অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও খননকাজে ফাঁকি

অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিলের নদীগুলো

পানিশূন্য গুমানী নদী ও বড়াল নদের সংযোগস্থলে চলছে বোরো ধান চাষ। 	ছবি : সংগৃহীত

পানিশূন্য গুমানী নদী ও বড়াল নদের সংযোগস্থলে চলছে বোরো ধান চাষ। ছবি : সংগৃহীত

প্রবাদ আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম।’ চলনবিল- যার নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে, থইথই জলে উথাল-পাতাল ঢেউয়ের কথা ভেবে। দিন দিনে সেই ভাবনা ফিকে হয়ে আসছে। পুরনো প্রবাদও পাল্টে যেতে শুরু করেছে। জলাশয়কে কেন্দ্র করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও অনিয়মের যত ধরনের উদাহরণ আছে, সবই যদি এক জায়গার মধ্যে দেখতে হলে, যেতে হবে চলনবিল। 

উন্নয়নের বিষবৃক্ষ থেকে কী অমৃত ফল আসছে, তা দেখতে হলেও যেতে হবে চলনবিলে। সেখানে গেলে শোনা যাবে মরতে বসা চলনবিলের আর্তনাদ। দেখা যাবে, দখল-দূষণে কীভাবে অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিলের প্রায় ২২টি নদী।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিলের নাম চলনবিল। রাজশাহী বিভাগের ৬ জেলার ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিল চলনবিলের অবস্থান। বর্তমানে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ- এই তিন জেলার ১০টি উপজেলার, ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বৃহত্তর চলনবিল। বিলে ছিল- ২১টি নদ-নদী, ৭১টি নালা-খাল ও ৯৩টি ছোট বিল।

মাঝিদের কাছে গল্প শোনা যায়- এ বিলের বুকে প্রমোদতরি ভাসিয়ে একসময় রাজা-বাদশারা ক্লান্তি ঝড়াতেন। পর্যটকরা চলনবিলের বিশালতা দেখে অভিভূত হতেন। লেখকেরা রচনা করেছেন বিভিন্ন কাহিনি। চলনবিলের মাছে ভোজ হয়েছে অভিজাত বাড়িতে। কালের বিবর্তে এসবের অনেকটাই এখন বিবর্ণ। এক সময় যে বিলে প্রায় আধ হাত মাপের সুস্বাদু কই মাছ আর তেলেভরা বাচা মাছ মিলত, তা এখন অতীতের সুখ-স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বিলের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এর বিশালতা। দখল-দূষণে মরা খালে পরিণত হয়েছে দেশের বৃহত্তম চলনবিলের নদ-নদীগুলো। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে বিলের বিভিন্ন খাল। ভূউপরিস্থ পানি না থাকায় নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে বিলুপ্ত হতে বসেছে বিলের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি আবাদ।

অপরিকল্পিত উন্নয়নে কমছে আয়তন

ইম্পিরিয়াল গেজটিয়ার অব ইন্ডিয়ার তথ্য মতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এই আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। হিসাব অনুযায়ী, ৮২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ৪০৮ বর্গমাইল। তথ্য মতে, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। এই হিসাবে ১৯০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ১৯৯ বর্গকিলোমিটার। প্রতিবছর গড়ে বিলের আয়তন কমছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই চলনবিলের আয়তন কমছে। ১৯৯৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ১৫ বছরেই পাকা সড়ক হয়েছে ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার, সেতু ১১৩টি, কালভার্ট ৮৫৫টি, গ্রোথ সেন্টার ৯০টি ও স্লুইসগেট ২১টি। এর অধিকাংশই হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির তথ্যমতে, ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মিত হলে চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ওই রেললাইন চলনবিলকে দ্বিখ-িত করে। ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হয়। ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ী-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। ২০০২ সালে এর বুকচিরে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক। ফলে ছোট হতে হতে এখন মরতে বসেছে চলনবিল। ২০০ বছরের কম সময়ে আট ভাগের সাত ভাগই নাই হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে কমেছে মাছ আর পানি। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, ১৯৮২ সালেও বিল থেকে মাছ পাওয়া গেছে ২৭ হাজার টন, ২০০৬ সালে তা কমে হয়েছে ১২ হাজার টন। ২৫ বছরে ৭২ শতাংশ কমেছে। 

বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, সংযুক্ত নালা ও খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, চাষ করা মাছ উৎপাদন ও জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণেই প্রাকৃতিক মাছ কমছে বলে মনে করেন পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ।

প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অনেকেই বিলে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। অন্যদিকে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা জাল দলিল করে দখলে নিয়েছে বিলের কয়েক হাজার একর খাসজমি। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড থেকে জানা গেছে, চলনবিলের তিনটি জেলার বেশিরভাগ খাসজমি ও জলাশয় এখন প্রভাবশালীদের দখলে।

বিল এলাকার বাসিন্দারা বলেন, একসময় সারা বছরই বিলে পানি থাকত। এখন শুকনো মৌসুমে কোথাও প্রায় পানি নেই। পাঁচ-ছয় বছর আগেও ২৭-২৮ ফুট নিচে পানি মিলত, এখন ১০০ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। 

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রথম এই বিলে পানি কমতে থাকে। ১৯৮৫ সালে বড়াল নদের উৎসমুখ রাজশাহীর চারঘাটে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বড়াল নদ পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এ সময় থেকে চলনবিলও পানিশূন্য হতে শুরু করে। একদিকে মৎস্যসম্পদ বিলুপ্ত ও অন্যদিকে সেচের পানি না পেয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

২২ নদী ভরাট, খনন কাজে শুভঙ্করের ফাঁকি  

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে বড়াল নদ মরা খালে পরিণত হয়েছে। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। প্রায় ৬৬ হাজার ২৪০ জন কৃষক এসব খাল ও নালা থেকে সেচের পানি পেতেন। বর্তমানে ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। যা মোট নালা ও খালের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাকি ৪২ কিলোমিটার নালা ও খাল পুনরায় খনন করে নাব্যতা ফেরানোর কাজ চলছে। সেই কাজেও হয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

চলনবিলের বুক চিরে প্রবহমান এক সময়ের উত্তাল গোমতি এখন দখল আর দূষণের কবলে। বর্ষা মৌসুমে কিছু ছোট নৌকা চলাচল করলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকে জেগে ওঠে চর। তবে নদীর আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে খনন কাজ করা হয়েছে। নদী খনন করা হয়েছে ঠিকই; কিন্তু নাব্য ফেরেনি। খনন করা মাটি ভেঙে আবার ভরাট হয়েছে নদী। শুধু গোমতি নদী নয়, খনন কাজ চলছে চলনবিলের আত্রাই ও গুমানী তুলশীগঙ্গা নদীতেও। প্রতিটি নদী খননেই অনিয়ম করা হয়েছে। কোনো নদীই নিয়ম মোতাবেক খনন করা হয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, খনন করা মাটি নদী তীর হতে ১ হাজার মিটার দূরে রাখার কথা। অথচ খননের মাটি নদীর দুই পাশে রাখা হয়েছে। সেই মাটি আবার নদীতেই চলে যাচ্ছে। মাটি ভরাট হয়ে আবার ভরাট হচ্ছে নদী। তীর ঘেঁষে মাটির বাঁধ তৈরি হওয়ায় সংকুচিত হয়েছে নদী। নদী খননে এমন দৃশ্যমান অনিয়ম করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। শুধু খননে অনিয়ম নয়, দখল ও দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিলের এমন প্রায় ২২টি নদী। এসব নদীর বুকে এখন পুকুরসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর চারঘাট থেকে উৎপত্তি হয়ে চলনবিলের মধ্য দিয়ে মুসা খাঁ, নন্দকুজা, চিকনাইসহ বাঘাবাড়ির হুরাসাগর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে বড়াল নদী। প্রমত্তা বড়ালের চারঘাট এলাকায় ৪শ’ থেকে ৬শ’ ফুট নদী দখল করে দুটি স্থাপনা নির্মাণসহ বড়াই গ্রামের আটঘরিয়া থেকে বনপাড়া হয়ে জোনাইল বাজার পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার নদী দখল করে সরকারি অফিসসহ ব্যক্তিমালিকানায় বহু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, তুলসি চেঁচিয়া, তুলশীগঙ্গা, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গাসহ প্রায় ২২টি নদীর দুই পাড় দখল করে বসতি নির্মাণ অব্যাহত আছে। ১৮টি খালের মধ্যে নবীর হাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল, গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্গুগুয়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর অস্তিত্ব হারাতে চলছে।

জানা গেছে, চলনবিলের তিনটি নদী কমপক্ষে ৯৭ ফুট (৩০ মিটার) প্রস্থ এবং ৮ ফুট (২.৫ মিটার) গভীর করে খনন করার কথা; কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই করা হয়নি। আত্রাই নদীর ভক্সঘুড়ার এরশাদ নগর থেকে গুরুদাসপুর রাবারড্যাম পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার খনন কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আত্রাই নদীর খনন কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংকে ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে গুমানি নদীর খনন কাজ করেছেন কারাগারে থাকা ক্যাসিনো সাহেদ।

চলনবিল নিয়ে গবেষণা করেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, চলনবিল বাঁচাতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো অপসারণ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকৃতিবান্ধব হতে হবে। বিলের মধ্যে পুকুর খোঁড়া বন্ধ করতে হবে। ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদী-নালা-খাল খনন করে মাটির ওপরের পানির স্তর স্বাভাবিক করতে হবে। পরিকল্পনা, ভূমি, কৃষি, পানিসম্পদ, নৌ, স্থানীয় সরকার, মৎস্য ও পরিবেশ- সব মন্ত্রণালয় মিলে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। 

স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, একদিনে চলনবিলের এ অবস্থা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চলনবিল রক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলনবিল প্রকল্প দিয়েছে। তবে এই বিলের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি জনসাধারণকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তবেই চলনবিলের মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি ও রক্ষা পাবে।

বিষয় : চলনবিল

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh