ICT Division

শিক্ষার্থী নয়, সদরঘাটের যাত্রীদের নিয়ে চিন্তায় জবি কর্তৃপক্ষ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রধান ফটকের সামনে অবৈধভাবে বসানো হয়েছে বাসস্ট্যান্ড। এতে নিয়মিতই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ পথচারীরা। গত রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সাভার পরিবহনের বাস চাপায় এক পথচারী নিহত ও জবির এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ তিনজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে সেই জায়গায়। তবুও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই অবৈধ বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সদরঘাটের যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েই চিন্তা বেশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে দাবি জানালেও তার বাস্তবায়নে উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বরং শিক্ষার্থীদের দেখানো হয় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সদরঘাটের যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার অজুহাত।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদে  ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামালকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, রায়সাহেব বাজারে গাড়ি ঘুরানোর জায়গা নেই। বাসস্ট্যান্ড যদি মুরগিটোলা হয় তাহলে সদরঘাটের যাত্রীদের আবার গাড়ি ভাড়া দিয়ে যাওয়া আসা করতে হবে। যাত্রীদের কাছে অনেক ভারী ব্যাগ থাকে। তারা তো এতদূর হেঁটে আসতে পারবেনা। অনেক কষ্ট হবে। বাস এই পর্যন্ত আসলে তাদের সেই সমস্যাটা আর হয়না। তাই বাসস্ট্যান্ডটি থাকলে ভালো হয়।

তবে অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ড স্থাপন ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র ও পুলিশের চাঁদাবাজি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী মহল মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিস্তান থেকে সদরঘাটগামী বাসগুলোর জন্য ধোলাইখালে বাসস্ট্যান্ড স্থাপনের অনুমতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় ও যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে ধোলাইখালে বাসস্ট্যান্ডটি সরিয়েও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ও পুলিশের চাঁদাবাজিতে ভাটা পড়ে। স্বার্থে আঘাত লাগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্বার্থান্বেষী মহলেরও। 

সেজন্য অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও পুনরায় অবৈধভাবে বাসস্ট্যান্ড জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে নিয়ে আসে চক্রটি। এখন প্রকাশ্যেই চলে চাঁদাবাজি। রাত ১০ টার পর থেকেই তা আরো চাঁদাবাজি বাড়তে থাকে। বাংলাবাজার মোড়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের জায়গা চাঁদাবাজির অন্যতম আখড়া হিসেবে গড়ে তুলেছে তারা। রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, বাস থেকে বিভিন্ন হারে তোলা হয় চাঁদার টাকা। পরিচয়ে সিটি কর্পোরেশনের কথা বলা হলেও এর সাথে সিটি কর্পোরেশনের কোনো সংযোগই নেই বলে জানা যায়।

চাঁদাবাজির এই মহা উৎসবে যোগ দিয়েছে পুলিশও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে থেকেই গভীর রাতে প্রতিটি বাস থেকে ১০০ টাকা হারে চাঁদা তুলে পুলিশ। চাঁদা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন তারা। প্রতিদিন কর্তব্যরত পুলিশের শিফট পরিবর্তন হলেও একই হারে চলতে থাকে চাঁদাবাজি। পুলিশের চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ও ছবি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। চাঁদাবাজির এই টাকার একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী মহলের পকেটে যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, জবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলামেরও বেশ কয়েকটি বাস রয়েছে সাভার পরিবহনের ব্যানারে। যেসব দেখাশোনা করেন শরিফুলের কাছের ছোটভাই হিসেবে পরিচিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির এক কর্মকর্তা। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক বেশ কয়েকজন নেতারও একাধিক করে বাস রয়েছে বিভিন্ন পরিবহনের ব্যানারে। সেই প্রভাবেও ঘাঁটি গেড়ে বসেছে এই অবৈধ বাসস্ট্যান্ড।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের কর্মচারী হাসানের মালিকানায় রয়েছে সাভার পরিবহনের তিনটির অধিক বাস। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রভাবশালী শিক্ষক ও কর্মকর্তার অংশীদারিত্ব আছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। সেই প্রভাবেই প্রধান ফটক দখল করেই বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই মহলের স্বার্থ হাসিলেই অবৈধ এই বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হয়না বলেও অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এদিকে মূল ফটকে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড স্থাপনের ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রাস্তা পারাপারে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন তারা। গত রবিবার মূল ফটকের সামনেই সাভার পরিবহনের এক বাসের ধাক্কায় এক রিকশার আরোহী নিহত হন। গুরুতর আহত হন রিকশাচালক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

লাইনম্যান ও হেলপারদের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থী হেনস্থাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলার অভিযোগও রয়েছে। প্রায় প্রতিনিয়তই পরিবহন শ্রমিকদের হেনস্থার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক বলেন, পুলিশের ডিসি, ট্রাফিকের এডিসি থানার ওসিরাসহ সবাই মিটিং করবো কিভাবে ক্যাম্পাসের সামনের জটলা, দুর্ঘটনা ঘটছে এসব সমাধান করা যায়। আর নতুন ক্যাম্পাসে থানা ও পুলিশ ক্যাম্পের ব্যাপারেও আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলাপ করেছি।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //