বহুরূপী শিমূল ভূঁইয়া: ঠান্ডা মাথার ভয়ঙ্কর খুনি

প্রকৃত নাম মাহমুদ হাসান ভূঁইয়া (৫৪) হলেও ফুলতলা উপজেলায় শিমুল ভূঁইয়া নামে পরিচিত। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে সৈয়দ আমানুল্লাহ, আমানুল্লাহ সাঈদ, শিহাব, আবুল ফজল,  ফজল মোল্লা ও ফজলসহ বিভিন্ন ছদ্মনামে পরিচিত। এক কথায় বহুরূপি চরিত্র শিমুল ভূঁইয়ার।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যা করার পর সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এই শিমুল ভূঁইয়ার নাম। একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডের সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। এমপি আজীমরে হত্যা মামলায় ইতিমধ্যে ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশের জালে আটক হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঠান্ডা মাথার ভয়ংকর এই খুনি।  

শিমুল ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ দুইটি হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরকসহ ফুলতলা, যশোর সদর থানা ও যশোরের অভয়নগর থানায় আটটি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে আর কী কী মামলা রয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনার ফুলতলা উপজেলা সদরের দামোদর গ্রামের মৃত নাসির ভূঁইয়ার ছয় ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে চতুর্থ শিমুল ভূঁইয়া। ভাইদের মধ্যে লাকি ভূঁইয়া ফুলতলা বাজারের পানপট্টির ইজারাদার, বকুল ভূঁইয়া ফুলতলা বাজারের বাস স্ট্যান্ডের ইজিবাইক ও মাহিন্দ্রের ভাড়া আদায়কারী, মুকুল ভূঁইয়া ওরফে হাত কাটা মুকুল বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের সময় পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত, পঞ্চম ভাই পিপলু ভূঁইয়া পুলিশে চাকরিরত ও সবার ছোট শরীফ মোহাম্মদ ভূঁইয়া শিপলু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। দুই বোনের মধ্যে ছোট বোন লুচির স্বামী নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থি দল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) শীর্ষ নেতা মোফাখখারুল ইসলাম। ঐ দলের তাত্ত্বিক নেতাও মোফাখখারুল।

শিমুল ভূঁইয়া ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভগ্নিপতি মোফাখখারুলের হাত ধরে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পার্টির আমলে ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নের তত্কালীন চেয়ারম্যান প্রার্থী ইমরান হোসেনকে সকাল ১০টার দিকে শোলগাতিয়া বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শিমুল ভূঁইয়ার নাম প্রথম আলোচনায় আসে। এরপর একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হোসেনকে হত্যা করে সে। এছাড়া ফুলতলা উপজেলার পার্শ্ববর্তী যশোরের অভয়নগর উপজেলার গণেশ নামে এক জনকে ও ইমান আলী নামে আরেক জনকে হত্যা করা হয়। এ দুটি মামলায় শিমুল ভূঁইয়া ওরফে সৈয়দ আমানুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে ছিলেন।

সূত্র জানায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফুলতলার দামোদর গ্রামের সরদার ও ভূঁইয়া পরিবারের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিস কক্ষের মধ্যে শিমুল ভূঁইয়া দামোদর ইউনিয়নের তত্কালীন চেয়ারম্যান সরদার আবুল কাশেমকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট তার বড় ছেলে একই ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান সরদার আবু সাঈদ বাদলকে বাড়ির সামনের রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

সরদার পরিবারের অভিযোগ, দুটি হত্যাকাণ্ডে শিমুল ভূঁইয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি জড়িত। এরমধ্যে আবুল কাশেম হত্যা মামলায় শিমুল, শিপলু ও মমিনুরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত থেকে তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। ওই দুটি মামলার বাদী ছিলেন সরদার আবুল কাশেমের আরেক ছেলে ফুলতলা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সে সময়ের সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার আলাউদ্দিন মিঠু। পিতা ও ভাইয়ের মামলা নিয়ে আদালতে তদারকি করছিলেন মিঠু। এ নিয়ে তার ওপর শিমুল ভুঁইয়াসহ  তার সন্ত্রাসী বাহিনী কয়েক দফা হামলা চালায়। এছাড়া তাকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। 

এ রকম অবস্থায় ২০১৭ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে দামোদর গ্রামের নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি করে হত্যা করা হয় সরদার আলাউদ্দিন মিঠুকে। এ সময় তার শ্বশুর সৈয়দ সেলিম ও দেহরক্ষী নওশের গাজী গুলিবিদ্ধ হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় নওশের গাজীকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড তার নেশায় পরিণত হয়। জড়িত থাকলেও সে থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

শিমুলের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মুক্তা খুলনা জেলা পরিষদের সদস্য। গত নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, শিমুলের ভয়ে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়াতে সাহস করেনি।

এদিকে এলাকায় খোঁজ নিয়ে  জানা গেছে, প্রায় দুই যুগ ধরে বাড়িছাড়া শিমুল ভূঁইয়া। প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন কেউ তার খবর জানে না।

হত্যাকাণ্ডসহ শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে ছোট ভাই দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শরীফ মোহাম্মদ ভূঁইয়া শিপলু ও বড় ভাই হানিফ মোহাম্মদ ভূঁইয়া ওরফে লাকি ভূঁইয়ার ছেলে তানভীর ভূঁইয়ার। একাধিক হত্যা মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘ দুই যুগের ওপর বাড়িছাড়া শিমুল ভূঁইয়া।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে শিমুল ভূঁইয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘর তালাবদ্ধ। যেন সুনসান নীরবতা। ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়ার বাড়িতেও কারো সাড়া পাওয়া যায়নি। পাশের আরেকটি বাড়িতে বড় ভাই হানিফ মোহাম্মদ ভূঁইয়া ওরফে লাকি ভূঁইয়া। লাকি ভূঁইয়ার ছেলে তানভীর ভূঁইয়াও সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। লাকি ভূঁইয়ার বাড়িটিও তালাবদ্ধ। জানালার কপাট খোলা থাকলেও ঘরের মধ্যে কারো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। তারা কোথায় গেছে, তাও জানেন না প্রতিবেশীরা।

খুলনার পুলিশ সুপার সাঈদুর রহমান বলেন, শিমুল ভূঁইয়ার গ্রেফতারের বিষয়ে আমাদের কোনো কিছু জানা নেই।

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পুলিশের কাছে চিহ্নিত পলাতক মো. আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহিন সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি শিমুল ভূঁইয়ার ফুপাতো ভাই। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে তার বাড়ি হলেও ফুলতলায় তাদের যাতায়াত রয়েছে। তবে পুলিশ এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। শাহিন কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ছোট ভাই।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //