উজানবাঁশি- লোকজ জীবনের আখ্যান

চল্লিশ বছর বাঘের পেটে থাকা এবং তারপর এই গ্রহে নেমে আসা আবু তোয়াব একজন নগ্ন মানব। নীলাক্ষি তীরের জনপদে তার আবির্ভাবের সূত্র ধরে বিধৃত কাহিনিতে আমরা এমন অনেক কিছু ‘উজানবাঁশি’ উপন্যাসে পাই; যা আগে আর দেখা যায়নি কোথাও।

স্বকৃত নোমান বিরচিত ‘উজানবাঁশি’ উপন্যাসটি এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে কলেবরে সর্ববৃহৎ। এখানে তিনি যে গল্পটি বলেছেন, সেই গল্পের ভেতরও গল্প আছে। আর স্বভাবগতভাবেই গল্প শোনার আগ্রহ মানুষের সুপ্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষের এই আগ্রহের ফলেই বিভিন্ন সময়ে নানা কাহিনির উদ্ভব হয়েছে।

‘উজানবাঁশি’ উপন্যাসের শুরু হয়েছে এভাবে, ‘ধনুকের মতো বাঁক নিয়ে নীলাক্ষি যেখানে উজানগাঁয়ে ঢুকেছে, ঠিক সেখানে, সেই ধনুকের পেটে যুদ্ধের মাঠের মতো বিশাল নয়নচর। যুদ্ধের মাঠই বটে। র‍্যাডক্লিফ যখন মানচিত্র আঁকেন নীলাক্ষিকে করেছিলেন পাক-ভারতের সীমানা। কিন্তু নদী তো চিরকাল অস্থির। ভাঙে, গড়ে। প্রতিনিয়ত গতিপথ বদলায়। নীলাক্ষিও বদলালো। ধীরে ধীরে সরে আসে পশ্চিমে, আর পুবে জাগিয়ে তোলে দুই শ কুড়ি একরের বিশাল চর। শুরু হয় চরের মালিকানা নিয়ে পাক-ভারত লড়াই। কেউ হারত না, কেউ জিততও না। কয়েক বছর পরই বাঁধত তুমুল যুদ্ধ। সেই কবে পাকিস্তান ভাঙল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, অথচ এখনো মীমাংসা হলো না চর নিয়ে বাংলা-ভারতের বিবাদ। এখনো যুদ্ধ বাঁধে চরের মালিকানা নিয়ে। সেই যুদ্ধে গরু মরে, ছাগল মরে, পাখপাখালি মরে, কখনো কখনো মানুষও। তাই এই চরে কারো যাওয়া বারণ। গেলে খুলি উড়ে যাবে, বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাবে, ভুড়ি নেমে যাবে। এই পথে যাতায়াত কেবল সন্ন্যাসীদের। গেরুয়া বসন, মাথায় জটা, গলায় জপমালা, এক হাতে ত্রিশূল, অন্য হাতে বদনা। বিএসএফ বাধা দেয় না, বিডিআরও না। আইন তাদের জন্য শিথিল। কিংবা তারা আইনের আওতায় পড়ে না।’ 

এ পর্যন্ত পড়েই বলে দেওয়া যায়, এই উপন্যাসের উপজীব্য একটি জনপদের মানুষের জীবন আর এর কাহিনি নিশ্চিতভাবেই বিশ্লেষণাত্মক, দীর্ঘ ও সমগ্রতাসন্ধানী। শুরুতেই সার্থক চিত্রায়ণে যথার্থ ভাষা প্রয়োগও আমরা লক্ষ্য করি। পরবর্তীতেও ঘটনার সাথে এর উপযুক্ত পরিবেশের সুনিপুণ চিত্র ফুটে উঠেছে প্রত্যেক পরতে। অবলীলায় লেখক সবকিছু বলে গেছেন, কোনো আড়ষ্টতা নেই।

‘উজানবাঁশি’র প্লট বা আখ্যান অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত। প্লটের মধ্যে ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়াকাণ্ডকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন লেখক, যা বাস্তব জীবনকে প্রতিফলিত করে। ঔপন্যাসিক স্বকৃত নোমান তার জাদুকরি দক্ষতায় এর কাহিনিকে আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক ও বাস্তবোচিত করেছেন। সামগ্রিক জীবনদর্শন, সংঘাত আর মিথের মিশেল এই উপন্যাসটিকে অনন্য উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গেছে বলা যায়। 

বইয়ের ফ্ল্যাপেই বলা হয়েছে, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সমাজ ও রাজনীতি, রক্ষণশীলতা ও উদারপন্থা, জ্ঞান ও নির্জ্ঞান এবং বহুমুখী সংস্কৃতির দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস। উপজীব্য বিষয় ও ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষার মাধ্যমেই ‘উজানবাঁশি’ উপন্যাস হয়ে উঠেছে যথার্থ ও সার্থক আবেদনবাহী। তাছাড়া গল্প বলার স্টাইলের চমৎকার ধরন দেখেই আমরা বুঝতে পারি, লেখক স্বকৃত নোমানের গল্প বলার শক্তি, চিন্তার মননশীলতা, স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //