চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সর্বস্বান্ত ৬৪ লাখ মানুষ

চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হচ্ছেন। চিকিৎসা খরচের একটি বিশাল অংশ চলে যায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে। চিকিৎসকরা এখন আর রোগীর সঙ্গে কথা বলে, রোগীর দেহের লক্ষ্মণ-উপসর্গ দেখে নিজের চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে চিকিৎসা করেন না বা করতে চান না। তারা এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে চিকিৎসা করছেন।

ফলে রোগীর সঙ্গে দেখা হলে এক-দুই মিনিট কথা বলে চিকিৎসক চোখ বন্ধ করে কিছু পরীক্ষা দিয়ে দিচ্ছেন। পরীক্ষায় যে রোগ ধরা পড়ছে তার ওপর ভিত্তি করে রোগীকে ওষুধ অথবা সুস্থ হওয়ার জন্য অন্য কিছু দিচ্ছেন। এতে করে রোগীর নিজের পকেট থেকে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। 

রোগীর পকেট থেকে ৬৭ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় হয় : বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা খরচের ৬৭ শতাংশই ব্যয় হয় ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে

প্রকাশ করা বাংলাদেশ জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয় হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ রোগী নিজের পকেট থেকে খরচ করে। অবশিষ্ট ৩৩ শতাংশ আসে সরকারি তহবিল ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার অনুদান থেকে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই চিকিৎসা খরচের বেশি ব্যয় হয় রোগীর নিজের পকেট থেকে। বাংলাদেশের কাছাকাছি কেবল আফগানিস্তানে রোগীরা চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে খরচ করে। আফগানিস্তানে রোগীরা নিজের পকেট থেকে ৬৪ শতাংশ ব্যয় করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রোগীর নিজের পকেট থেকে সবচেয়ে কম ব্যয় করে মালদ্বীপের মানুষ। তারা খরচ করে মোট ব্যয়ের ১৮ শতাংশ। অবশিষ্ট ৮২ শতাংশ মালদ্বীপবাসীর চিকিৎসা খরচ আসে সরকারি তহবিল এবং অন্যান্য অনুদান থেকে। 

বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০১২ সালেও চিকিৎসায় ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬০ শতাংশ। ওই বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের কৌশলপত্রে বলা হয়েছিল, ‘রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে সরকার। ২০৩২ সালে রোগীর নিজস্ব ব্যয় ৩২ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।’ 

করোনাকালে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়েছে। সরকারি সহায়তা খুব কম রোগীই পেয়েছেন। বেশির ভাগ রোগীই বাড়িতে থেকে বা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে করোনার চিকিৎসা নিয়েছেন। এমনকি বাড়িতে অথবা বাসায় অক্সিমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সেখানে সরকারি কোনো ভর্তুকি ছিল না, উপরন্তু বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে করোনার ওষুধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সেবা নিতে হয়েছে। করোনার কারণে দেশের বেশির ভাগ কারখানা, অফিস বন্ধ রাখার কারণে চাকরি খ্ইুয়েছেন অনেকে। জীবন বাঁচাতে মানুষকে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এভাবে কেউ কেউ দারিদ্র্যে ডুবে গেছেন। সেখান থেকে খুব শিগগিরই উঠে আসা সম্ভব নয়। 

স্বাস্থ্যবীমা পারে রোগীর চিকিৎসা খরচ কমাতে : করোনা মহামারিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের হয়েছে বেসামাল অবস্থা। বয়স্ক রোগীদের করোনা চিকিৎসায় তিন চার দিনেই লাখ টাকা লেগে যায়। ফলে যে পরিবারের বয়স্কদের করোনা হয়েছে কেবল তারাই বুঝতে পারছেন তাদের আপনজনদের সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে আসতে কতটুকু বেগ পেতে হয়েছে। এই ব্যয় মেটানোর পরিপ্রেক্ষিতে আবারও দাবি উঠেছে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের সব মানুষের চিকিৎসা খরচ চালানো যায় কি-না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই সমাধান। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় চিকিৎসা খরচ নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে রোগীদের চিকিৎসা করতে খুব বেশি ব্যয় করতে হয় না। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে স্বাস্থ্যবীমা। একটু ন্যূনতম খরচ করে ব্যক্তি বীমার আওতায় চিকিৎসা পাবেন। এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে বেশ কিছু সমীক্ষা হয়েছে। কিছু এনজিও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবীমা চালু করে সুফল পেয়েছে। সরকারিভাবে টাঙ্গাইলের কয়েকটি উপজেলা নিয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইলে প্রকল্পটি থেকে পুরোপুরি সফলতা না আসলেও কিছুটা হলেও সুফল পাওয়া গেছে। 

পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে ২৭ হাজার ৮৪১টি, ঘাটাইলে ২৭ হাজার ২৩১টি এবং মধুপুরে ২৬ হাজার ৪৪৫টি দরিদ্র পরিবারকে স্বাস্থ্যবীমার জন্য নিবন্ধন করা হয়েছে। বীমার জন্য প্রাথমিকভাবে যে টাকাটা (প্রিমিয়াম) দিতে হয় তা সরকারি তহবিল থেকেই দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিবারপ্রতি বার্ষিক এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়েছে। এই এক হাজার টাকার বিনিময়ে প্রতিটি পরিবার বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা পাবে। এসএসকে কার্ড দেখিয়ে নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে। বীমার আওতায় প্রতিটি পরিবার ৭৮ ধরনের চিকিৎসাসেবা পাবে। ঢাকায়ও এ প্রকল্পটি চালু করার চিন্তা করছে সরকার। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবীমা সারাদেশে কার্যকর করা সম্ভব কি-না তা পরে ভাবা হবে। সরকারি উদ্যোগে স্বাস্থ্য বীমা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি কিংবা দেশের বীমাসংক্রান্ত আইনে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এটি কার্যকর করার জন্য একটি আইন করার প্রয়োজন হবে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণা থেকে জানা যায়, সরকারি করোনা হাসপাতালে সাধারণ শয্যার একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে এক লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে এ খরচ পুরোটাই রোগীর পকেট থেকে খরচ করতে হয়। স্বাস্থ্য বীমা চালু হলে নাগরিকদের চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমে যেতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃত যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় নাগরিকরা আর্থিক অসচ্ছলতা থেকে মুক্ত না হয়েও স্বাস্থ্যসুবিধা পেতে পারে, সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই বলা হয় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা। ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) সংক্রান্ত প্রস্তাবে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইউএইচসির পক্ষে প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালে জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

বীমা কোম্পানিগুলো কেন এগিয়ে আসবে : বীমা কোম্পানিগুলো বছরে এক হাজার টাকা নিয়ে প্রতিটি পরিবারকে এক বছরের জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াটাকে আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব বলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে। এটা করলে বীমা কোম্পানিগুলোকে লোকসান গুনতে হবে এমন মনে হতে পারে অনেকের কাছে; কিন্তু না, এমন হবার আশঙ্কা নেই। প্রতিটি পরিবার থেকে এক হাজার করে টাকা পেলে এক লাখ পরিবার থেকে বীমা কোম্পানি পাবে এক লাখ হাজার টাকা অর্থাৎ ১০ কোটি টাকা পাবে।

বাস্তবতা হলো প্রতিটি পরিবারকে প্রতিদিনই ওষুধ নিতে হয় না, প্রতিদিনই তারা অসুস্থ হয় না। দেখা গেছে বছরে একবার অথবা দু’বার ওষুধ নিতে হয়, হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে বছরের একবার অথবা দু’বারই হাসপাতালে যেতে হয়। বড় ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার রোগও কম। ফলে ১০ কোটি টাকা এক বছরের জন্য একটি বীমা কোম্পানি নিয়ে যে ব্যবসাটা করবে, তার মুনাফার টাকাই রোগীদের পেছনে ব্যয় হবে না বরং থেকে যাবে, যা থেকে যাবে তা বীমা কোম্পানির নিজস্ব মুনাফা হিসেবে থাকবে। আর মাঝখান দিয়ে মানুষ বছরে এক হাজার টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা নিতে পারবে- এভাবেই বীমা কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসতে পারে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে। 

‘বাংলাদেশ সোস্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ বাংলাদেশে দারিদ্র্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। এই সুরক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এবং ক্রমাগত দরিদ্র পরিবারের উপকার করছে। সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হলে এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখনকার ৩৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //