আবরার কি ছাত্র রাজনীতির বলি?

আবরার ফাহাদ

আবরার ফাহাদ

ছাত্রসমাজ যেকোনো দেশের গর্ব। তাদের কণ্ঠেই ঘোষিত হয় আগামীর পদধ্বনি। নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে তারা যেমন সচেতন, তেমনি দেশের মানুষের স্বার্থের ব্যাপারেও সোচ্চার। 

রাষ্ট্রের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানা অনিয়ম, শিক্ষার পরিবেশ উন্নতকরণের জন্য ছাত্ররাই রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করেছে বারবার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল এ দেশের ছাত্রসমাজ। 

এরপরের ইতিহাস অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নীতি আদর্শ থেকে দূরে সরে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন সহিংস কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। তথাকথিত ছাত্র রাজনীতির বলি হয়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে একের পর এক শিক্ষার্থীকে। আসলে স্বার্থ যেখানে মুখ্য, সংঘাত সেখানে অনিবার্য।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, কী কী আদর্শ থাকা প্রয়োজন নেতাদের মাঝে, কার স্বার্থে তারা এগিয়ে আসবে? একটু পেছনে ফিরলেই কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে। ষাট ও সত্তরের দশকে এ দেশের ছাত্র রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য, জনস্বার্থ রক্ষার জন্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য। 

দেশের প্রবীণ রাজনীতিকদের অতীত ঘাটলেও দেখা যাবে, তাদের উত্থানটা ছাত্র রাজনীতির আঙিনা থেকেই। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন, এমন সাবেক ছাত্র নেতার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিন্তু সেই পথের অনুসারী হয়ে রাজনীতিতে আসতে বর্তমান প্রজন্মের মেধাবীদের বেশ অনীহা। এর অন্যতম কারণ, সঠিক পথের দিশা দেখাবেন এমন নেতার এখন বড্ড অভাব। এক সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ছাত্ররা ব্যবহার করতেন তাদের মেধাশক্তি, প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা; আর এখন দেশি-বিদেশি অস্ত্রশস্ত্র। এর প্রতিবাদ করতে গেলে নেমে আসে রাষ্ট্র-রাজনীতির খড়গহস্ত। 

সম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড এ ধরনের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

মেনে নেয়ার খেলায় বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন আবরার ফাহাদ রাব্বী। থাকতেন শেরেবাংলা হলের নিচতলার ১০১১ নম্বর কক্ষে। গত বছরের ৬ অক্টোবর রাতে একই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আগ্রাসী আচরণের সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াই ছিল তার ‘অপরাধ’। 

আবরার তার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন- ‘দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর না থাকায় তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। আর এখন ভারতকে সেই মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য বলতে হচ্ছে।’ 

আবার ভারতের দুই রাজ্যের মধ্যকার পানি নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না, সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়াই পানি দেব।’ 

একইভাবে গ্যাস চুক্তিরও সমালোচনা করছিলেন আবরার। সবশেষে একটি কবিতার চারটি লাইন তুলে ধরেন। আর এই স্ট্যাটাসের কারণে তার ‘শিবির সংশ্লিষ্টতা’ নিয়ে সন্দেহ হয় ছাত্রলীগের।

হত্যাকাণ্ডের পরদিনই নিহতের বাবা বরকত উল্লাহর ১৯ শিক্ষার্থীকে আসামি করে চকবাজার থানায় করা মামলার দ্রুত তদন্ত শুরু হয়। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে একদিন পরই মামলাটি হস্তান্তর করা হয় ডিবিতে। মাত্র ৩৩ দিনেই অর্থাৎ গত বছরের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ওয়াহিদুজ্জামান। এরপর বিচার শুরু হতেই লেগেছে ১১ মাস, চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ। 

রাষ্ট্র ও বুয়েটের নিয়োগ দেয়া সিনিয়র আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী অবশ্য বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বিচার কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে আর বিলম্ব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিনই বিচারকাজ চলছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের হাতে আট আসামির দোষ স্বীকারোক্তি জবানবন্দি রয়েছে, যা সব আসামিদের এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মর্মে সম্পৃক্ততা প্রকাশ করে। এছাড়া ডিজিটাল ডকুমেন্ট ভিডিও ফুটেজ ও মৌখিক ডকুমেন্টও আছে। এগুলো আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ার যৌক্তিক কারণ হিসেবে কাজ করবে।’

এদিকে ছাত্র অধিকার পরিষদ আবরার হত্যার প্রথম বর্ষপূর্তিতে তার স্মরণে রাজধানীর পলাশী মোড়ের সড়ক দ্বীপে নির্মাণ করে ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী ‘আট স্তম্ভ’। প্রতিটি স্তম্ভের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ- সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, গণপ্রতিরক্ষা, সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, নদী-বন-বন্দর রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, বি-উপনিবেশায়ন। অথচ বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি সেই স্মৃতির মিনার, গুঁড়িয়ে দেয়া হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। পরদিন বাঁশ দিয়ে স্তম্ভটি পুনরায় নির্মাণ করা হলে সেটিও ভেঙে ফেলে পুলিশ। 

ওই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের আগের চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। যাদেরকে খুশি করার জন্য আবরারকে হত্যা করা হয়েছে, সে আধিপত্যবাদ এখনো সক্রিয়। তাদের খুশি করার জন্যই আবরারের স্মৃতিস্তম্ভটি ভাঙা হয়েছে।’

লাশের রাজনীতি

স্বাধীনতার পর গত চার দশকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণহানির সঠিক কোনো তালিকা নেই। তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে জানা যায়, সংখ্যাটি দুই শতাধিক। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত আট শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। মূলত দল ক্ষমতায় গেলেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বেশকিছু নৃশংস ঘটনার সাথে জড়িয়েছে ছাত্রলীগের নাম। তাদের টানা মেয়াদে প্রতিপক্ষ বা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ছয় শতাধিক। এসব সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ জনেরও বেশি। এর মধ্যে ৬০ জনই নিহত হন নিজেদের কোন্দলে। ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আসাদ রাজীবকে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় বহুতল ভবন থেকে। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই ২০১০ সালে মারধর করে বহুতল ভবন থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করে। ওই বছরই সংগঠনটির দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবুবকর সিদ্দিক। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২০১২ সালে প্রাণ হারান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ। একই বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাদের চাপাতির কোপে মৃত্যু হয় পুরান ঢাকার নিরীহ দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের। অথচ সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কাজে ছাত্রলীগকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিএনপি-জামায়াত আমলেও একইভাবে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। অর্থ-সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে প্রাণও ঝরেছে বহু শিক্ষার্থীর। ২০০২ সালে বুয়েটে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে ছাত্রদল নেতাদের গুলিতে সাবেকুন নাহার সনি নিহত হওয়ার ঘটনাটিও সারাদেশকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। এদিকে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পরই প্রথা মেনে তদন্ত কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। থানাতেও মামলা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে হারিয়ে গেছে সেগুলো। বিচারের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের রক্তক্ষরণই কেবল শেষ হয় না।

এটিই কি তবে শেষের শুরু? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ছাত্র রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনের, সুখ-দুঃখে সবার আগে এগিয়ে আসার; অথচ হচ্ছে তার উল্টোটা। ছাত্র সংগঠনগুলোতে এখন সুবিধাবাদী ও অ-ছাত্ররা স্থান হচ্ছে। নামধারী ছাত্রনেতারা স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজ সংগঠনের মধ্যেও মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে, তৈরি করছে বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপ। তাদের মাঝে পড়ে এর শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা মনে করেন, ‘ছাত্রদের ব্যবহার করে জাতীয় ও শিক্ষকদের রাজনীতি আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের মতো ছাত্র সংগঠনগুলো যতদিন না মূল দল থেকে আলাদা হতে পারবে, ততদিন এই অবস্থার পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার সেটি করতে হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা জরুরি।’ 

ছাত্র রাজনীতি ছাত্র-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা। দেশের সামগ্রিক রাজনীতির প্রভাবকে এর জন্য দায়ী করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় রাজনীতিতেও তো প্রক্রিয়াগতভাবে গণতন্ত্রহীনতার একটা অবস্থা বিরাজ করছে। ছাত্র রাজনীতিও তার বাইরে নয়। তবে এমনটি চলতে থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষার্থী, এমনকি কোনো ছাত্র সংগঠনের জন্যই মঙ্গল হবে না। এগুলো এক সময় ক্ষয় হতে বাধ্য। কারণ ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক বেশি সচেতন, তারা জানে কে কী করছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর তাদের আর আস্থা নেই। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ন্যায্য আন্দোলনের সূচনাও তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই হয়েছে।’

বন্ধ হোক অপরাজনীতি

মত, দ্বিমত ও ভিন্নমত নিয়েই গণতন্ত্র; কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নেই সহাবস্থানও। ক্ষমতাসীনদের দাপটে ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না বিরোধী নেতা-কর্মীরা। সবকিছুতেই একক আধিপত্য। ফলে তাদের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকেই অনেকে ‘ছাত্র রাজনীতি’ বলে মনে করছেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে দাবি উঠছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। 

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শাসকরা বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও নব্বইয়ের আগে সেভাবে সফল হয়নি। এরশাদ সরকারের পতনের পরই মূলত ছাত্র রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন মেরুকরণ। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে ছাত্র সংগঠনগুলো পরিণত হয় লেজুড়বৃত্তিক ‘লাঠিয়ালে’। নিজেদের সুবিধা আদায়, ভিন্নমত দমনসহ নানা কাজে জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা। তবে এর বাইরেও তো ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতি রয়েছে। যাদের হাত ধরে এখনো অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলে। এ অবস্থায় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি অপরাজনীতির পক্ষেই যায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি আর সন্ত্রাস এক কথা নয়। আসলে ছাত্র রাজনীতির প্রধান ধারা দুটি- একটি ক্ষমতাসীন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর রাজনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের কাছাকাছি থাকে, আর অন্যটি তাদের বদলানোর জন্য লড়াই করে। প্রথম ধারাটি শাসক ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে উলঙ্গভাবে প্রকাশিত, যা ক্ষমতাসীন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে। সেইসাথে দখলকারী, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাড়াটে লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করে তারা। দ্বিতীয় ধারাটি অবশ্য দৃঢ়ভাবে সংগঠিত নয়, রাষ্ট্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করে, সে কারণে তারা ক্ষমতার নানা খুঁটির বৈরী আচরণ পায়; কিন্তু এই দ্বিতীয় ধারাটিই সমাজের নতুন জন্মের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, বরং রাজনীতির নামে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে সেগুলোকেই বন্ধ করতে হবে। ইতিবাচক রাজনীতি বন্ধ হলে তো প্রতিবাদের সব পথই রুদ্ধ হয়ে যাবে।’

জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ রাজনীতি জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলছেন, ‘এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতের, বিরোধী মতের ন্যূনতম স্থান নেই, এটি ঠিক; কিন্তু ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে বিপদ আরো বাড়বে। জঙ্গিবাদের উত্থান হবে। তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, করতে হবে কলুষমুক্ত। বন্ধ করতে হবে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি। যখন যে দল ক্ষমতায় তার ছাত্র সংগঠনের দখলে বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, এ অপসংষ্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। নিয়মিত নির্বাচন করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল সংসদে। গণতান্ত্রিকভাবে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে দুর্বৃত্তমুক্ত করতে হবে। তখন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, মতের আদান-প্রদান করবে, চিন্তার প্রসার ঘটাবে, রাজনীতি সচেতন হবে।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh