ICT Division

৫ টাকা ছাড় কোনো নিরাময় নয়

দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জনগণের নিদারুণ কষ্ট, সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মক কমে যাওয়া, এর পেছনে কারণ কী সেটা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সরকারি দল মনে করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বরং ভালো অবস্থানে আছে। বিরোধীরা মনে করে- সরকারের দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং সীমাহীন দুর্নীতির লাগাম টানতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের এই দশা।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারে গেলে যা পাওয়া যাবে-

ফুয়েল (এখানে ডিজেল) হলো মাদার অব অল রিসোর্স। ডিজেলের দাম মাত্রাতিরিক্ত বাড়লে ‘হার্টলাইন অব সিভিলাইজেশন’- ইলেক্ট্রিসিটিসহ সব কিছুর দাম বাড়ে। ডিজেল আর ইলেক্ট্রিসিটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে আর কোনো কিছুর দাম নাগালে থাকে না। এই দুটি পণ্যই মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং বাকি সকল পণ্য-সেবার মূল্য অটোমেটিক বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এই দুটি পণ্যের দাম বেড়েছে দফায় দফায়। এর ফলে অন্য সকল পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। 

এর সঙ্গে আছে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের কারসাজি। বিদ্যুৎ ও ডিজেলের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন পণ্যের দামও তারা বাড়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে তেলের দাম ৫ টাকা কমানোয় দেশজুড়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ২৯ তারিখে পরিবহন মালিকদের নিয়ে বিআরটিএর বৈঠকে ভাড়া সমন্বয়ের কথা ছিল, কিন্তু বিআরটিএ বৈঠকই ডাকেনি! অথচ তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বাড়ানোর বেলায় মালিকদের চেয়ে বেশি গরজ দেখিয়েছে বিআরটিএ।

এসব মনুষ্যসৃষ্ট সংকট যখন মানুষকে বাঁচা-মরার সীমানায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তখন এবার বর্ষাকালে ৪১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সারফেস ওয়াটারের সংকট বাড়বে। ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল নেমে যাবে। বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভার তৈরি করে। এবার তা না হওয়ায় রাজধানীতে সুপেয় পানির সংকটের চেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা; উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক হারে ডিপ টিউবওয়েলে পানি উঠবে না। খাঁ-খাঁ করতে থাকবে ক্ষেত-খামার। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ছোট ছোট গাছপালা মারা যাবে। সাধারণ টিউবওয়েলে পানি উঠবে না। চূড়ান্ত ক্ষতি হবে সেচনির্ভর ফসলের, বিশেষ করে ইরি ধানের। 

আজকে এক হালি ডিমের ৫০-৬০ টাকা দাম নিয়ে যারা আতঙ্কিত হচ্ছেন, আমন মৌসুম শেষে এই আতঙ্ক শিরা-উপশিরা বেয়ে মাথায় উঠে আসবে। জমানো টাকায় কত দিন? আইএমএফ নির্দিষ্ট করে শর্ত দেওয়ার পরও ব্যাংক সুদ বাড়ানো হয়নি, কারণ বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের চটানোর ইচ্ছা এবং ক্ষমতা নেই সরকারের।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে পর্যালোচনা শেষে সরকারের বিশেষজ্ঞগণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন; রাশিয়া থেকে তেল আমদানি সম্ভব নয়। প্রথম থেকেই একদল বলতে শুরু করেছিল- ‘রাশিয়া বাংলাদেশে তেল বিক্রি করতে উদগ্রীব’। এরপর একে একে বলা হতে থাকে ‘রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের পর তেমন একটা লাভ থাকবে না।’ শেষে বলা হচ্ছিল- ‘রাশিয়ার তেলে সালফার বেশি।’

চীন, ভারত, জাপান, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যারা রাশিয়ার উপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেছে সেই ন্যাটো ও ইইউভুক্ত জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, গ্রিস, স্পেন, অস্ট্রিয়া, রোমানিয়া, ইউকে, স্লোভাকিয়া, এস্তোনিয়া সকলেই রাশিয়ার তেল কিনছে। জোটের সতর্কবাণী উপেক্ষা করেই কিনছে। তাদের কারও ‘সালফার’জনিত সমস্যা হয়নি। সমস্যা কেবল বাংলাদেশের।

সর্বশেষ সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, “ডলারের বিপরীতে বিকল্প মুদ্রায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানি সম্ভব নয়। কারণ বিশাল অঙ্কের রাশিয়ান মুদ্রা রুবল বাংলাদেশের পক্ষে জোগান দেওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলারেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা যাবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই কম দামে অন্য কোনো দেশ থেকে তেল আমদানি করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।”

এটাও খোঁড়া যুক্তি, কারণ রাশিয়া ‘রুবলেই কিনতে হবে’ এমন শর্ত দেয়নি। তারা বরং ইউহান, রুপিতে কনভার্ট করেও দাম পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল।

অনেকে বলেছেন- ‘রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের।’ এটাও সত্য নয়। গত মাসেই ইইউ প্রতিনিধি ‘তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নেই’ বলে গেছেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, ২৬ আগস্ট সচিবালয়ে এসব সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ঠিক একই দিনে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী রিপোর্ট করেছে- ‘রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনা যাবে কিনা তা শুধু তেলের মানই নয়, আনুষঙ্গিক আরও বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। তবে রাশিয়া থেকে আসা নমুনা পরীক্ষার পর বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাশিয়া থেকে আসা জ্বালানি তেলের নমুনা চট্টগ্রামে পৌঁছলেও ইস্টার্ন রিফাইনারির ল্যাবে এখনো সেটি পরীক্ষা করা হয়নি। আগামী দিন কয়েকের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে।’ তাহলে সালফারের পরিমাণ বেশি এটা কোথায় পেল? 

মূলত যে বিষয়টি লুকানো হচ্ছে তা হলো, সরাসরি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় জোটের খবরদারি। তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বড় বাজার। সেই বাজারকে ‘দাও’ ধরে তারা হুমকি দিয়েছে- ‘রাশিয়া থেকে তেল কেনা যাবে না।’ সেটাকেই একটু ঘুরিয়ে কূটনীতিকরা বলছেন- ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।’

কিন্তু বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং নীতিনির্ধারকদের মতে রাশিয়া তেল নিয়ে ‘কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার মতো দুরবস্থায় পড়েছে!’ তাই তারা বাংলাদেশকে তেল ‘গছাতে চাইছে’ এবং বাংলাদেশ তেল না কিনলে রাশিয়ার বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে! রাশিয়াকে এই সুযোগে একটা ‘শিক্ষা’ দেওয়াই যায়। তাই যদি হয় তাহলে রাশিয়া থেকে অন্য কিছু কেনাও তো নৈতিকভাবে সঠিক নয়। বাংলাদেশ কেন ৩ লাখ টন গম কিনতে চায়? একটা ওষুধ কোম্পানিও ওষুধ এক্সপোর্ট করতে পা বাড়িয়ে আছে! এসব ক্ষেত্রে কি মার্কিন-ন্যাটোর নিষেধাজ্ঞা থাকবে না? সেই ওষুধ কোম্পানির মালিকের বক্তব্য- ‘রাশিয়ায় এখন ওষুধের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এটি আমাদের জন্য সুযোগ। আমরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাই।’

নিন্দুকেরা বলাবলি করছে; এসব মূল ব্যাপার নয়। মূল বিষয় হলো ডলারে কেনা-বেচা হলে এহাত-ওহাত করার সুযোগ থাকে। হয়তো বিদেশে ডলার পাচারের ইঙ্গিত করছেন তারা।

অথচ আগেই কথা উঠেছিল- ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি রাশিয়া থেকে সরাসরি টাকা রুবলে বিনিময় করে তেল আমদানি করতে চায়, তার একটা উদাহরণ এ রকম হতে পারে; সোয়াপ চুক্তির অধীন রাশিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি বাংলাদেশি ব্যাংক (ধরা যাক সোনালী ব্যাংক) কোনো রুশ ব্যাংকে একটা রুবল অ্যাকাউন্ট খুলবে। রাশিয়ার সেই ব্যাংকও সোনালী ব্যাংকে একটা টাকা অ্যাকাউন্ট খুলবে।’ কিন্তু ‘সোয়াপ’ পদ্ধতিটাও আমলে আনা হলো না। 

এর মধ্যে কথা উঠেছে- ভারত কীভাবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে। এ নিয়ে বলা হয়, ভারত সরকার জানিয়েছে, ‘নিজ দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে যেটি শ্রেয়তর, সেটিই করবে তার সরকার। অর্থাৎ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পরোয়া করছে না তারা। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে।’

অর্থাৎ ভারত তার দেশের স্বার্থ দেখছে, আর বাংলাদেশ কল্পিত বন্ধুর ধমককে গুরুত্ব দিয়ে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছে। দেখা যাক, তাদের কথিত ‘কম দামে অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি করব’ বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়।

এখন জ্বালানি তেলের মাত্রাতিরিক্ত দাম বেড়ে জনজীবন দুর্বিষহ হলেও এদের কোনো সমস্যা নেই। পরিবহন ভাড়া লাগামহীন বেড়ে প্রতিটি পণ্যমূল্য বাড়লেও তাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে এটা বলে- ‘বাজার মনিটরিং আরো দশগুণ বাড়িয়েও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’ 

শুধু মাঝে মাঝে একটা টাইমফ্রেম বলে দিতে হবে- অমুক মাস থেকে লোডশেডিং থাকবে না, তমুক মাস থেকে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হবে... জনগণ সেসব ‘মুলো’কে নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিন গুজরান করতে করতে এক সময় ওতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //