Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

‘টেম্পার শেষ’ নোটে ভোগান্তি, নতুন টাকা কবে?

Icon

আবুল বাসার সাজ্জাদ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১১:৫৫

‘টেম্পার শেষ’ নোটে ভোগান্তি, নতুন টাকা কবে?

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নতুন নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে না, পুরনো নোটগুলো অতি ব্যবহারে মলিন হয়ে যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অচলও হয়ে পড়ছে।

এসব নোটের গ্রহীতারা চালাতে না পেরে টাকা ফেলে দিচ্ছেন, ব্যবসায়ীদের হাতে জমে থাকা নোটগুলো ব্যাংকে পাল্টাতে না পেরে নতুন টাকা বিক্রির দোকানে অর্ধেক দামে বেচতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন নকশার নোট ছাড়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটি কার্যকর না হওয়াতে দেখা দিয়েছে এই বিপত্তি।

গত কোরবানির ঈদের আগে শুরুতে অল্প কিছু টাকা বাজারে ছাড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ঈদের পরে আরও টাকা ছাড়া হবে, কিন্তু সেই টাকা আর ছাড়া হয়নি।

বেশি ঝামেলা ছোট নোটে। দৈনন্দিন লেনদেনে ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে এগুলো দ্রুত মলিন হয়ে যায়।

বাসের ভাড়া সর্বনিম্ন ১০ টাকা থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে ১০ টাকার নোটেই।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নাজমুল আলম সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, “প্রতিদিনের বাজার থেকে শুরু করে বাসভাড়া—সবকিছুতেই খুচরা টাকা জরুরি। দ্রুত নতুন টাকা সরবরাহ না করলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।”

বেসরকারি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, “টাকা ছাপানো একটা খরচের ব্যাপার। এখন সরকার নতুন টাকা না ছাপিয়ে খরচ কমাচ্ছে কিনা বলতে পারি না। তবে এটা ঠিক, নতুন টাকার সরবরাহ কম হওয়ায় এই সমস্যায় অনেকেই পড়ছে।”

একটা নোট কয়বার হাতবদল হয় এসব হিসাব করে কিছুদিন পরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নোট ছাড়া উচিত, বলছেন তিনি।

ইসমাইল কবীররা ঝামেলায়

ফার্মগেট থেকে বাসে করে শাহবাগ যাচ্ছিলেন ইসমাইল কবীর। ১০ টাকা ভাড়া দিতে ৫০ টাকার একটা নোট দেন। ফেরত পান একটি ২০ টাকার আর দুটি ১০ টাকার নোট।

১০ টাকার একটি নোট ছিল একেবারেই মলিন। সেটি আবার ছেঁড়া, স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। নোটটি পাল্টে দিতে বললে বাস সহকারী বললেন, “১০ টাকা ভাড়া, দিছেন ৫০ টাকা। ১০ টাকা ভাংতি দেন, না হয় এটাই নেন।”

এই কথা শুনে ইসমাইল আর কথা বাড়ালেন না। নোটটা মানিব্যাগে রেখে দিলেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল পরে।

শাহবাগ নেমে এক দোকানে চা-রুটি খেয়ে তালিযুক্ত সেই ১০ টাকার নোটটি দিলে দোকানি সেটি ফেরত দেন। ‘আমি নিয়েছি, আপনি নেবেন না কেন’—তার এই কথায় মন গলেনি সেই দোকানির।

চার দিনেও সেই টাকা কোথাও চালাতে পারেননি ইসমাইল, সাম্প্রতিক দেশকালকে বিরক্তির সুরে বললেন তিনি।

“এসব টাকা প্রায়ই হাতে আসে। আমি সহজে ছেঁড়া-ফাড়া টাকা নেই না। তবে কখনও ভুলে নিয়ে ফেলি। পরে এই টাকা চালাতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ি। এখন ছেঁড়া-ফাড়া টাকা ছাড়া বাকিগুলোও খুব নড়বড়ে। মানে যে কোনো সময় ছিঁড়ে যেতে পারে।”

কোরবানির ঈদের আগে সীমিত পরিসরে কিছু টাকা বাজারে ছাড়ার পর নোটের নকশা নিয়ে নানা কথা উঠে। ২০ টাকার নোটে মন্দিরের ছবি থাকার পর এ নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। এরপর সরকার আর নোট ছাড়েনি। এ কারণে বাজারে থাকা টাকাগুলো শত ব্যবহারে মলিন হয়ে যাচ্ছে। ৫ টাকার নোট দেখাই যায় না, ১০ আর ২০ টাকার নোট নিয়েও সংকট বেশি। এর অনেকগুলো চালানোই দায়।

ইসমাইল কবীরের মতো আরেকটি ঘটনা ঘটল রুবেল মিয়ার সঙ্গেও। তিনি এক কেজি আম কিনে যেসব নোট ফেরত পেয়েছেন, তার কোনোটিই তিনি নিতে রাজি না।

তবে আপত্তি জানাতেই দোকানি বললেন, “নতুন টাকা পাবেন কোথায়? সবখানেই তো এ রকম নোট ঘুরছে। দেশে নতুন টাকা নাই। সবই এমন ত্যানামার্কা টাকা।”

একটি বাসে চালকের সহকারীর ভাষায়, ‘নোটের টেম্পার শেষ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেছেন, তাদের হাতে পুরনো ভালো নোট আছে। কিন্তু সেগুলো বাজারে ছাড়া হবে না। নতুন নকশার নোটগুলো প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।

কথা কাটাকাটি নিত্য ঘটনা

ইসমাইল কবীর বাসে যে ঝামেলায় পড়েছিলেন, একই ঝামেলায় নিত্যদিন পড়েন শত শত যাত্রী, ক্রেতা-বিক্রেতা।

বাজারে, চায়ের দোকানে কিংবা গণপরিবহনে—যেখানেই খুচরা টাকার দরকার, সেখানেই বিড়ম্বনা। নোট নিয়ে যাত্রী-বাস সহকারী, ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে।

বাসের এক যাত্রী স্কচটেপ মারা ১০ টাকা দিলে নিতে চাননি সহকারী কামরুল ইসলাম। পরে সেই যাত্রী জোর করেই দিয়ে বলেন,“তোমাদের মতো হেল্পাররাই দিছে এটা, তাইলে নিবা না কেন?”

কামরুল তার হাতে থাকা সবগুলো নোট দেখিয়ে বলেন, “দেখেন মামা, এখানের ম্যাক্সিমাম টাকা নরম। এগুলো নিয়াই গ্যাঞ্জাম বাজে যাত্রীগো লগে। সরকার নতুন নোট ছাপাইলেই তো হয়। এগুলোর তো টেম্পার শেষ।”

পান্থপথ এলাকার রিকশাচালক মো. হাসান বলেন, “ছেঁড়া টাকার জন্য দিনে কয়বার ঝামেলায় পড়ি তার শেষ নাই। শরীর-হাত ঘামে। পাতলা টাকা নিলেও কয়েকবার হাতাইলেই ছিঁড়া যায়।”

মলিন নোটও মেলে না কখনও

কখনও কখনও খুচরা নোট পাওয়াই যায় না। ইস্কাটনে এক রিকশাচালককে ৩০ টাকা ভাড়া দেওয়ার জন্য ৫০ টাকার নোট দিলে তিনি বলেন, “মামা, ভাংতি দেন, ভাংতি নাই।”

সেগুনবাগিচায় বারডেম হাসপাতালের ক্যান্টিনে সকালে গিয়ে নাশতা খেতে চাইলে ব্যবস্থাপক শুরুতেই বলে নেন, “ভাংতি কিন্তু নাই। ভাংতি টাকা থাকলে বসেন।”

এমন কেন বলছেন—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “মামা, ভাংতি টাকার খুব অভাব। কী করব বলেন?”

না দেখে নিলে বিপদ, বেচতে হয় অর্ধেক দরে

কারওয়ানবাজারে আখের রস বিক্রেতা কাজের ব্যস্ততায় এক ক্রেতার কাছ থেকে টাকা ভালো করে না দেখেই রেখে দিয়েছিলেন। সেই টাকা তিনি দুই দিনেও আর চালাতে পারেননি।

সাম্প্রতিক দেশকালকে তিনি বলেন, “কাস্টমার বেশি আছিল, তাই ২০ টাকা না দেইখ্যাই রাইখ্যা দিছিলাম। পরে এই টাকা যারেই দেই, ফেরত দিয়া দেয়। টাকাটা যে খালি তালি দেওয়াই না, একেবারে পাতলা টিস্যুর মতো।

তালি থাকলেও অনেক সময় চালানো যায়। কিন্তু হাতে নিয়ে যদি কেউ দেখে টিস্যুর মতো, তাইলে কেউ নিবে?—এই প্রশ্ন করে বলেন, “তবে এইরকম টাকা আমার কাছে দুই-তিন দিন পরপরই আসে। আমিও সিস্টেমে চালায়া দেই।”

কোনো কোনো বিক্রেতার কাছে কয়েক মাসে অনেকগুলো ছেঁড়া টাকা জমে যায়। যেগুলো কোনোভাবেই বিনিময়ের যোগ্য না। তাই তারা সেই ছেঁড়া নোটগুলো অর্ধেক দরে বিক্রি করে দেন।

আসাদ গেটে একটি টং দোকানে পত্রিকা বিক্রি করেন মো. শহিদুল্লাহ খন্দকার। তার কাছে কয়েক মাসে ধরেই খুচরা ছেঁড়া টাকা জমেছে। সব মিলিয়ে ছিল ৩৪০ টাকা। এই নোটগুলো তিনি ১৭০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, “আমার জিনিসের মূল্য কম থাকায় খুচরা টাকার লেনদেন বেশি। আর বর্তমানে খুচরা টাকা প্রচুর ছেঁড়াফাড়া। প্রতিদিন কয়েকটা ছেঁড়া টাকা, বাতিল টাকা পাই। বারবার চেক দিয়েও কীভাবে যেন ছেঁড়া এসে যায়। সেগুলো কাউকে দিলে নেয় না। পরে আমার কাছে পড়ে থাকতে থাকতে যখন অনেকগুলো জমে, তখন গুলিস্তান থেকে আসা খুচরা ছেঁড়া টাকা কিনে ওদের কাছে বিক্রি করে দেই।”

কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক

গত ২ জুন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত পরিসরে নতুন নকশার নোট বাজারে ছাড়ে। ২০, ৫০ ও ১০০০ টাকার নোট বিতরণ করা হয়। সে সময় সংবাদমাধ্যমে লেখা হয় ২০০ কোটি টাকার নোট ছাপতে পেরেছে সরকার।

তবে এই নতুন নোট নিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। এই টাকা এটিএম এবং মেট্রোরেলের বুথে অচল। নতুন নোট নিয়ে সংশয়ের কারণে সেগুলো চালাতে গিয়েও হিমশিম খেয়েছে মানুষ।

ঈদের পর নতুন নোট আর ছাড়ার খবর আসেনি। এখনও বাজারে পুরনো নোটই চলছে। এক বছরেও পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাড়তে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

মানুষের ভোগান্তির কথা জানিয়ে নতুন নোট ছাড়ার অগ্রগতি কী—এই প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, “আমাদের কাছে ফ্রেশ নোট পর্যাপ্ত আছে। কিন্তু আমরা বাজারে ছাড়ছি না। আমরা নতুন ডিজাইনের নোটগুলো বাজারে ছাড়তে চাচ্ছি। আগামী মাসের শেষের দিকে ১০ টাকার নোট বাজারে ছাড়া হবে। এর পর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য নোট বাজারে আসবে।”

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫