায় সবারেই নাগালের বাইরে। এ সময় দরকার ছিল সরকারের কঠোর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা।

মুনাফালোভি সিন্ডিকেট যেন বাজার থেকে কোটি কোটি হাতিয়ে নিতে না পারে, সেই দিকটা মনিটরিং করা জরুরি ছিল; কিন্তু সরকার তা করেনি। বরং ‘মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে’, ‘বাংলাদেশের মানুষ বেশি ভাত খায়, তাই চালের ওপর চাপ বেড়েছে’র মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেছেন কোনো কোনো মন্ত্রী! ওই মন্ত্রীরা যদি একটি বার ঢাকার টিসিবির খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি করা ট্রাকের ছবি দেখতেন, তাহলে কিছুটা বুঝতে পারতেন যে, তারা কতটা অমানবিক মন্তব্য করেছেন। 

এটাই বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির চলমান ধারা। এখানে বিশ্বের তাবৎ অর্থনীতিবিদের সূত্র ফেল মেরেছে। এখানে টাকার অবমূল্যায়ন গোপনে হয়। জনগণ শুধু জানে ৮৫ টাকার ডলার এখন ৯২ টাকা। তাও মিলছে না। শেয়ারবাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য উপচে পড়ছে। সেভিংস অ্যাকাউন্টেও সুদ পাওয়া যাচ্ছে না। ইনভেস্টমেন্ট করতে ২৮টি দপ্তরের লোকজন হা করে বসে আছে। ঘুষ-দুর্নীতি প্রকাশ্য এবং বৈধ। স্বয়ং ‘দুদক’এর লোকজন দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত। বিশ্ববাজারে তুলোর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ফলে আমদানিকৃত সুতা-কাপড়েরও দাম বেড়েছে। বায়ারদের ধরে দেওয়া আগের ‘সি-এম’-এ লাভ থাকছে না। কম্পোজিট নয় যে কারাখানাগুলো তারা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। এক এপেক্স বন্ধ হয়ে ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। মাত্র ১০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়নি সরকার। অথচ পদ্মায় আর কর্ণফুলীতে টানেল নির্মিত হচ্ছে! 

বেশ কিছু বিভাগীয় শহরে একটার পর একটা ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, শহরে শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ, ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, রিকশা-অটো-ঠেলাগাড়ি-পানদোকানসমেত সুপার হাইওয়ে নির্মাণ, রঙ-বেরঙের রিসোর্ট নির্মাণ আর সামরিক-বেসামরিক আমলা, মন্ত্রী-সাংসদদের প্রোফাইলই উন্নয়ন নয়। 

জানা কথা যে, কোভিডের পর পরই সারাবিশ্বের মুদ্রার বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দরিদ্র এবং মধ্য আয়ের দেশেও খাদ্য সংকট দেখা দেবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। সেই পদক্ষেপ নিতে হতো। তার বদলে তারা ছেলে ভোলানো রূপকথার গল্প শুনিয়েছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কিসের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সবাই বলবেন-গার্মেন্টস শিল্পের আয়ের ওপর। আসলে কি তাই? একেবারেই না। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত দাঁড়িয়ে আছে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের ওপর। কোভিড-পরবর্তী মাসগুলোতে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক। এর পেছনের কারণ হিসেবে মহামারির বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর অর্থ লেনদেনের অবৈধ চ্যানেলগুলো চালু হওয়া, নতুন বৈদেশিক নিয়োগ কমে যাওয়া এবং প্রবাসীদের চাকরি হারানোর মতো বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে। গত বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া, এই তিন দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। এ বছর এই তিন দেশ থেকে উল্লিখিত তিন মাসে গত বছরের চেয়ে ৯৩২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার কম এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশ ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে ৭৭১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার কম রেমিট্যান্স পেয়েছে। মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামলেও, দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছিল। প্রবাসীরা দেশে ২৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল, যা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল; কিন্তু তা হয়নি।

তারপরও সরকার বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে দিলেন। বিশ্বব্যাংক বলল, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশ হবে। গত জানুয়ারির রিপোর্টের তুলনায় যা ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। সরকার আরও একটু আগবাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ফেললেন। অথচ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপি দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন বোঝা সম্ভব নয়।

জিডিপি কী? কোনো একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন জিডিপি নামে পরিচিত। জিডিপির ধারণা কোথা থেকে এলো? মার্কিন অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেতসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাশিয়াতে। ১৯২২ সালে পরিবারসহ চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতি বের করার দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়। ১৯৩৭ সালে তিনি কংগ্রেসের কাছে ‘ন্যাশনাল ইনকাম ১৯২৯-৩৫’ নামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট। সেই থেকে শুরু। সাইমন কুজনেতস এই মৌলিক কাজের জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পান ১৯৭১ সালে।

অথচ সাইমন কুজনেতসের ধারণাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদরা এখানে ব্যয় করতে পারলেই জিডিপি বৃদ্ধি পাবে বলে প্রচার করে থাকেন। ধরুন, একটা প্রকল্প করতে লাগে ৫ কোটি টাকা। পারস্পরিক যোগসাজশে সেটা ৫০ কোটি টাকা বানিয়ে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও সমস্যা নেই। জিডিপি তাতে বাড়বে; কিন্তু ওয়েলফেয়ার স্টেট বা একটি কল্যাণমুখী দেশের জিডিপির ধারণাটাই বদলে দিয়েছেন কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অর্থনীবিদ এবং রাষ্ট্র পরিচালকরা। যেমন- আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটান জিডিপি নির্ণয় করে তাদের নিজেদের মতো করে। আর সেটা সর্বতোভাবে জনকল্যাণকর। এই উল্লেখযোগ্য বিকল্পটি হাতে-কলমে ব্যবহার করছে ভুটান। ভুটানে রাষ্ট্রীয়ভাবে জিডিপি বা ‘গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট’ এর বদলে মাপা হচ্ছে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা ‘জিএনএইচ’।

বিপর্যস্ত অর্থনীতির চেহারা এখন দেশের প্রতিটি মানুষের চোখের সামনে দগদগে ক্ষতের মতো। আয় কমছে আর বাড়ছে খরচ। অথচ সরকারি হিসেবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৌতুক করে বলা হচ্ছে, মাথাপিছু আয়ের অর্থ মাথার পেছনে থাকা আয়, তাই আয় বৃদ্ধি কেউ দেখতে পারছে না।

আবার ভারতের একসময়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওয়াই ভানুগোপাল রেড্ডি বলেছিলেন, ‘সাধারণত ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকে; কিন্তু ভারতে অতীতটাই অনিশ্চিত বেশি।’ এর কারণ দেশটিতে বারবারই জিডিপির হিসাব সংশোধন করা হয়েছে। যেমন- ২০১৮ সালে মোদি সরকারের গঠন করা এক কমিটি জিডিপির হিসাব সংশোধন করে বলেছে, তাদের সময়েই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেশি, কংগ্রেসের সময় কম। আগের হিসাবে যা ছিল উল্টো। এ ঘটনা নিয়ে মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের শিরোনাম ছিল ‘মোদির অধীনে ভারত বেশি ভালো করেছে, যদি আপনি জিডিপি বিশ্বাস করেন।’ অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ রুচির শর্মা লিখলেন, ভারতের জিডিপি এমনকি ‘বেসিক স্মল টেস্ট’ও পাস করতে পারবে না।

ওই একই অবস্থা এখন বাংলাদেশের। টেবিল চাপড়ে বলা হচ্ছিল ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।’ এখন এই পরিসংখ্যানের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোভিড-১৯-এর সময়েই গবেষকরা বলছেন, জিডিপির হিসাব রাজনৈতিক পরিসংখ্যানে পরিণত হয়েছে। 

শান্তিপ্রিয় দেশ ভুটানের প্রধান মনোযোগ তার মানুষের দিকে। গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসের ধারণাটি নিয়ে প্রথম কাজ করেন ভুসিকো মানশোল্ট নামের ডাচ রাজনীতিবিদ, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত এই রাজনীতিবিদের ধারণাটি তেমন প্রচার পায়নি। তবে ইউরোপজুড়ে জিডিপির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স’ এইসব সূচক ব্যবহার করা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়।

১৯৭২ সালে ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিনগিয়ে ওয়াংচুক তাদের উন্নয়নের ফলে যাতে মানুষের সুখ না কমে, সেই ব্যাপারে আলোকপাত করেন। অর্থাৎ তখন থেকেই ভুটানের রাজনীতি আর অর্থনীতিতে এই গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসের ধারণার আত্তীকরণ ঘটে এবং ধীরে ধীরে এই ব্যাপারটি ভুটানের সংবিধানের অংশ করা হয়। গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসের এই ধারণা প্রধান চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই চারটি স্তম্ভ হলো- টেকসই ও সমতাভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশের সুরক্ষা, নিজেদের সংস্কৃতির সুরক্ষা-প্রচার এবং সুশাসন। 

বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতা, ভোটবিহীন নির্বাচন, সমতাভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সুরক্ষা, প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা আর সুশাসনের বিষয়গুলো আয়নায় মুখ ভেংচি দিচ্ছে। একটা দেশ দিনের পর দিন অধঃপতিত হয়ে পড়ছে। সহায়সম্বলহীন, প্রাকৃতিক সম্পদহীন, সম্ভাবনাহীন হলেও মনকে প্রবোধ দেওয়া যেত। আমাদের যে ভুটান হওয়ারও যোগ্যতা নেই!

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //