তিস্তার ভয়াল থাবায় ক্ষত বিক্ষত দুই পাড়ের মানুষ

পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে ভেসে উঠেছে তিস্তার ভয়াল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত মানুষের ক্ষত চিহ্ন। আকস্মিক বন্যায় সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর বোবা কান্না যেন থামছে না।

জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার একদিনের তাণ্ডবে তছনছ হয়েছে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলের জমিসহ অসংখ্য স্থাপনা। ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব ভেসে গেছে নদীর স্রোতে। ভেসে গেছে কৃষকের মাছের ঘের। ধান, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুনের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে এই ভেবে দিশাহারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। পানি কমে গেলেও এখনও অনেক পরিবার ঘরে উঠতে পারেনি। 

এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৪০০ হাঁসের খামার করা হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) এখন নির্বাক। আকস্মিক বন্যায় বাড়িঘরসহ ভেসে গেছে হাঁসের খামার। এখন ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন।

হঠাৎ বন্যায় ফ্লাট বাইপাস সড়কটি ভেঙে একই এলাকার বকতিয়ার হোসেনের (৬৭) ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। ঘর মেরামতের টাকা-পয়সা হাতে না থাকায় এখনও সে পরিবার নিয়ে ভাঙা ঘরগুলোতেই অবস্থান করছেন। 

স্কুল শিক্ষার্থী সঙ্গীতা আক্তার বলেন, হঠাৎ পানির স্রোত ঘরের মধ্যে ঢুকলে প্রাণ বাঁচাতে আব্বা-আম্মুসহ আমরা দ্রুত গাইড বানের রাস্তায় উঠেছি। আমার বই-খাতাসহ বাড়ির সবকিছু ভেসে গেছে।

কান্না বিজড়িত কন্ঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক আশা করে তিন বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। কিন্তু একদিনের বন্যায় সব তছনছ হয়ে গেল। এখন দেনার টাকা শোধ করব কিভাবে? পরিবার নিয়েই বা খাবো কি?

উপজেলার তিস্তাপাড়ের সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরল ইসলাম বলেন, বন্যা মোকাবিলায় কোনো পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় অকাল বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে তিস্তাপাড়ের কৃষক ও সাধারন মানুষ। আকস্মিক এ বন্যায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় চলাচলে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এখনো কিছু পরিবারের বাড়িঘর পানির নিচে রয়েছে।

এই আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন, পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ও কাকিনা ইউনিয়ন, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়ন এবং সদর উপজেলার গোকুন্ডা, রাজপুর ও খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন।

এখনও বানের পানিতে তলিয়ে আছে তিস্তাপাড়ের ৩০টি গ্রাম এবং চর ও দ্বীপ চরের হাজার হাজার একর জমির আমন ধান, ভুট্টা, আলু ও বিভিন্ন জাতের শাকসবজি। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ।

জেলার পাটগ্রামের দহগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার নদীর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছে তিস্তার ঢল। 

গত মঙ্গলবার (১৯অক্টোবর) দিনগত রাত ১০টার পর থেকে পরদিন বুধবার (২০ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত পানিতে এখানকার সাড়ে ৩০০ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দহগ্রাম ইউনিয়নের তিস্তা চরাঞ্চলসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলোনিপাড়া, সর্দারপাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মহিমপাড়া, বড়বাড়ি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দপাড়া, মুন্সিপাড়া, ক্লিনিক পাড়া ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাতিপাড়া, কদুআমতলা এলাকায় বন্যায় শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে কাকিনা-রংপুর সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় এখনও লালমনিরহাটের সঙ্গে রংপুর এবং তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস ভেঙে যাওয়া নীলফামারী, জলঢাকা, বড়খাতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল জানান, বন্যায় হাতীবান্ধা উপজেলার সঙ্গে সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম চলছে। একইসাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //