বিউপনিবেশ চর্চা

মুঘল সাম্রাজ্য পতন, ইতিহাস চর্চা ও ভাষ্য

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

পতন চর্চা

বাংলার ও পূর্বাঞ্চলের নবাবি আমল বা নিজামত এবং একইসঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় বুঝতে, ১৭০০ শতকের শেষ সময় এবং সামগ্রিকভাবে ১৮০০ শতকের রাজনৈতিক উথাল-পাথালের ইতিহাস চর্চার ধারাবাহিকতা এবং এর উদ্দেশ্য বোঝা জরুরি। বাংলার নিজামতের অর্ধশতাব্দীব্যাপী সময়টিকে ধরতে, মুঘল আমলের কিছু ঘটনা এবং জড়িয়ে থাকা পতন বিতর্কও একইসঙ্গে ঝালিয়ে নেব আলোচ্য প্রবন্ধে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরের অর্ধশতকের কিছু বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার কপালে যে অন্ধকারচ্ছন্নতার টিকা লাগিয়ে দিয়েছে, সেই উদ্দেশ্যকেও প্রশ্ন করব এই আলোচনায়। 

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দক্ষিণ এশিয়ায় আসার আগে থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ধনী অঞ্চলের ক্ষমতা দখলের ভাবনা ভেবেছে। এ জন্য রিচার্ড হাকলুইত তার ‘প্রিন্সিপ্যালস অব নেভিগেশন’ গ্রন্থে বলছেন- বিশ্ব শাসন করতে ব্রিটিশরা ভগবানের কাছে আদেশপ্রাপ্ত। ইংল্যান্ডের উচিত তার প্রাথমিক ক্যাথলিক শত্রু স্পেনের বিরুদ্ধে অস্ত্রসজ্জা করে সঠিক মুসলমান বন্ধু আর শত্রু নির্ণয় করা। মার্টিন লুথার স্প্যানিশ আর অটোমান সাম্রাজ্যকে এক শ্রেণিতে ফেলেছিলেন। ধ্রুপদী ব্রিটিশ এবং স্কটিস লেখকদের রোম সাম্রাজ্য ধ্বংসকারী অটোমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। এলিজাবেথের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হারবোর্ন ১৫৮০ সাল নাগাদ যুক্তি দেখালেন, স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে অটোমান-ব্রিটিশ সমঝোতা হলে শয়তানের দুই অঙ্গ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মরবে এবং এটি আদতে ইংল্যান্ডের পক্ষে যাবে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের ক্ষমতা বিস্তৃত হবে (সূত্র : জোনাথন ইয়াকট, সেলিং এম্পায়ার : উইন্ডিয়া ইন মেকিং অব ব্রিটেন অ্যান্ড আমেরিকা ১৬০০-১৮৩০)। বাংলায় তার নজর পড়ে ১৬৪০ সাল নাগাদ। ১৬৮৬ সালে মুঘলদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্ণ রণসাজে সজ্জিত হয়ে ব্যর্থ যুদ্ধ চালায় বাংলায়। চরম ব্যর্থতা সত্ত্বেও পরের ৭০ বছর বাংলার মতো উর্বর, অর্থনীতিতে অসামান্য শক্তিশালী অঞ্চল দখল করার পরিকল্পনা করে গেছে। সুশীল চৌধুরী তার ‘রোড টু পলাশী বা ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন এইটিন্থ সেঞ্চুরি বেঙ্গল’ বইতে দেখাচ্ছেন, শোভা সিংহের বিদ্রোহের ফলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর কুঠিগুলোতে বাংলায় দুর্গ তৈরি এবং জোরদার নিরাপত্তা বিধান করার অনুমতি পেল। দুর্গের সুরক্ষা স্তর, বাণিজ্য ফরমান অপব্যবহার ইত্যাদি কেন্দ্র করে ব্রিটিশ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নিজামতের নিয়মিত বিবাদ চলতে থাকে। রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক দুষ্কর্ম ঢাকতে, কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে নবাবদের অর্থগৃধ্নু অত্যাচারী বলা হয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বহুবার অভিযোগ করা হয়, বাংলায় ব্যবসা করা করপোরেটদের অর্থ লুণ্ঠন করে বাংলার নিজামতের আর্থিক বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে। সুশীল চৌধুরী তার উপরোক্ত বইয়ে আরও দেখিয়েছেন- কোম্পানির এই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা, উদ্দেশ্যপূর্ণ বাংলা দখল ছলের অংশ। কোম্পানিগুলো শুধু অস্বচ্ছল ছিল তাই নয়, বাংলার মহাজন, বণিকদের থেকে তারা বিপুল পরিমাণ পুঁজি জোগাড় করেছে পলাশী-পূর্ব সময়ে। বাংলা নির্ভর এশীয় বণিকদের তুলনায় তারা এক-তৃতীয়াংশ কম ব্যবসা করত, তাই ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের, বিশেষ করে কেমব্র্রিজ ঘরানার ঐতিহাসিকদের বয়ানে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছলতা একটি স্বকল্প কল্পনা। এই অনৃত অনৈতিহাসিক অভিযোগ শুধু সমৃদ্ধ বাংলার নিজামতকে নিয়েই করা হয় না, তার পূর্বের সমৃদ্ধ মুঘল আমল নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে আজ অবধি। 

সমৃদ্ধ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো দক্ষিণ এশিয়ার স্বচ্ছলতার জন্য দায়ী, তত্ত্বটি প্রমাণের অন্যতম উদেশ্য ছিল মুঘল সাম্রাজ্য পতনের ব্রিটিশ উপনিবেশিক ভাষ্য তৈরি করা। জাতিবাদী ইসলামবিদ্বেষী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকরা ১৭৫৭ সালের পরের প্রায় দুশ’ বছরের উপনিবেশিক লুট-খুন অত্যাচারের ঘোমটা আর শাসনের বৈধতা তৈরি করে দক্ষিণ এশিয়ার পতনের সব দায় চাপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যপূর্ব সময়ের ওপর। আমরা যেন ভুলে না যাই, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস খোঁজার উদ্দেশ্য ছিল- সে সময়ের বিশ্বের ধনীতম সাম্রাজ্য, বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত মুঘল হিন্দুস্তানকে ধর্মান্ধ এবং তার পরের সময়কে অরাজক হিসেবে প্রতিপন্ন করে উপনিবেশ স্থাপনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা। জন এফ রিচার্ডস ‘দ্য মুঘল এম্পায়ার’- এ স্পষ্টভাবে বলেছেন- আকবরের পরে জাহাঙ্গিরের সময় থেকে ইসলামী মৌলবাদীরা মুঘল দরবারকে কব্জা করে। সেই চেষ্টা শীর্ষে পৌঁছায় আওরঙ্গজেবের সময়। আওরঙ্গজেবের ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি আর হিন্দু নির্যাতনের নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। এই একেদেশদর্শী বয়ান উপস্থাপনের প্রবণতা আজও থামেনি। ইতিহাসবিদ আনমেরি স্কিমেলও মনে করেন, আকবরের পরের সময় থেকে ধর্মান্ধ মুসলমানেরা মুঘল সম্রাটদের কব্জা করে এবং তার ফলেই ১৯৪৭ এর ভারত ভাগ হয়। অথচ ‘রাইটিং সেলফ রাইটিং এম্পায়ার’- এ রাজীব কিনরা দেখিয়েছেন- কীভাবে শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের আমলে চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য অমুসলমান অভিজাত মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনের কেন্দ্রে বিরাজ করেছে এবং প্রশাসনিকভাবে তাদের সংশ্লেষী নানান কাজে উৎসাহও দেওয়া হয়েছে। আকবরের পরের সময়ে দরবারে মোল্লাদের রমরমা বৃদ্ধি পাওয়ার ধারণা শুধু পশ্চিমের অধিকাংশ ঐতিহাসিকেরই ভাবনা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বহু মুক্তমনাও এই ধারণার শিকার। পাকিস্তানের নাট্যকার শাহিদ নাদিমের ‘দারা’ নাটক বা জহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ উভয়ই তাদের মত করে ভারত ভাঙার জন্য আওরঙ্গজেবের ধর্মান্ধ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। অনেকেই মনে করেন, মুঘলদের, বিশেষ করে আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি শুধু মুঘলদেরই পতনের কারণ হয়নি। এই উপমহাদেশকে একের পর এক রাজনৈতিক দুর্ঘটনায় টেনে নিয়ে গেছে এবং এক গাড্ডা থেকে অন্য গাড্ডায় পড়তে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে গিয়ে দেশভাগ ঘটিয়েছে। জেমস মিল ভারত ইতিহাসের হিন্দু, ইসলামি ও আধুনিককালের যুগভাগ শেষ পর্যন্ত প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ- এভাবে রূপান্তরিত হয়ের, মূল উদ্দেশ্য প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশের দক্ষিণ এশিয়া লুটকর্মের দায়মুক্তির ইতিহাস রচনার প্রচেষ্টা। 

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস রচনার মৌল উদ্দেশ্যই ছিল উপনিবেশের লুট, খুন আর অত্যাচারের ফলে উদ্ভূত সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া। তাদের বক্তব্য- দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমস্যা প্রাচীন সময় থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজ করেছে এবং উপনিবেশ সময়ের সমস্যাগুলোর উদ্ভব এই দ্বন্দ্বের কারণেই। ব্রিটিশরা এই ভূখণ্ডে আসার আগে থেকেই হিন্দু ও মুসলমানরা হিংসাত্মক দ্বন্দ্ব চালিয়েছে, পরস্পরকে বঞ্চিত এবং নিপীড়ন করেছে। এর ফল আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর দেহে বিরাজমান। এই তত্ত্ব প্রমাণের উদ্যমে আজও ভাটা পড়েনি। তারা দক্ষিণ এশিয়ার ঔপনিবেশিক শিক্ষিতদের বুঝিয়েছে, দুই ধর্মের মধ্যে চলতে থাকা চিরকালীন দ্বন্দ্ব নিরসন সম্ভব নয়। ডাও, জেমস, মিল, ভিনসেন্ট স্মিথ, হলওয়েল প্রত্যেকেরই ইতিহাস নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো- ব্রিটিশ উপনিবেশের অব্যবহিত আগের মুঘল সাম্রাজ্যকে ধর্মান্ধ সময় হিসেবে উপস্থাপন করা। বিংশ শতকের শুরুতে স্টেটিস্ট যদুনাথ সরকার ৫ খণ্ডে আওরঙ্গজেব গবেষণায় দেখান, আওরঙ্গজেবের ধর্মান্ধ নীতির জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংস হয়। একমাত্র আকবরের আমলে মুঘল সাম্রাজ্যে হিন্দুদের অংশগ্রহণ চূড়ান্ত আকারে পৌঁছায়। ‘ল্যাটার মুঘলস’- এর রচয়িতা যদুনাথ সরকারের পৃষ্ঠপোষক উইলিয়াম আরভিনের রাস্তা ধরে তিনি বললেন, মুঘল আমলের ধ্বংসের জন্য দায়ি অভিজাতদের মধ্যে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, মুঘল সম্রাটদের বেলেল্লাপনা, ধর্মান্ধতা আর সম্রাটদের ব্যক্তিত্বের অভাব। আরভিন বললেন, মুঘলদের নৈতিক চরিত্র ঠিক ছিল না। যদুনাথ উপনিবেশিক সরকার পক্ষীয় বয়ানটি বঙ্গভাগের সময় অবদি মূল ইতিহাসচর্চার আঙ্গিক রূপে পরিগণিত হতে থাকে। 

২০২১ সালে যদুনাথ সরকারের মুঘল সাম্রাজ্য পতনের সমস্ত দায় আওরঙ্গজেবের এবং তারপরের সময়টিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে প্রবেশ এবং উদ্ধারকারী হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আবির্ভাব নামক তত্ত্বের নব্বই বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই জনপ্রিয় তত্ত্বটি দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস পাঠ্যে আজও সবল ও সক্রিয় বয়ান। অথচ এই তত্ত্বে তথ্য নির্ভর বিতর্ক কম, অধিকাংশ ঝুটো আর মনগড়া ভাবনার ঐকমত্য। ফলে এতদিন মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পরের সময় থেকে উপনিবেশিক সময় শুরুর মাঝের ‘অন্ধকার’ সময়টির আলোচনায় বিতর্কের আলো কমই পড়েছে। আমাদের পলাশীপূর্ব সময়ের আলোচনা (লেখকের পলাশীপূর্বের বাংলার ৫০ বছর এবং পলাশীপূর্ব বাংলার বাণিজ্য) সেই ঔপনিবেশিক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার সচেতন প্রচেষ্টা। উপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের মুঘল সাম্রাজ্য ‘পতন’ এবং তার পরের অন্ধকারাচ্ছন্ন দক্ষিণ এশিয়া তত্ত্বের সার্বিক ঐকমত্য ইতিহাস চর্চার একদা দুটি প্রভাবশালী আঙ্গিক আমরা আলোচনা করব। প্রথমটি অভিজাত ব্যক্তিত্ব নির্ভর- অর্থাৎ সম্রাটের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ অথবা ব্যক্তিত্বের অভাব ইত্যদি বিষয়ে যুগনির্দিষ্ট আলোচনা। বলা হলো- যদি শাসকের বৌদ্ধিকতা, শাসনকর্মে যৌক্তিকতা ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, তাহলে তারা সুবৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাম্রাজ্যকে স্থায়ী করার সুযোগ পায়, নয়ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মূলত মুঘল ঐতিহাসিকেরা এই আলোচনা প্রবণতার জন্মদাতা। তত্ত্বটা কয়েক শতাব্দী গড়িয়ে এসে মহাসমারোহে উপনিবেশিক সময়ে চর্চিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে উপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের বয়ানে শাসক অভিজাতরা লার্জার দ্যন লাইফ চরিত্র অর্জন করেছে। ধরে নেওয়া হলো, অভিজাত শাসকেরা সমসাময়িক রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করার উপযুক্ত পাত্র। ঠিক এই ধরনের ইতিহাস অবলম্বন করে আওরঙ্গজেবকে বোঝার চেষ্টা করেছেন যদুনাথ সরকার। ‘মুঘল স্টেট’ বইয়ের ভূমিকায় সম্পাদক সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম এবং মুজফফর আলম যদুনাথ সরকারের ইতিহাস চর্চাকে বলেছেন- হুইগিশ ইতিহাস চর্চা, অর্থাৎ অতীতের নির্দিষ্টভাবে বেছে নেওয়া ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে, লেখক ঐতিহাসিকের মনের মধুরী মেশানো বাখানকে ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করার উপনিবেশিক ধারা। তার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বর ওপর, ঘটনাক্রমের ঘনঘটার ওপর ঐতিহাসিকের নির্ভরতা তো আছে।

দ্বিতীয় ইতিহাস চর্চাটি মার্ক্সীয় বীক্ষাজনিত ইতিহাস। ভারতের মার্ক্সবাদীরা ১৯৫০ সালের দশক থেকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং উপনিবেশিক সমাজ বিষয়ে গভীর বিতর্ক চালাচ্ছেন। এই ইতিহাস নির্মাণ আজও শেষ হয়নি। ‘জিনিয়লজিস অব ইসলাম : ডিসিপ্লিন অ্যান্ড রিজন্স অব পাওয়ার ইন ক্রিশ্চানিটি অ্যান্ড ইসলাম’ বইতে তালাল আসাদও মার্ক্সীয় বীক্ষাকে হুইগিশ অভিধা দিচ্ছেন। তার যুক্তি Whig history is rooted in European Enlightment thinking that gave rise to European liberalism and Marxist theory of history, which itself is influenced by Christianity's teleological assumption that mankind must progress towards a certain goal. ব্রিটিশ এবং উপনিবেশিক ইতিহাসকারদের ব্যক্তি নির্ভরতার বদলে মার্ক্সীয়রা ‘পতন তত্ত্বে’ ব্যক্তির স্থানে সংগঠনকে আনলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তারা বললেন, সামাজিক সংগঠনগুলোর নির্দিষ্ট অভিলক্ষ্য এবং স্বার্থ রয়েছে। উত্থান, শীর্ষে ওঠা এবং পতন নির্ভর করে মানসিক দ্বন্দ্ব নয়, ব্যবস্থপনা দ্বন্দ্বের উত্তেজনায়। গত পাঁচ দশকে এই মার্ক্সীয় কাঠামো নির্ভর করে মুঘল সাম্রাজ্য পতন গবেষণা দুই ভাগে বিভক্ত হলো- একটি, সাম্রাজ্য নিয়োজিত থাকা বন্দী নির্ভর অভিজাত মনসবদার এবং বিশাল সংখ্যক রায়ত বিষয়ক আলোচনা- ইরফান হাবিবের ‘এগ্রারিয়ান সিস্টেমস অব মুঘল ইন্ডিয়া : ১৫৫৬-১৭০৭’ অথবা এম আতহার আলির ‘দ্য মুঘল নোবিলিটি আন্ডার আওরঙ্গজেব’, অন্য ভাগটি হলো নুরুল হাসানের ‘জমিনদার আন্ডার দ্য মুঘলস’ এবং তাঁর অনুগামীবৃন্দের শুরু করা মূলত রাষ্ট্র এবং গ্রামীণ জমিদারদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা। তাদের ধারণা, এই দ্বন্দ্বই ১৭০০ পরবর্তী সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের পথ নির্ধারণ করেছে। 

এই দুই মার্ক্সীয় পথকে মিলিয়ে পতন তত্ত্বে প্রবেশের উদাহরণও খুব ব্যতিক্রম নয়। ১৯৬০, ৭০-এর দশকে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষ করে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষকদের উদ্যোগে এই মিলন কর্মটি শুরু হয়। এর আকর্ষণীয় দিকটি হলো, ওয়েবারবাদ নির্ভর করে মুঘল সাম্রাজ্য পতনের ধারণাটি বোঝার উদ্যম-রাষ্ট্র গঠনের পদ্ধতির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিবদ্ধ মানুষের হাতে প্রভূত ক্ষমতা নিষিক্ত হয়, এই ব্যক্তিরাই ব্যবস্থার হৃদয় বা ধারক হিসেবে পরিগণিত হন। বিভিন্ন দিকে ছুটে যাওয়া বিভিন্ন সাংগঠনিক গতি-প্রকৃতির দ্বন্দ্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাকে ভারসাম্য দিতে প্রয়োজন হয় এই ধরনের ব্যক্তিত্বের। কাঠামোয় স্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে সম্রাটই মূল অক্ষদ- এবং ছত্রছায়া। এ ধরনের ইতিহাসচর্চার দুটি উদাহরণ দেব স্টিফেন পি ব্লেকের ‘প্যাট্রিমনিয়াল ব্যুরোক্রাটিক এম্পায়ার অব দ্য মুঘলস’ এবং এম এন পিয়ারসনের ‘দ্য পলিটিক্যাল পার্টিপেশন ইন মুঘল ইন্ডিয়া’ থেকে।

এই দুইজন ইতিহাসবিদ খুবই পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত পন্থা নির্ভর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন বিষয়ে উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার বদলে আরও এক ঝাঁক প্রশ্ন প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। বলা হলো মুঘল সাম্রাজ্য বিষয়ে উত্তর খুঁজতে গেলে অবশ্যই একই কাঠামোয় ঢালা উসমানি এবং সাফাভি সাম্রাজ্য বিষয়ে খোঁজ নেওয়া জরুরি এবং ঐতিহাসিকরা আশা করতে থাকেন, তিন সাম্রাজ্যের তুলনামূলক আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু উত্তর পাওয়া যাবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১৬০০ সালে আকবরের সময়েই মুঘল রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যায়নি। বহুকাল ধরে রাষ্ট্র গঠনের ভাঙা-গড়া চলেছিল স্থানীয় নানান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। আমরা মুঘল রাষ্ট্রকে এককালীন কার্পেট না ভেবে এটিকে বেশ কয়েকটি কার্পেটজুড়ে বিভিন্ন রঙের একটি সুবৃহৎ কার্পেট হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। ১৭০০ উত্তর সময়ে আরও একটি ক্রান্তিকালের দেখা পাওয়া গেল অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মুঘল একাধিপত্যের ক্রমাবনতি ঘটল এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব হলো। মোট কথা, ১৭শ’ শতক থেকে ১৮শ’ শতকে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক রূপরেখা হলো কেন্দ্রিভূত শাসন ভেঙেচুরে ভারতজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রের উদ্ভব। এই যে পরিবর্তন ঘটছে দক্ষিণ এশিয়ায়, প্রায় একই ঘটনা ঘটছে উমাইয়া রাজত্বে। একই সময়ে তাদের অঞ্চলেও প্রায় একই রূপান্তর ঘটছে। মাথায় রাখতে হবে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রের উদ্ভব আলোচনা, পতন পরবর্তী অন্ধকারাচ্ছন্ন অর্ধশতাব্দীব্যাপী দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস আলোচনায় উপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা থেকে বেরিয়ে আসার ধারা। 

তবু মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং সেই সময়ের অন্ধকার দক্ষিণ এশিয়ার ক্রান্তিকালের ধারণাটা উপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসাতে রয়েই গেল। এই ক্রান্তিকাল অবলম্বনে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চর্চা কোন পথে এগিয়েছে? সেই আলোচনায় প্রবেশ করতে আবারও ফিরে যেতে চাই পতন ইতিহাসচর্চার পথ খোঁজার তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে। ব্যক্তি নির্ভর ইতিহাসচর্চাকারীরা বললেন, সাম্রাজ্য পতনের মূলে সম্রাট এবং অন্য ঘটক অভিজাত চরিত্রের পতনের সঙ্গে সামগ্রিক সাম্রাজ্যের পতনের মূল সূত্রটি নিহিত থাকে। নারী বিদ্বেষী ঐতিহাসিকদের ধারণা হলো সাম্রাজ্য পতনের সঙ্গে হারেম কৃষ্টির অঙ্গাঙ্গী যোগ রয়েছে। তারা ‘পেটিকোট গভর্নমেন্ট’এর মত অশ্লীল শব্দবন্ধ তৈরি করলেন- ইঙ্গিত হারেম প্রভাবিত সম্রাটের অপৌরুষোচিত কর্মকাণ্ড সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী। এ প্রসঙ্গে কিছুটা শীলিত যুক্তি উপস্থাপন করেছেন যদুনাথ সরকার এবং তার অনুগামীরা। তারা বললেন, মুঘল শাসনের পতনের মূল সূত্রটি নিহিত আছে মুঘল সম্রাটদের ধর্মান্ধতায়। তত্ত্ব প্রমাণে তিনি বেছে নিলেন ধর্মান্ধ এবং শিয়াপন্থা বিদ্বেষী আওরঙ্গজেবকে। এরা মনে করেন সম্রাট আলমগীরের ধর্মান্ধতার জন্য হিন্দু অভিজাতরা আওরঙ্গজেবের ওপর আস্থা হারান। তাঁর ভাষায় আওরঙ্গজেব ‘was the worst ruler imaginable of an empire composed of many creeds and races, of diverse interests and ways of life and thought’। এই ধারণার প্রতিস্পর্ধায় উঠে এলেন জায়গিরদারি সংকট নিয়ে কাজ করা সতীশ চন্দ্র (মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া), ইরফান হাবিবের (মুঘল এগ্রারিয়ান সিস্টেমস) মত মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক অথবা জে এফ রিচার্ডস (দ্য ইম্পিরিয়াল ক্রাইসিস ইন ডেকান) ইত্যাদি। আগেই বলেছি, তারা যদুনাথের মত ব্যক্তির ক্রমাবণতির ইতিহাসের বদলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অবলম্বন করলেন ঠিকই; কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের খোঁজটি রয়েই গেল। মার্ক্সীয়রা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেন, জায়গিরদারি সংকটের সঙ্গে তথাকথিত কৃষি সংকট, রাজস্ব আদায় এবং মনসবদারদের অধিকৃত জায়গিরের মধ্যে রাজস্ব বণ্টনের সমস্যা, একই সঙ্গে উৎপাদন, দামবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফিতি, মনসবদারদের হঠাৎ সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষকদের ওপর মুঘলদের অতিরিক্ত অত্যাচার ইত্যাদির ফলে রাজস্ব আদায় কম হওয়া চলকগুলোর তথ্যগুলো মিলে-মিশে ঘটিয়ে। ইরফান হাবিব উপনিবেশিক ঐতিহাসিক ডাব্লিউ এইচ মুরল্যণ্ডের ‘ফ্রম আকবর টু আওরঙ্গজেব : আ স্টাডি ইন ইন্ডিয়ান ইকোনমিক হিস্ট্রি’ অনুসরণ করে লিখলেন- পোটেনশিয়ালিটিজ অব অব ক্যাপিটেলিস্টিক ডেভেলাপমেন্ট ইন দ্য ইকনমি অব মুঘল ইন্ডিয়া এবং পূর্বে উল্লিখিত এগ্রারিয়ান সিস্টেমস...। হাবিবের ধারায় কাজ করলেন, নোমান আহমদ সিদ্দিকি, প্রকাশিত হলো ‘ল্যান্ড রেভিনিউ এডমিনিস্ট্রেশন আন্ডার দ্য মুঘলস’। মুরল্যান্ডের কাজের মূল অভিমুখ ছিল ব্রিটিশ লুঠ অত্যাচারের বদলে দক্ষিণ এশিয়ার পতনের কারণ হিসেবে ‘মুঘল অত্যচার’ এর দিকে নজর ঘোরানো। হাবিব সেই অভিমুখটিই আত্মীকৃত করলেন, তাত্ত্বিকভাবে পতনোন্মুখ সামন্ততন্ত্রের পরে পুঁজিবাদে উত্তরণের পথ হিসেবে। হাবিবের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আতহার আলি ‘মুঘল নোবিলিটি আন্ডার আওরঙ্গজেব’-এ মুঘল পতনের তত্ত্বকে জুড়লেন যে জমি এখনো বন্টিত হয়নি তার তুলনামূলক পার্থক্য অবলম্বন করে। সঞ্জয় সুব্রামনিয়াম ও মুজফফর আলম বলছেন, পরের দিকের মনসবদারির গবেষণা অন্য সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করছে, যা আতহারের অজানা ছিল। ততদিনে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসচর্চায় অভ্যন্তরীণ সমস্যায় মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্ধকার দিকে যাত্রা তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। সতীশ চন্দ্র মেডিভ্যাল ইন্ডিয়ায় জায়গিরদার, জমিদার এবং রায়তদের মধ্যে ত্রিভূজাকৃতি সম্পর্কের সমস্যাকে পতনের কারণ হিসেবে দর্শাতে চাইলেন। পাঞ্জাব ও অবাধ নিয়ে সাম্প্রতিকতম কাজে মুজাফফর আলম ক্রাইসিস অব এম্পায়ার ১১০-১২২ পাতায় চতুর্থ পক্ষ মদদিমাশ জমির দখলদারদের হাজির করে পতনের কারণ হিসেবে জুড়লেন (যারা সেই সময়ে বিদ্রোহের চরিত্র হিসেবে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ আর বন্টনের সমস্যাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছেন)। 

সতীশ চন্দ্র, ‘পার্টি অ্যান্ড পলিটিক্স অব মুঘল কোট’- এ বললেন, ১৭০৪-১৭৪১ সালের অষ্টাদশ শতকে জায়গিরদারেরা চাষীদের ওপর অত্যাচার করত। কারণ জায়গিরদারদের সম্পদের উচ্চাকাক্সক্ষা মুঘল রাজস্ব আদায় থেকে পূরণ হচ্ছিল না। দরবারে মুঘল অভিজাতরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হচ্ছিল ঠিকই; কিন্তু এই বিভেদ ধর্ম বা জাতি নির্ভর ছিল না। বিভেদ তৈরি হচ্ছিল মুঘল অভিজাতদের দরবারি স্বার্থ নির্ভর করে এবং একে হিন্দু পক্ষীয় বা হিন্দু বিরোধী কোনোটাই বলা যাবে না। এক সঙ্গে শ্রীপদ রামা শর্মার ভুল ভাঙালেন। শ্রীপদ রামা মুঘল এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়ায় দেখিয়েছেন দারা শুকো আর আওরঙ্গজেবের মধ্যে সিংহাসনের লড়াইতে হিন্দু আর মুসলমানেরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। হিন্দুরা ছিল দারার সঙ্গে আর মুসলমানরা ছিল আওরঙ্গজেবের পক্ষে। সতীশ চন্দ্র বললেন, দু’পক্ষে যোগ দেওয়া অভিজাত হিন্দুর সংখ্যা সমান ছিল। সিংহাসনের লড়াইতে ধর্মীয় বিভেদ ছিল না প্রসঙ্গটি খুবই সম্প্রতি আলোচনা করেছেন অড্রে তুরস্কে। তিনি বলেছেন, শাহজাহানের পুত্রদের সিংহাসন দখলের লড়াইতে (১৬৫৭-৫৯) মুঘল প্রশাসনের হিন্দু আমলারা আওরঙ্গজেব এবং দাদা দারার শিবিরে সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়। অধিকাংশ রাজপুত দারার পাশে দাঁড়ায় আর মধ্য সপ্তদশ শতকে মুঘল প্রশাসনে যথেষ্ট বড় শক্তি হয়ে ওঠা মারাঠারা আওরঙ্গজেবের শিবিরে জড়ো হয়। ন্যূনতম পদের ওপরে অর্থাৎ ১০০০ মনসদবদারির ওপরে থাকা ২১ জন হিন্দু আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং ২৪ জন দারার সঙ্গে। আওরঙ্গজেব ও দারা মোটামুটি সম সংখ্যক হিন্দু অভিজাতের আনুগত্য অর্জন করেন। (আওরঙ্গজেব : দ্য ম্যান এন্ড দ্য মিথ, অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ, আত্মজা প্রকাশন)। তিনি বললেন, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের একটি বড় কারণ সাংস্কৃতিক। সে সময় উমাইয়া, সাফাভি ও মুঘলেরা ইউরোপীয় আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি নেয়নি। ফলে তারা পিছিয়ে পড়েছে। সতীশ চন্দ্রের পরে পতন তত্ত্ব জুড়ল আতহার আলি। আওরঙ্গজেবের সময়ে মুঘল অভিজাত শ্রেণি এবং তিনি ইতিহাস পাঠের ধারণা অনেকটাই বদলে বললেন- আওরঙ্গজেব ১৬৭০ থেকেই রাজপুত বিদ্রোহের জন্য চরমভাবে এদের বিরোধী। তাই রাজপুতদের প্রতিপক্ষ মারাঠাদের তোল্লাই ও মনসবদারিও দিলেন। দরবারে উচ্চপদস্থ মারাঠা অভিজাতর সংখ্যা বাড়ল। আকবরের সময় আমলাতন্ত্রে হিন্দু উচ্চ অভিজাতদের সংখ্যা ২৩ শতাংশ ছিল আর আওরঙ্গজেবের সময় বেড়ে হলো ৩১ শতাংশ। তিনি প্রথম প্রমাণ করলেন, আওরঙ্গজেব হিন্দু বিরোধী ছিলেন না। ১৭০০ সালের বহু আগে থেকে জাহাঙ্গীরের সময় থেকেই জায়গিরদারি সংকট চলছিল। তিনি সতীশ চন্দ্রের তত্ত্ব অনুসরণ করে বললেন, জায়গিরিদারি ব্যবস্থায় সংকটের কারণ ছিল জায়গিরগুলো থেকে খুব বেশি রাজস্ব না আসা। তাছাড়া খুব বেশি জায়গির মনসবদারদের বন্টনের জন্য অবশিষ্টও ছিল না। ফলে নতুন জায়গির বরাদ্দ সম্ভব হচ্ছিল না। তৎকালীন এক লেখকের উক্তি মনসবদারি অর্জন সমস্যার ঠিকই; কিন্তু নতুন জায়গির বরাদ্দ অসম্ভবকে মনসবদারি সংকটের কারণ দেখিয়ে বললেন, জায়গির বরাদ্দ ছাড়াই তখন মনসব দেওয়া হচ্ছিল। 

ইরফান হাবিব পতনের কারণ আলোচনা করলেন- মুঘল কৃষির পতনকে ‘এগ্রারিয়ান সিস্টেমস অব মুঘল এম্পায়ার ১৫৫৬-১৭০৭’-এ। তিনি বললেন, জায়গিরদারেরা অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের জন্য চাষীর ওপর অত্যাচার করছিল। বার্নিয়ে এবং অন্যান্য ফারসি তথ্য উদ্ধৃত করে বললেন, প্রজারা চারদিকে বিদ্রোহ করছিল। কারণ চাষীরা জায়গিরদারদের অত্যাচার সহ্য করছিল না। কোথাও চাষীরা পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে যাচ্ছিল, কোথাও সরাসরি বিদ্রোহে অবতীর্ণ হচ্ছিল। চাষীদের বিদ্রোহে জমিদারেরাও যোগ দিচ্ছিল। তিনি বিদ্রোহগুলোর বিস্তৃত বর্ণনাও দিয়েছেন। ১৬৭০ সালে পিটার মুণ্ডিকে উদ্ধৃত করে বললেন, মুঘল সাম্রাজ্যে সারাক্ষণ কোথাও না কোথাও বিদ্রোহের আগুন জ্বলছিল। মানুচিকে উদ্ধৃত করে বললেন, সাম্রাজ্যের পক্ষে জমিদারদের সামলানো মুশকিল হয়ে উঠছিল। আওরঙ্গজেবের প্রশাসনিক নথি থেকে তিনি দেখালেন, সম্রাট জানতেন জমিদারেরা রাজস্ব দিচ্ছেন না, তারা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে। ফলে কম রাজস্ব আদায় হচ্ছিল। যদিও গোলকুণ্ডা আর বিজাপুর সংযুক্তির ফলে শাহী রাজস্ব ২৩ শতাংশ বেড়েছিল। হাবিব বলছেন, সমস্যার শেকড় লুকিয়ে ছিল কৃষি সংকটে। সংকটটি তিনি দেখালেন, পরস্পর বিরোধী দুটি সূত্র অবলম্বন করে- পণ্য উৎপাদন বাড়ছে, বাণিজ্য রপ্তানি বাড়ছে একইসঙ্গে কৃষির সংকটও বাড়ছে। তিনি আরও বললেন, এই বিদ্রোহগুলো শ্রেণি সংগ্রামের একটা রূপ। সংগ্রামটি প্রকাশ্য হয়নি মূলত ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য। ১৬৭০ সালের সতনামীদের লড়াই, ১৬৮৪ সালে ভারুচের বিদ্রোহ, ১৬০০ সালের শেষে শিখদের লড়াই ইত্যাদিতে অংশগ্রহণকারীদের ধর্মীয় চরিত্র শ্রেণি চেতনাকে দাবিয়ে রেখেছিল এবং শ্রেণি সংগ্রামকে বিদ্রোহে রূপান্তরিত করেছিল। জমিদার গোষ্ঠীও এই লড়াইতে যোগ দেয়। তারা অভিজাত হলেও, স্বস্বার্থে চাষীদের লড়াইতে ছিল। এতে বিদ্রোহ শক্তিশালী হয়। তিনি বললেন, জাগিরদারদের অত্যাচার আর চাষীদের বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস করল। 

পতন তত্ত্বে নিয়ে এবার আলোচনা করব অশীন দাশগুপ্তর ‘ইন্ডিয়ান মার্চেন্টস এন্ড ডিক্লাইন অব সুরাট ১৭০০-১৭৫০’ ইত্যাদি কাজ নিয়ে। অশীনবাবু মূলত ভারত সাগর এলাকা এবং সুরাট বন্দরের ব্যবসায়ীদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৭০০ সালের শুরুর সময় থেকে সুরাট বন্দরের পতন ঘটতে থাকে। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের দামি ভোগ্য পণ্য আসা বন্ধ হয়ে যায়। এই তত্ত্বে তিনি সুরাট বন্দরের পতনের সঙ্গে মুঘল পতনকে জুড়লেন। তিনি ব্রিটিশ আর ডাচ সূত্র থেকে মুঘল সাম্রাজ্য পতনের যুক্তি ও তথ্যগুলো সাজিয়েছেন। সুরাট বন্দরের ধ্বংসের কারণের বিশাল পশ্চাদভূমিতে চলতে থাকা মারাঠা যুদ্ধ। এ ছাড়াও পশ্চিম এশিয়ার বাজারেও পতন ঘটেছিল একই সঙ্গে। কারণ পারসিক আর তুর্কি সাম্রাজ্যর পতন ঘটেছিল এই সময়ে। দক্ষিণ পূর্ব এশীয় বাজার ডাচদের দখলে আসায় সুরাটি বণিকদের সেখানকার দখল কমেছিল। সুরাটের ধ্বংসের উত্তর সময় প্রাথমিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যে ধনীদের ভোগ্যপণ্য আসা বন্ধ হলো; দ্বিতীয়ত, আগ্রার কাছে বায়ানায় নীল উৎপাদন বন্ধ হলো। তবে তথ্যগুলো ঠিক নয়, সেটি পরে প্রমাণ হয়েছে- সুরাট পতনের বহু আগে থেকেই ডাচেরা বায়ানার নীল কেনা বন্ধ করে আগরার কুঠি বন্ধ করে গুজরাটের সরখেজ নীল কিনেছিল। আমরা যেন মাথায় রাখি সুরাট থেকে দামি ভোগ্য পণ্য আসা বন্ধ হলেও, সেসব মুঘল ভারতে আসা বন্ধ হয়নি। ভোগ্য পণ্য সুরাটের বদলে দক্ষিণ এশিয়ায় আসার পথ করে নিল পূর্ব উপকূলের মছলিত্তনম এবং হুগলি বন্দর মারফৎ। ডাচদের অত্যাচারে সপ্তদশ শতকে মছলিত্তনম ধ্বংস হলেও হুগলির বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল। সমান্তরালভাবে পাটনারও উত্থান ঘটছিল, যার সঙ্গে সরাসরি আগরার পাইকারি বাজারের সম্পর্ক তৈরি হলো। নাদির শাহের আক্রমণে যে সব জিনিসপত্র দখল হয়েছিল, সে বাবদে ফারসি বর্ণনা থেকে আন্দাজ করা যায়- দিল্লিতে দামি ভোগ্যপণ্য আসা বন্ধ হয়নি। 

অনিরুদ্ধ রায় বলছেন, মুঘল সাম্রাজ্যের আর্থিক সমস্যাকে জায়গিরদারির সমস্যাও বলা যেতে পারে এবং সে সমস্যা মুঘল আমলে নতুন কিছু নয়। জাহাঙ্গির সিংহাসনে আরোহন করে বিশাল সংখ্যায় মনসদবদারি বিলোলেন। দশ বছরেও বহু মনসবদার জায়গির পায়নি। ১৬০৫-১৬২১ সালে মনসদবদারের সংখ্যা দ্বিগুণ হলো; কিন্তু জায়গির দ্বিগুণ হলো না। ফলে বেতন সমস্যা দেখা দিল। মুঘল সাম্রাজ্যে অর্থনৈতিক সংকট নেমে এল। জাহাঙ্গির মনসবদারদের বেতন কমিয়ে দিলেন। আর্থিক সমস্যা চলতে থাকল ১৬৪৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ শাহজাহানের রাজত্বকালের শেষের সময় অব্দি। তারপর কিছুটা সামাল দিয়ে ঘাটতি ১/৪ অংশে নামিয়ে আনলেন; কিন্তু সামগ্রিক সংকটের সমাধান তখনো হয়নি। শাহজাহানের শেষ সময়ে সিংহাসনের যুদ্ধে আর্থিক সংকট আরও বাড়ল। অনিরুদ্ধ রায় এটাকে সিভিল ওয়ার বলছেন। সংকটটি তাই বহুকাল ছিল। এটিকে লুকিয়ে, চাপা দিয়ে বা জোড়াতালি দিয়ে সামলানো হচ্ছিল। এ ছাড়াও ১৮ শতকে নানান রাজনৈতিক সমস্যা ছিল; বিশেষ করে নাদির শাহের লুট মুঘলদের আভিজাত্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। আহমদ শাহ আবদালিকে প্রথমবার ধাক্কা দিয়ে ভারত থেকে হঠিয়ে দেওয়া গেলেও, পরের দিকে তার অভিযান, লুট ইত্যাদি আটকানো যায়নি। দিল্লি দখল এবং লুট হলো। মারাঠারা উত্তর ভারত দখলের চেষ্টা করল, তাদের সাম্রাজ্য লিপ্সা বাড়ছিল। তারা মুঘল আর ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ জানায়। রাজপুতেরা রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করলে অসহায় সম্রাট শাহ আলম বললেন- ‘আমার সাম্রাজ্য দিল্লি থেকে পালাম অবদি শুধু, তার বাইরে নয়’। মুঘলেরা মহাদেঘি সিন্ধিয়া মারাঠাদের সাহায্য নিতে চাইল বিশাল অর্থের বিনিময়ে, সেটি যখন ঘটল না, তখন দিল্লিকে অনেক অর্থ দিতে হলো। এই ধ্বংস বৃত্ত সর্ম্প্ণূ হলো ব্রিটিশদের আগমনে, সে ইতিহাস আমরা সবাই জানি। 

মুঘল সাম্রাজ্য পতনে বি-শহরিকরণ নিয়েও বিশদে আলোচনা হয়েছে। ফরাসি কাউন্ট অব মোদাভ ১৭৭৪- এ দক্ষিণ এশিয়ায় আসেন। তিনি দিল্লি, আগরার ধংসাবশেষ দেখেন এবং বর্ণনা দেন। দিল্লি দরবারের কবি মীর তাকি মীর, নবাবি অবধের ফৈজাবাদে যান ১৭০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তিনি লিখলেন- ‘দহলি যো এক শহর থা আলম মেঁ ইন্তেখাব, [এক সময়] দিল্লি নামে এক শহর ছিল, একদা সেটা চোখের মণিও ছিল’। এর বাইরে নতুন নতুন গবেষণায় বোঝা যাচ্ছিল- পতনের কারণ হিসেবে বি-শহরিকরণ তত্ত্বকে মান্যতা দেওয়া কঠিন। ক্রিস্টোফার বেইলি রুলার্স, টাউনসমেন এন্ড বাজার্স অব নর্থ ইন্ডিয়ায় বললেন- পুরোনো শহর ধ্বংস হলেও নতুন নতুন এলাকা ক্রমশ উঠে আসছে, নতুন নতুন গঞ্জ তৈরি হচ্ছে, নতুন ব্যবসা কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। সঞ্জয় সুব্রহ্মণিয়ম আর মুজফফর আলম বললেন, অবধ আর বাংলা ছিল আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর স্বচ্ছলতম এলাকা। অন্যান্য আমেরিকান লেখক সে সময়ে পতন আলোচনায় উঠে আসছিলেন দ্রুত। 

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে কোন নির্দিষ্ট কারণকে না জুড়ে, আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাকে জুড়লেন মুজফফর আলম ‘ক্রাইসিস অব এম্পায়ার’- এর মত অসামান্য কাজে। বিশেষ করে ১৭২০-১৭৫০ সালের মধ্যে সময় সারণীতে যে সব নতুন নতুন আঞ্চলিক রাষ্ট্র গড়ে উঠলো যেমন- পূর্বে বাংলা, উত্তরে অবধ, দক্ষিণে হায়দ্রাবাদ, যেগুলো কয়েক দশক আগেও মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। তাদের সম্পদ, পরমায়ু, মূলগত চরিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। মুঘল রাষ্ট্র কাঠমোতে নতুন তৈরি রাষ্ট্রগুলোর অনেকেরই ফিরে যাওয়া সমস্যার ছিল। আওরঙ্গজেবের পরে নতুন যে রাষ্ট্রগুলো তৈরি হলো, তাতে অনেক রাষ্ট্র প্রধান যেমন- মুর্শিদকুলি খান, নিজের প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেও মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথা, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনেকটিই অনুসরণ করেছেন। কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা শিথিল হয়ে যাওয়ায় আরও এক ধরনের আঞ্চলিক চরিত্রের রাষ্ট্র গড়ে উঠছিল ১৭শ’ শেষ এবং ১৮শ’ মধ্যখান অবদি- যেমন মারাঠা, জাঠ অথবা শিখ রাষ্ট্র, জাতি এবং ধর্ম চরিত্র নির্ভর হয়ে তৈরি হচ্ছিল। মাথায় রাখতে হবে ব্রিটিশপূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের রাষ্ট্র তৈরির পূর্ব উদাহরণ নেই। এত দিন ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে ঐতিহাসিক বয়ান শুনেছিলাম, তাকে চ্যালেঞ্জ করে গোষ্ঠীকেন্দ্রীক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারণাটাও ইতিহাস আলোচনায় উঠে এলো। একই সঙ্গে পতন তত্ত্বে জাগতিক বস্তুবাদী নানা যুক্তির সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র চরিত্রর উদ্ভব ও বিকাশে কৃষ্টিগত বিষয়গুলোও আলোচিত হতে শুরু করল। পতনের খোঁজে ভাষাও জুড়ল। মুঘলেরা ফারসি ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চালু করায়, তার সঙ্গে স্থানীয় ভাষাগুলোর টক্কর লাগল কি-না এবং এই ভাষা নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ি কি-না এই প্রশ্নটিও তুলেছেন মুজফফর আলম ‘দ্য পারসুইট অব পার্সিয়ান’, ‘ল্যাঙ্গুয়েজেস ইন মুঘল পলিটিক্স’ বইতে। ফারসিতে লেখা মুঘল কাহিনী, চিঠি বা রাজস্ব আদায় ইত্যাদি নথি থেকে আমরা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ভাষার সঙ্গে ফারসির দ্বন্দ্ব এবং সংশ্লেষের উদাহরণ দেখি। একই বিশ্লেষণ আমরা পাচ্ছি, গৌতম ভদ্র, দক্ষিণে জে এফ রিচার্ডস বা ভেলচেরু নারায়ণ রাওয়ের আলোচনায়। তারা দেখালেন যে, মুঘলরা রাষ্ট্রের কাজেও সুক্ষ্মভাবে পারসিকের সঙ্গে স্থানীয় ভাষার মিশেল ঘটায়। গৌতম ভদ্র, নারায়ণ রাও ও রিচার্ডসন বিভিন্ন আধা সাহিত্যিক মিথ এবং নথি অবলম্বনে তাদের তত্ত্ব প্রমাণ করলেন। গামাল্লা সমাজের প্রতিনায়ক সারভায়ি পাপাদু যাকে এতদিন ফারসি ইতিহাস ভিলেন হিসেবে দেখিয়েছিল, তাকে কীভাবে অন্যরূপে দেখা যায় সে সব আলোচনা শুরু হলো। 

১৮ শতকে উদ্ভব হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের অনেকেই মুঘল কেন্দ্রীকতার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। মারাঠাদের মত পাঠানরাও ছিল এরকম এক শক্তি। উত্তর পশ্চিমের মুঘল এবং সাফাভি রাজত্বের মাঝখানে থাকা বাজাইদ আনসারি এবং তার উত্তরাধিকারীদের রৌসানিয়া আন্দোলনকে মুঘলেরা ১৬ এবং ১৭ শতকে দমন করে। আওরঙ্গজেবের সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন পাস্তুন নেতা খুশহাল খান খটক মৌলবাদী অবস্থান অবলম্বন করে। খুশহাল খানের কবিতা এবং অন্যান্য সাহিত্যিক কাজ থেকে আমরা লক্ষ্য করি, তার পূর্ব সময়ের শের শাহ সুরির স্মৃতি, যিনি হিন্দুস্তানের শাসক হিসেবে হুমায়ুনকে বিদেশে বাস করতে বাধ্য করেন (সূত্র : সরফ গণি, প্রোডাকশন এন্ড ডমিনেশন, আফগানিস্তান ১৭৪৭-১৯০১)। ১৮ শতকের শুরুর সময়ের এই সাহিত্যকর্মগুলো ঘিলজার হোতক গোষ্ঠীর নেতা মীর ওয়াইস খান হোতক, সাফাভি প্রশাসকের সামনেই কান্দাহারে পাস্তুনরাষ্ট্র তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৭০৯-১৭১৫ অবদি তিনিই কার্যত কান্দাহারের শাসক ছিলেন। উত্তরাধিকারীরা তার মত নম্র ছিল না, পুত্র মীর মহম্মদ ইরানে কিরমান আক্রমণ করেন এবং ১৭২২ সালে ইসফাহান দখল নেন এবং নিজেকে শাসক ঘোষণা করেন। সাফল্য স্থায়ী হয় না, প্রতিবেশী পাস্তুন এবং আবদালিরা, সাফাভি শাসক নাদির কুলি আফসার ইত্যাদিরা উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণ করতে এক সঙ্গে মিলে নতুন রাজাকে আক্রমণ ও পরাজিত করেন।

১৭২৫ সালে মীর মহম্মদের মৃত্যুর পর, ১৭৩১ সালে নাদির শাহ পূর্ব ইরানে নিজের অবস্থান জোরদার করতে পাস্তুনশক্তির উত্থানকে দমন করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন এবং ১৭৩৯ সালে দিল্লি লুণ্ঠন করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের বাইরে নাদির শাহের সাফল্য অনুসরণ করে ১৭৪৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পাস্তুন শক্তির উত্থান ঘটে নতুন করে। নাদির শাহর বাহিনীতে বহু ঘিলজা ও আবদালি চাকরি নিয়েছিল এবং তার রণনীতি কাছে থেকে দেখেছে। তার অধীনে আফসার বিজেতা আহমদ খান যিনি আবদালিদের খুবই ক্ষুদ্র সাদোজাই গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন, ১৭৪৭ সালে পাস্তুনদের নেতৃত্ব দেন। তাকে নেতা বেছে নেওয়া হয় পাস্তুনখানদের একটি মাজারে আয়োজিত বৈঠকে। তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মুঘল এবং মারাঠাদের চ্যলেঞ্জ জানান এবং উত্তর ভারতে শিখ রাষ্ট্র গড়ে ওঠায় বড় ভূমিকা পালন করেন। নাদির শাহের ক্ষণস্থায়ী কিন্তু চোখ ধাঁধানো সাফল্য মহম্মদ শাহের রাজত্বর দূর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে এতদিনের প্রান্তিক শক্তিরা নিজেদের জোর আর ক্ষমতার আন্দাজ পেতে শুরু করে।

কেন্দ্রে মুঘল রাষ্ট্র ক্রমশ শক্তিহীন হলেও উপনিবেশিক তত্ত্বের মুখে ধুলে দিয়ে সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার পতন ঘটে না বরং অঞ্চলগুলো শক্তশালী হয়- দিল্লি থেকে পাঞ্জাব, আবধ থেকে দক্ষিণ থেকে পূর্বাঞ্চল আলাদা রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে উঠে আসতে শুরু করে। নাদির শাহ দিল্লি লুণ্ঠন করায় মুঘলদের যতটুকু সম্মান বেঁচেছিল, সেটিও পথের ধারে লুটোয়। 

১৮ শতক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এই উথাল-পাথাল সময়ের দিকে নজর দিলে বোঝা যাবে, এ সময়টি অসম্ভব রাজনৈতিক দুর্বিপাকের সময় ছিল- একদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও খুবই বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা মুঘল সাম্রাজ্য পতন ইতিহাসের আঙ্গিকগুলো চর্চায় প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনৈতিক উথাল-পাথালগুলোতে সামাজিক ও আর্থিক কোন বিপর্যয় ঘটছে কি-না? অর্থাৎ আওরঙ্গজেবের প্রয়াণের পরের সময়ে দক্ষিণ এশিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের দিকে ঢলে পড়ছে কি-না। বিপর্যয় ঘটছে; কিন্তু সর্বত্র নয়। আমরা দেখছি, সেনাবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করা হলে স্থানীয় সমাজগুলোতে কিছুটা বিপর্যয় ঘটেছে। বিশাল সেনাবাহিনী যাতায়াতের ফলে চাষের মাঠের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। মুঘল, নবাবি আমল অবদি ভারতের প্রায় বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী যাতায়াতের জন্য ক্ষতি পূরণের জন্য তাকাভি ঋণ দেওয়া হত (সূত্র : প্রসন্ন পার্থসারথী, হোয়াই ইউরোপি গ্রিউ রিচ, এশিয়া ডিডিন্ট)। উপনিবেশিক সময়ে এবং খুব সম সম্পন্ন রাষ্ট্র ছাড়া পরের সময়গুলোতে কিন্তু বহু জায়গায় সেনাবাহিনী চলাচলে উদ্ভুত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না চাষী এবং সাধারণ রায়তরা। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ব্যবস্থা ধ্বংস করার কোনো নিদর্শন অর্থাৎ বিশিল্পায়নের চেষ্টাকৃত উদাহরণ ব্রিটিশ আমলের আগে দেখা যায়নি। ১৭৫০ সালের পরে ক্রমশ সেচ পুকুর ধ্বংস, গবাদি পশু হত্যা, এমন কী মানুষের এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় অবস্থান্তর ঘটতে থাকে এবং এগুলো ১৭৭০ সালের পরে দ্রুত হারে সংগঠিত হয়। সম্পদ লুঠ হয়, সামাজিক সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হয়, চাষী হকার কারিগর নারীদের অধিকার এবং সম্পদ হরণ করা হয়। বাংলায় নবাবি আমলের পরের সময়ে এ সব ঘটনা চলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বে বিপরীত প্রভাব ফেলেছিল। 

কিন্তু এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব কিছুটা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে বিশেষ করে ১৭৪০ সালের পরে থেকে ১৭৭০ সাল অবধি। শুরুতে নাদির শাহ, পরে আহমদ শাহ আবদালি এবং শেষে রোহিলারা মুঘলদের পণবন্দী করে রাখায় দিল্লির অধিবাসীদের মনে হয়েছিল সারা ভারত যেন পণবন্দী হয়ে আছে; কিন্তু আমরা যদি তিরুবনন্তপুরম, জয়পুর, পুণে, হায়দারাবাদ অথবা মুর্শিদাবাদের অধিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সময়টাকে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে অন্য আলোচনায় ঢুকে পড়ব। কারণ আমরা দেখব দিল্লির অধিবাসীদের মত তার বাইরের মানুষরা পণবন্দী ছিল না। মাথায় রাখা দরকার সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ঢালের পথে গড়িয়ে যায়নি বরং বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির খতিয়ান তৈরি হচ্ছিল। সে সময়ে বিকাশের রাশ দিল্লি বা আগরার হাত থেকে সরে চলে এসেছিল ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক রাষ্ট্রের হাতে। সব অঞ্চলের অভিজ্ঞতা সমান নয়, তবুও বাংলা, জয়পুর ও হায়দারাবাদের রাজনীতি-অর্থনীতি ১৮ শতকের শুরুতেই ঊর্ধ্বগামী, অন্যরা যেমন- মহীশূর বা পাঞ্জাব দেরি করে ডানা মেলেছে। ১৮ শতক জুড়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সব অঞ্চলের বিকাশের ইতিহাস কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষ্যে ধরা যাবে না এবং মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পরের সময় থেকে উপনিবেশিক সময়ের শুরুর মোটামুটি অর্ধশতাব্দী কালকে কোনোভাবেই অন্ধকার সময় আখ্যা দেওয়া যাবে না। যে অন্ধকার সময়ের বয়ান অবলম্বন করে উপনিবেশিক ঐতিহাসিকরা লুঠেরা খুনি অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা খুঁজেছিল। 

আমরা শুরু করেছিলাম এই তথ্য বয়ান করে মুঘল পতনের কারণ খোঁজা এবং তাদের সাম্রাজ্যের শুরুর সময়টিকে অন্ধকারের সময় হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার ইতিহাস চর্চা আজকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে; কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে সেই ইচ্ছাকৃত উপনিবেশিক ঐতিহাসিক বিকৃতিটি চিহ্নিত করে কাটাবার উদ্যম নেওয়া হয়েছে। সুশীল চৌধুরী, নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ, ওম প্রকাশ আগরওয়াল, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম, মুজফফর আলম প্রমুখদের অষ্টাদশ শতকের গবেষণা অবলম্বন করে ‘পলাশীর পূর্ব ৫০ বছরের বাংলা’ এবং ‘পলাশীপূর্ব বাংলার বাণিজ্য’ এই দুটি বইতে দেখাতে চেষ্টা করেছি, সে সময়ের বাংলার সমৃদ্ধ সমাজ এবং অর্থনীতির চিত্রগুলো। যদিও আমাদের হাত বাঁধা, এই আলোচনার ঘেরাটোপ পলাশী অবধি, পলাশীর পরের সময় বিশ্লেষণে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাও বলি, পলাশীপূর্ব সময়ে যে সমৃদ্ধির ঔজ্বল্য এই কাজগুলোতে দেখানো গিয়েছিল বিস্তৃতভাবে, সেই প্রভা নিভে গেল পলাশীর পরের সাত বছরের অন্তহীন লুটের সঙ্গে ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি পাওয়ার সময় থেকে। পলাশির কয়েক বছর পরেও যে দামি ধাতু আসত বাংলায় এবং নিজামতের খাজাঞ্চিখানায় জমা হয়ে কারিগরকে দাদন ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যোগাত, ইউরোপীয়দের কলকাতা ছাড়া করার দৃপ্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দিত। বাংলা নির্ভর এশীয় বণিকদের ব্যবসা ছিল ইউরোপীয়দের তিনগুণের থেকেও বেশি- সেই ব্যবসা ধ্বংস করে দেওয়া হলো, চাষী কারিগর হকারদের আন্তর্জাতিক বাজার ধ্বংস করা হলো, বিশিল্পায়ন শুরু হলো, ফসল চাষে পরিবর্তন এলো, সম্পত্তির অধিকার হরিণ করা হলো, বাংলা লুঠের অর্থে বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পলাশীর পরে দামি ধাতু এবং অন্যান্য সম্পদ আসার প্রবণতা বন্ধই হয়ে গেল। হস গোমানস ‘মুঘল অয়ারফেয়ার ইন্ডিয়ান ফ্রন্টিয়ার্স এন্ড হাইরোডস টু এম্পায়ার ১৫০০-১৭০০’ তে দেখিয়েছেন- কীভাবে অপেশাদার সামাজিক বাহিনী থেকে লুঠের কাজে, সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে সেনাছাউনি নির্ভর কার্যত সমাজ বিচ্ছিন্ন, লুঠযোগ্য পেশাদার সেনাবাহিনী তৈরি করল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য- যাদের কাজ ছিল শাসক কোম্পানির লুঠের কাজে সহায়ক হওয়া। আরও বেশি লুঠের জন্য নতুন নতুন ভৌগোলিক এলাকা দখল করা। অর্থাৎ আওরঙ্গজেবের প্রয়াণের পরে মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীকতা ঢিলে হয়ে যাওয়ায় ভারতজুড়ে অন্ধকার নেমে আসেনি; পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণে আলাদা আলাদাভাবে নতুন নতুন পর্বে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। যে উদ্যম শেষ হয়ে গেল অপ্রতিরোধ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের লুঠ, খুন, অত্যাচারের দাপটে। মুঘলেরা শুধু সুবাগুলোর নিজস্বতা বজায় রেখেছিল তাই নয়, সুবাগুলোর নানান অঞ্চলের বৈচিত্রকেও বজায় রেখেছিল। কেন্দ্র, স্বাধীন সুবার প্রশাসক, সবাই মিলে চেষ্টা করেছে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল তাদের নিজস্বতা বজায় রেখে সাম্রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠুক। তাদের মাথা ব্যথা ছিল নিয়মিত রাজস্ব আদায় নিয়ে, সার্বিক সমাজে কৃষ্টি চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে নয়। ব্রিটশেরা প্যাক্স ব্রিটানিকার তত্ত্ব চাপিয়ে দিল, যে ঢিলে ঢালা আমলাতন্ত্র মুঘল বা ব্রিটিশ পূর্ব সময়ে ছিল, তাকে প্রতিস্থাপিত করল আমলাতান্ত্রিক ইস্পাত কাঠামো, যেখানে চেষ্টা করা হলো তার পূর্বের আমলকে পশ্চাদপদ প্রতিক্রিয়াশীল দাগিয়ে দিয়ে ভারতজুড়ে ব্রিটিশ এককেন্দ্রীক ইউরোপমন্যতা চাপিয়ে দেওয়ার। ডব্লিউ এইচ মুরল্যান্ড মুঘল আমল বুঝতে ১৯২০ সালে যে উপনিবেশিক তাত্ত্বিক বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চায়, যে তত্ত্ব প্রায় মান্যতা দিলেন আলিগড়িয় আঙ্গিকের ঐতিহাসিকেরা। তাকে বিনা দ্বিধায় নতুন করে জানা, বোঝা, প্রশ্ন করার সময় এসেছে। সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম ও মুজফফর আলম ‘মুঘল স্টেট’ বইতে বলছেন, মুঘল আমল শুধু কেন্দ্রীয়স্তরে রাজ বাহাদুর, ছত্রশাল, তানসেন, বৈজুবাওরা, আকবর-বীরবল, কৃষ্ণদেব রায়ার মত মিথই তৈরি করেনি, নানা আঞ্চলিক মিথ, কথ্য এবং লিখিত ইতিহাস তৈরি করেছে। তাছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে, বিশেষ করে ইউরোপে ‘মুঘল’ শব্দটি ক্ষমতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, তেমনি মুঘল আমলকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দিতে [নানান গালগপ্পে ভুল তথ্য তত্ত্ব ছড়াতে] ইউরোপীয় মুসাফির, লেখক পর্তুগিজ দিওগো দো কুটো, ফরাসি চিকিৎসক ফ্রান্সিস বার্নিয়ে এবং ভেনিসিয় সর্ববিদ্যাবিশারদ নিকোলো মানুচি বড় ভূমিকা পালন করেন। ‘পলাশী পূর্ব’ উপসর্গ যোগে আমরা যে ধারাবাহিক মঞ্জুষা তৈরি করছি, উপনিবেশের সময়ের আগের আমলকে বুঝতে, তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো উপনিবেশের তৈরি করা নানান অনৃত তথ্য, তত্ত্বকে প্রশ্ন করা এবং ইউরোপমন্যতাবিহীন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস নির্মাণ করা।

১৮ শতকের শুরুর সময়ের মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ এবং বাংলা অঞ্চলের রাজনীতির ক্রান্তিকালের চরিত্র বুঝতে আমাদের আরও গভীর আলোচনায় ঢুকতে হবে। নবাব ও জমিদারি কাঠামোর মধ্যেকার সম্পর্ক কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলের এই সম্পর্কের চরিত্র থেকে বেশ আলাদা। এটাও মাথায় রাখা দরকার যে, বাংলায় আমাদের আলোচ্য সময়ে অঙ্কের বাণিজ্য অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্যের তুলনায় অনেক গুণ বেশি ছিল। বাঙলার কৃষি অর্থনীতি, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সঙ্গে ১৮ শতকের শুরুর দিকে নবাবেরা নব্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার সম্পর্ক নতুন করে সাজিয়ে তুলতে চাইছিল। মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দিন, আলিবর্দির নানান শুরু করে যাওয়া কাজ সিরাজ তার দাদুর তৈরি করে দেওয়া কাঠামোকে আরও স্থায়ী এবং স্থিতিশীল রূপ দিতে আরম্ভ করেছিলেন; কিন্তু কিছুটা বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘটনাক্রম এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশীতে পরে পাওয়া চৌদ্দ আনা আর নবাবদের অযোগ্যতায় বাংলা, তার পরে ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়া নতুন এক অনতিক্রম্য রজনীতির আবর্তে জড়িয়ে পড়ল।

মুঘল নিয়ন্ত্রণ ঢিলে হলেও বাংলার সমৃদ্ধি বেড়েছে সমৃদ্ধ মুঘলযুগের তুলনায়। একই কথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য নিজামত বিষয়ে কম বেশিই বলা যায়। ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের ‘পতন’ এর পরে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের শুরু, এই উপনিবেশিক তত্ত্ব উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং ‘উপনিবেশিক’। শুধু দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস চর্চায় নয়, সামগ্রিক ইতিহাস চর্চায় মুঘল আমলের নানা বিষয় জানা ও বোঝার জন্য বিশাল গবেষণা চলছে। খুব সম্প্রতি আধুনিক উপনিবেশিক ইতিহাসের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে নতুন আলোতে দেখা এবং বেশ কিছু নতুন সূত্র অবলম্বন করে অতীত ঘটনা বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপনে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- রিচার্ড ম্যাক্সয়েল ঈটন, সুপ্রিয়া গান্ধী, মুনিস ফারুকি, অড্রে ট্রুস্কে, রাজীব কিনরা, কপিল রাজ, বীণা তলোয়ার, রুবি লাল, প্রসন্ন পার্থসারথী, এবা কখ, হস গোমানস, ইরা মুখুটি, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম, সুশীল চৌধুরী ও বার্নার্ড কোহন (শেষ দু’জন অনেক আগেই শুরু করেছেন এবং প্রয়াত), নিকোলাস ড্রিক্স এবং অন্যান্যরা। এই ঐতিহাসিকরা উপনিবেশ বিরোধী চর্চার কঠিন কাজ সহজ করেছেন। গত দু’শতকে প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশিক ইতিহাস চর্চায় বাংলা, সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়াকে জানা, বোঝার যে জগদ্দল উপনিবেশিক ইসলাম-ঘৃণাভিত্তিক নবজাগরণীয় নিগড় চেপে বসেছিল, সেই ছক ভেঙে দিয়ে উপনিবেশের তৈরি জ্ঞানচর্চা কাঠামোর বাইরে চোখ রাখার মালমশলা দিচ্ছেন। এই কাজে বেশ কিছু অনালোচিত তথ্য, সূত্রও প্রকাশ্যে এসেছে। উপনিবেশিক ইতিহাস যে সব অনৃত তথ্যের চাষাবাদ করেছিল, সেগুলোকেও নতুন তথ্যের আলোকে সেঁকে নেওয়া হচ্ছে। আলোচ্য গবেষকদের দেখানো পথের জ্ঞানচর্চায় বাংলা তথা দক্ষিণ এশিয়ায় খুব বেশি চর্চিত নয়, এমন কিছু বিষয় উঠে আসছে, যেগুলো তথাকথিত মূলধারার প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস/সমাজবিদ্যা চর্চার প্রতিস্পর্ধী। মূলধারায় থেকেও যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ করা যায়, তার জলজ্যন্ত উদাহরণ সুশীল চৌধুরী, অড্রে তুরস্কে, মুনিস ফারুকিরা। 

লেখক : উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক, অনুবাদক এবং ‘পরম’ পত্রিকার যৌথ সম্পাদক , কলকাতা

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh