টাইমস্কেল তেলেসমাতিতে দ্বিগুণ বেতন বাড়ছে শিক্ষকদের

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

২০০৭ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন মো. আনিছুর রহমান। ২০০৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শর্ত সুবিধায় হয়ে উঠেন প্রধান শিক্ষক।

আনিছুর রহমানের কপাল খুলে যায় ২০১৩ সালে। এসময় দেশের রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারি করা হয়। কপাল খুললেও আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হতে সময় লেগেছে মাত্র ৪ বছর। মাত্র চার বছর চাকরি জীবনে টাইমস্কেল লাগিয়েছেন তিনটি। আর এতেই তার বেতন হয়েছে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা!

শুধু আনিছুর রহমান নয়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এমন ৩৭ জন প্রধান শিক্ষক ২০১৪ সাল থেকে সরকারি প্রায় দ্বিগুণ বেতন তুলছেন। আর এর ফলে এই সাত বছরে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানলেও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এখনো বাড়তি বেতনই তুলছেন এসব শিক্ষকরা।

উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা জানান, সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন ৩০-৩২ হাজার টাকা। অন্যদিকে অবৈধ পন্থায় টাইমস্কেল লাগিয়ে এসব শিক্ষকরা বেতন তুলছেন ৪৮ হাজার ২৫৬ টাকা।

জানা যায়, তৎকালীন উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৭০- ৮০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ২-৩টি টাইম স্কেল, ক্রসপান্ডিং স্কেলের মাধ্যমে ৪৮,২৫৬ টাকা অবৈধ ভাবে মাসিক বেতন ভাতা হিসেবে তুলছেন এসব প্রধান শিক্ষক।

এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের টাইমস্কেল কর্তন ও অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বিল দাখিল করতে চিঠি দেয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের হিসাব মহানিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালের স্মারক অনুযায়ী ২০১৩-১৪ সালে অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের টাইমস্কেল পাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের টাইমস্কেল কর্তন ও অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বিল দাখিল করতে বলা হলো।

অভিযোগ রয়েছে, এই চিঠির পরও অদৃশ্য শক্তি ও ঘুষের কারণে চিঠিটি ধামা-চাপা দিয়ে এসব শিক্ষক অতিরিক্ত সরকারি অর্থ প্রতি মাসেই বেতন হিসেবে উত্তোলন করছেন।

জানতে চাইলে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম হারুন-উর-রশিদ বলেন, এসব শিক্ষকের বেতন কর্তন শুরু হয়ে গেছে। তবে বাস্তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেতন কাটার কোনো ঘটনা এখনো ঘটেনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩-১৪ সালে অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিকাল গণনা ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করে ২০২০ সালের ১২ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এতে বলা হয়, অধিগ্রহণকৃত এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ২০১৩ এর বিধি-এ উল্লেখিত কার্যকর চাকরিকাল একই বিধিমালার বিধি-১০ এ পেনশন গণনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ফলে এ সংক্রান্ত মঞ্জুরি আদেশ সংশোধন করে অতিরিক্ত প্রদান করা অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের থেকে আদায় যোগ্যা।

এতে আরো বলা হয়, উল্লিখিত বিষয়ে আর্থিক সংযোগ ছিলো বিধায় অর্থ বিভাগের সম্মতি ছাড়া কোন হিসাবরক্ষণ অফিস টাইমস্কেল প্রদান সংক্রান্ত বিল পাশ করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এরপরই ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর উপসচিব রওনক আফরোজা সুমা সাক্ষরিত আরো একটি পরিপত্র জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এখানে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়, জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয়করণের আগে চাকরিকাল গণনা করে টাইমস্কেল সিলেকশন গ্রেড প্রদানের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী বলেন, আমার জানা মতে যেসব শিক্ষক পেনশনে চলে যাচ্ছেন তাদের পেনশন থেকে টাকা কেটে সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে এখনো যেসব চাকরি করছেন তাদের বেতন কাটা হচ্ছে কী না সেটি জানা নাই।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্রের কারণে সারাদেশে কমবেশি এমন অবস্থার তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলাও ছিল আদালতে। তবে ফলাফল জানি না। এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা আসলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কেউ ডিপিএড করে কম বেতন পাচ্ছেন৷ আবার কেউ অতিরিক্ত অর্থ তুলছেন। সারাদেশের এসব সমস্যার বিষয়ে চলতি সপ্তাহে মহা হিসাব নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে। প্রাথমিকের অর্থ সংক্রান্ত যেসব সমস্যা রয়েছে সেসব সমাধান দ্রুত হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, এ বিষয়টি পরিচালক পলিসি এন্ড অপারেশন মনীষ চাকমা দেখভাল করেন। উনি ভাল বলতে পারবেন।

পরে যুগ্মসচিব মনীষ চাকমা বলেন, এমন প্রধান শিক্ষকদের পেনশনের সময় সমন্বয় করে দেখা যাচ্ছে তারা আর পেনশনের অর্থ পাচ্ছেন না। বরং পেনশন শেষে অনেকের বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। কোন শিক্ষক অনিয়ম করে সরকারের টাকা ঘরে তুলবেন এমন কোনো সুযোগ নেই।- বাংলাদেশ জার্নাল

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //