মধ্যবিত্তরা বাজেট হিসাবের বাইরে

বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই

বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই

গত বৃহস্পতিবার (৩ জুন) সংসদে যে বাজেট উত্থাপিত হল, তাতে মধ্যবিত্তের জন্য স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। অথচ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তারা কর দেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করেন। 

করোনা মহামারিতে এই শ্রেণীর মানুষের আয় কমেছে। কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অনেকেই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ঋণে জর্জরিত হয়েছেন। নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে আর কোনো বিকল্প আয়ের উৎস তাদের নেই। যারা এখনো টিকে থাকার লড়াই করছেন তাদের সামনেও রয়েছে অনিশ্চিত সময়। এবারের বাজেটে তাদের ব্যাপারে তেমন কিছুই নেই। 

বাজেট ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে মাথায় রেখে বাজেট করছি। এটা হবে মানুষের জীবন রক্ষার বাজেট। মানুষের জীবিকার রক্ষারও বাজেট এটা। সবার যাতে অংশীদারত্ব থাকে, এমন কৌশল অবলম্বন করেই আমি প্রণয়ন করছি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট।’ কিন্তু বাজেটে সে কথার প্রতিফলন মেলেনি। মধ্যবিত্তরা উপেক্ষিত থেকেছে অনেকাংশেই।

অথচ করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মধ্যবিত্তরাই। তাদের সীমিত আয়। খরচ বেড়ে যাওয়ার একটা বিষয় থাকে। বাড়িভাড়া, বাচ্চাদের শিক্ষাবাবদ খরচ, ওষুধ খরচ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি খরচ বাদ দিয়ে যে টাকা অবশিষ্ট থাকে, সেই টাকা তারা দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর জন্য ব্যয় করে। অর্থাৎ কোন খাতে তারা কত ব্যয় করবে সেটা মাসের শুরু থেকেই নির্ধারিত। যদি কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারে মাসের ২৫ তারিখের পর বাকিতে পণ্য কিনতে হয়, তাহলে তার সারা বছরই সেই ধার চলতে থাকে। যদি কোনো মাসে বাচ্চার লেখাপড়ার খরচ বেড়ে যায় কিংবা ওষুধের জন্য খরচ বেড়ে যায়, তবে সেই মাসে খাবারের জন্য কিছুটা কম খরচ করতে হয়। আয় নির্দিষ্ট হওয়ার কারণে হিসাব নিকাশ যা করার, খাদ্যের খরচের উপরই করতে হয়। যদি বাড়ি ভাড়া বেড়ে যায়, পরের মাস থেকে খাবারের মান একটু কমে যায়, যতদিন না পর্যন্ত বেতন বাড়ে। এই হচ্ছে মধ্যবিত্তের অবস্থা।

বাজেটে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। আবার দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের জন্যও সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে এতদিন ৮৮ লাখ গরিব-অসহায় সহায়তা পেয়ে আসছিল। এই বাজেটে আরো ১৪ লাখ সুবিধাভোগী যুক্ত হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, নারীদের জন্য কর ছাড় ইতিবাচক বলে প্রশংসিত হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কোনো সুখবর নেই। যাদের আয় কমেছে, তাদের ব্যাপারেও নেই বিশেষ উদ্যোগ। বাজেটের পর স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পণ্যের দাম ও সেবার মূল্য বাড়লে সবাইকে তা পরিশোধ করতে হবে।    

বাজেটে কর্মসৃজনমূলক বা কর্মসংস্থানমূলক কিংবা যারা করোনার কারণে আরো দরিদ্র হয়ে পড়েছেন তাদের জন্য কোনো কার্যকর কর্মসূচি নেই। মানবসম্পদ উন্নয়ন, জীবিকা নিশ্চিতের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে- ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোয় কর্মসংস্থান বাড়বে। এই সুবিধা সবাই পাবে। কিন্তু করোনাকালে বন্ধ থাকা সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ অন্যান্য স্বায়ত্তশায়িত প্রতিষ্ঠানের শূন্য থাকা পদে নিয়োগ ও নিয়মিত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। 

বেকারদের জন্য বাজেটে একমাত্র ‘মহামারিজনিত কারণে দেশব্যাপী হঠাৎ বেকারত্ব ও আয় হারানো তালিকাভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর’ জন্য সরাসরি এককালীন নগদ আড়াই হাজার টাকা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই স্বল্প বরাদ্দে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কতটুকু ক্ষতিপূরণ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।    

বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কোনো ছাড় দেয়া হয়নি। আগের মতোই বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হলে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। অথচ সবচেয়ে বেশি রিটার্ন জমা দেন মধ্যবিত্তরা। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, যারা সবচেয়ে বেশি কর দেন; কিন্তু সুবিধা পান অন্যদের চেয়ে কম।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা আজও কাটেনি। মধ্যবিত্তের কাছে সঞ্চয়পত্র তাই নিরাপদ বিনিয়োগ বলে বিবেচিত ছিল। কিন্তু নতুন বাজেটে দুই লাখ টাকার ঊর্ধ্বে সঞ্চয়পত্র কিনতে ও পোস্টাল সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। মধ্যবিত্তদের অনেকেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় দৈনন্দিন খরচ চালান। তাদের আর কোনো আয়ের পথ খোলা নেই। সঞ্চয়পত্রের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় নিশ্চিতভাবেই তারা বিপাকে পড়বেন। এতে সঞ্চয়পত্রের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন অনেকে। জড়িয়ে পড়তে পারেন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সামনে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা সমবায় সমিতি, বহুস্তর বিপণন কোম্পানিতে (এমএলএম) বিনিয়োগের প্রলোভন আসবে। ফাঁদে পড়তে পারেন তারা।

চলতি বছর একটি বর্ধিত স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে ৮০ হাজার পরিবারকে প্রতি বছর ৫০ হাজার টাকার বীমার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু, এটিও কেবল দারিদ্র্যসীমার নিচে যাদের অবস্থান, তাদের জন্য। মধ্যবিত্তরা এর আওতায় পড়েনি। অথচ করোনা চিকিৎসা করাতে গিয়েই মধ্যবিত্ত অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। 

এ বছরের শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনোমিকস ইউনিট (এইচইইউ) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালে একজনের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। মধ্যবিত্তদের স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা হলে তারা চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা পেতেন।

প্রায় দেড় বছর ধরে শিক্ষায় যে অচলাবস্থা চলছে, তা থেকে বের হয়ে কীভাবে শিক্ষার্থীদের যোগ্য ও কাজের উপযুক্ত করে তোলা হবে সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেই। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি নিয়মিত আদায় করে যাচ্ছে। সন্তানদের নিয়ে হতাশায় থাকা অভিভাবকরা এই বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ অনুভব করছেন। সরকারের তরফে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন ফি সমন্বয়ের কথা আগেই বলা হয়েছিল। কিন্তু এত দিনেও তা কার্যকর হয়নি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ফি আদায় করলেও শিক্ষকদের সময়মত বেতন দিচ্ছেন না। এতে শিক্ষকরা চরম অর্থসংকটে আছেন। এসব বিষয়েও যথাযথ মনিটরিং দরকার। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা ও শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষিত জনবলকে কাজে লাগাতে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াও সচল রাখতে হবে। এতে অন্তত কিছু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। গত এক বছরে মধ্যবিত্তদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়েছেন। এ সমস্যা থেকে কী করে তাদের রক্ষা করা যায় সে ব্যাপারেও ভাবতে হবে।

মূলত মধ্যবিত্ত যারা, তারাই আয় হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। সুতরাং, মধ্যবিত্ত বিকাশের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি আরো এগিয়ে যাবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল, এবারের বাজেটে তা অনেকটাই হোঁচট খাচ্ছে। এ রকম এক পরিস্থিতিতে গতানুগতিক নীতি বদলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের যে চ্যালেঞ্জ, সরকার তা কতটুকু নিতে পারবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //