এই আকালে শিক্ষার্থীদের কী হবে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ছুটি শেষ হলে ছুটি বাড়ছে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ছুটি শেষ হলে ছুটি বাড়ছে

করোনা প্রাদুর্ভাবে প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এত দীর্ঘ সময় ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকার পরও শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা নিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ছুটি শেষ হলে ছুটি বাড়ছে। এ অবস্থায় শিখন ঘাটতি নিয়েই পরবর্তী শ্রেণিতে উঠছে শিক্ষার্থীরা।  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে পঠন-পাঠনের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা সহজ নয়। অনলাইন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন হয়নি। চেষ্টা করা হচ্ছে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে সেটা করার। এছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনো-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। 

গত মার্চে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের মার্চ মাস থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মতো এত দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশে। এই দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় রয়েছে শুধু বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনা থেকে খুব শিগগির যে মুক্তি মিলছে না তা বলা যায়। আবার টিকা স্বল্পতায় এর আওতায় সবাইকে আনতে কয়েক বছর সময় লাগবে। এরই মধ্যে প্রায় দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এখন আরো দেড় থেকে দুই বছর যদি করোনা সংক্রমণ থাকে তাহলে তিন-চার বছর কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে? 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার মধ্যেও ‘ব্লেন্ডিং’ পদ্ধতিতে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অর্থাৎ করোনার সংক্রমণ কমে এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। আবার করোনা বাড়লে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে করোনা সংক্রমণের হার ৩ শতাংশের কাছাকাছি এলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আর এখন করোনার ঊর্ধ্বগতিতে (২০.২৭ শতাংশ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা চিন্তাও করা যাচ্ছে না।

আমেরিকায় লকডাউন চলাকালে সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক করে দেয়া হয় এবং এখন তা পুরোপুরি সচল আছে। আগামী ফল সেমিস্টার থেকে শতভাগ ইন-পারসন ক্লাস শুরু হবে। ভারতশাসিত কাশ্মীরে উন্মুক্ত স্থানে পাঠদান ইতিমধ্যেই একটা সমাধান হিসেবে চালু হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরে বহু বছর ধরেই খোলা আকাশের নিচে লেখাপড়া শেখানোর চল রয়েছে। দেশটি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত করে তোলার জন্য খোলা জায়গায় পাঠদানে সাফল্য পেয়েছে। ফিনল্যান্ডে জঙ্গলে স্কুল বেশ জনপ্রিয়। ডেনমার্কেও উন্মুক্ত স্থানে বিশেষ দিনে ক্লাস করার প্রথা চালু রয়েছে। বহু শিক্ষক ও স্কুল নিয়মিত এই বিশেষ দিনে বাইরে স্কুল শিক্ষার আয়োজন করেন। ডেনমার্কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোভিড-১৯-এর মধ্যে এই সংস্কৃতিকে আরো উৎসাহিত করেছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল মালেক বলেন, ‘অনেক দেশই করোনাকালীন শিক্ষা নিয়ে তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা করে ফেলেছে। তারা ‘ব্লেন্ডিং’ পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। করোনা সংক্রমণ কমে এলে সরাসরি ক্লাসে যাচ্ছে, আবার বেড়ে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে অনলাইনে চলে যাচ্ছে। শুধু করোনা শেষ হলে তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে- এ চিন্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, মফস্বলের শিক্ষকরা কিন্তু ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই চেনেন। তাঁরা ভাগ করে করে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব নিতে পারেন। এমন একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করা খুব কঠিন বিষয় নয়। অ্যাসাইনমেন্ট প্ল্যানটাও ঢেলে সাজানো দরকার। 

করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর থেকে সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস শুরু হয়েছে। সেই ক্লাস দেখার সুযোগ সব শিক্ষার্থীর নেই। যাদের রয়েছে তাদেরও আকর্ষণ করতে পারেনি ক্লাসগুলো। এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিলেও তা সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হলেও তা মূল্যায়ন না হওয়ায় যেনতেনভাবে জমা দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অনেক অভিভাবক নিজেরাই অ্যাসাইনমেন্ট লিখে স্কুলে জমা দিচ্ছেন। তবে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকরা গত মাস থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হোমওয়ার্ক দিয়ে আসছেন। এটি কার্যকর করা সম্ভব হলে অন্তত একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে আসতে পারে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘আমি প্রথমেই বলব, আমাদের অঙ্গীকারের অভাব রয়েছে। এত শিক্ষানীতি হলো, একটাও কি বাস্তবায়ন করা হয়েছে? শুধু বঙ্গবন্ধুর সময়ে শিক্ষায় জিডিপির ৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছিল, এখন তা ২ শতাংশ। আসলে আমরা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের তো আগে থেকেই বিকল্প খোঁজা উচিত ছিলো। সেটা না করে আমরা বলেছি, স্কুল খুলবে না, ছুটি বেড়েছে এসব। আমাদের বলা উচিত ছিলো, পড়ালেখা করো, অ্যাসাইনমেন্ট করো। কেন দেড় বছরেও টেলিভিশন ক্লাস জনপ্রিয় হলো না, অনলাইন কেন সবার কাছে পৌঁছাল না? একটা ক্লাস লাখ লাখ শিক্ষার্থী দেখবে, কেন এতে জনপ্রিয় শিক্ষকদের যুক্ত করা হচ্ছে না? আসলে সবই আমাদের অঙ্গীকারের অভাব।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh