জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মীজানুর রহমান- নিভৃতে আলো জ্বেলে রেখে গেছেন

মীজানুর রহমান এদেশের সাহিত্যবোদ্ধা মহলে একটি চিরউজ্জ্বল শিখা। সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পবিষয়ক ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র সম্পাদক এবং লেখক মীজানুর রহমানকে কবি শামসুর রাহমান একটি যথার্থ অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন- ‘সম্পাদকদের সম্পাদক’। বাংলা সাহিত্যের এই মনীষী জন্মেছিলেন বিক্রমপুরের টোল বাসাইল গ্রামে ১৯৩১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ইছামতি নদীর তীরে বেড়ে ওঠা এই সংশপ্তক মেধাবী ব্যক্তিত্ব বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন বুদ্ধিদীপ্ত সম্পাদকীয়, তথ্যসমৃদ্ধ স্মৃতিচারণ রচনার জনক।

মহৎপ্রাণ মীজানুর রহমান তার ত্রৈমাসিক পত্রিকাটির সম্পাদনায় কেন্দ্রীভূত হন সাহিত্য সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বোধ থেকেই। তবে পত্রিকার বিশেষ লক্ষ্য পূরণের আগেই ইহজগত ছাড়েন মীজানুর রহমান, ২০০৬ সালের ২৬ জুন। বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গ প্রকাশমানের কোনো পত্রিকার কথা বলতে গেলেই মাথায় চলে আসে ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’। ইতোপূর্বে বাংলার সাহিত্য পত্রিকা সমূহের ইতিহাসে বিদেশি ভাষার দৃষ্টান্ত ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব বিবেচনাবোধ থেকে মীজানুর রহমান তার নিজের নামেই পত্রিকার নামকরণ করেন।

১৯৪৬ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করলেন একটি হাতে লিখিত পত্রিকা ‘মুয়াজ্জিন’, সেই থেকেই সম্পাদক জীবনের যাত্রা শুরু হয় মীজানুর রহমানের। তারপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের দাঙ্গার সময় পরিবারের সঙ্গে এপার বাংলায় চলে আসেন তিনি।

সর্ব সংকটেও তার মননশীলতার বীজের অঙ্কুরিত হওয়া ব্যাহত হয়নি কখনো। এপার বাংলায় এসে তিনি ভর্তি হলেন পুরান ঢাকার আরমানীটোলা স্কুলে এবং ধীরে ধীরে চালিয়ে যেতে লাগলেন পত্রিকার সম্পাদনাবিষয়ক পরিকল্পনা। এভাবে এদেশের প্রথম কিশোর মাসিক পত্রিকা ‘ঝংকার’ তিনি প্রকাশ করলেন ১৯৪৯ সালে, ‘মুয়াজ্জিন’-এর পরিবর্তিত রূপ হিসেবে। মাধ্যমিকের পর তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কলা বিভাগে (তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজ); কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বর্ণান্ধতার কারণে তিনি সেখানে অধ্যয়ন চালিয়ে যেতে পারেননি। রম্যরচনা ও বিনোদন, সাহিত্যকেন্দ্রিক পত্রিকা ‘রূপছায়া’ তিনি প্রকাশ করলেন ১৯৫১ সালে। দীর্ঘ দশ বছর তিনি এটির সম্পাদনা বহাল রেখেছিলেন। আর এই রূপছায়া পেয়েছিল পূর্ববঙ্গের পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা। তবে এইসমস্ত পত্রিকা পেরিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পত্রিকাটি স্বর্ণাক্ষরের পত্রিকা হয়ে উঠেছিল মীজানুর রহমানের অঙ্গুলী স্পর্শে, সেই পত্রিকাটি ছিল- ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’।

১৯৮৩ সাল থাকে এই পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু হয় এবং নিরলসভাবে এই পত্রিকাটি নিয়ে কাজ করে গেছেন এই মানুষটি। শারীরিক নানান অসুস্থতা তাকে জেঁকে ধরেছে বারবার; কিন্তু, এক দৃঢ় সম্পাদকের মতই দৃঢ়মানস মীজানুর রহমান নিজের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে কাজটি প্রেম দিয়ে করে গেছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও ষাটের দশকের শিল্পান্দোলনের পুরোধা ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তার রচিত গ্রন্থ ‘ভালোবাসার সাম্পান’-এ মীজানুর রহমানকে নিয়ে বলেন- ‘সত্যি সত্যি কতটা প্রাণশক্তি, নিমগ্নতা, নিষ্ঠা আর অঙ্গিকার যে ছিল, মীজান ভাইয়ের মধ্যে তা টের পাওয়া গেল- যখন তিনি তার সম্পাদনায় ‘মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’ বের করলেন। দীর্ঘ বিশ বছর ধরে পত্রিকাটি প্রায় একটানা চালাচ্ছেন তিনি।

উচ্চাঙ্গের এই পত্রিকাটির প্রকাশমান যেমন উঁচু মাপের, তেমনি এর কলেবরও বিপুল। একটি উন্নতমানের স্ট্যান্ডার্ড ম্যাগাজিন বলতে যা বোঝায় পত্রিকাটি তাই।’ হাঁপানি তাকে বারবার কাবু করে ফেলবার চেষ্টা করেছে কিন্তু আত্মশক্তিতে ভরপুর এই মানুষটিকে কাবু করতে পারেনি। আর বরাবর তার কাজের সহযোগীতায় ছিলেন মমতা ও প্রেমের শক্তি নিয়ে তার স্ত্রী নূরজাহান বকশী। প্রতিটি লেখার বারবার প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে সাজানো গোছানো সমস্ত বিষয়েই তিনি সহযোগীতা করতেন।


কেবল একটি গড়পড়তা পত্রিকা করবার জন্য পত্রিকা করেননি মীজানুর রহমান। তার সম্পাদিত ত্রৈমাসিককে তিনি সর্বদাই একটি স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা হিসেবেই তৈরি করবার চেষ্টা করছেন। আর সেই চেষ্টার ফলাফলও পরিলক্ষিত হয়েছে বারবার। তিনি তার পত্রিকায় কেবল সাহিত্যিকদের ক্রিয়েটিভ লেখা নিয়েই কাজ করেননি, বরং ইতিহাসচর্চায় আগ্রহী এবং শিল্পকলাবিদদেরও লেখায় প্রবৃত্ত করিয়েছেন।

যেমন- পটুয়া কামরুল হাসান লিখেছেন ‘আমার স্কেচ ও প্রেমের ভ্রমরেরা’, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ‘আমি ও আমার ছবি’; কামাল উদ্দিন হোসেন ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন ‘গ্রেট মোগল’; আবার সংগীত বিষয়ে ওয়াহিদুল হক লিখেছেন ‘বাংলা সুরে বাংলা গান : বাঙালী গায়?’ অপরদিকে ইফতিখার আহমেদ আলোচনা করেন ‘সত্যের পরাজয়ের সমস্যা’ নিয়ে যা প্রধানত দর্শনের বিষয়। এভাবে লক্ষ্য করা যায়, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, আলী আসগর, দ্বিজেন শর্মা, কলিম খান, মলয় রায়চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুল হালিম, শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ক্ষেত্র গুপ্ত, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, দেবীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, আসাদ চৌধুরী, হায়াৎ মামুদ, রফিক কায়সার, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মোয়াজ্জেম হোসেন, মাহমুদ শাহ কোরেশী, ফরহাদ মজহার, রশিদ হায়দার, শাহাবুদ্দীন আহমদ, বিপ্রদাস বড়ুয়া, সায়ীদ আতিকুল্লাহ, রফিক আজাদ প্রমুখ লেখক মীজানুর রহামনের ত্রৈমাসিক পত্রিকায় লিখেছেন।

মীজানুর রহমানকে যাত্রা করতে হয়েছে নানা ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। তিনি ১৯৬৫ সালে বেতারে যোগ দেন সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে। এরপর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৬৭ সালে কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের সঙ্গে ‘গাঙচিল প্রেস’ নামে একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেও খুব আশাজনক ফল না পাওয়ায়, পরের বছরই আবার প্রেস ছেড়ে চাকরিতে যোগদান করেন। এবার তিনি চাকরি করা শুরু করেন অবজারভার গ্রুপে। আর কিছুদিন পরই মতবিরোধের কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি আবারও নেমে পড়েন তার নিজস্ব বিচরণযোগ্য ভূমি পত্রিকা সম্পাদনায়। শিক্ষক-গবেষক ড. সৈয়দ আজিজুল হক মীজানুর রহমান সংবর্ধনা উৎসব স্মরণিকায় ১৯৯৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে লিখেছিলেন, ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র সম্পাদনা ও প্রকাশ উপলক্ষে তিনি বিশেষভাবে আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছেন। পত্রিকার এমন নামকরণের মধ্যে কেউ কেউ লক্ষ্য করেছেন স্পর্ধা, কেউ দুঃসাহস; আবার কারো কাছে উদ্ভট হাস্যকর মনে হয়েছে, মনে হয়েছে রুচির বিকার। কিন্তু ১৯৮৩ সালে পত্রিকাটি আবির্ভাবের পর এই দীর্ঘকাল তার অব্যাহত জয়যাত্রা এবং সেই সঙ্গে সম্পাদনার গুণগত মান লক্ষ্য করে সমালোচকরাও প্রমাদ গুণেছেন, বাধ্য হয়েছেন ভুল স্বীকারে।’

ধারাবাহিক সংখ্যা আর বিশেষ সংখ্যা মিলিয়ে আশিটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন মীজানুর রহমান জীবিত অবস্থায়। আর এর মাঝে বিশেষ সংখ্যাগুলো উল্লেখযোগ্য- যেমন ‘আহসান হাবীব সংখ্যা’ (১৯৮৫), ‘বৃক্ষ সংখ্যা’ (১৯৮৬), ‘কামরুল হাসান সংখ্যা’ (১৯৮৭), ‘রশীদ চৌধুরী সংখ্যা’ (১৯৮৭-৮৮), ‘পক্ষী সংখ্যা’ (১৯৮৯), ‘বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা’ (১৯৯১), ‘শামসুর রাহমান সংখ্যা’ (১৯৯১), ‘গণিত সংখ্যা’ (দুই খণ্ড, ১৯৯৫), ‘বিদ্যাসাগর সংখ্যা’ (১৯৯৭), ‘নদী সংখ্যা’ (১৯৯৯)। এসবের প্রত্যেকটি সংখ্যায় সম্পাদকের বিচিত্র আগ্রহ ও দক্ষতার ক্ষেত্র ফুটে উঠেছে।

এমন একটা উজ্জ্বলতর সম্পাদকীয় ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এ সময়ের সাহিত্যকালে রুচিশীল এবং মেধাবী সম্পাদক বিরল। গত কয়েক দশকের বাংলা পত্রিকার যে বেহাল দশা তা দক্ষ ও যোগ্য সম্পাদকের অভাবের ফলাফল। এই সংকটের সময়ে মীজানুর রহমানের দিকে তাকালে আমাদের সেই অভাববোধ আরও বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে তার রেখে যাওয়া বিপুল কর্মযজ্ঞ ও কর্মচিন্তা থেকে পেতে পারি নির্দেশনা। অন্তত তার তৈরি করা পত্রিকাটি দেখলে আমরা এগিয়ে যেতে পারি আরও ভবিষ্যতের দিকে- যেখানে আলো পাবো ফের খুঁজে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //