আবারো সেই ভিসি

বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমানের। করোনাভাইরাসের সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়ার সমস্যা সমাধানের বিষয়ে একজন ছাত্রের সাথে তার যে টেলিফোন আলাপ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘গরিবের বাচ্চা’ বলে মন্তব্য করেছেন। 

তিনি বেশ উত্তেজিত হয়েই বলেন, ‘আমি মনে হয় সব থেকে গরিবের বাচ্চাদের নিয়ে এসে ভর্তি করেছি। তোমরা এত মিসকিন, নিজেদের আত্মমর্যাদা পর্যন্ত নেই। আমি কী বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম যে, দরিদ্রদের ভর্তি করা হয়। এটা কি দরিদ্রদের এতিমখানা, মাদ্রাসা? তোমাদের বিয়ে হবে না। বিয়ে করতে গেলে বলবে, গরিবের বাচ্চা সব তোমরা।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘খাওয়ার টাকা লাগছে না, কেএফসি যাওয়া লাগছে না, মোটরসাইকেলের খরচ লাগছে না, বিড়ি-সিগারেট লাগছে না, রিকশাভাড়া লাগছে না, বান্ধবীকে আইসক্রিম খাওয়ানো লাগতেছে না? এসব টাকা দিয়ে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছ না কেন?’

এর আগেও একাধিকবার এই উপাচার্যর এ রকম বিতর্কিত মন্তব্য সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। যুবলীগের দায়িত্ব পেলে তিনি উপাচার্য পদ ছেড়ে দিতে রাজি আছেন- এরকম খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে ও তখন তিনি তার বক্তব্যের সপক্ষে অনেক যুক্তিও দেখিয়েছেন। 

উল্লেখ্য, অধ্যাপক মীজানুর রহমান আসলে যুবলীগেরই কর্মী। ২০০৩ সাল থেকে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীর কবির নানক যখন পলাতক, তখন তিনি যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। অর্থাৎ, মীজানুর রহমান মূলত যুবলীগ নেতা। শিক্ষক অথবা উপাচার্য তার দ্বিতীয় পরিচয়। স্মরণ করা যেতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশেষ কর্মকর্তার’ পদ তৈরি করে ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ছাত্রলীগের ১২ নেতাকে নিয়োগ দিয়েও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন এই উপাচার্য।

সর্বশেষ মেস ভাড়ার বিষয় নিয়ে ভিসি মীজানুর রহমানের একটি ফোন রেকর্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। যদিও এই বক্তব্যটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় শুরু হলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আসলে তিনি কথাগুলো ওভাবে বলেননি! কথাগুলোর পূর্বাপর কিছু উল্লেখ না করে কেবল খণ্ডিত অংশ তুলে ধরা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। 

তিনি আরো বলেন, ‘কথাগুলো কাউকে আঘাত করার জন্য বলিনি। প্রসঙ্গক্রমে বলেছি।’ তার যুক্তি, ১৬ হাজার ছাত্র টিউশনি করে চলে। বাড়িতে টাকা পাঠায়। সুতরাং তাদের দুই হাজার টাকা করে মোট ২৯ কোটি টাকা মেস ভাড়ার জন্য বরাদ্দ দিতে হবে- এটা কোনো বাস্তবসম্মত দাবি নয়। কারণ যারা মেসে থাকে তারা সবাই গরিব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই কি গরিব?’

তবে যুক্তি যা-ই হোক, কিংবা উপাচার্য যে প্রসঙ্গেই কথাগুলো বলুন না কেন, তিনি যে তার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের ছোট করেছেন ও তাদের প্রতি তার যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি পরিষ্কার। কারণ গরিব হয়ে জন্মানোটা যেমন কারো অপরাধ নয়, তেমনি একজন মানুষ গরিব হলেও তাকে এই শব্দে সম্বোধন করা যায় না। প্রত্যেকের একটা পরিচয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর তো বটেই। তাতে তিনি সমজের যে প্রান্ত থেকেই আসুন না কেন, তার প্রথম পরিচয় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কোথায়, কার সন্তান, বাবা কী করেন- এই পরিচয়গুলো পরে। 

তাছাড়া একজন উপাচার্য তার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ করে কেএফসিতে খাওয়া, বান্ধবীকে নিয়ে ঘোরা, মোটরসাইকেলে চড়া- ইত্যাদি মন্তব্য করতে পারেন না। কেউ কেউ এগুলো করলেও সেটিকে সাধারণীকরণের সুযোগ নেই। তাছাড়া কেউ যদি কেএফসিতে খায়, বান্ধবীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘোরে- সেটি একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কোথাও এ কথা উল্লেখ নেই যে, রেস্টুরেন্টে খাওয়া যাবে না বা বান্ধবীকে নিয়ে ঘোরা যাবে না।

মাদ্রাসা, এতিমখানা ও দরিদ্র মানুষদের সম্পর্কে তার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিও অবমাননাকর। কেননা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যখন তার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কোনো কথা বলবেন, সেখানে সর্বোচ্চ শালীনতা, ভদ্রতা ও যুক্তি থাকবে- এটাই কাম্য। যদি সেটি না থাকে, তাহলে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সাথে তার কোনো পার্থক্য থাকে না। 

মূলত ছাত্রদের ‘গরিবের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে তিনি নিজের চিন্তার দারিদ্র্যকেই প্রকাশ করেছেন। সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের প্রতি তার শিক্ষকসুলভ কোনো মানবিকতা বা সহমর্মিতা নেই; বরং তার কথায় একজন প্রশাসক অথবা একজন টিপিক্যাল অ্যাকাউন্ট্যান্টের আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে- যিনি শয়নে-স্বপনে শুধু টাকা গোনেন। 

তিনি সম্ভবত ভুলে গেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণার কেন্দ্র; টাকা বানানোর মেশিন নয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে একটি বেসরকারি হাসপাতালের সাথে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পার্থক্য থাকে না।

ভিসি মীজানুর রহমান প্রমাণ করেছেন যে, তিনি সমাজের সেই এলিটদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা বিত্তহীন মানুষকে ‘চাষা’ বা ‘চাষার বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে জাহিরের চেষ্টা করেন। তিনি যে প্রসঙ্গেই কথাগুলো বলুন না কেন, তার বক্তব্যের ভেতরে দাম্ভিকতা স্পষ্ট- যা একজন উপাচার্য তো দূরে থাক, একজন জুনিয়র শিক্ষকের কাছেও মানুষ প্রত্যাশা করে না। সুতরাং তিনি জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে থেকে কী করে এতটা দাম্ভিক আচরণ করতে পারেন এবং পরপর এরকম অনেক ঘটনার জন্ম দেয়ার পরেও তিনি কী করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থাকেন- সেটিই বরং বিস্ময়ের। 

অথবা এমনও হতে পারে যে, আমরা যে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, সেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে হলে এরকম যোগ্যতার মানুষই প্রয়োজন! ভিসির চেয়েও একটি রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠনের চেয়ারম্যানের পদকে যিনি বড় অথবা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন!

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারা আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্তের তালিকায় চোখ রাখলেই পরিষ্কার হবে। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, ১৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের লিখিত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য, অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি-পদায়ন, অর্থ আত্মসাৎ, উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহার ইত্যাদি। 

সবশেষ গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাসিরউদ্দিনকে নিয়ে যা হয়েছে, আন্দোলনের মুখে তিনি যেভাবে ক্যাম্পাস ছেড়ে ‘পালিয়ে গেছেন’, তাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ভাবমূর্তি বলে কিছু আর অবশিষ্ট আছে কী না সন্দেহ!

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি দুর্নীতি করবেন ও মঞ্জুরি কমিশনকে সেটি তদন্ত করতে হবে- এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে না। যদি কোনো ভিসির ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে ও তিনি যদি দুর্নীতি নাও করে থাকেন, তারপরও তো তার নৈতিক কারণে পদ ছেড়ে দেয়া উচিত। এটুকু নৈতিক অবস্থান একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে আশা করতেই পারি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh