কেএনএফকে বর্জনের ঘোষণা সাধারণ বমদের

বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ কর্তৃক দুটি ব্যাংকে ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় কেএনএফ বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সাধারণ বমদের স্বাভাবিক চলাফেরার দাবিতে মানববন্ধন করেছে বম জনগোষ্ঠীর সদস্যরা।

একই সঙ্গে অস্ত্র লুট এবং ব্যাংক ডাকাতির এই ঘটনায় মানববন্ধন করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা।

আজ রবিবার (১৯ মে) বিকালে জেলা শহরে উজানি পাড়ারস্থ ইভেনজেলিক্যাল খ্রিষ্টিয়ান চার্চ-ইসিসি প্রাঙ্গণে সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর ব্যানারে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে সরকারের প্রতি বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড এবং কেএনএফকে বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বম সম্প্রদায়ের অর্ধ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু অংশ নেন।

মানববন্ধনে লালঅয় পার বম নামে এক শিক্ষার্থী লিখিত বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে প্রাণের ভয়ে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু জঙ্গলে অনাহারে অবর্ণনীয় কষ্টে দিনযাপন করছে। যা শিক্ষার্থীরা কখনো আশা করেনি। বম শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে চাই। এই পরিণতির জন্য কেএনএফকে দায়ী করে তাদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী বলে উল্লেখ করা হয়।

লালঅয় পার বম বলেন, কেএনএফের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ছাত্র সমাজ গ্রহণ করে না। তাদের এই কর্মকাণ্ডকে তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাই। সন্ত্রাসী, রাষ্ট্রবিরোধী ও ডাকাতগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। গোটা বম ছাত্র সমাজ কেএনএফকে বর্জন করেছে জানিয়ে কেএনএফের প্রতি ১০টি বার্তা দেন তিনি।

এছাড়া বম ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে সরকারে প্রতি চারটি দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থী লালঅয় পার বম। সেগুলো হলো-

১. তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা। নির্দোষ-নিরীহ আটককৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া।
২. দোষীদের দায় বম ছাত্র সমাজ নেবে না। প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।
৩. নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে কেএনএফের উত্থান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা।
৪. বম সমাজকে স্বাভাবিক বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া।

লালপেক থার নামে এক বম সদস্যও তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বম জনগোষ্ঠীর মানুষ স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থাকায় রাজনীতির চাল-চলেন পরিচিত নয়। যার কারণে অপ্রীতিকর, অপ্রত্যাশিত ও রাষ্ট্রবিরোধী ঘটনা মোকাবেলা ও প্রতিরোধ করার মত উপায় আমাদের ছিল না। দেরীতে হলেও আজ আমরা সমবেত হয়েছি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য।

আজ উপলব্ধি করলাম, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সন্ত্রাসী, রাষ্ট্রবিরোধী ও ডাকাতগোষ্ঠী পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমরা জাতি হিসেবে ভালো, সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। অল্প কিছু সংখ্যক পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী কেএনএফ সদস্যদের কারণে সেই সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন জাতি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। আমরা বম সম্প্রদায় কেএনএফকে বর্জন করলাম।

পরে কেএনএফ সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সকল বম সম্প্রদায়কে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি।

শুধু বম হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা নানাভাবে হয়রানি শিকার হচ্ছে অভিযোগ করে ঙুন চুয়াম বম নামে এক বম নারী বলেন, অনেক বম শিক্ষার্থী সম্প্রতি ৪৬তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারেনি। পরীক্ষা দেওয়ার জন্য অনুমতি নিতে হয় কিন্তু অনুমতি পায়নি।

আমার এক ছেলে এবং এক মেয়েও পরীক্ষা দিতে পারেনি। আমার ছেলে জিজ্ঞেস করে বলেন, মা, আমরা কেন বম ঘরে জন্ম নিলাম। এখন কোন চেক পোস্টে পার হতে পারি না। অনেকের বম পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে। ভয়ে এখন অনেকে বম পরিচয় লুকিয়ে রাখতে চায়। স্বাভাবিক চলাফেরার সুযোগ নাই। সরকারকে অনুরোধ করব, যারা সন্ত্রাসী, অস্ত্র লুট ও ডাকাতির সাথে জড়িত তাদেরকে ধরেন। কিন্তু কোন নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি করা না হয়।

তুয়ারনেম নামে আরেক নারী বম ভাষায় তার বক্তব্যে বলেন, কেএনএফ অস্ত্র লুট ও ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে একটি জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা শাস্তি পাক। কিন্তু আমরা নিরীহ বমরা শান্তিতে থাকতে চাই। এখন সবাই মনে করে, বম মানে কেএনএফ। আবার কেএনএফ মানে বম। অথচ তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কেউ তাদের সমর্থন করে না।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন শহরে কালাঘাটার এলাকার প্রেস ব্যাটারিয়ান চার্চের ধর্মযাজক জর্জেও লনচেও।

গত ২ এপ্রিল রুমা উপজেলার সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি করে অর্থ লুট করে একদল সশস্ত্র লোকজন। পুলিশের ১০টি এবং আনসার সদস্যের ৪টি অস্ত্রও লুট করে নিয়ে যায় তারা। অপহরণ করা হয় ব্যাংকটির ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে। দুদিন পর রুমার একটা পাহাড়ি এলাকা থেকে ছাড়া পান তিনি।

রুমা ঘটনার একদিন পর ৩ এপ্রিল থানচি উপজেলার সোনালী ও কৃষি ব্যাংকেও দিন-দুপুরে অর্থ লুটের ঘটনা ঘটে।

দুটি ঘটনায় পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ জড়িত বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-অর্থ উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুমা ও থানচিতে অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী। অভিযানে অংশ নিচ্ছেন সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যের যৌথ বাহিনী।

যৌথ বাহিনীর এই অভিযান সমন্বয় করছেন সেনাবাহিনী।

যৌথ বাহিনীর এই অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত রুমা থানায় ৫টি ও থানচি থানায় ৪টি মামলায় ২৫ নারীসহ মোট ৮৬ জনকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে পুলিশ।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //