সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, তবুও বাড়তি চালের দাম

কাইয়ুম মিয়া ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকায় বসবাস করেছেন। পেশায় একজন রিকশাচালক। আগে বাস চালাতেন। করোনা মহামারির প্রথম দিকে বাস ছেড়ে রিকশা চালানো শুরু করেন তিনি। পরিবারে দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রী। এখনো কোনো সন্তানের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে পারেন না তিনি। নিজেকেই কাজে নামতে হয়। সারাদিনে যেই টাকা উপার্জন করেন দিন শেষে  সব টাকা চাল কিনতেই চলে যায়। চালের ঊর্ধ্বমুখী দামে নিয়ে এই প্রতিবেদকরে সাথে নিজের হতাশা ব্যক্ত করছিলেন কাইয়ুম মিয়া।

আজ শনিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে কাইয়ুম মিয়া জানান, গতকাল শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যায় ঠিক করেন পুরো এক বস্তা চাল কিনবেন। তবে মোটা চাল পাইজামের কেজি ৫৫ টাকা দেখে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন পাঁচ কেজি চাল নিয়ে।

তিনি বলেন, নতুন ধানের চাল তো বাজারে এসেছে এক মাস হল। দাম কমার তো কোনো লক্ষণ নেই। মোটা চাল ছেড়ে আরো মোটা চাল ধরেছি। খরচ হচ্ছে আগের মতোই।

হতাশ কাইয়ুম জানান, আমনের মৌসুমে দাম কমলে ছয় সদস্যের পরিবারের জন্য এক বস্তা চাল কিনবেন ভেবেছিলেন। দাম বাজেটের মধ্যে না নামায় এক মাস ধরে ৫ কেজি করে কিনছেন তিনি।

ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাস ধরে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে অন্তত দুই টাকা করে কমেছে। তবে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকায় ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় চালের দাম এখনো বেশ বাড়তি।

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির বাজার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে সরু চালের দাম তিন শতাংশ, মাঝারি চালের দাম আড়াই শতাংশ এবং মোটা চালের দাম পাঁচ শতাংশ কমেছে। তবুও এক বছর আগের তুলনায় সরু চাল আড়াই শতাংশ, মাঝারি চাল সাড়ে পাঁচ শতাংশ এবং মোট চাল তিন শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির হিসাবে, ঢাকার বাজারগুলোতে এখন সরু চাল প্রতি কেজি ৫৮ টাকা থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ৬২ থেকে ৭৫ টাকা; এক বছর আগে দর ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। মাঝারি চাল এখন প্রতিকেজি ৫২ টাকা থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং এক বছর আগে ৫০ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হত।

আর দামে কিছুটা কম হওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ কেনেন মোটা চাল, মান ভেদে যা এখন প্রতিকেজি ৪৬ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে যা ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা এবং এক বছর আগে ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা।

রাজধানীর বাসাবোর এক মুদি দোকানি বলেন, চালের দাম কমার আশায় ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন। চালের দাম কমে যেতে পারে এমন আশায় মিরপুর ১ নম্বর বাজার থেকে কম পরিমাণে চাল কিনছি। বিক্রিও হচ্ছে কম।

দাম কমলে বিক্রির পরিমাণ বাড়বে তখন মাস শেষে মুনাফাও বেশি হবে বলে মনে করছেন বেশির ভাগ খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা।

চলতি আমন মৌসুমে প্রতিকেজি ৪২ টাকা দরে পাঁচ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্য নিয়েছিল সরকার। গত এক মাসেরও বেশি সময়ে মাত্র দেড় লাখ টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে। সরকার আমন ধানের সর্বোচ্চ দর প্রতি মণ ১১২০ টাকা নির্ধারণ করলেও বিভিন্ন জেলায় ১৩০০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকায় নতুন ধান বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। যে কারণে সরকারের সংগ্রহ হচ্ছে কম।

মিরপুর শাহ আলী মার্কেটে চালের পাইকারি দোকান জনতা রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হারুন জানান, গত এক মাস ধরে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল। মোটা চাল ও আটাশ চালের দাম কিছুটা কমেছে। ১৫ ডিসেম্বরের পর বস্তায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা করে কমেছে। তবে মিনিকেট বা সরু চাল এখনো ঊর্ধ্বমুখী। আগামী বোরো মৌসুমের ধান আসার আগে সরু চালের দাম কমার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন তিনি।

চালের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠানামার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, বাজারে এখন গুটি স্বর্ণা বস্তা (৫০ কেজি) ২২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, যা এক মাস আগে ২৩০০ থেকে ২৩৫০ টাকায় ছিল। বিআর ২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা ২৬০০ টাকা করে, যা এক মাস আগে ২৭০০ টাকা ছিল। তবে পুরনো ২৮ চাল এখনও আগের মতই ২৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইজাম নতুন চাল বস্তা ২৩০০ থেকে ২৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট বা সরু চালের দাম প্রতি বস্তা ৩৪০০ টাকা থেকে প্রতিকেজি ৬৮ টাকা থেকে ৭২ টাকা। এরফান ও মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের সরু চাল প্রতিকেজি ৭৩ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে, আমন মৌসুমে নতুন সুগন্ধি চাল আসলেও এগুলোর দাম কমেনি বলেও দাবি করেন অনেক বিক্রেতা।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2023 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //