গুজব ছড়িয়ে হত্যা: প্রধান আসামি আবুলের স্বীকারোক্তি

লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে শহিদুন্নবী জুয়েলকে হত্যার পর মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি আবুল হোসেন (৪৫) রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

শনিবার (১৪ নভেম্বর) বিকেলে আমলি আদালত-২ এর বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফাজ উদ্দিন তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

এর আগে সোমবার (৯ নভেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে আমলী আদালত-৩ এর বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফেরদৌসী বেগম আবুল হোসেনের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে আলোচিত এ ঘটনায় করা তিন মামলার প্রধান আসামি আবুল হোসেনকে ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। ওই তিন মামলায় মোট গ্রেফতার হলেন ৩২ জন।

এ মামলায় এর আগে ১০ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। যার মধ্যে প্রধান আসামি আবুল হোসেন ও মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীসহ চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কোরআন অবমাননা হয়নি উল্লেখ করে জবানবন্দিতে তারা ব্যাপক তথ্য দিয়েছেন। যা নিয়ে মামলার পরবর্তী তদন্ত চলছে বলেও জানায় পুলিশ।  

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী বলেন, হত্যা মামলার প্রধান আসামি আবুল হোসেন পাঁচদিনের রিমান্ডে তদন্ত কর্মকর্তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। যার তদন্ত চলছে। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত জুয়েল কোরআনে পা রাখেননি। তবে কোরআন রাখা সেল্ফের ফ্লোরে পা দিয়ে উপরের সেল্ফের বই খুঁজছিলেন। পরে তাকে প্রশ্ন করলে কখনো নিজেকে ডিবি, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা পরিচয় দিচ্ছিলেন জুয়েল। জুয়েলের মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকটি চড় দিয়ে ইউপি সদস্যের হাতে জুয়েলকে তুলে দেন বলেও স্বীকার করেন গ্রেফতার প্রধান আসামি আবুল হোসেন।
ইউপি ভবনের জনবিস্ফোরণ থামাতে তার প্রতিষ্ঠানের মাইক ব্যবহার করে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনওসহ কর্মকর্তারা কথা বলেন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল গত ২৯ অক্টোবর বিকেলে সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজন সঙ্গীসহ বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা। নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান যোবাইয়েরকে পাশের ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে- কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট-পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনেন। নিহত জুয়েলের সঙ্গী সুলতান যোবাইয়েরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh