বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীর প্রাককথন

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রের দ্যুতি ভূলোকের শিল্পমনাদের বিশেষ করে জাতে ভারতীয়দের মননে ছড়িয়ে ছিল এবং আছে বহুকাল ধরেই। পিতামহ ও পিতা ছিলেন একাডেমিক নিয়মের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী। এ সুবাদে শৈশবেই চিত্রকলার আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। অবনীন্দ্রনাথের চিত্রকলার পাঠ শুরু হয় তৎকালীন আর্ট স্কুলের শিক্ষক ইতালীয় শিল্পী গিলার্ডির কাছে। 

১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরি ভারত ভ্রমণে এলে আর্ট গ্যলারি পরিদর্শনের সময় তাঁদের ওরিয়েন্টাল আর্ট সম্পর্কে বোঝাবার দায়িত্ব পান। ইতালিয়ান গিলার্ডি, ইংরেজ পামার, জাপানি টাইকান প্রমুখ চিত্রশিল্পীর নিকট তিনি চিত্রাঙ্কন বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন। শুরুটি পাশ্চাত্য কৌশলের হাত ধরে হলেও, পরবর্তীতে উপমহাদেশীয় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের গুরুদায়িত্বটিও নেন তিনি। তার হাত ধরেই দেশীয় ও প্রাচ্য ঐতিহ্য থেকে তৈরি হয় চিত্রশিল্পের নব্য ভারতীয় বা নব্য বঙ্গীয় ভাবধারা। বহুমুখী প্রতিভার এই শিল্পীর গল্প বলার অসাধারণ প্রতিভাকে বিশেষ দৃষ্টির সাথে প্রস্ফুটিত করে তুলেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচর্যা। তার মধ্যে অদ্বিতীয় এক কথাশিল্পীকে আবিস্কার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যার চেষ্টায় আমরা পেয়েছি ‘ছবি লিখিয়ে অবনঠাকুর’কে। 

ছবি শিল্পের আঙিনা ভেঙে এলেন কথাশিল্পে, লিখে ফেললেন ‘শকুন্তলা’। শব্দ বাক্যের চিত্ররূপময়তায় ক্রমশ তৈরি হল তার অনবদ্য সব কীর্তি, বাংলাসাহিত্যে যোগ হল বুড়ো আংলা, ক্ষীরের পুতুল, একে তিন তিনে এক, আলোর ফুলকি, রাজকাহিনির মতো রচনাবলি। অদ্বিতীয় এই কথাশিল্পীর কল্যাণে শিশুকিশোর সাহিত্যে খুলে গেল আরও এক আলোময় দ্বার। গল্প, কবিতা, চিঠিপত্র, শিল্প আলোচনা, যাত্রাপালা, পুঁথি, স্মৃতিকথা সব মিলিয়ে প্রকাশিত রচনা সংখ্যা প্রায় তিনশ সত্তরটি। নির্মাণ করেন শিল্পে আধুনিকতার স্বতন্ত্র পথ।

এর বাইরে আছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলি’। সকল মহৎ কর্মের পেছনে ক্রমে বোনা ইতিহাসের সূতোর পরিক্রমার মতো এই বিশেষ গ্রন্থটির পেছনেও রয়েছে কিছু ইতিহাস। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঁচটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করেন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপধ্যায়। বিহারের খয়রার কুমার গুরুপ্রসাদ সিংহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন তার সাহায্যেই এই পদগুলো সৃষ্টি হয়। ভারতীয় শিল্পকলার অধ্যাপনার পদটি খয়রার রানীর নামে ‘রানী বাগেশ্বরী অধ্যাপক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। উপাচার্য স্যার আশুতোষ এই পদে সর্বপ্রথম শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বরণ করেন। এই পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে ১৯২১ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় ত্রিশটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এ সকল বক্তৃতাসমূহ বঙ্গবাণী, প্রবাসী ও বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। 

১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবন্ধগুলোকে ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলি’তে উঠে এসেছে শিল্পসাহিত্যের রূপ ও রসের এক অনন্যধারার বিশ্লেষণ। ভাষা ও বর্ণনায় গদ্যগুলো সরস ও কোমলভাবে উঠে এসেছে। শিল্পকলার দুরহ অঞ্চলগুলো নিয়ে অবনঠাকুরের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এই বই সম্পর্কে নন্দলাল বসু লিখেছিলেন, শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগেশ্বরী বক্তৃতামালা, রূপকলার আলোচনার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী গ্রন্থ এবং এ যুগে আমাদের মধ্যে রসবোধের উন্মেষসাধনে অতুলনীয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বঙ্গসাহিত্যের এটি এক অমূল্য সম্পদ। জীবের মনস্তত্ত্ব যেমন জটিল যেমন অপার, সুন্দরও তেমনি বিচিত্র, তেমনি অপরিমেয়। শিল্প যে পুরোপুরি এক আত্মীকরণের ব্যাপার এবং এর অধিকার নিজগুণেই অর্জন করতে হয় তা বুঝিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুররা। বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলিতে শিল্পসাহিত্যের অনুসন্ধিৎসা ও রসবোধ ও সূক্ষ্মতর ভাবনাগুলিকে মূর্ত করেছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

‘যোগ সাধন করতে হয় শুনেছি চোখ বুজে, শ্বাসপ্রশ্বাস দমন করে; কিন্তু শিল্প সাধনার অন্য প্রকার- চোখ খুলেই রাখতে হয়, প্রাণকে জাগ্রত রাখতে হয়, মনকে পিঞ্জর খোলা পাখির মতো মুক্তি দিতে হয়- কল্পনালোকে ও বাস্তবজগতে সুখে বিচরণ করতে। প্রত্যেক শিল্পীকে স্বপ্ন ধরার জাল নিজের মতো করে বুনে নিতে হয় প্রথমে, তারপর বসে থাকা- বিশ্বের চলাচলের পথের ধারে নিজের আসন নিজে বিছিয়ে, চুপটি করে নয়- সজাগ হয়ে। এই সজাগ সাধনার গোড়ায় শ্রান্তিকে বরণ করতে হয়- ‘art is no not a pleasure trip, it is a battle, a mill that grinds.-MILLET.’ 

প্রবন্ধাবলির শুরুতে এভাবে তিনি নিজের শিল্প বিষয়ক উপলব্ধি নিয়ে বলেছেন। প্রবন্ধগুলোর ভেতরে রয়েছে শিল্পে অধিকার, অনধিকার, শিল্পের সচলতা ও অচলতা, শিল্প ও দেহতত্ত্ব, শিল্প ও ভাষা শিল্পবৃত্তি, শিল্পীর ক্রিয়াকাণ্ড, জাতি ও শিল্প, আর্য ও অনার্য শিল্পসহ বিবিধ বিষয়াদি নিয়ে সরস আলাপ। অবনীন্দ্রনাথ মনে করেন, শিল্পবোধ-বিহীন শিল্পচর্চা রসবোধ-বিহীন রসশাস্ত্র পড়বার মত। শিল্প সাধনার গূঢ় তত্ত্বাদি নিয়ে তার এই প্রবন্ধগুলি শিল্প বিষয়ক বোঝাপড়ায় পরিপক্বতা তৈরিতে এক ঔষধি ভাবধারা বহন করে যেন। সৌন্দর্যর সার ধরবার জন্য অন্যদের বুনে দেওয়া জালের বাইরে থাকবার ব্যাপারটিকে তিনি সচ্ছ করেছেন শিল্পের সচলতা ও অচলতার চিহ্নায়ন করতে গিয়ে। উদ্দেশ্যহীন বিদ্রুত বিষম আর বিচিত্রতাও সুন্দরতম, তা দেখার দৃষ্টি এবং নিত্য ও অমূর্ত সুন্দরের ভাব-বস্তুভেদে এর অধিষ্ঠান এর ধারণাও রয়েছে প্রবন্ধে। শিল্পের নিঃশর্ততা, শিল্পের মন্ময়তার সাথে আর্টিস্টের মনে রসনার সাথে সম্মিলিত হয়ে নতুন শিল্পের আর্বিভাব ঘটে। সুন্দর-অসুন্দর সম্বন্ধে শেষ কথা যদি কেউ বলতে পারে তা আমাদের নিজের নিজের মন। শিল্পশাস্ত্র নিয়ে অবনঠাকুরের মতামতও এরূপ। 

শিল্প বিষয়ক তাত্ত্বিক মতাদর্শের বাইরেও এই প্রবন্ধগুলির চমৎকারের একটি অন্যতম ব্যাপার হল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাশৈলী ও প্রকাশের চৌকস ঢঙ। গদ্যে তার রসবোধের জুড়ি মেলা ভার। শব্দচয়নে তীক্ষ্ণ ও বাক্যের নিপূণতা অবনীন্দ্র ঠাকুরকে নিয়ে গেছে কথাশিল্পের ভিন্নমাত্রায়। কখনো বাক্যে ধ্রুপদী উদাহরণ, কখনো রূপকের রূপময়তা এই দীপ্ত গদ্যগুলোর জৌলুস দেখিয়েছে। শিল্পের মূলমন্ত্র ও সাহিত্যের রসজ্ঞ তাত্ত্বিকতা বিষয়ে উপমহাদেশীয় শিল্পের নন্দনতত্ত্বে এক অনুসরণীয় অবস্থান তৈরি করেছে বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলি। আধুনিক শিল্প ও শিল্প স্বতন্ত্রতার এক নান্দনিক ইচ্ছেময়ী ডানা আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন অবনঠাকুর।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh