দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

করোনার সংকটের মধ্যে টানা লকডাউনে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি। যার আঁচ সরাসরি গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। কাজ হারিয়েছেন লাখ লাখ কর্মজীবী। অর্থ সংকটে পড়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। শিল্পজগতে চরম দুর্দশা। শিকেয় উঠেছে ব্যবসা। কেউ আবার নতুন কারবারে হাত দিলেও মূলধনের অভাব। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তো আরও আগেই পুঁজি ও জমানো সঞ্চয় ভেঙে খেয়ে বসে আছেন। 

বছর ঘুরলেও দগদগে ক্ষতের যন্ত্রণা নিয়েই টিকে থাকার লড়াইয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। তাছাড়া ‘জীবন ও জীবিকা বাঁচানো’র কথা বলা হলেও বাস্তবতার সংযোগ নেই এই খতিয়ানে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা দিয়ে আর যাই হোক; রুগ্ণ জীবন ও জীবিকাকে টেনে তোলা অন্তত সম্ভব নয়। উপেক্ষা করা হয়েছে চলমান মহামারিতে নতুন করে দরিদ্র হওয়া বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকেও। 
টাকা দেবে গৌরীসেন

লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। তাই এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে বরাদ্দের পুরো অর্থের এক-তৃতীয়াংশ সরকারকে ঋণ করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘বাইরে থেকে ধারের বাজার এখন খুব ভালো। আমাদের রেকর্ডও খুব ভালো। অপচয় করি না। সময় মতো পরিশোধ করি। পজেটিভভাবে করি বলেই গ্রোথ ধরে রাখতে পেরেছি। কোনোভাবেই এটা নিয়ে ভয় পাচ্ছি না।’ 

স্বাস্থ্যের দুরবস্থা  

পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনার কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে যেকোনো পরিকল্পনাতেই এখন সবার ওপর স্থান পায়। কাজেই ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও স্বাস্থ্যখাত সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে বলে অনুমান ছিল। বাস্তবতা হলো এবারও জনগুরুত্বপূর্ণ খাতটির বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশও ছুঁতে পারেনি। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় যদিও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

অথচ গত অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে নতুন তেমন কিছু নেই। ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে এবার, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটে যার আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশে। এ চিত্রটা অবশ্য গত ১২ অর্থবছরের। প্রতিবারই জনস্বাস্থ্যে সরকারের ব্যয় ধরা হয় জিডিপির এক শতাংশেরও নিচে।

যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ, স্বাস্থ্য খাতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকতেও জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনা করে সরকার। ‘বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ যাই থাক, প্রয়োজনে অর্থের জোগান দিতে কোনো সমস্যা হবে না’ বলে অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের শিক্ষক ড. শাফিউন শিমুল বলেন, ‘যেহেতু এটা একটা বিশাল ঘাটতি বাজেট। তাই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থছাড় করাও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। একইসঙ্গে অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতিগত কারণে থোক বরাদ্দের অর্থও খুব একটা কাজে আসবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯ পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো, আইসোলেশন সেন্টার ও হাসপাতাল তৈরিই কেবল মহামারি মোকাবেলার উপায় নয়। এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সফল রিস্ক কমিউনিকেশন ও সমন্বিত প্রচেষ্টা। অথচ এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই প্রস্তাবিত বাজেটে।’

অংকের বাইরে দারিদ্র্য 

বাংলাদেশে গত বছরের মার্চ থেকে জেঁকে বসা করোনা বিশালসংখ্যক নতুন দারিদ্র্য তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এ দেশের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ আগে থেকেই দরিদ্র। মহামারির কারণে এ অনুপাত বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটির মতো মানুষ এখন গরিব। 

সিপিডির গত এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, করোনার কারণে দেশে ১ কোটি ৬৮ লাখ মানুষ নতুন দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। একই সময়ে পরিচালিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আরেকটি সমীক্ষার ফলাফল বলছে, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগেই ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষকে দরিদ্র হতে হয়েছে। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের খানা পর্যায়ের জরিপের তথ্য, করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। তার মানে নতুন-পুরনো মিলে গরিব মানুষের সংখ্যা ছয় থেকে সাত কোটি। সব হিসাবেই সংখ্যাটি বেশ বড়; কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘মহামারিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিপর্যয়ের পর্যায়ে যাওয়ার মতো খারাপ হয়নি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলাতেও সরকার কার্যকর ও সচেতনভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ 

নতুন দরিদ্র হওয়া বেশিরভাগ মানুষই জীবিকা নির্বাহ করতেন অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে। করোনা সংক্রামণ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সময় যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তাতে যে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর বাইরেও করোনাকালে ৬ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরতে হয়েছে, প্রতি বছর শ্রমের বাজারে আসছে ২২ লাখ তরুণ, তাদের কর্মসংস্থানের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা বাজেটে নেই। সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী এবং ২০ লাখের বেশি শিক্ষক বিপর্যস্ত। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা সহায়তা ও শিক্ষকদের জন্য দুর্যোগ ভাতা প্রয়োজন থাকলেও বাজেটে তার নির্দেশনা নেই। নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং পাহাড় সমতলের আদিবাসীরাও এই সময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপদাপন্ন হয়েছেন। তাদেরকে রক্ষায়ও তেমন বরাদ্দ দেয়া হয়নি। 

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘করোনার ছোবলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন, বাজেটে তাদের বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৌখিক ঘোষণা দিলেও বরাদ্দ আগের মতোই নিতান্ত কম।’ 

ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় অনেক মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এদের সহায়তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। আবার এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, সাহায্য বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ। সুতরাং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে যাতে দুর্নীতি ঢুকে না পড়ে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’

পণ্য হলো শিক্ষা! 

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও মহামারির মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষা খাত জিডিপির ছয় শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ পেলে তা আদর্শ ধরা হয়। অথচ আগামী অর্থবছরে যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা জিডিপির ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এমনিতেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাগামহীন ফি আর নানা অজুহাতে টাকা নেয়। এগুলো না থামিয়ে আরোপ হচ্ছে কর। 

টাকা উঠুক সাধারণের হাতে  
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের হাতে নগদের অভাব থাকলে বাজারে চাহিদা বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে সাধারণের আয়ের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে ছোট-মাঝারি শিল্পকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারাও উৎসাহ পেয়ে কর্মী নিয়োগের পথে হাঁটে। এ ছাড়াও বিনিয়োগকারীরা যাতে লগ্নিতে উৎসাহ পান, তার সহজ সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে সরকারকেই। 

তবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাক্সিক্ষত বরাদ্দ দেয়া হয়নি। উল্টো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করা উচিত ছিল সরকারের। কারণ সাধারণ মানুষের হাতে টাকা দিলে তারা সেটা খরচ করত, এতে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসত। সে জন্য ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো উচিত, যা প্রস্তাবিত বাজেটে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।’

উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ যুক্তিসঙ্গত হয়নি উল্লেখ করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকার যদিও বলছে- এই কর মালিকপক্ষ তাদের মোট লভ্যাংশ থেকে দেবে; কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা যাবে তার উল্টো অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা ঠিকই শিক্ষার্থীদের ওপর এই করের বোঝা চাপিয়ে দেবেন। এতে অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //