পার্বত্য শান্তিচুক্তি: ২৩ বছরে বদলে গেছে পার্বত্য জনপদ

শান্তিচুক্তির ফলে পর্যটন খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ছবিটি রাঙামাটির সাজেক এলাকা থেকে তোলা। ছবি: খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

শান্তিচুক্তির ফলে পর্যটন খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ছবিটি রাঙামাটির সাজেক এলাকা থেকে তোলা। ছবি: খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

আজ ২ ডিসেম্বর (বুধবার) পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৩ বছর। পার্বত্য শান্তিচুক্তি পরবর্তী গত দুই দশকে বদলে গেছে পাহাড়ি জনপদ। সড়ক,বিদ্যুৎসহ পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। 

সরকার বেসরকারি বিনিয়োগে পাহাড়ে কৃষি, শিল্প,পর্যটন ও শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। একসময়ের পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি জনপদ এখন অগ্রসর হচ্ছে। পাহাড়ের সম্প্রীতি বজায় থাকলে আসবে উন্নয়ন, উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা।  

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই দশকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অবসান ঘটাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও জনসংহতি সমিতি মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে বদলে যেতে শুরু করে পার্বত্য জনপদ। পাহাড়ে পর্যটন, কৃষি, বিদ্যুৎ ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। 

চুক্তির আগে পাহড়ে অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পর্যটকদের কোনো আনাগোনা ছিল না। তবে চুক্তি পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য আবিষ্কারে পর্যটক আসতে শুরু করে। বর্তমানে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য এলাকা। 

খাগড়াছড়ি পর্যটন করপোরেশন ইউনিট ব্যবস্থাপক এ কে এম রফিকুল আলম জানান, শান্তিচুক্তির আগে পাহাড়ে কোনো পর্যটকই আসে না। শান্তিচুক্তি হওয়ার পর পাহাড় শান্ত হওয়ায় বর্তমানে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক আসে। বিশেষত দেশি পর্যটকের আগমন বেশি ঘটেছে। চুক্তি না হলে এটি সম্ভবই ছিল না।  তবে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো মধ্যে সহিসংতা কমলে পর্যটকদের আগমন আরো বাড়বে। 

ছবিটি খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদী এলাকা থেকে তোলা

শান্তিচুক্তি পূববর্তী সময়ে খাগড়াছড়িতে সড়ক অবকাঠমোর তেমন উন্নয়ন হয়নি। তৎকালীন সময়ে সড়কগুলোতে ছিল ঝুঁকিপুর্ণ বেইলি সেতু। শান্তিচুক্তির পরে সড়ক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সড়ক অবকাঠামো পরিবর্তন বিকশিত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি। গত দুই দশকে সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেইলি সেতুর পরিবর্তে সড়কে বসেছে স্থায়ী সেতু। সড়ক উন্নয়ন হওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষি পণ্য সরবরাহ বেড়েছে। খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারের অর্থায়নে চুক্তির পরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-বাঘাইহাট সড়ক, বাঘ্ইাহাট-মাচালাং-সাজেক সড়ক উন্নয়ন, দীঘিনালা- ছোটমেরুং, চংড়াছড়ি-লংগদু সড়ক উন্নয়ন, জেলা সড়ক উন্নয়ন, মহালছড়ি-সিন্দুকছড়ি-জালিয়াপাড়া সড়ক উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়) ইর্স্টান বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প ,বিভিন্ন সড়কে পিসি গার্ডার সেতু, আরসিসি সেতু নির্মিত হয়েছে। এছাড়া সড়ক উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। 

খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপদ বিভাগে নির্বাহী  প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, শান্তিচুক্তির পরে পাহাড়ে সড়ক ব্যবস্থাপনায়  ইতিবাচক পরির্বতন হয়ে। পর্যটন নির্ভর জেলা হওয়ায় এখানে সড়ক উন্নয়ন জরুরি ছিল। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খাগড়াছড়ির ৩৯৭ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন হয়েছে। চুক্তি পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন সড়ক সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে পর্যটন ও কৃষি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। জেলায় বেইলি ব্রিজের পরিবর্তে ৪৩টি স্থায়ী সেতু নির্মিত হয়েছে।

চুক্তি আগে পাহাড়ে অধিকাংশ অঞ্চল ছিল অন্ধকারচ্ছন্ন, ছিল না বিদ্যুৎ সংযোগ। তবে চুক্তি পরবর্তী সময়ে প্রতিটি পার্বত্য জেলা স্থাপন করা হয়েছে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র। খাগড়াছড়িতে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে অধিকাংশ গ্রাহক। খাগড়াছড়িতে ৮০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণ হয়েছে। 

খাগড়াছড়ির ঠাকুরছড়ায় তৈরি হয়েছে ১৩২/৩৩কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র

খাগড়াছড়ি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী  প্রকৌশলী স্বাগত সরকার জানান, চুক্তির আগে বিদ্যুৎ সুবিধা ছিল যৎসামান্য। বর্তমানে অধিকাংশ পাহাড়ি অঞ্চল বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৬৮ হাজার বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে।  

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি পাহাড়ো আর্শীবাদ। চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালির মাঝে সম্প্রীতির উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমান সরকার শান্তিচুক্তি করেছে এর মধ্য দিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। 

পার্বত্য শান্তি চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। চুক্তি অনুযায়ী যেসব বিভাগ এখনো জেলা পরিষদের হাতে ন্যাস্ত হয়নি তা ন্যাস্ত করার দাবি জানিয়েছে তিনি। তবে ৩৩ বিভাগের মধ্যে জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তির হয়েছে ২৬টি বিভাগ।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান। চুক্তি অনুযায়ী ভূমি ব্যবস্থাপনা  ও পুলিশ  বিভাগকে জেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা কথা থাকলেও তা এখনো করা হয়নি। এছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক অনুসরণ করতে হবে। শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়িত হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তি উদযাপনে আজ জেলায় দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh