মাছে ভাতে বাঙালি

পৃথিবীর অস্তিত্বের সঙ্গে যেদিন মানবের অস্তিত্ব প্রকাশ পেল সেদিন থেকেই খাদ্য সংগ্রহের ইতিহাস তৈরি হতে থাকল। আদিম মানুষ ছিল একেবারেই প্রকৃতি নির্ভর। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারাটা মানুষের জন্য ছিল এক অনিশ্চিত জীবনযাপন। সে সময় মানুষের খাবার ছিল কাঁচা জীবজন্তুর মাংস, বুনো গাছগাছালি আর ফলমুল। এইসব বুনো গাছগাছালি দিনের পর দিন দেখতে দেখতে চোখে পড়ে কত কী পরিবর্তন। এই পরিবর্তন খেয়াল করতে করতেই একদিন পেয়ে গেল মানুষ তার ফসল। অতঃপর মানুষ শুরু করল ফসলের আবাদ। মানুষ খুঁজে পেল এক নতুন পথের ঠিকানা। সেই কৃষিজীবী মানুষই একদিন খোঁজ পেল ধানের। সেই ধান থেকে হল চাল আর চাল থেকে ভাত। সেই ভাতের কদর বাঙালির খাদ্যাভাসে এমন যে বাঙালি পেল এক চিরন্তন আখ্যা ‘ভেতো বাঙালি’। 

কথায় আছে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ তো সেই ধান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বঙ্গদেশে আমদানি হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গায় ধান চাষ হতো শুকনো মাটিতে। ধারণা করা হয় ভারতবর্ষেই সম্ভবত পানিতে ডোবানো জমিতে প্রথম ধানের চাষ করা হয়েছিল। এ ধরনের চাষ বাংলাদেশের ভৌগোলিক এবং জলবায়ু বিশেষ অনুকূলে ছিল বিধায় কালে কালে ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে। আর ভাত! প্রত্নতাত্ত্বিকদের বক্তব্য অনুসারে তার ইতিহাস ১২ হাজার বছরের। ভাত উৎপত্তির ইতিহাস ভারতবর্ষের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত থেকেও ধারণা পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও খনন অনুসন্ধানে যে সময়কাল নির্ণয় করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ৮৫৫-১৩৮০ এই সময়কালে চালের প্রচলন ছিল। এ রকম নানান গবেষণায় অনুমিত হয় তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে ভাত রান্নাও করা হতো। 

ভাত শব্দটি কীভাবে এলো? বঙ্গীয় শব্দকোষে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ভাত শব্দের উৎস বিশ্লেষণে সংস্কৃত ‘ভক্ত’ ও প্রাকৃত ‘ভন্ত’ শব্দের যোগসূত্র রয়েছে। সেখান থেকেই ভাত শব্দটি এসেছে। ভাত শব্দটি আসলে কীভাবে এসেছে এ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন থাকলেও ভাত যে বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান এ নিয়ে আপতত কোনো দ্বিধা নেই। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহের সমস্ত আচারানুষ্ঠানে ভাতই প্রধান হয়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন নামে ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ সহযোগে। বাঙালি কৃষ্টির রন্ধ্রে রন্ধ্রে রানির মতো বাস ভাতের। 

এ তো গেল ভাতের কথা। ভাতের মতো বাঙালির কৃষ্টির আরেক সখা হলো মাছ। এক পশলা তার কথাও হোক। ভাত আর মাছ এই দুই সখা-সখীকে একসঙ্গে জুড়ে নিয়ে বলা হয় ‘মাছভাত’ বা ‘ভাতমাছ’ আর মাছভাতকে বাঙালির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বলা হয়- ‘মাছেভাতে বাঙালি’। 

মাছভাতে বাঙালি এই বাক্যদ্বয়ে খানিকটা ব্যাঙ্গোক্তি থাকলেও এতে বাঙালির বয়েই গেছে। বরং এ শব্দদ্বয় বাঙালির অত্যন্ত গর্বের, পরিচয়ও বটে। গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের দেশে খেতে বসে ভাতের পাশে ষোড়শ-ব্যঞ্জনে অষ্টপদই মাছের সে কথা তো ইতিহাসই বলেছে। বলছে বাংলার প্রাচীন কবি-সাহিত্যিকরাও। তাঁদের সাহিত্য-কবিতায়ও মাছের ছড়াছড়ি ছিল। ঈশ্বর গুপ্ত বলেছিলেন, 

‘ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল

ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।’

মাছ খাওয়া কখন থেকে শুরু হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি ইতিহাসের পাতায়। তবে ধারণা করা হয় গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের বঙ্গদেশে মাছ আগাগোড়াই খাওয়া হতো। সে কারণেই বাঙালির পরিচয়ে মাছ-ভাত জড়িয়ে আছে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে। চন্দ্রকেতু গড়ে মাছের ছবিসহ যে ফলকটি পাওয়া গেছে সেটি সম্পর্কে লেখক নীহাররঞ্জন রায় ধারণা করেছেন, সেই ফলকটি চতুর্থ শতকের। তাছাড়া অষ্টম শতাব্দী থেকে পাহাড়পুর এবং ময়নামতিতে যেসব পোড়ামাটির মধ্যে নানান ছবি তৈরি হয়, তার অনেকগুলোতেই মাছের ছবি আছে। এমনকি মাছ কোটা, ঝুড়িতে করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ছবিও রয়েছে। এ থেকে মাছের প্রতি এ অঞ্চলের লোকদের ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। 

চতুর্দশ শতাব্দীর প্রকৃত পৈঙ্গল গ্রন্থে তেমন ভালোবাসারই প্রমাণ পাওয়া যায়। যেখানে কবি বলেছেন, ‘ওগগরা ভত্তা রম্ভা পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা মৌইলি মচ্ছা নলিতা গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা (ই) পুনবন্তা।’ মূলকথা এই, যে রমণী কলাপাতায় গরম ভাত, ঘি, মৌরলা মাছ, এবং নলিতা মানে পাটশাক পরিবেশন করে স্বামীকে খাওয়ায় সেই স্বামী পুণ্যবান। 

বঙ্গদেশের ধর্মভীরু ব্রাহ্মণরা বোধ হয় পাহাড়পুরের আমলে মাছ খেতেন না। সুকুমার সেনের মতে, প্রাচীন বাঙালি সমাজে মাছ-মাংসের জনপ্রিয়তা ছিল অব্রাহ্মণদের মধ্যে। আর ধর্মভীরু বৌদ্ধদের মধ্যে মাছ খাওয়া আগাগোড়াই বারণ ছিল; কিন্তু কই, রুই, ইলিশের মতো মুখরোচক খাবার অথবা একটা দেশের জনপ্রিয় রীতিকে দূরে ঠেলে রাখা সহজ ছিল না। সে কারণেই দশ বা এগারো শতকের একজন শাস্ত্রকার ভবদেব ভট্ট মাছ খাওয়া যে ভালো এটার পক্ষে অনেক যুক্তি সাজিয়েছিলেন।

এমনকি বৃহদ্ধর্মপুরাণেও মাছের মাহাত্ম্য বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা আছে- রুই, পুঁটি, শোল, সাদা রঙের এবং আঁশওয়ালা মাছ ব্রাহ্মণরাও খেতে পারেন। জীমূতবাহনও মাছের শত্রু ছিলেন না, তিনি ইলিশ মাছ এবং ইলিশ মাছের তেলের প্রশংসা করেছেন। 

বাঙালি চিরকালই ভোজনরসিক। তাই সেকাল হোক কি একাল, সব যুগের খাবারেই পেট ভরে যায় তার; কিন্তু যে যা-ই বলুক ভাই, বাঙালির মন ভরাতে কিন্তু ভাত-মাছে আপোষ চলে না। কতশত মাছের নাম আর স্বাদ যে লেগে আছে বাঙালির মননে সে কেবল বাঙালিই জানে এমন নয়।

বাঙালির ভোজনগুণ সর্বজনবিদিত। সেই মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যগুলোর থেকেও বাঙালির রসনা বিলাসের প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষত, চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চন্ডিকাব্য, পদ্মপুরাণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ভারতবর্ষে বিশেষ করে বাংলায় যেসব বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন যেমন- হিউয়েন সাঙ, মানুচি, মানরিক, ইবনেবতুতা এদের লিখিত গ্রন্থ থেকেও বাংলা তথা ভারতবর্ষের খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়।

বৈদিক সংস্কৃতে ভোজন শব্দের দুটি অর্থ ছিল। সে সময় ভোজন অর্থে সুখানুভূতি এবং খাদ্য দুটোই বোঝানো হতো। ভোজনে জৈবিক প্রয়োজন ছাড়াও যে একটা তৃপ্তি বা আনন্দের অনুভূতি আছে সেটা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। সে জন্যই বোধকরি সর্বস্তরের মানুষ কমবেশি সুখাদ্যের অনুরাগী। অনেকে আছেন যারা হয়তো ভোজনবিলাসী নন কিন্তু ভোজনরসিক, পরিমাণে খান অল্প কিন্তু যেটুকু খান সেটা হতে হয় সুস্বাদু ও পরিতৃপ্তিদায়ক।

প্রাচীনকালে বাঙালির খাওয়া-দাওয়া প্রসঙ্গে বিখ্যাত লেখক নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙালির ইতিহাস বইটিতে লিখেছেন- ‘ইতিহাসের উষাকাল হইতেই ধান যে-দেশের প্রথম ও প্রধান উৎপন্ন বস্তু, সে-দেশে প্রধান খাদ্যই হইবে ভাত তাহাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই। ভাত-ভক্ষণের এই অভ্যাস ও সংস্কার অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির দান। তার মতে- ‘বারিবহুল খাল-বিল বহুল, প্রশান্ত সভ্যতা প্রভাবিত এবং আদি অস্ট্রেলীয়মূল বাংলায় মৎস্য অন্যতম প্রধান খাদ্যবস্তুরূপে পরিগণিত হইবে ইহা কিছু আশ্চর্য নয়।’ 

চীন, জাপান, ব্রহ্মদেশ, পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের আহার্য তালিকার দিকে তাকাইলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ এ হিসাবে কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সর্বত্রই এই তালিকায় ভাত ও মাছই প্রধান খাদ্যবস্তু। বাংলাদেশের এই মৎস্যপ্রীতি আর্যসভ্যতা ও সংস্কৃতি কোনোদিনই প্রীতির চক্ষে দেখতো না, আজও দেখে না : অবজ্ঞার দৃষ্টিটাই বরং সুস্পষ্ট। মাংসের প্রতিও বাঙালির বিরাগ কোনোদিনই ছিল না।

মাংস খাওয়ার বর্ণনাও পাওয়া যায় চর্যাপদে ভুসুকুপার গানে। গরু, খাসি এবং হরিণের মাংস খাওয়ার চল ছিল মধ্যযুগ থেকেই। হরিণের মাংস খুব সুস্বাদু তাই চর্যাপদে লেখা ছিল- ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। অর্থাৎ হরিণের মাংস এতই সুখ্যাতি ছিল যে সবাই বনে এসে হরিণ খুঁজে মারত। সে সময় বাঙালির বিয়ের ভোজে হরিণের মাংসের পদ অনিবার্যভাবে পরিবেশন করা হতো। সঙ্গে খাসি, পাখির মাংসও থাকত। তবে বাঙালি কৃষ্টির শেষ কথা হলো খাবারে চাই সরু চালের ধোঁয়া ওঠা ভাত আর হরেক পদের মাছ। 

নৈষধচরিতে ভাতের বর্ণনার মতো- ‘পরিবেশিত অন্ন হইতে ধুম উঠিতেছে, তাহার প্রতিটি কণা অভগ্ন, একটি হইতে আরেকটি বিচ্ছিন্ন, সে অন্ন সুসিদ্ধ, সুস্বাদু আর শুভ্রবর্ণ, সরু ও সৌরভময়।’ আজও খাবার পাত তেমনি হতে হবে, তবেই না রসনায় তৃপ্ত হবে মাছ-ভাতের বাঙালি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh