লবণ মৌসুম শেষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি

লবণ উৎপাদন কম

লবণ উৎপাদন কম

কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হয়েছে। ২২ লাখ টন লবণ উৎপাদনের টার্গেট মাথায় রেখে শুরু হয়েছিল লবণ মৌসুম। মৌসুম শেষে সর্বশেষ উৎপাদন হয়েছে সাড়ে ১৬ লাখ টন লবণ। এর সঙ্গে যোগ হবে গত মৌসুমে উৎপাদিত মজুদকৃত ৩ লাখ টন লবণ। তাই দেশের চাহিদা ২২ লাখ টন লবণের বিপরীতে বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে লবণ রয়েছে সাড়ে ১৯ লাখ টন লবণ। আড়াই লাখ টন লবণ এখনো চাহিদার চেয়ে কম রয়েছে। ফলে বছরের শেষ প্রান্তে এসে আড়াই লাখ টন লবণ আমদানি করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন লবণ মিল মালিকরা। 

চাহিদার চেয়ে লবণ উৎপাদন কম হলেও এখনো লবণের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কালবৈশাখীর কবল ও প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে উৎপাদিত লবণের প্রায় লক্ষাধিক টন বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে লবণ উৎপাদন সাড়ে ১৭ লাখ টনে উন্নীত হতো। চাল, ডাল তেলসহ সামগ্রিক নিত্যপণ্যের মূল্য চরম ঊর্ধ্বমুখী হলেও লবণের মূল্য সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে লবণ চাষিরা চলতি মৌসুমে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ১ কোটি লোক জড়িত। কারণ পরিবহন শ্রমিক মধ্যস্বত্বভোগী, মিল মালিক, মিল শ্রমিক খুচরা বিপণনকারীসহ অসংখ্য লোক। দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদনকারী উপকূলীয় অঞ্চল চট্টগ্রামের বাঁশখালীসহ কক্সবাজারের ৭ উপজেলার লক্ষাধিক লবণ চাষি এ পর্যন্ত সাড়ে ১৬ লাখ টন লবণ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। 

মাঠ ছেড়ে আসা লবণ চাষি টেকনাফের জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি চলতি মৌসুমে ১০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেছেন। তবে লবণের ন্যায্যমূল্য না থাকায় তিনি প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। 

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে তাপভিত্তিক কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য লবণ উৎপাদনের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে ৭ হাজার একরেরও বেশি। ফলে লবণ কম উৎপাদন হওয়ার পেছনে লবণের জমি কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন লবণ শিল্পের উন্নয়ন প্রকল্পের (বিসিক) কর্মকর্তারা। তাছাড়া মৌসুমের শুরু থেকে লবণের ন্যায্যমূল্য না থাকায় চাষিরা মাঠে নেমেছিল এমনিতেই দেরিতে। লবণের অব্যাহত দরপতনের ফলে মৌসুমের শুরু থেকে লবণ চাষি ও বর্গা চাষিদের মধ্যে উৎসাহ না থাকায় কম লবণ উৎপাদনে আরেকটি কারণ বলে জানান বিসিকের কর্মকর্তারা। 

প্রতি কেজি লবণের মাঠ পর্যায়ে বর্তমান মূল্য ৪/৫ টাকা অথচ প্রতি কেজি লবণ উৎপাদন করতে চাষিদের খরচ পড়েছে ৮-৯ টাকা। যে কারণে অনেক লবণ চাষি এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 

লবণ উৎপাদনকারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী জানিয়েছেন, সর্বশেষ চেষ্টা সত্ত্বেও লবণ চাষিরা দেশের চাহিদার ২২ লাখ টন লবণ উৎপাদন করতে পারেননি। কারণ বিরূপ আবহাওয়া লবণের মূল্য কম থাকা ইত্যাদি কারণে লবণ উৎপাদন ব্যহত হয়েছে মারাত্মকভাবে। 

প্রান্তিক লবণ চাষি সমিতির সভাপতি আনোয়ার পাশা চৌধুরী বলেন, মহেশখালীতে যেসব জমিতে প্রতি বছর অধিক পরিমাণ লবণ উৎপাদিত হতো তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জমি সরকার উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য অধিগ্রহণ করায় চাষিরা চরমভাবে বেকায়দায় পড়ে যায়। অনেক লবণচাষি ও বর্গাচাষি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মধ্যস্বত্ব ভোগী মহেশখালীর নুরুল আলম জানিয়েছেন, এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত উপকূলীয় অঞ্চলের ২ লক্ষাধিক লোক এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ লবণ বিক্রি করতে মোটেও আগ্রহী নয়।

কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক জানান, ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের ঘাটতি মোকাবেলার অজুহাতে ব্যাপকভাবে লবণ আমদানি করা হলে কক্সবাজারের লবণচাষিরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পাইকারি হারে লবণ মিল মালিকদের লবণ আমদানির পারমিট ইস্যু না করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল ইসলাম আজাদ জানান, এখনো লবণ আমদানি করার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যদি তৈরি হয় তাহলে মাত্র আড়াই লাখ টন লবণ বিদেশ থেকে আমদানি করা যেতে পারে। তবে চাষিরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কক্সবাজারসহ দেশের ৫০ লাখ লোক ও শ্রমিক লবণ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন আর সারাদেশে মিল মালিক রয়েছে ৩৬৫টি। 

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের (বিসিক) উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল জানান, আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষিত লবণ চাষিদের প্রণোদনা দেওয়া না হলে আগামী দিনে লবণ উৎপাদনকারী প্রশিক্ষিত চাষির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এতে করে দেশীয় এ শিল্পটি চরমভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। শুধু তাই নয় লবণ চাষিদের বাঁচিয়ে রাখতে আপদকালে তাদের নানা সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে সরকারকে পাশে দাঁড়াতে হবে বলেও মনে করেন বিসিক এই কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh