এডিপির কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন হয়নি ১১ মাসেও

এগিয়ে চলেছে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজ

এগিয়ে চলেছে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজ

২০২০-২১ অর্থ বছরের ১১ মাস পার হলেও  বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পিছুটান ছাড়ছে না। মহামারীর মধ্যে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে অনেক কম।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মে পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার ৫৮ শতাংশ। এতে শেষ মাসের খরচের জন্য বেঁচে গেছে ৪২ শতাংশ বা প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল অর্থ থেকে জুনে যত কম খরচ হবে, বছর শেষে এডিপির বাস্তবায়নও তত কম হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, মাস তিনেক আগে কাটছাটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৭২ কোটি টাকা। তবে মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা বা ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় উৎসের অর্থ ব্যয় হয়েছে ৮২ হাজার ৬৩৪ কোটি। আর বৈদেশিক সহায়তার অংশ থেকে ৩৯ হাজার ৪৯৮ কোটি ব্যয় হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে এডিপির বাস্তবায়নের হার থাকে শোচনীয়। প্রায় তিন প্রান্তিক পর্যন্ত প্রতি মাসের গড় বাস্তবায়নের হার ৫-৬ শতাংশের মতো। কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলো যখন দেখে সময় শেষ তখন পুরো বছরের খরচ করতে থাকে তিন মাসে। এতে শেষ সময়ে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়, কাজের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পুরো বছরের প্রায় অর্ধেক খরচ হয় শেষ এক মাসে। এবছর নতুন করে সংকট তৈরি করেছে করোনা ভাইরাস এজন্যই এডিপি এ বছর মুখ থুবড়ে পড়েছে।

এর আগে বুধবার জাতীয় সংসদে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ডিপি বাস্তবায়নের তথ্য পর্যালোচনায় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুই লাখ ১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা উন্নয়ন বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছিল এক লাখ ৬১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। আর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের দুই লাখ ১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা উন্নয়ন বরাদ্দের বিপরীতে ২১ মে পর্যন্ত এক লাখ ২২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, কোভিড- ১৯ এর কারণে চলতি ও বিগত অর্থ বছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার কমেছে।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নিবার্হী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এডিপি বাস্তবায়নে বড় দুর্বলতা হচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলোর গাফিলতি। এই যে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা রয়েছে তা পুরো কাজে লাগবে না। দেখা যাবে, শেষ মাসে এ টাকার বেশিরভাগই তারা ছাড় করে ফেলেবে, মন্ত্রণালয়গুলো হিসাব দেখাবে এক মাসে বিশাল খরচ হয়েছে। মনে রাখতে হবে টাকা খরচ হলেই কিন্তু কাজ বাস্তাবয়ন হয় না, মানসম্মত হয় না। এটা কোন সিস্টেম হতে পারে না। এ জায়গায় মনিটরিং ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে হবে।’

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে অর্থ বরাদ্দে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় চলমান প্রকল্পগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সরাসরি করোনা মোকাবেলা ও করোনার কাজেও গতি আসত। আঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, আইসিটি শিক্ষার উন্নয়ন, দারিদ্র্য কমানো এবং প্রকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পগুলো পর্যাপ্ত অর্থ পেয়েছে। এমনকি বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে এমন প্রকল্পের বরাদ্দ কেটে নিয়ে দ্রুতগতির প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দও নিশ্চিত করা হয়। অগ্রাধিকার বাছাইয়ের পরও কাঙ্খিত ব্যয় হয়নি।

আইএমইডি সূত্র জানায়, সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। ১১ মাসে মোট এডিপি বাস্তবায়নের হার ৭৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, টাকার অংকে ৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এর পরেই সেতু বিভাগের মোট অগ্রগতি ৭১ শতাংশ, টাকার অংকে ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

বড় মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বাস্তবায়নের হারে হতাশ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ১০ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার মধ্যে ১১ মাসে বাস্তবায়নের হার ৪৫ দশমিক ১২ শতাংশ। টাকার অংকে খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। কাছাকাছি রয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে খরচ করেছ ৩ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা বা ৪৪ শতাংশ। এ তালিকায় সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। ১১ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েও খরচ করেছ মাত্র ৩ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়ন হার ৩১ শতাংশ।

সার্বিক বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, গত ১০ বছরে এডিপির প্রায় ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। মোট ১১ লাখ ৯৮ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ ১৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৮৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।

দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এক লাখ ৭৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। কিন্তু এ বছর করোনা বাস্তবতায় কিছুটা পিছিয়ে গেছে। 

উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি হাতে নিয়েছে সরকার। এতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া যাবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ৮৮ হাজার ২৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে। তবে এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশন থেকে পাওয়া যাবে ১১ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //