ঢাকা কেন্দ্র : ঢাকার ইতিহাস সংরক্ষক

মাওলা বখ্শ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ২৪ মোহিনী মোহন দাস লেনে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির ১৯৮৭ সালে পথচলা শুরু। মাওলা বখ্শ সরদার দাতব্য চক্ষু হাসপাতাল পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ‘ঢাকা কেন্দ্র’ নামে আরেকটি শাখা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চায় অবদান রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু।

ট্রাস্টের বর্গাকৃতির ঢাকা কেন্দ্র; ঢাকার ইতিহাস সংরক্ষক দোতলা ভবনটির নিচতলায় চক্ষু হাসপাতাল এবং দোতলায় ঢাকা কেন্দ্রের অবস্থান। পাঠাগার ও সংগ্রহশালা ঢাকা কেন্দ্রের মূল আকর্ষণ। ঢাকার ইতিহাস বিষয়ক বহু প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের এক দারুণ সংগ্রহ রয়েছে এই পাঠাগারে। এখানে প্রায় ছয় হাজার বই রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় তিন হাজার বই শুধু ঢাকার ইতিহাস এবং এ সম্পর্কিত নানা বিষয়ের ওপর। এখানে সংগৃহীত কেদারনাথ মজুমদারের ‘ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস’, যতীন্দ্র মোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’, সত্যেন সেনের ‘শহরের ইতিকথা’ উল্লেখ্য। 

ঢাকা কেন্দ্রের সংগ্রহশালায় রয়েছে বাইশ পঞ্চায়েতের সর্দার ও ঢাকার বেশ কিছু বনেদি পরিবারের ব্যবহৃত নানা রকম আসবাব ও জামা-কাপড়। এ ছাড়াও আছে আন্টাঘর ময়দানের ঐতিহাসিক আন্টা (বিলিয়ার্ড খেলায় ব্যবহৃত বল), শতবর্ষী জাপানি ঘড়ি, বৈদ্যুতিক রেকর্ড প্লেয়ার, পুরনো টেলিফোন সেট, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বেতারযন্ত্র, বাতিদানি, কলের গান, ১৮৯৬ সালে তৈরি জমির দলিল, প্রাচীন ইট, প্রাচীন মানচিত্র, পুরনো ভবনের নকশাসহ ঐতিহাসিক অনেক বস্তু। 

ঢাকা কেন্দ্রের আঙিনাজুড়ে বিস্তৃত ছাদ বাগান। সেখানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রকমের ফুল ও পাতাবাহারের গাছ। ছাদ বাগানের এক কোণে ঢাকা কেন্দ্রের সাপ্তাহিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি আড্ডার বৈঠকখানা। উল্লেখ্য, মাওলা বখ্শ সরদার ছিলেন ঢাকার বাইশ পঞ্চায়েত সরদারের একজন। ১৯৪৪ সালে মাওলা বখ্শ সরদার নির্বাচিত হন, ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ সূত্রাপুর জামে মসজিদে তাকে সরদারি পাগড়ি পরিয়ে দেন।

ইতিহাস গবেষক হাশেম সূফি ঢাকা কেন্দ্রের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। তিনি জানালেন, ‘ঢাকা কেন্দ্র এখন বাংলাদেশ ছাড়াও বিদেশেও বেশ প্রচারিত একটি সেন্টার। এটি ঢাকাইয়াদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রজেক্ট পরিচালনা করে আসছে। ঢাকা কেন্দ্র মাওলা বখ্শ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কালচারাল সেন্টার। ১৯৮৭ সালে মাওলা বখ্শ সরদার মৃত্যুবরণ করেন, তার চেহলামের দিন তার ছেলে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজিম বখ্শ সরদার পিতার নামে ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেয়। প্রথমে নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে এবং পারিবারিক অর্থায়নে এটি চালু হয়। এখন ট্রাস্টে তাদের সকল আত্মীয়-স্বজনও অর্থায়ন করেন। ট্রাস্ট ও ঢাকা কেন্দ্র গঠনে পরামর্শ দিয়ে এবং ঢাকার ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রহে আমি সহযোগিতা করেছি।’ 

ঢাকা কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এক সময় ঢাকা কেন্দ্রের কার্যক্রম অনেক বড় পরিসরে ছিল। এখন সেসব কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আছে। ত্রৈমাসিক ঢাকা নামে একটি প্রকাশনা নিয়মিত বের হতো, ২০১০ সালের পর তাও বন্ধ রয়েছে। আমাদের পাঠাগারে সাধারণ পাঠক খুব একটা আসেন না, গবেষকরাই আসেন। তবে পাঠাগার সকলের জন্য উন্মুক্ত। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন দুপুর তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে।’ 

ঢাকা কেন্দ্র ভবনটির গা ঘেঁষে মোহিনী মোহন দাসের বাড়ি। বাড়িটিতে ১৯০১ সালের ১৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল মোট সতেরো দিন স্বামী বিবেকানন্দ ঢাকা সফরকালে অবস্থান করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের ঢাকা সফরকে স্মরণ করে এবং মোহিনী মোহন দাসের বাড়িটির কথা উল্লেখ করে ঢাকা কেন্দ্রের আঙিনায় একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয় ২০২৪ সালের ৯ মার্চ।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //