বেপরোয়া মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে আসছে নীতিমালা

গত কয়েক বছরে মহাসড়ক এবং শহরের রাস্তায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে, সরকার দেশে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৮৯২ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে, ২০২১ সালে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। 

বিআরটিএ’র পরিচালক (নিরাপত্তা) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে গত কয়েক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা  বেড়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩ হাজারের নিচে। কিন্তু জাতীয় মহাসড়ক এবং শহরের রাস্তায় মোটরসাইকেল চলাচল বৃদ্ধির কারণে ২০১৯ সালে সংখ্যাটি ৪ হাজারের ঘর অতিক্রম করেছে।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু আমাদের তদন্ত অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। তাই বিআরটিএ মহাসড়কে মোটরবাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

বিআরটিএ’র এই পরিচালক আরো বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই এ লক্ষ্যে নীতিমালার খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) জমা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় খসড়া নীতির বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করবে এবং তারা এটি চূড়ান্ত করবে।

মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, এই উদ্যোগের আওতায় সরকার মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

গত ৭ জানুয়ারি, রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) সড়ক দুর্ঘটনার ওপর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে উল্লেখ করেছে যে, দেশে ২০২২ সালে ৬ হাজার ৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৭১৩ জন নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ১২ হাজার ৬১৫ জন আহত হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, ২ হাজার ৯৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৯১ জন মারা গেছে, যা মোট মৃত্যুর ৪০ দশমিক ০৭ শতাংশ।

ফাউন্ডেশনটি নয়টি জাতীয় দৈনিক, সাতটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছাড়াও ২০১৯, ২০২০, ২০২১ এবং ২০২২ সালে এই চার বছরে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় একই। ২০২০, ২০২১ এবং ২০২২ সালে মোট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণে মোট দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে।

২০১৯ সালে সংঘটিত ১১৮৯টি  মটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মোট ৯৪৫ ব্যক্তি, ২০২০ সালে ১৩৮১টি দুর্ঘটনায় ১৪৬৩ ব্যক্তি, ২০২১ সালে ২০৭৮টি দুর্ঘটনায় ২২১৪ ব্যক্তি এবং ২০২২ সালে ২৯৭৩টি দুর্ঘটনায় ৩০৯১ ব্যক্তি প্রাণ হারায়।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মটর সাইকেল দুর্ঘটনা ১৬.১৪ শতাংশ এবং  হতাহতের ঘটনা ৫৪.৮১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এই দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০.৪৭ শতাংশ এবং হতাহতের ঘটনা বেড়েছে ৫১.৩৩ শতাংশ।। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে এই দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৩.০৭ শতাংশ এবং হতাহতের ঘটনা বেড়েছে ৩৯.৬১ শতাংশ।

২০২২ সালে সংঘটিত ২৯৭৩টি মটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ৩০৯১ ব্যক্তি প্রাণ হারায় এবং ২১৫৪ ব্যক্তি আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ৭৬.৪১ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।

অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে মটরসাইকেলের সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২১.২৬ শতাংশ, মটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩২.২২ শতাংশ, ভারী যাবাহন মটরসাইকেলকে আঘাত করা ও ধাক্কা দেওয়ার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৪.৮৭ শতাংশ এবং ১.৬৫ শতাংশ ছিল অন্যান্য দুর্ঘটনা।

মটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধির বহুবিধ কারণ রয়েছে। অধিকাংশ মটরসাইকেল চালক বয়সে কিশোর কিংবা তরুণ কেবল এটাই সত্য নয়, তাদের মধ্যে জ্ঞানের অভাব এবং ট্রাাফিক আইন না মানার প্রবণতাও রয়েছে। তরুণরা বেপরোয়া গতিতে মটরসাইকেল চালায় ফলে নিজেরা যেমন দুর্ঘটনায় পতিত হয় তেমনি অন্যরাও দুর্ঘটনার শিকার হয়।

বিরাট সংখ্যক মটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ট্রাক, কাভার ভ্যান , পিকআপ ও বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে। এই দ্রুতগামী যানবাহনগুলোর অধিকাংশ চালক অদক্ষ ও অসুস্থ। বেপরোয়াভাবে তাদের গাড়ি চালানোর ফলে যারা সাবধানে মোটরসাইকেল চালান, তারাও দুর্ঘটনার শিকার হন।

চার চাকার যানবাহনের চেয়ে মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু দেশের দুর্বল (ফিটনেসবিহীন) গণপরিবহনগুলো সহজেই রাস্তায় নামতে পারে বিধায় এবং মানুষ যানজট এড়াতে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। আর এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2023 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //