নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই চলছে কিস্তি আদায়

সর্বাত্মক বিধিনিষেধের মধ্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাগেরহাটে চলছে কিস্তি আদায়। নানা কৌশলে মাঠকর্মীরা কিস্তি আদায় করছেন। পরবর্তীতে ঋণ না দেয়া, অতিরিক্ত টাকা আদায়, টাকা আদায়ে মামলা করাসহ নানা ভয় দেখিয়ে কিস্তি নেয়া হচ্ছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) অনুমোদিত এনজিও ও স্থানীয় সমবায় সমিতিগুলোর মাঠকর্মীরা এভাবেই কিস্তি আদায় করছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানায়ও থামছে না এনজিওর দৌরাত্ব, যেকোনো মূল্যে টাকা আদায় করতেই হবে। লকডাউনের মধ্যে আয় বন্ধ থাকার পরেও কিস্তি দিতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন গ্রাহকরা। 

জেলা প্রশাসন বলছে, লকডাউনের মধ্যে কিস্তি আদায় না করার জন্য এনজিওগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদি কেউ নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার আইরারঘোপ এলাকার ফারজানা বেগম বলেন, আমি একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। শুনেছি লকডাউনে কিস্তি নেয়া বন্ধ। কিন্তু আমরাতো নিয়মিত কিস্তি দিয়ে যাচ্ছি।

একই উপজেলার হিজলা গ্রামের ফয়জুল হক বলেন, ঋণের দায়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছিলাম। কয়েক বছর আগে বাড়িতে এসে আবারো সবকিছু নতুন করে শুরু করেছি। স্থানীয় একটি সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নেয়া ছিল। লকডাউনের সময় কিস্তি দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে কয়েক মাস চললে আবারো বাড়ি ছাড়তে হবে।

বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ড এলাকার সেলুন মালিক ডেভিড বলেন, তিন সপ্তাহ হলো দেড় লাখ টাকা ঋণ তুলেছিলাম একটি এনজিও থেকে। লকডাউনে সেলুন বন্ধ থাকলেও আমার কিস্তি বন্ধ নেই। অফিসার নিয়মিত কিস্তি নিতে আসছেন আমাদের কাছে। ওই এনজিও‘র টাকা নিয়ে আমার উপকার হয়েছে, তাই আপনার কাছে আমি নাম বলব না।

নবলোক পরিষদ, টিএমএমএস, ওয়েভ ফাউন্ডেশন, উদ্দীপন, ব্যুরো বাংলাদেশ, কোডেক, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি এনজিও‘র ফকিরহাট উপজেলা শাখার কয়েকজন গ্রাহকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের কর্মীরা নিয়মিত কিস্তি আদায় করছেন।

শুধু ফকিরহাট নয় বাগেরহাটের নয়টি উপজেলার সর্বত্রই কিস্তি আদায় করছেন এমআরএ অনুমোদিত এনজিও ও সমবায় সমিতির মাঠকর্মীরা। প্রত্যেকটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা সব এনজিও‘র ব্যবস্থাপকদের কিস্তি আদায় না করার জন্য চিঠিও দিয়েছেন। এসব আদেশ ভঙ্গ করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দু-একটি এনজিওকে জরিমানাও করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। করোনাকালে চাপ দিয়ে ঋণ আদায়ের অপরাধে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনকে জরিমানা করেন কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিৎ দেবনাথ।

চিতলমারী উপজেলার একটি গ্রামে কিস্তি আদায় করতে দেখাযায় একটি স্বনামধন্য এনজিওর একজন মাঠকর্মীকে। তার ছবি তুলতে গেলে তিনি বলেন, ভাই আমার ছবি তুলেন না। আমিতো ছোট চাকরি করি। অফিস থেকে পাঠালে আমি কি করব। আমরা গ্রাহকের কাছে না আসলে আমাদের চাকরি থাকবে না। তাই আমরা আসি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক এনজিও কর্মী বলেন, অফিসিয়ালি সবকিছু বন্ধ থাকলেও গ্রামে গ্রামে চলছে কিস্তি আদায়। কিস্তি আদায় করতে না পারলে বেতনও বন্ধ রাখা হয় তাদের। মাঠকর্মীদের আদায়কৃত টাকা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবেও জমা হচ্ছে বলে দাবি করেন ওই মাঠকর্মী।

ফেডারেশন অফ এনজিওস ইন বাংলাদেশ, বাগেরহাট জেলা শাখার  সাধারণ সম্পাদক ও ব্যুরো বাংলাদেশের বাগেরহাট অঞ্চলের এরিয়া ম্যানেজার মামনুর রশীদ বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেতাবেক আমাদের প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ রেখেছি। আমাদের সংগঠনের সকল সদস্য প্রতিষ্ঠানকে কিস্তি আদায় না করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর পরেও কেউ যদি কিস্তি আদায় করে তাহলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট এনজিও ফোরামের (বিএনএফ) সাধারণ সম্পাদক শেখ আসাদ বলেন, সাধারণ মানুষের সার্বিক উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিরলসভাবে সরকারের সহযোগী ও সমঅংশীদার হিসেবে কাজ করছে। যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করে আসছে। তবে এই মহামারি করোনার কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এনজিওগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তারপরও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা বদ্ধ পরিকর। যদি কোনো সংস্থা এমআরএ অথবা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কিস্তি আদায়সহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তাহলে তার দায়ভার সেইসব সংগঠনের।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আ.ন.ম ফয়জুল হক বলেন, লকডাউনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যদি কোনো এনজিও কিস্তি আদায় করে বা কিস্তি আদায়ের জন্য চাপ দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গ্রাহকদের কিস্তি না দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং কোনো মাঠকর্মী কিস্তির জন্য চাপ দিলে প্রশাসনকে অবহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh