টেস্ট ক্রিকেটে ২০ বছর, ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী

অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নব জাগরণের সূচনা হয়। আইসিসি ট্রফি জয় হচ্ছে প্রথম ধাপ। এরপর ১৯৯৮ সালে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়, ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অভিষেকে পাকিস্তান ও স্কটল্যান্ডের মতো দলকে পরাজিত করার মাধ্যমে স্মরণীয় পারফরম্যান্স করে বাংলাদেশ, যার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্ট পরিবারের সদস্য হয় বাংলাদেশ। 

একই বছরের ১০ নভেম্বর প্রথমবারের মতো সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষে খেলতে নামে নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের দল। সময়ের হিসেবে এরপর ২০ বছর কেটে গেলেও, যতটা উন্নতি হলে তৃপ্তি পাওয়া যায়, ততটা উন্নতি হয়নি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের। 

অনেক অর্জনের গল্প যেমন রয়েছে, তেমনি হতাশার গল্পও কম নয়। মূলত টেস্ট ক্রিকেটে এখনো একটি দল হয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নেমেছিল টাইগাররা। অভিষেক টেস্টে ভারতের কাছে ৯ উইকেটের হার দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। এই দুই দশকের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আনন্দ-হতাশার নানা গল্প রচিত হয়েছে। অবশ্য প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি ঘটেনি। এরপর থেকে টানা হারের গল্প দেখতে দেখতে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ভক্তরা। 

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয় পেতে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়েকে ২২৬ রানে হারিয়ে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। যদিও এই প্রথম টেস্ট ম্যাচ জয়ের আগে তিনটি ম্যাচে ড্রয়ের সাফল্য দেখায় টাইগাররা। এরপরের ১৫ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট ম্যাচে হারানোর বীরত্ব দেখালেও, হারের পাল্লাটা কম ভারী নয় বাংলাদেশের। ২০ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে মোট ১১৯টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। এর মধ্যে জয়ের সংখ্যা মাত্র ১৪ ও ড্র ১৬টি ম্যাচে। বাকি ৮৯ ম্যাচে হারের রেকর্ড নিয়েই পথ চলতে হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৫টি ম্যাচেই আবার ইনিংস হারের লজ্জায় পড়তে হয়েছে টাইগারদের। এক ইনিংসে দলীয় রান একশ’ পার না করার ঘটনা রয়েছে ১০ বার! রয়েছে ইনিংসে সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউট হওয়ার মতো লজ্জার রেকর্ডও। 

লজ্জার আরো কিছু বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের। এই যেমন অভিষেক টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমে লজ্জাজনকভাবে আফগানিস্তান বাংলাদেশকে হারিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ যে কটি জয় পেয়েছে, এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জিতেছে। টেস্ট ক্রিকেটে বয়সের দিক দিয়ে টিনএজ পেরিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। 

বর্তমানে আইসিসি টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে ১২ দলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০ নম্বরে। র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের নবীন দল আফগানিস্তান রয়েছে ৯ নম্বরে। ১২টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে এখনো ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় অধরা রয়ে গেছে। ১২ নম্বরে থাকা আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে যদিও খেলা হয়নি। টেস্ট ক্রিকেটের দুই দশকে আকরাম খান থেকে শুরু করে সাইফ হাসান- মোট ৯৬ ক্রিকেটারের মাথায় টেস্ট ক্যাপ উঠেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ঔজ্জ্বলতা ছড়ান অনেকেই। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন মুশফিকুর রহীম। লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম তুলেছেন তামিম ইকবাল ও শাহাদাত হোসেন রাজীব। 

টেস্ট দলকে এ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন ১১ জন অধিনায়ক। পরিসংখ্যান বলছে, শতকরা হিসেবে খালেদ মাসুদ পাইলট ও খালেদ মাহমুদ সুজন শতভাগ ব্যর্থ। পাইলটের নেতৃত্বে ১২ ম্যাচ খেলে একটিতেও জয় আসেনি। সুজনের নেতৃত্বে ৯ ম্যাচেই হেরেছে বাংলাদেশ। ১৩ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েও একটি ড্র ছাড়া কোনো ম্যাচ জেতাতে পারেননি মোহাম্মদ আশরাফুল। হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে ১৮ ম্যাচ খেলে একটি জয় পায় টাইগাররা। চারটি ম্যাচে ড্র ও ১৩টি ম্যাচে হারের রেকর্ড রয়েছে। ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। জয় তিনটি, হার ১১টিতে। সর্বোচ্চ ৩৪টি টেস্ট ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুশফিকুর রহীম। তার অধিনায়কত্বে জয় এসেছে সর্বোচ্চ সাতটি ম্যাচে। বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হকের নেতৃত্বে চারটি ম্যাচ খেলে একটিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি তিনটি ম্যাচে হার। শতকরা হিসেবে টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে শতভাগ সফল মাশরাফি। একটি মাত্র ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েই দলকে জিতিয়েছেন তিনি। 

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যানও মুশফিক। ৭০ ম্যাচ খেলে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪১৩ রান সংগ্রহ করেছেন তিনি। এরপর রান সংগ্রাহকের তালিকায় তামিম, সাকিব, বাশার, মুমিনুলরাও রয়েছেন।

দেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ২০১৩ গল টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির অনন্য রেকর্ড গড়েন মুশফিক। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন তিনিই। তামিম ইকবালের রেকর্ডও রয়েছে। ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে লর্ডসে সেঞ্চুরি হাঁকানোর রেকর্ড রয়েছে এ ওপেনারের। সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেট শিকারের তালিকায় শীর্ষ সাকিব আল হাসান। সর্বোচ্চ ২১০টি উইকেট শিকার করেছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। এর পর তাইজুল ইসলাম, মোহাম্মদ রফিক, মেহেদী হাসান মিরাজ, মাশরাফি, শাহাদাত আছেন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লর্ডসে ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অনার্স বোর্ডে নাম তোলেন শাহাদাত। টেস্টে ফিল্ডিং বিভাগে রেকর্ডে শীর্ষে আছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ইমরুল কায়েস, মুমিনুল, আশরাফুলরা। অলরাউন্ডিং নৈপুণ্যে সবার সেরা হিসেবে নাম রয়েছে সাকিব আল হাসানের। 

একসাথে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ক্রিকেটার সোহাগ গাজী। ২০১৩ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে বিরল এ কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে আট নম্বরে নেমে ১৬১ বলে ১০১ রানে অপরাজিত থাকেন। আবার টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে ১০ উইকেট নেয়ার বিশ্বরেকর্ড এনামুল হক জুনিয়রের। 

বিষয়টি যতটা না কাকতালীয় ঠিক ততটাই আকর্ষণীয়। ১০ নম্বরে সাধারণত বোলাররা ব্যাটিং করে থাকেন। সেখানে নেমে সেঞ্চুরি করার বিরল এক কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন আবুল হাসান রাজু। ২০১২ সালের নভেম্বরে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দারুণ এই অর্জন করেছিলেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান রাজু।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh