গগনচিলের ডানা

ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

চলন্ত বাসের মধ্যেও যে সমানের সিট এবং পেছনের সিট মিলিয়ে ৪/৫ জনের ছোটখাটো গ্রুপ তৈরি হয়ে যেতে পারে এবং দিব্যি এরকম প্রাণবন্ত আলোচনাও জমে উঠতে পারে, আগে তেমন ধারণা ছিল না। আড্ডা জমানোর জন্য পূর্বপরিকল্পনা মাফিক সিট অ্যারেঞ্জ করা হয়েছে এমনও নয়। হলদিয়ার বিভিন্ন হোটেল বা লজ থেকে বিভিন্ন জন বাসে উঠে যে যার মতো বসে পড়েছে। বসার পর ডানে-বামে কিংবা সামনে-পেছনে তাকিয়ে সহযাত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে সচেষ্ট হয়েছে। আগে থেকেই অনেকের মধ্যে চেনাজানা আছে, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিগত চার রাত আর তিন দিনের কাব্যসুবাসিত একত্র বাসের স্মৃতি। ফলে শেষ পর্যন্ত কেউ আর অচেনা থাকে না বললেই চলে।

পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন জেলা তো আছেই, আসাম-ত্রিপুরা-মেঘালয় এমন কি আন্দামান পর্যন্ত যেখানে বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চার চল আছে বছরে বছরে সে সব জায়গা থেকে কবি সাহিত্যিকেরা এসে তিন দিনের জন্য মিলিত হয় পূর্ব মেদিনীপুরের বন্দরনগরী হলদিয়ায়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ২০/২৫ জন অতিথি কবি। তিন দিনের কবিতা উৎসব শেষে দুটি রিজার্ভ বাসে সবাই ফিরে চলেছে। নিকটাপাল্লার অনেকে আগের দিনেই সন্ধ্যে নাগাদ কেটে পড়লেও দুটি বাস মিলিয়ে যাত্রী সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আপাত গন্তব্য কলকাতার রবীন্দ্রসদন। তারপর ছড়িয়ে পড়বে যে-যার মতো। বারো বছর ধরে এই রকমই চলে আসছে। প্রতি বছর আমন্ত্রিত কবি-সাহিত্যিকের কিছু অদল-বদল হয়, সেই সুযোগে নতুনদেরও প্রবেশ ঘটে; তাই বলে পরষ্পর পরিচিত হয়ে উঠতে মোটেই সময় লাগে না। ফলে চলন্ত বাসেও শেষবেলার আড্ডা জমে ওঠে বেশ।

আমাদের সামনের সিটে বামদিকে বসেছেন কবি ভাস্বতী গোস্বামী, ফর্সা ধবধবে ছোটখাটো মানুষ। সদা হাস্যময়ী। চেনাজানা থাক বা না থাক, বাঙালি-মাত্রই তার আত্মীয়। অথচ স্বামীর কর্মসূত্রে তিনি থাকেন বাংলার বাইরে, রাজধানী দিল্লিতে। ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে, তবু বাংলার জন্য প্রবল টান। ছলছুতো পেলেই ছুটে আসেন কলকাতা। কবিতা উৎসব, বইমেলা, বসন্ত-উৎসব তো আছেই, সর্বোপরি বেলঘরিয়ার পুরানো বাড়িতে অশীতিপর শ্বশুর মশাই পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন, বড়বউমা বাড়ি এলে তার খুব আনন্দ হয়; কাজেই তাকে আসতেই হয় বছরে পাঁচ সাতবার। সেই মানুষ কিনা দুম করে বলে বসলেন,

‘এক পৃষ্ঠা কবিতা পড়ার জন্য অত দূর থেকে আর আসব নারে প্রণব।’

প্রণব বসেছে আরও দুই সিট সামনে, ডান দিকে, সেখান থেকেই উত্তর দেয়,

‘কেন, তোমার কি লোকসান হয়ে যাচ্ছে?’

পাশের সিট থেকে মধ্যবয়সী এক মহিলা আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়েন,

‘এক কবিতার পেছনে তাহলে খরচ পড়ছে কত?’

প্রণব হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ করে,

‘এটা তোমার ঠিক হলো না মাধুরীদি, এখানেও হিসাব-নিকাশ! এই কবিতার মধ্যে মাধুরী সাহাও কম যান না,

‘প্রাণজি বসাকের কথা মনে আছে? ওই যে বলেছিলেন-আয়ুর হিসেব হয় অমরত্বের নয়, কবিতা কেবলই আত্মরতি সংগোপনে শুধু পাপক্ষয়।’

একজন বয়সী কবি ঘাড়মাথা দুলিয়ে বলেন,

‘কলমে জোর আছে, বড্ড ভালো লেখেন; কিন্তু এবারে তো দেখলাম না তাকে!’

‘দিল্লির মায়া বলে কথা! রাজধানী ছাড়তে মন চায়!’

ভাস্বতী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন,

‘তার স্ত্রী অসুস্থ। একেবারে শেষবেলায় প্লেনের টিকিট ক্যানসেল করেছেন।’

মাধুরী সাহা এ নিয়ে আর কথা বাড়ান না। প্রণব গলা বাড়িয়ে ভাস্বতী গোস্বামীর কাছে জানতে চায়,

‘তোমার ফ্লাইট কখন দিদি?’

‘রাত সাড়ে আটটায়।’

‘আজই!’ মাহমুদ হাফিজ এতক্ষণে যেনবা আকাশ থেকে পড়ে, ‘বিকেলে কলেজ স্ট্রিটে আসছেন না?’

‘না ভাই, এবার আর হচ্ছে না। কাল সকালে মিটিং আছে দিল্লিতে।’

‘বাংলাদেশের কবিদের সম্মানে কফি হাউসের সান্ধ্যআড্ডায় আপনাকে পাব না, এ যে ভাবতেই পারছি না দিদি!’

নজরুলের গান থেকে কোট করেন ভাস্বতী গোস্বামী,

‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায় বন্ধু। গত বছর তো আড্ডার মাঝখানে ছিলাম আমি। এবার থাকছি না, আগেই সে-কথা জানিয়েছি শ্যামল দাকে। অসুবিধা নেই হাফিজ ভাই, আপনি তো মার্চের গোড়াতেই দিল্লি আসছেন, তখন আড্ডা হবে।’

প্রণব ফোঁড়ন কাটে,

‘বাঙালির আড্ডা বাংলার বাইরে, বেশ বলেছ যা হোক।’

কবি রোকেয়া ইসলাম আছেন বেশ খানেক সামনে, নিজস্ব বৃত্তে ছিলেন মশগুল, সেই বৃত্ত ভেঙে মাথা উচিয়ে আহ্বান জানান,

‘তাহলে আপনারা ঢাকায় চলে আসুন, বাঙালির আড্ডা বাংলাদেশেই হেবে কবিতা ক্যাফেতে। ফেব্রুয়ারিতেই আসুন আমাদের বইমেলাতে।’

এইবার ঢাকাইয়া বুলিতে প্রণব জানায়,

‘যামু যামু। কামাল ভাইয়ের লগে কতা হইছে, আগে টাঙ্গাইল যাইয়া লই।’

মাহমুদ কামাল দুইমুখো ধারের ছুরি। যেমন তার কবিত্বশক্তি, তেমনি তার সাংগঠনিক দক্ষতা। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবিতা উৎসব হয় ঢাকা থেকে অনেকটা দূর টাঙ্গাইলে। ভারত থেকে অন্তত ত্রিশজন বাঙালি কবি সেখানে অংশ নেন কবি শ্যামলকান্তি দাশের নেতৃত্বে। তারা দু’জনেই আছেন অগ্রবর্তী বাসটিতে কামালের সঙ্গে। বাসের ভেতরেই হয়তো ভারতীয় বাহিনীর নাম সিলেকশন হয়ে যাচ্ছে, কয়েকবার তালিকায় নাম ওঠা সত্ত্বেও ভাস্বতী গোস্বামী বাংলাদেশে আসতে পারেননি তা নিয়ে খুব দুঃখ তার। মাসে-দুমাসে দিল্লি থেকে কলকাতা আসতে পারেন বেশ, ঢাকায় যেতে তার অসুবিধা কোথায়! বাংলাদেশ নিয়ে তার কৌতূহলও প্রবল। বাংলাদেশের কতজন কবি বন্ধুর নাম ঠিকানা যে তার সংগ্রহে আছে তা বলা মুশকিল। তার মধ্যে বেশ কজনের সঙ্গে তো হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত চ্যাটিংও হয়; তবু আজও তার সীমান্তের ওপারে যাওয়া হয়নি। প্রবল বিশ্বাস-এপারে আসা তার হবেই, তিতাস অথবা পদ্মা নদীতীরে তিনি খালিপায়ে হেঁটে বেড়াবেন; এই রকম বিচিত্র সব ইচ্ছে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন। কবে থেকে তার এই সব ইচ্ছেপূরণের অভিযাত্রা শুরু হবে কে জানে সেই কথা! ভাস্বতীদিদের পাড়ার ছেলে প্রণব, বয়সে তরুণ, কবিতা লেখে খেটেখুটে, তার মুখে ঢাকাইয়া ভাষা শুনে তিনি প্রতিবাদ করেন,

‘যামু খামু তুই কোথায় পেয়েছিস প্রণব?’

চটপট জবাব দেয়,

‘ওই দেশের সবাই তো বলে শুনি। ওই যে রগুড়ে কবি আসলাম সানীর কথা শুনেছ?’

‘সানী ঢাকাইয়া কবি। তার কথা আলাদা। তাই বলে সারা দেশের সবাই তো আর ওই ভাষায় কথা বলে না।’

‘ওরে বাবা! বাংলাদেশ নিয়ে এত কথা জানো তুমি?’

‘কুষ্টিয়া-যশোরের ভাষা শুনেছিস কখনো?’

এতক্ষণে আমার বুকের মধ্যে অব্যাখ্যেয় এক অনুভূতির ঢেউ ওঠে। আমি শেকড় ছোঁয়া টান অনুভব করি। আমাদের ওই তল্লাটের আর কোনো কবি সাহিত্যিক বর্তমান এ-দলে নেই। আমিই একা দলছুট মানুষ, মেহেরপুর থেকে দর্শনা হয়ে বর্ডার টপকে চলে আসি, আবার শেয়ালদা থেকে গেদে লোকাল ধরে ফিরে যাই একা একা। গত দু’বছরে ভাস্বতীদির সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে, এমন কি তার সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’র একটি কপিতে নাম লিখে আমাকে উপহার দিয়েছেন, কিন্তু কখনো জানতে চাননি-বাংলাদেশের কোন জেলা থেকে আমি এসেছি, কোথায় আমার বাড়িঘর, অন্যদের চেয়ে আমার মুখের ভাষা একটু অন্যরকম কেন, কিছুই তিনি শুধাননি।

বাংলাদেশের মানুষ পেলেই তার সঙ্গে নানান কথায় সখ্য গড়ে তোলেন, সবাই সেটা জানে, কলকাতার অনেকে তা নিয়ে অভব্য তামাশাও করে, তিনি গায়ে মাখেন না। বরং প্রণবকে তিনি গায়ে পড়ে বাংলাদেশের ভাষা-বৈচিত্র্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য এবং মাধুর্য বিষয়ক ছবক দেন। বেশ পেছনের সিট থেকে কে একজন কুটুশ করে বেসুরো গলায় বলে ওঠে, ‘চালাইয়া যান দিদি। চাটগাঁইয়া কিংবা সিলেটী ভাষা হুনছেননি?’

ভাস্বতী গোস্বামীর ধৈর্যের কাঁটা একচুলও নড়ে না। এমন কটাক্ষের সামনেও দিব্যি হাসিমুখে বলতে পারেন-‘আঞ্চলিকতার বৈচিত্র্য যতই থাক, ভাষা কিন্তু একটাই-বাংলা ভাষা। সত্যি ভাষা-আন্দোলন ওদেরই সাজে, আমাদের নয়।’

কবি ও কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরা এতক্ষণ পর নড়েচড়ে বসেন। এ বছর তিনি কথাসাহিত্যে আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন, প্রগলভতা তাকে মানায় না। সেই তিনিও চলন্ত বাসের চলমান এই আলোচনায় ঢুকে পড়েন,

‘এ নিয়ে একটি সেমিনার পেপার রেডি করে ফ্যালো তো ভাস্বতী, জীবনানন্দ সভাগৃহে হয়ে যাক সেমিনার।’

সুবোধ গাঙ্গুলী প্রস্তাব দেন,

‘সামনের ফেব্রুয়ারিতেই হোক তাহলে!’

ভাস্বতী গোস্বামী উঠে দাঁড়িয়ে জোর দিয়ে জানান,

‘আমি কিন্তু সিরিয়াসলি নিচ্ছি নলিনীদা। প্রবন্ধ আমি লিখব ঠিকই, আমার একটা দাবি মানতে হবে।’

‘এর মধ্যে আবার দাবি কিসের?’ সুবোধ গাঙ্গুলী প্রশ্ন করেন।

‘বাংলাদেশ থেকে আনিসুজ্জামান স্যারকে চিফ গেস্ট করে আনতে হবে।’ ভাস্বতী ডানে বামে তাকিয়ে সমর্থন খোঁজেন-‘কেমন হবে বলুন তো!’

সবার আগে প্রতিক্রিয়া জানায় প্রণব,

‘আবারও সেই বাংলাদেশ! আচ্ছা বাংলাদেশের প্রতি তোমার এত পক্ষপাত কেন দিদি?’

‘কথা হচ্ছে ভাষা-আন্দোলন নিয়ে, সবার আগে বাংলাদেশের নাম তো আসবেই। এখানে পক্ষপাতের কিছু নেই তো! গোটা পৃথিবীকে এরা জানিয়ে দিয়েছে-মাতৃভাষার অধিকার কাকে বলে। জন্মগত অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না, হ্যাঁ।’

নলিনী বেরা সহাস্যমুখে জানান,

‘হবে। তোমার দিয়েই হবে। হাত লাগাও দেখি-প্রবন্ধটা নামিয়ে ফ্যালো তো!’

‘কিন্তু আনিস স্যারের ব্যাপারটা!’

‘জানো তো-ফেব্রুয়ারি এলে ওঁরা খুব ব্যস্ত থাকেন। কথা বলে দেখতে হবে-সময় দিতে পারবেন কি না।’

সুবোধ গাঙ্গুলী টিপ্পনি কাটেন,

‘ভারত-সরকার তাকে পদ্মশ্রী পদ্মভূষণ দেবে, সেই তিনি আমাদের একটু সময় দেবেন না কেন!’

প্রণব আরেক কাঠি শুধরে দেয়,

‘জন্মসূত্রে তিনি তো আসলে ভারতীয়ই। আমাদের ডাক ফেলবেন কী করে!’

‘তুই কিন্তু সাবধান প্রণব!’ ভাস্বতী সহসা ধমকে ওঠেন, ‘তোর কথায় কেমন যেন এনআরসি-বিরোধী গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।’

‘অ, থাকো তো দিল্লিতে, মাথার মধ্যে কিলবিল করছে এনআরসির পোকা!’

‘দিল্লিতে থাকার খোঁটা দিস্নে তো ভাই। দেশের রাজধানী দিল্লি। তুইও থাকতে পারিস সেখানে! একটানা দিল্লিতে বাস করলে তবে টের পাবি-বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত রহস্যটা কী!’

বলা নেই কওয়া নেই আমার পাশের সিট থেকে বাংলাদেশের তরুণ কবি ইমরান হাবিব উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে,

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়/ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়।’

 সহসা বাসের ভেতরের পরিবেশটাই পাল্টে যায়। সামনে-পেছনে, ডানে-বাসে সব আড্ডা থেমে যায়। ইমরানের কবিতা কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনুক আর না-ই শুনুক, এই এক গানে সবাইকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়; কিন্তু খেয়ালী কবি ইমরান হাবিব কী ভেবে যেন দুম করে ব্রেক কষে, মুখের দুলাইন গেয়েই গান থামিয়ে দেয়। শ্রোতা-সাধারণ তা মানবে না, জোর দাবি জানায় গানের জন্য। ইমরান নয়, ওই গানেরই বাকি অংশ শুরু করেন সন্তোষ ঢালী। পেশায় অধ্যাপক, স্বভাবে বাউন্ডুলে বাউল, হলদিয়ার মঞ্চেও লোকগীতি শুনিয়ে দর্শক মাতিয়েছিলেন, সেই সন্তোষদা দুই সারি যাত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডান হাত তুলে গেয়ে ওঠেন-‘কইতো যাহা আমার দাদায়, কইছে তাহা আমার বাবায় এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি অন্য ভাষা শোভা পায়?’ কে বলবে ক্লাসঘরের গুরুগম্ভীর অধ্যাপক গোঁফদাড়ি আচ্ছাদিত এই মানুষটি! ‘বাংলাদেশের বয়াতিরা নাইচা নাইচা কেমন গায়’, তা সবার চোখের সামনে দৃশ্যমান করে তুলতে নিজেই কোমার দুলিয়ে নাচতে থাকেন!

কবি নলিনী বেরা আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে বলেন,

‘কেমন দৃঢ় প্রত্যয় দেখেছ-এই জানের বদল রাখুমরে ভাই বাপ-দাদার জবানের মান!’

গান থামিয়ে অধ্যাপক সন্তোষ ঢালী জোর দিয়ে বলেন,

‘বাপ-দাদার জবানের মান আমরা রেখেছি। আর সেই পথ ধরেই স্বাধীনতা পেয়েছি। এই জন্য আমাদের একুশের সাহিত্য আছে, মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য আছে; বাঙালি হয়েও এমন কিন্তু আপনাদের নেই দাদা।’

ভাস্বতীয় গোস্বামী বিতর্ক এড়াতে এগিয়ে আসেন,

‘বাংলাদেশের সাহিত্য এসব ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগ তাদের সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, সেটাও মানতে হবে।’

প্রণব আবার টিপ্পনি কাটে,

‘বাংলাদেশ স্টাডিজ নিয়ে তুমি পিএইচডি করছ না কেন দিদি?’

‘করব করব, বুড়ো বয়সে একটা কিছু করে ফেলব দেখিস।’ ভাস্বতী বলেন, ‘তখন এই দিদির কান্ড দেখে চোখ উল্টে তাকিয়ে থাকবি, হ্যাঁ।’

‘তাই নাকি! তাহলে দেরি করছ কেন?’

‘মানুষ কেন ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয় উন্মুল হয়, তাই নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি, বুঝেছিস?’

‘অমা তোমরাও কি তবে ঘটি ছিলে দিদি? নাকি বাঙাল?’

ভাস্বতী গোস্বামীর মন খারাপ হয়ে যায়। মুখ কালো করে বসে থাকেন। এ সময় সুধীর মিত্র বলেন,

‘অ্যাদ্দিন পর ঘটি-ফটি শুনলে কান জ্বালা করে ভাই। ও সব প্রসঙ্গ থাক। আমার তো চৌদ্দপুরুষের কেউ নেই বাংলাদেশে। তবু বাঙালির দেশ বাংলাদেশ শুনলেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।’

বামপাশ থেকে এক ভদ্রলোক মজা করেন বেশ,

‘এ আপনার বুকের ব্যামো দাদা। সময় খারাপ। চিকিৎসা করান।’

এতক্ষণ পর নিজের সিট থেকে উঠে এসে প্রণব পাল দাঁড়ায় ভাস্বতী গোস্বামীর সামনে। হাতজোড় করে অনুনয় করে,

‘দুঃখিত দিদি। তুমি কি আমার উপরে রাগ করলে?’

‘নাহ।’ ছোট্ট একটুখানি উত্তর দিয়ে চুপ করে থাকেন ভাস্বতী। প্রণব জানায়,

‘তুমি কাজ শুরু কর দিদি, আমি তোমার সঙ্গে আছি।’

চোখ তুলে তাকান ভাস্বতী। আস্তে করে বলেন,

‘অনেকদিন থেকে আমি একটা গ্রাম খুঁজি মনে মনে।’

‘বাংলাদেশের গ্রাম? কী নাম বলো তো! আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন আছে ফরিদপুরে। তারা নিশ্চয় চিনতে পারবে।’

ভাস্বতী গোস্বামীর চোখের তারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি ঘোষণা করেন,

‘গ্রামের নাম কার্পাসডাঙ্গা; কিন্তু সে তো ফরিদপুরের ওদিকে নয়।’

বিকট শব্দে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে আমাদের বাস এসে থামে রাস্তার ধারে এক সস্তা রেস্টুরেন্টের সামনে। পনের মিনিটের চা-বিরতি। অগ্রবর্তী বাসটিও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই বাসের যাত্রীরা আড়মোড়া ভেঙে নেমে আসে বাস থেকে। মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের অদর্শনেই অস্থির সবাই। কবি শ্যামলকান্তি দাশ সবার খোঁজখবর নেন। শুক্লা বউদিও আছেন তার পাশে। উত্তম-সুচিত্রার জুটিকেও হার মানায়। বাঁধন কখনো আলগা হয় না।

রফিকুল হক দাদুভাই। পঁচাশিতে পা দেওয়া যুবক। প্রাণের পেয়ালা তার সর্বদা উপচে পড়ে আনন্দে। দেখে মনে হয়-দুঃখ কাকে বলে তিনি তা মোটেই জানেন না। চা-বিরতির পর সেই দাদুভাই লাফিয়ে আমাদের বাসে উঠে ঘোষণা দেন-বাকি পথ তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। এ-ঘোষণায় সবাই খুশি। এখন তাহলে ছড়ার ছররা চলবে। বাব্বা! বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি। ছড়ার পর ছড়া, ছড়ার ঘোড়া চলে টগ্বগিয়ে; কিন্তু প্রণব এবার বাদ সাধে সেই ছড়াপ্রবাহে, হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলে,

‘দাদুভাই, আপনি তো বাংলাদেশের প্রবীণ বটবৃক্ষ, সাংবাদিকতারও দিকপাল, আপনি কি বলতে পারেন-কার্পাসডাঙ্গা গ্রামটা কোথায়?’

‘কী নাম?’ দাদুভাই চোখ গোল করে তাকান।

‘প্রণবকুমার পাল।’

‘ভারি তো জঞ্জাল’ ‘গ্রামের নামটি কী বললে?’

‘কার্পাসডাঙ্গা।’

আমার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করে। ভাস্বতীদি চোখমুখ লাল করে প্রণবের দিকে তাকায়, বলেই ফ্যালে-‘কে বলেছে তোকে এই প্রশ্ন করতে?’

‘কার্পাসডাঙ্গা নামের গ্রামটিকে খুঁজবার প্রেক্ষাপট শুনেই দাদুভাই ওই নাম দিয়ে একটি ছড়া বলে যান গড়গড় করে। তারপর দাবি করেন, বাংলাদেশের যে-কোনো গ্রামেরই নাম হতে পারে কার্পাসডাঙ্গা। কার্পাস ফোটে না কোন গ্রামে? যে-কোনো একটি গ্রামকে ধরে নিয়ে গবেষণা শুরুর পরামর্শ দেন ভাস্বতী গোস্বামীকে।

‘যে-কোনো গ্রাম!’ ভাস্বতী গোস্বামী খুঁতখুঁত করে, ‘পিসিমার মুখে শুনেছি সে-গ্রামে নীলচাষ হতো, কবে নাকি নীলবিদ্রোহ হয়েছিল!’

আমি চিৎকার করে বলতে চাই সেই কার্পাসডাঙ্গা আমি চিনি, সেখানে আমার বন্ধুর বাড়ি; বলতে চাই, কিন্তু কণ্ঠস্বর স্ফুট হয় না। আমার আগেই সারামুখে কার্পাসফাটা হাসি ছড়িয়ে দাদুভাই বলেন,

‘তাহলে তো হয়েই গেল। দীনবন্ধু মিত্রের পোস্টমাস্টারি এলাকাটা খুঁজে দ্যাখো গে ঠিক পেয়ে যাবে!’

নিজের উপরে ভয়ানক রাগ হয় আমার। ভাস্বতীদি আরো আগে আমাকে কেন যে শুধাননি! হয়তো আমার উপরে আস্থা পাননি। তার এত আবেগের কার্পাসডাঙ্গার খবর আছে আমার কাছে, অথচ আমাদের ছাড়া বাংলাদেশের আরও অনেক কবির কাছেই জানতে চেয়েছেন। কী ভেবে দাদুভাই আবার ছড়া প্রসঙ্গে আসেন।

‘দু’লাইনের একটি ছড়া শোনো, নীলচাষের ছড়া।’

আমরা সবাই কান খাড়া করি। কবি বলেন, ‘জমির শত্রু নীল, আর চাষির শত্রু হিল।’

আমাদের চমকে দিয়ে প্রশ্ন করেন,

‘কে এই হিল? কারো জানা আছে জেম্স হিলের নাম?’

আমরা পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। এরই মধ্যে ভাস্বতীদি দুম করে বলেন,

‘এ ছড়া আমি পিসিমার মুখে শুনেছি অনেক আগে।’

‘পিসিমা! বাড়ি কোথায় পিসিমার?’

‘পিসিমার মুখেই তো কার্পাসডাঙ্গার গল্প শুনেছি। ভৈরব নদীর দুপারে নীল চাষ, চাষিদের ওপরে নির্যাতন, তারপর একটি নীলকুঠিতে অগ্নিসংযোগ........।’

দাদুভাই একেবারে নিশ্চিত কণ্ঠে জানান,

‘অত্যাচারী জেম্স হিল তাহলে ওই তল্লাটেই নীলকর সাহেব ছিল।’

এতক্ষণে আমি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করি,

‘ওই তল্লাট মানে বেশি দূর নয় দাদুভাই।’ শিয়ালদা থেকে গেদে লোকাল ধরে দর্শনা, তার ওপারেই কার্পাসডাঙ্গা। আমি ওই তল্লাটেরই মানুষ। আরো অনেক নীলের ছড়া প্রচলিত আছে আমাদের এলাকায় লোকজনের মুখে মুখে।’

ছড়ার মানুষ রফিকুল হক দাদুভাই উচ্ছসিত কণ্ঠে বলেন,

‘ছড়ার কেমন শক্তি দেখেছ-ইতিহাসকেও বুকের মধ্যে ধরে রাখে।’

দাদুভাই ছড়া নিয়ে আরও অনেক কথা বলতে থাকেন। কিন্তু ভাস্বতী গোস্বামীর মনোযোগ তখন আমার দিকে। ড্যাবডেবে চোখে আমাকে নতুন করে দেখেন। এক সময় আমারই অস্বস্তি হয়, চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে তাকাই। কিন্তু ভাস্বতীদি ভূতগ্রস্ত মানুষের মতো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে প্রস্তাব দেন,

‘তোমাকে একবার ছুঁয়ে দেখব ভাই!’

আমি ভেতরে বাইরে কেঁপে উঠি। অনুচ্চস্বরে জানাই,

‘কিন্তু আমার বাড়ি তো কার্পাসডাঙ্গা নয়, আরো খানিকটা দূরে।’

‘আহা, তুমি তো চেনো ঠিকই সেই সোনার কার্পাসডাঙ্গা।’

আমাকে কবুল করতেই হয়, সেই গ্রাম আমি যথেষ্ট ভালো চিনি, আমি কার্পাসডাঙ্গা স্কুলেরই ছাত্র ছিলাম। সেই গ্রামে এখনো অনেক বন্ধু আছে। রাস্তাঘাট সব আমার চেনা।

ভাস্বতীদির চোখেমুখে অপার বিস্ময়। চলন্ত বাসের মধ্যে তিনি যে দৃশ্যের অবতারণা করেন, তা অনেকের চোখে পড়ার মতো। নিজের সিট ছেড়ে এসে সত্যিই আমার দু’হাত জাপ্টে ধরেন, আমার সিটের সহযাত্রী শুকুর খানকে তুলে দিয়ে পাশাপাশি বসে পড়েন। এইবার তার বেশ স্বস্তি হয়। আমার ডান হাতের আঙ্গুল ধরে টান দিয়ে বলেন,

‘তুমি যে আমার ভাই, সেটা মানছ তো!’

‘কার্পাসডাঙ্গায় কি আপনার পূর্বপুরুষের বাস ছিল?’ আমি জানতে চাই।

‘চৌদ্দপুরুষের বাস ছিল তাই শুনেছি। আমার জন্ম এপারেই। কিন্তু আমাকে তুমি আপনি আপনি করছ কেন? দিদিকে কেউ আপনি বলে?’

আমি আর কী বলব! আমাদের বৃত্ত ঘিরে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সাতচল্লিশের দেশ ভাগ, র‌্যাডক্লিপের নিষ্ঠুর ছুরি এবং বিরামহীন রক্তক্ষরণ। সবশেষে কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে একই বাড়ির উঠোন কিংবা হেঁসেল দ্বিখণ্ডিত করেছে সেই সব দৃষ্টান্তও তুলে আনেন কেউ কেউ, হৃৎপিন্ডের ঘাই আমি টের পাই, কিন্তু মুখের মানচিত্রে সে বেদনার ছাপ পড়তে দিই না। আমি বরং ভাস্বতীদিকে বুঝতে চেষ্টা করি।

বাইরে আলো ঝলমলে রোদ। বাসের জানালা খুলে দিতেই হাওয়া এসে ঢুকে পড়ে হুড়মুড়িয়ে। কবি ভাস্বতী গোস্বামীরও তখন বুকের কপাট হাট করে খোলা। কথার পিঠে কথা এসে ধাক্কা মারে। ভাস্বতীর পিতৃ এবং মাতৃকূলে একমাত্র পিসিমা ছাড়া আজ আর কেউ বেঁচে নেই। মাকে হারিয়েছে তার জন্মমুহূর্তে। বাল্য-বিধবা পিসি মাতৃহারা ভ্রাতৃষ্পুত্রীকে মানুষ করার সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেও ভাইটিকে আর সংসারী করতে পারেননি। একমাত্র সেই ভাইটি বছর তিনেক আগে আকস্মিকভাবে মারা যাবার পর থেকে তার দিবারাত্রির গাওনা হয়েছে-সে বাপের ভিটেয় চলে যাবে। এতদিন পর কে আছে সেখানে, সেই কার্পাসডাঙ্গায়? কার কাছে যাবে, কে দেখবে তাকে এই বার্ধক্যে? না, কোনো যুক্তি মানবে না, কারো কথা শুনবে না। জন্মভিটেই গিয়ে সে চোখ বুজতে চায়, এই তার অন্তিম বাসনা।

কোথায় কার্পাসডাঙ্গা, কেমন তার আকাশ-বাতাস মানুষজন, কিছুই জানা নেই ভাস্বতীর। আশৈশব শুধু গল্প শুনেছে পিসিমার মুখে। আমাকে দেখার পর সেই গল্পের সঙ্গে সবকিছু মিলিয়ে নেবার সাধ জাগে তার। কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল, কোনোটি বাক্যে স্ফুরিত হয়, কোনোটি চোখমুখে উদ্ভাসিত হয়-মল্লিকবাড়ির শানবাঁধানো পুকুরঘাট আছে? এখনো সেখানে লালপদ্ম নীলপদ্ম ফোটে? বাড়ির দক্ষিণে জোড়া তালগাছ আছে? তার পাশে নাটমন্দির? এ সব প্রশ্নের কী উত্তর দেব আমি?সত্যের ভার কতটা সইতে পারবেন এই ভদ্র মহিলা কিংবা তার পিসিমা, সে আমি নির্ণয় করতে পারি না। ভাস্বতীদি আমার বাম হাত ছুঁয়ে প্রশ্ন করে,

‘আমাকে একদিন গগনচিল চিনিয়ে দেবে ভাই?’ উত্তর দিতে আমার বিলম্ব হলেও তার সহ্য হয় না। তিনি আছেন কথার ঘোরে- ‘পিসিমা বলে কার্পাসডাঙ্গার আকাশে গগনচিলের উড়াউড়ি দেখা যায়, লক্ষ্মীপেঁচার ডাক শোনা যায়, সন্ধ্যেবেলা ‘তুইথুলি’ পক্ষী এসে ভয় দেখায়। আমাকে একদিন দেখাবে এসব?’

ঘাড়-মাথা দুলিয়ে আমি কোনো রকমে উত্তর দিই। এরই মধ্যে রবীন্দ্রসদনে এসে যে-যার মতো ছড়িয়ে পড়ি। আমি শেয়ালদা এসে গেদে লোকাল ধরে সীমান্তে পৌঁছাই বিকেল নাগাদ। চেকপোস্টের নিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে যখন পা রাখি, তখন সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। কে যেন আমার ভেতর থেকে গেয়ে ওঠে-‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে.........।’ আমি ভয়ে ভারতীয় সীমান্তের দিকে আর তাকাতে পারি না। মনে হয় ওইখানে ওই পিলারের আড়ালে পিসিমা দাঁড়িয়ে বালিকা ভাস্বতীকে আঙ্গুল তুলে দেখাচ্ছে এপারের আকাশের গায়ে গগনচিলের ডানা ঝাপটানি। দু’জনই ধ্যানমগ্ন ওই লক্ষ্যে। কী কাজ তাদের ধ্যান ভাঙিয়ে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh