ICT Division

ব্রিটিশ মসলিন প্রপঞ্চ ও প্যাঁচ-পয়জার

‘What muslins so curious, for uses so various,

A poet has here brought to sell you.  

সভ্যতার আদিতম পর্বে যে যে সামগ্রীর অন্বেষণ ও উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরি বলে তৎকালীন মানুষের কাছে প্রতিভাত হয়েছিল আবরণ নিঃসন্দেহে তার অন্যতম। আবরণ অন্বেষার প্রাথমিক যুগে গাছের ছাল সাময়িক সান্ত্বনার কারণ হলেও মানুষকে দীর্ঘদিন নিশ্চেষ্ট রাখার পক্ষে তা যথেষ্ট ছিল না। ভিন্ন ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অঙ্গ থেকে খসে পড়ল বল্কল বা ছাল। এবার এলো জন্তু-জানোয়ারের চামড়া। এখানেও থেমে পড়েনি আবরণ ভাবনা।

লজ্জা নিবারণ, সৌন্দর্য সাধন এবং নির্মম প্রকৃতির হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য নতুন নতুন ভাবনার ফলে সৃষ্টি হলো নতুন নতুন আবরণ। ভারতবর্ষে প্রাচীনতম সভ্যতার যে নিদর্শন সিন্ধু উপত্যকায় পাওয়া গেল, সেখানে একটি বস্ত্রখণ্ড প্রমাণ করল যে তুলা-পশমের ব্যবহার ওই দূর অতীতের মানুষের কাছেও অজ্ঞাত ছিল না। আসলে নবাশ্মীয় যুগ থেকে বয়নের অস্তিত্ব আজ স্বীকৃত সত্য। 

প্রাচীনকাল থেকেই সুতা তৈরি ও কাপড় বোনার নানা পরিবর্তন পরিবর্ধনে যন্ত্রপাতিরও আবিষ্কার হয়েছে। বোনার জন্য তাঁতের নানা পরিবর্তন এখানে উল্লেখযোগ্য। একইভাবে তন্তু থেকে যে সুতার জন্ম তার রকমফের যেমন জানতে বুঝতে শিখল মানুষ, তেমনি সুতা তৈরির নানা কৌশল সম্পর্কেও মানুষ হয়ে উঠল দক্ষ। আসলে বোনার সুতা নিয়েই তাঁতের যা কিছু কায়কারবার। সুতা হলো প্রাকৃতিক উৎসের তন্তুর পর এক্কেবারে পয়লা কারিগরি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে, রাজাদের কোমরবন্ধযুক্ত মসলিন পোশাক ছিল অভিজাত রাজত্বের ফ্যাশন, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের নেপোলিয়ন বোনাপার্টের প্রথম স্ত্রী জোসেফাইন মসলিনের পোশাকের মাধ্যমে জনপ্রিয় ফ্যাশনে ‘সাদা বস্ত্রসাম্রাজ্যের’ প্রতিষ্ঠা দেয়, যা স্বামীর রাজনৈতিক নিওক্ল্যাসিক্যাল সাম্রাজ্যের শৈলীকে প্রতিফলিত করে। কথিত যে, জোসেফাইন এবং তার ফ্যাশনেবল বন্ধুরা তাদের মসলিন গাউনে জল ছিটিয়ে দিত, যার ফলে কাপড়টি তাদের শরীরের সাথে লেপ্টে থাকত, একই সাথে শরীরের ত্বক আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

শুধু মসলিনের কাপড় পরা তখন রাজনৈতিক বক্তব্যই ছিল না, এটি একটি প্রলোভনসঙ্কুল কাজও ছিল। গ্রিক-রোমান সমন্বিত বিরাজমান সাংস্কৃতিক আবহ নিওক্ল্যাসিজমকে অনুপ্রাণিত করেছিল, ‘অ্যাংলোম্যানিয়া- স্টাইল’, যা দেশের সাধারণ পরিধানকেও ফ্যাশনে উন্নীত করেছিল, তা জ্য-জ্যাক রুশোর মতো দার্শনিকদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছিল। কাপড়ের অন্তর্নিহিত লোভনীয় গুণাবলি হিসাবে জনপ্রিয় ফ্যাশনে মসলিন বস্ত্রে তৈরি সাদা পোশাক এবং আনুষঙ্গিক বস্ত্র অভিযোজন নিশ্চিত করেছিল।

১৮৪৪ সালের মে মাসের এক রিপোর্টে জে. ডানবার বলছেন, তখন ঢাকায় সূক্ষ্ম সাদা ও রংচঙ মসলিন ‘ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা সর্বোচ্চ নম্বরের (২৫০) থেকেও সূক্ষ্ম দেশি সুতা দিয়ে তৈরি’ হচ্ছে। ঢাকায় হাতে কাটা সুতা তখনো ম্যানচেস্টারের কলে তৈরি সুতার চেয়ে সূক্ষ্ম! তাঁর বক্তব্য- ‘এখনো ঢাকায় যে মানের মসলিন তৈরি হয় তা ইংল্যান্ডে কোনোদিনই তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।’

ঢাকাই মসলিন সম্পর্কে শ্রীকেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রবাসীতে লিখেছিলেন, ‘এদেশের যে সকল শিল্প লোপ পাইয়াছে তাহার মধ্যে ঢাকার মসলিনের স্মৃতি সর্ব্বাপেক্ষা আধুনিক। অতি অল্প দিন-পঞ্চাশ বৎসর-পূর্ব্বেও (১৮৮১ নাগাদ) এই বয়নশিল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এদেশের শিল্পীকে গৌরবান্বিত ও বিদেশীয়কে হতাশ করিত। অতি আধুনিক যুগে কলনির্মিত স্বল্পমূল্য অনুকরণের ফলে ইহার ধ্বংসপ্রাপ্তি ঘটিয়াছে।’ 

দুটো উদ্ধৃতিই ১৮৮০ দশকের ঢাকাই মসলিন বিষয়ক। ঠিক তার ১০০ বছর আগে ১৭৮০ সালের আগে-পরে মসলিন নিয়ে বিলাতে সুতা, বয়ন, শ্রমিক, তাঁতি, কবি ইত্যাদি বিষয়ে ঘটে যাওয়া খণ্ড কথা এই রচনার উদ্দেশ্য। কোনো সুবিস্তৃত ইতিহাস নয়। কতিপয় ঘটনার সারাংশ বলা যেতে পারে বড়জোর।

মসলিন সুতির একটি সূক্ষ্ম বস্ত্র। আদিকাল থেকেই ভারত সারা বিশ্বে এই বস্ত্র সামগ্রীর জন্য বিখ্যাত। ভারতের মধ্যে তো বটেই মসলিনের রাজধানী ছিল ঢাকা। ফলে মসলিনের সাথে ঢাকাই মসলিন জড়িয়ে গেছে ওতপ্রোতভাবে। দুনিয়ার লোকেরা এর সৌন্দর্যে বিস্মিত হয়েছিল, বাতাস এবং জলের সাথে এর সূক্ষ্মতা এবং স্বচ্ছতার তুলনা করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বস্ত্র ভারত থেকে ইউরোপে রপ্তানি করে, যেখানে মসলিনের পোশাক ছিল আভিজাত্যের প্রতীক।

শিল্পকর্মে মসলিন ঔপনিবেশিকতা

বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর বাণিজ্য আকর্ষণ ছিল মসলিন বস্ত্র। পরবর্তীকালে দুই শতাব্দী জুড়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বাংলার বস্ত্র। বিশেষ করে ঢাকাই মসলিন যা পৃথিবীর এক অত্যাশ্চর্য বস্ত্র, সবচেয়ে মূল্যবান কাপড়। যে ঔপনিবেশিক বাণিজ্যকর্তারা বাংলার বস্ত্র কারিগরির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারে ছিল সর্বাগ্রগণ্য, তারাই যন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে সামনে নিয়ে আসে একটা সময়ে। তার প্রমাণ লেখা-পত্রে দলিলে যেমন আছে, তেমনি আছে চিত্রাঙ্কনেও।

এক শিল্পকর্মের শীর্ষে অঙ্কিত চিত্রে দেখা যায়নতুন বিলাতি সুতা কলের প্রতিনিধিত্বকারী একটি খচ্চর ভারতীয় বাঘকে পদদলিত করছে। ব্রিটিশরা সস্তা, মেশিনে তৈরি কাপড় দিয়ে বাজার প্লাবিত করেছিল। যা ‘হস্ত শিল্প নৈপুণ্যের’ উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ভারতীয় বয়ন শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়। 

শিল্পকর্মের নারী চিত্রে দেখা যায়, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে মসলিনের পোশাক পরিহিত। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আদ্যক্ষরসহ একটি গ্লাসে রত্নখচিত ভারতীয় পাত্র থেকে জল (মসলিনের প্রতিনিধিত্ব করে) ঢেলে দিচ্ছে। এটি মসলিন বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্রিটেনে ভারতের বিশাল সম্পদ হস্তান্তরের প্রতীক!

ফ্যাশনে ‘পরিধেয়’ যখন ‘বস্ত্রহীনতা’র নামান্তর!

দুর্ভাগ্যবশত, ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের সূত্রপাতের ফলে মসলিনের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আবেদন বড় ধাক্কা খায়। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে মেরি আন্তোনিয়েত্তের বিদায় এবং ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধে, মসলিন এবং ফরাসি অভিজাততন্ত্রের মধ্যে একসময়ের চটকদার সম্পর্কসূত্রের মধ্যে সম্পদ উৎপাদনের ক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যায়।

মসলিনের সমালোচকেরা, বলা ভালো নিন্দুকেরা কেউ কেউ বলত ‘ইরোটিক ক্লথ’ বা ‘কামোত্তেজক বস্ত্র’! এদিকে ষোড়শ শতকের চিঠিপত্রে বাংলার সমাজচিত্রে উল্লেখ আছে যে, ‘‘সূক্ষ্ম বস্ত্রের কদর সেকালে সাধারণের মধ্যে তেমন ছিল না। এই সকল বস্ত্রাদির ব্যবহার সেকালের সমাজে নিন্দনীয় ছিল। পরবর্তীকালে অতিসূক্ষ্ম ‘জামদানি দোলাই’ ও ‘চন্দ্রকোণার ধুতি’ পরিধান করে তথাকথিত আধুনিক যুবক যুবতীগণের লম্পট-লম্পটি হওয়ার চমকপ্রদ সংবাদ মেলে একখানি পুরাতন পত্রে”।

১৮ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের উচ্চ সামাজিক শ্রেণিকে জনপরিসরে নগ্নভাবে উপস্থিত হওয়ার জন্য অভিযুক্ত এবং উপহাস করা হয়েছিল, যা তারপরে একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন কেলেঙ্কারির দিকে পরিচালিত হয়েছিল। যেখানে অপরাধী ঢাকা মসলিন ছাড়া আর কেউ ছিল না।

‘রোমান লেখক পেট্রোনিয়াস ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যিনি ঢাকা মসলিনের স্বচ্ছতা নিয়ে ভ্রু তুলেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আপনার নববধূ হয়তো আকাশের মেঘের নিচে প্রকাশ্যে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানোর নিমিত্তে বাতাসের মতো মসলিনের পোশাক পরিধান করে নিজেকে উপস্থিত করতে পারে।’ এদিকে ইংরেজ মহিলাদের একটি মাসিক ম্যাগাজিনের একটি স্ত্রী বিদ্বেষী কৌতুক উদ্ধৃতিতে আছে, একজন দর্জি মহিলা ক্লায়েন্টকে তার পেটিকোট, পকেট, কাঁচুলি এবং হাতা খুলে ফেলে তাকে সর্বশেষ ফ্যাশন অর্জনে সহায়তা করার জন্য নির্দেশনা দেয়।

ঢাকাই মসলিন বনাম বিলাতি মসলিন দ্বৈরথ

কৌটিল্য সূত্রে পরিধানের বস্ত্র প্রসঙ্গে সূক্ষ্ম, ঈষৎ সূক্ষ্ম, মৃদু ও স্থূল এই চার রকমের কথা বলা হয়েছে। এই যে বস্ত্রের সূক্ষ্মতা তাতে পৌঁছতে মানব সভ্যতার বহু কাল পাড়ি দিতে হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। জগতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বস্ত্রটি বাংলার গ্রামীণ তাঁত পেশাজীবীরা অত্যন্ত নৈপুণ্য ও দক্ষতার সাথে বয়ন করেছিলেন। শুধুই হাতে তৈরি সুতায় হাতে বোনা তাঁতে তৈরি হতো এই সূক্ষ্মতম বস্ত্র। যার নাম মসলিন।

বাংলা তথা ঢাকাই মসলিন হয়ে উঠেছিল জগৎ বিখ্যাত। এই মূল্যবান বস্ত্র বাণিজ্যে দেশ-বিদেশের বণিকরা সম্পৃক্ত হলো। একসময় বলপূর্বক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শক্তির উপনিবেশে পরিণত হলে মসলিনকেও চরম মূল্য দিতে হলো তার অবলুপ্তির মাধ্যমে। কিন্তু এই চালচিত্রের বর্ণনা, অন্যায়, অত্যাচার, স্বেচ্ছাচার, লুট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে অসংখ্য প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে বাংলার নানাবিধ কারিগরি বিদ্যার সাথে বস্ত্র বয়নের তথা মসলিনের সুতার সূক্ষ্মতায় পৌঁছতে ব্রিটিশ শক্তি মনোনিবেশ করে। যার ফলস্বরূপ ব্রিটেনে তাঁতশিল্পের যন্ত্রায়নের উৎকর্ষের সাহায্যে তারা দাবি করে সূক্ষ্ম মসলিন উৎপাদনের। কলে তৈরি সুতায়, কলে তৈরি বস্ত্র, মেড ইন ব্রিটেন মসলিন।

এই যে ‘ব্রিটিশ মসলিন’ বা ‘বিলাতি মসলিন’ বনাম ‘ঢাকাই মসলিন’ দ্বৈরথ, ইতিহাসে তার নানা খুঁটিনাটি তথ্যাদি আছে। বাংলা ভাষায়ও সেসব আছে খুবই অল্পবিস্তর। সেসব মূলত ঢাকাই মসলিনকে ঘিরে। কিন্তু ব্রিটিশ মসলিনকে ঘিরে বিস্তারিত রচনা বাংলায় দুর্লভ আজও। এরই মাঝে প্রায় পৌনে দুশ বছর পর নিকটতম সময়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলায় তৈরি হয়েছে মসলিন পুনরুজ্জীবনের নানা প্রকল্প।

বলা বাহুল্য ‘ঢাকা কটন’ বা ফুটি কার্পাসের অস্তিত্ব যেমন বিলীন হয়েছে ইতোমধ্যেই তেমনি বিলীন হয়েছে কারিগর পরম্পরা। হাতে সূক্ষ্মতম মসলিনের সুতা তৈরি সুদূর পরাহত! সেখানে এসব প্রচেষ্টায় যোগ হয়েছে নানা রকম সেমি স্বয়ংক্রিয় সুতা তৈরির চরকা। কিন্তু আজ থেকে দেড়শ বছর আগে ব্রিটিশ যন্ত্রে মসলিন নামেই সূক্ষ্ম বস্ত্র প্রস্তুত করেছিল। যা দিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ সূক্ষ্মতম বস্ত্রের চাহিদা পূরণ ও মূল্যবান ঢাকাই মসলিন আমদানি খরচ রদ করেছিল। আর তার মাধ্যমেই বাংলার তথা ঢাকার মসলিন বস্ত্র কারিগরির ইস্তফা হয়েছিল। ইতিহাসের মোটামুটি এই হলো বয়ান। আমরা ফিরে দেখতে চাই ব্রিটিশ মসলিনের সেসব দিনের নানা ঘটনাপ্রবাহকে। এই ইতিহাসের ফাঁকফোকরে আছে নানা ঘটনার পরম্পরা। সেদিকে মনোনিবেশ করা যাক এই পর্যায়ে।

সুতার সূক্ষ্মতা ও বিলাতের নয়া বস্ত্র জামানা 

‘...every young lady in the British isles who aspired to be a bride was equally anxious to be led to the alter in a cloud of Dacca Muslin.’ 

১৮০০ সালের মধ্যে নতুন ‘ব্রিটিশ কটন ইন্ডাস্ট্রি’ পুরনো বস্ত্রবিশ্বকে পরিত্যক্ত করে ‘নতুন সুতার বিশ্বে’ বা ‘নতুন তুলার বিশ্বে’ পরিণত করতে উদ্যোগী হয়। সুতার রাজ্যে তখন দ্বৈরথ, ঢাকা বনাম ল্যাঙ্কাশায়ার। ‘ঢাকার আঙুল বনাম বিলাতের মিউল’। ফোর্স ওয়াটসনের মতে ১৭৭৬ সালে ঢাকায় ৪০ হাজার সুতাকাটনি ছিল। তার পরের ৪০ বছরের মধ্যে ঢাকার লোকসংখ্যাই কমে দাঁড়ায় ৪০ হাজারে! একটা সময় আসে যখন সস্তার ব্রিটিশ মসলিন ও ক্যালিকো ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায়।

ব্রিটিশ বস্ত্রশিল্প ইতিহাস প্রণেতাদের প্রথম সারির রবার্ট ওয়েন, উইলিয়াম রেডক্লিফ এবং জন কেনেডি প্রমুখ ব্রিটিশ বস্ত্রশিল্পে স্যামুয়েল ওল্ডনো’র ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। বিশেষত সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পথিকৃৎ ভূমিকার জন্য ওল্ডনো মূল্যায়িত। রবার্ট ওয়েন তার আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে যা উল্লেখ করেছেন তা উদ্ধৃত করা সঙ্গত।

“ওল্ডনো যখন স্টকপোর্ট ও চেশায়ারে মসলিন প্রস্তুত করছিলেন তখন আমি শিক্ষানবিশ হিসাবে Mr. McGuffog-এর সাথে কর্মরত। মসলিন প্রস্তুতকারী হিসাবে তার মূল ভূমিকা চলছিল ১৭৮০, ৮১, ৮২ সালে। যখন আমি কাজ শুরু করি তখন সেখানে ইন্ডিয়ান মসলিন ছাড়া অন্য কোনো মসলিন বিক্রয়ের জন্য ছিল না। ‘British mule Muslin’ নামে ওল্ডনো’র মসলিন ছিল তখন বাজারের নতুন বস্ত্র পণ্য। আধা গজ চওড়া এই বস্ত্রের জন্য তখন McGuffog ওল্ডনোকে ৯ সিলিং মূল্য দিতেন। McGuffog তার নিজস্ব ক্রেতাদের কাছে প্রতি গজ বিক্রয় করত অর্ধ স্বর্ণ মুদ্রায়! ক্রেতাদের এই কাপড় সংগ্রহের জন্য দুর্মর ক্রয় ইচ্ছা ছিল এবং এই দামে অভিজাতরা দ্রুত ক্রয় করেছিল। ওল্ডনো ক্রয়কৃত কাটা সুতার মসলিনে লাভ করলেও তার ধারণা ছিল কাটা সুতা সংগ্রহের জন্য লাভ কম হচ্ছে! ফলে নিজেই সুতা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেন, এবং আকাক্সিক্ষত সুতা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে সফল হন।”

নানা যান্ত্রিক উন্নতি ও আবিষ্কারের ফলে, বিশেষত হারগিভসের ‘সুতা কাটার চরকা’ ১৭৭০ সালে, আর্করাইটের ‘জলকাঠামো’ ১৭৬৯ সালে, ক্রম্পটনের ‘সুতাকাটার কল’ ১৯৭৯ সালে বিলাতের বস্ত্রশিল্পের উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বস্ত্র উৎপাদনে লক্ষণীয় বৃদ্ধিতে বস্ত্রমূল্য হ্রাস যেমন হয়েছে, তেমনি সুতার মানের উন্নতি হয়েছে। ফলত ১৮ শতকের শেষদিকে বিলাতে বস্ত্র উৎপাদন আর মোটেও ‘শিল্প’ বা ‘কলা’ রইল না, এই প্রথম বিজ্ঞানে আত্তীকৃত হয়ে গেল। 

সুতার রকমফের বুঝতে ব্যবহৃত হয় এর পরিমাপের একক কাউন্ট। যা সুতার সূক্ষ্মতাকে নির্দেশ করে। যত বেশি কাউন্ট তত বেশি সূক্ষ্ম সুতা। ১৮ শতকের মাঝামাঝি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমদানিকৃত ভারতীয় সুতা ছিল ৬০ কাউন্টের।  সে সময় ইংল্যান্ডে হাতে কাটা এক তার সুতা ১৬ থেকে ২০ কাউন্টের বেশি হতো না। 

হারগিভসের চরকা ২০ কাউন্টে আর তখন আর্করাইটের পিনাকল ৬০ কাউন্টে পৌঁছতে পেরেছিল।  ক্রম্পটনের সুতা কাটার কলে সর্বোচ্চ সূক্ষ্ম সুতা ছিল ৪০ কাউন্ট। এর কিছুদিন পর তা ৮০ কাউন্ট তার আগে ছিল ৬০ কাউন্ট। পরবর্তীতে ১৮১০ সালে সুতা কাটায় ৩৫০ কাউন্টের সূক্ষ্মতায় পৌঁছেছিল।  ১৮৩০ সালে ৩৫০ কাউন্ট ছিল মোটামুটি মানসম্পন্ন মসলিন পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়।

সূক্ষ্ম সুতা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তখন McConnel & co. প্রখ্যাত, স্থাপিত ১৭৯০ সালে। সেখানে ৬০ থেকে ১৬০ কাউন্টের সুতা প্রস্তুত হতো ১৭৯৫ সালে। ১৮৩৩ সালে তাদের সুতা কাটার শ্রমিক ছিল ১৫৪৫ জন, যা তখনকার সমকক্ষীয় যে কোনো সুতা কারখানা থেকে ২০০ জন বেশি।  গড়ে তাদের সুতা উৎপাদন হতো ১৭০ কাউন্টের। যেখানে ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সুতার গড় কাউন্ট ছিল ৫০।

এই সময়ের মধ্যে বেশি কাউন্টের সুতা কাটার মজুরির ব্যাপক পতন হলো। ১৭৮০ ’র শুরুতে ১০০ কাউন্টের ১ পাউন্ড সুতা কাটায় যেখানে মজুরি ছিল ২ পাউন্ড থেকে ২ পাউন্ড ৪০ শিলিং, কিন্তু ১৮৩০ সালে তার মজুরি দাঁড়ায় মাত্র ৩ শিলিং। 

যার ফলে কাঁচা তুলার দামের আরোপযোগ্য পতন তো হলোই, সাথে বাষ্পীয় শক্তির আবির্ভাব ও উন্নত যন্ত্র চরকার সুতার সাথে সুতা প্রস্তুতকারকদের অবশ্যম্ভাবী প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলো। যান্ত্রিক টাকুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলো, ১৭৮৮ সালে তার সংখ্যা ছিল ৫০০০০।১৫ কিন্তু ১৮১১ সালে ক্রম্পটন উত্থাপিত তথ্য যা ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড পার্লামেন্টে দাখিল করেছিল তাতে টাকুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ লক্ষ। হারগিভসদর যন্ত্র চরকা এবং আর্করাইটের ‘জলকাঠামো’র হিসাবে ছিল ৫ লক্ষের মতো।

বিলাতে সুতা কাটার কলের আগে ভারত থেকে সূক্ষ্ম মসলিন আমদানি হতো, যা সূক্ষ্ম সুতায় বোনা হতো। ঢাকায় হাতে কাটা সূক্ষ্ম উন্নতমানের সুতার ব্যাপক উদ্দীপিত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ মূল্য পাওয়া যাচ্ছিল না। বরং বিলাতে উৎপাদিত সুতা সস্তা হওয়ার ফলে ব্যাপক ব্যবহৃত হতে থাকে। তখন ক্রম্পটনের সুতাকাটার কল ‘মসলিন চরকা’ হিসাবে পরিচিতি পায়। 

টমাস আইসওয়ার্থ বোল্টনে স্থায়ী মসলিন প্রস্তুতকারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮০ সালে।

স্যামুয়েল ওল্ডনো স্টকপোর্ট ও এন্ডারটনে ১৭৮৩ সালের বসন্তে মসলিনের প্রস্তুতকারক হিসাবে আবির্ভূত হয়ে তার তিন বছরের মধ্যে বিলাতের নেতৃস্থানীয় প্রস্তুতকারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন।১৯ 

ফলে বিলাতে লম্বা অংশের তুলার চাহিদা আবারও তুঙ্গে ওঠে। ১৭৮৭ সালের মধ্যেই ৫ লক্ষ বিলাতি মসলিন প্রস্তুত সম্পন্ন হয়। বিলাতে তখন শুরু হয়ে যায় ‘কটন লর্ড’দের যুগ!

ফল যা হবার তাই হলো। বিলাত ও ভারতের বাজারের মধ্যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরোপ হলো। ফলস্বরূপ ১৭৮০ সালের মধ্যেই আফ্রিকা, ব্রিটেনে প্রস্তুত আমেরিকায় ইন্ডিয়ান ক্যালিকো পুনঃ রফতানি শুরু করে।

সংক্ষেপে ফলাফল দাঁড়ায়, ১৮ শতকের শেষপাদে বিলাতের বস্ত্র শিল্পের নিশ্চিত উত্তরণে স্থানান্তরিত হয় ‘হ্রস্ব আঁশের কাঁচা তুলার পুরনো দুনিয়া থেকে লম্বা আঁশের কাঁচা তুলার নতুন দুনিয়ায়।’ আর এভাবেই ঢাকার ‘সুপিরিয়র কটন ইনফেরিয়র কটন’ হয়ে ওঠে তখনকার বিলাতি বস্ত্র বাণিজ্যের সূত্রানুযায়ী। 

তুলাজাত পণ্য ১৭৮৪ থেকে ১৭৮৬ ছিল ব্রিটিশ রফতানির ৬ শতাংশ, তা বেড়ে ১৭৯৪-১৭৯৬ সালে ১৫.৬ শতাংশ, এবং ১৮০৪-১৮০৬ সালে পৌঁছায় ৪২.২ শতাংশে। বিলাতের বস্ত্র রফতানি যখন প্রচণ্ড গতিতে ঊর্ধ্বমুখী তখন মসলিন রাজধানী ঢাকার কারিগর লোকসংখ্যা অধঃগতিতে নিমজ্জিত হতে থাকে! যা পরের ২ দশকের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের জনপদে পরিণত হয়। আর এদিকে মসলিন নামের ব্রিটিশ বস্ত্র পণ্যের দামও কমে আসে ব্যাপকভাবে।

‘ব্রিটিশ মসলিন’ বা ‘বিলাতি মসলিন’-এর জন্মকথা 

আমরা জানি তত দিন পর্যন্ত প্রচলিত ঢাকাই মসলিনের স্থলাভিষিক্ত হতে মরিয়া ‘ব্রিটিশ মসলিন’ বা ‘বিলাতি মসলিন’। বলা ভালো এই মরিয়া চেষ্টায় তখন যে বস্ত্র প্রস্তুতকারকেরা আত্মনিয়োজিত হয়েছিল তাদের কথা বাংলার মসলিন পাঠে খুব কমই উচ্চারিত ও পঠিত। এমতাবস্থায় ফিরে দেখা যাক কেমন ছিল ব্রিটিশ মসলিনের আবির্ভাব? 

আমরা জানি তত দিন পর্যন্ত ঢাকায় মসলিনের একচেটিয়া বাজার ইংল্যান্ডে তো বটেই, গোটা পৃথিবীতে তার জয়জয়কার! ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষত ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি মসলিন প্রস্তুতের চেষ্টা করে কিছু মাত্রায় সফল হয়েছিল বলে দাবি আছে। কেমন ছিল সে সফলতা? ঢাকাই মসলিনের কতটা সমকক্ষ ছিল সেসব কলে প্রস্তুত সূক্ষ্ম বস্ত্র? এর পেছনের গল্পটাই বা কী? সেসব ফিরে দেখা যেতে পারে এবার।

বিলাতে কে কোথায় প্রথম মসলিন বোনা শুরু করেছিল চোখ বন্ধ করে তার নামধাম সাকিন ঠিকানা বলে দেওয়া খুব সহজ নয়! কেননা তখন পলাশী পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড জুড়ে নানা জায়গায় সংগঠিত ও ব্যক্তি উদ্যোগে মসলিন প্রস্তুতের চেষ্টা হয়েছিল। সেসব প্রচেষ্টা হয়েছিল প্রায় একই সময়ে।

বিশেষত ১৭৮০ সালের আগে পরে। ১৭৫৮ সালের অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে গ্লাসগোর এন্ডারস্টোনে তেমনই এক উদ্যোগ ছিল প্রখ্যাত ব্রিটিশ বস্ত্র ব্যবসায়ী হেনরি মন্টিথের পিতা জেমস মন্টিথের ব্রোফিল্ডের ছাপাখানা এবং সুতা ও বয়ন কারখানা ব্ল্যানটাইরে। সেখানে তিনি মসলিন বোনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা ছিল স্কটল্যান্ডে প্রথম মসলিন বোনার উদ্যোগ। কিন্তু তাঁর তৈরি সুতা যথেষ্ট সূক্ষ্ম না হওয়ায় ভারতীয় সূক্ষ্ম সুতায় প্রথমে হাতে ছোড়া মাকু ও পরবর্তীকালে প্রাযুক্তিক মাকু ছুড়েও সফল হতে পারেননি।

১৭৩৫ সাল নাগাদ মেইন স্ট্রিট বরাবর হস্তচালিত তাঁতিদের একটি ছোট সম্প্রদায় বসবাস করত এবং ১৭৫৮ সাল নাগাদ গ্লাসগোর তাঁতিদের সংগঠন বিশপ স্ট্রিট নামে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করে। তার এগারো বছর পর ১৭৬৯ সালে জেমস মন্টিথ এন্ডারস্টোন গ্রামে স্কটল্যান্ডে বোনা প্রথম মসলিনের বস্ত্র তৈরি করেছিলেন। মন্টিথই প্রথম স্কটল্যান্ডে বিশুদ্ধ তুলার একটি সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র তৈরি করেন এবং তা দিয়ে তৈরি মসলিন পোশাক তিনি রানী শার্লটকে (কিং জর্জ ৩’র স্ত্রী) উপহার দিতেন।

অন্যত্র উল্লেখ আছে যে, ১৭৭১ সালে গ্লাসগোতে কিছু সংখ্যক মসলিন রুমাল তৈরি হয়েছিল, কারণ তখন হাতে কাটা সুতায় এর বেশি সংখ্যক মসলিন বোনা সম্ভব হয়নি। 

১৭৮০ সাল নাগাদ ল্যাঙ্কাশায়ার ও গ্লাসগোতে মসলিন বোনা শুরু হয়। তত দিনে যন্ত্র চরকায় সুতা কাটা শুরু হয়ে গেলেও সূক্ষ্মতা বিচারে সে বস্ত্র পিছিয়ে ছিল। এমনকি ভারতে হাতে কাটা সুতায় বুনেও সমকক্ষতা নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। অতঃপর ১৭৮৫ সালের দিকে যখন আরও উন্নত সুতা কাটা প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে উঠল তখন মসলিনের টানা পোড়েনের জন্য সুতার আকাল রইল না। ফলে অতিদ্রুত উন্নততর সুতায় কমপক্ষে ৫ লক্ষ মসলিন তৈরি হয়। সেটা ছিল ১৭৮৭ সাল।

১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টরদের কাছে উত্থাপিত সিলেক্ট কমিটির রিপোর্টে উল্লেখিত হয়েছিল যে, ‘প্রতিটি বস্ত্র বিতান একই রকমের ‘ব্রিটিশ মসলিন’ বিক্রয় করছে, দেখতে সেসব বাহ্যিকভাবে ভারতীয় মসলিনের চেয়ে অভিজাত মনে হলেও কিন্তু মূল্যে ভারতীয় মসলিনের চার ভাগের এক বা তিন ভাগের এক ভাগ। সেই সময় বোল্টন, গ্লাসগো, পেইজলি ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে এসব মসলিন প্রস্তুত হচ্ছে। বুক, মাল, লেনো, জেকোনেট ইত্যাদি অপেক্ষাকৃত হালকা বস্ত্র ল্যাঙ্কাশায়ার ও গ্লাসগোতে যেসব তৈরি হচ্ছিল তারচেয়ে বেশি সেলাই ও ছাপা মসলিন বিশেষভাবে এসব স্থানে ও পেইজলিতে প্রস্তুত হতো।

লন্ডনের বিখ্যাত মসলিন বস্ত্র ব্যবসায়ী স্লেট মসলিন প্রস্তুতকারক ওল্ডনোকে লিখিত পত্রে তখনকার বস্ত্র ব্যবসা বিষয়ক নানা তথ্য উল্লেখ করেন-

“তারা যে কার্যক্রমটি আঁকড়ে ধরেছিল তা সত্যিই দুর্দান্ত ছিল, ব্রিটেনে এমন একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠা করা যা অন্তত কিছু পরিমাপে বাংলার বস্ত্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যাতে এমন কিছু মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন যাদের ‘বেঙ্গল পিস অব গুডস সম্পর্কে অত্যন্ত সেকেলে এবং অদ্ভুত প্রকল্প’ বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান থাকলেও কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।”

‘স্কচ এবং ল্যাঙ্কাশায়ার মসলিনের উৎকর্ষ নিয়ে আমাদের কান ঝালাপালা করে প্রতিদিন চাপ দেওয়া হয়, যদি তার সস্তা সহজলভ্যতা কোনো উৎকর্ষতা প্রমাণ করে তবে তা 

প্রকৃতপক্ষেই ইতিবাচক।’

‘প্রাইভেট ট্রেড ইন্ডিয়া এখন খুব কম দামে বিক্রি করছে, এবং ঢাকার ধরনের চমৎকার পণ্য-অনেক পাইকারি দোকানিরা এখন তাদের মজুত মালামাল বিক্রয় করে দিচ্ছে।

ঢাকাই মসলিন যেমন কোনো সুখী গল্প নয়, তেমনই বিলাতি মসলিনের পশ্চাতে নিহিত অসুখী ঢাকার তাঁতিদের গল্প, আর সাথে মিশে আছে বিলাতের বস্ত্র শ্রমিকদের ঘাম রক্তের উপাখ্যান। ‘জেন অস্টিন লং রিজেন্সি’ যা সর্বোত্তম পশ্চিমা মসলিন হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। সেসব ‘অথেন্টিক্যাল ইংলিশ’ মসলিন, তবে কোনোভাবেই যা ঢাকাই মসলিনের কাছাকাছিও নয়। 

আমরা সকলেই অতীত পাশ্চাত্যের অভিজাত মহিলাদের ফ্যাশনকে সূক্ষ্ম সাদা মসলিন কাপড়ের সাথে যুক্ত হিসেবেই দেখে এসেছি- বিশেষত পল্লবাকার নকশার মসলিন, বিন্দু বিন্দু নকশার মসলিন, চৌখুপি, ডোরাকাটা মসলিন এবং এমব্রয়ডারি করা মসলিন। হেনরি টিলনি, নর্থ্যাঙ্গার অ্যাবিদর নায়ক, তার বোনের মাধ্যমে মসলিনের সাথে সুপরিচিত ছিলেন, যিনি শুধু সাদা পোশাক পরতেন।

ঔপন্যাসিক জেন অস্টিনের ১৮০৩ সালে লিখিত ও ১৮১৭ সালে প্রকাশিত ইংরেজি সাহিত্যের প্রখ্যাত ‘নর্থ্যাঙ্গার অ্যাবি’ গথিক উপন্যাসে তৎকালীন ভারতীয় মসলিন প্রসঙ্গ-

‘প্রিয় ক্যাথরিন আমার’, তিনি বললেন, ‘এই পিনটি আমার হাতা থেকে নাও; আমি ভয় পাচ্ছি যে এটি ইতোমধ্যে একটি গর্ত হয়ে ছিঁড়ে গেছে; আর যদি তা হয়েই থাকে তবে আমি খুব কষ্ট পাব। আমার একটি প্রিয় গাউন, যদিও এর দাম কিন্তু নয় শিলিং প্রতি গজ।’

মসলিনের দিকে তাকিয়ে মি. টিলনি বললেন, ‘আমার ঠিক এটাই অনুমান করা উচিত ছিল, ম্যাডাম।’

‘আপনি মসলিন বোঝেন স্যার?’

‘বিশেষ করে কোনটা ভাল; আমি সব সময় আমার নিজেরটাই কিনি, এবং এ বিষয়ে কেনাকাটায় চমৎকার পছন্দকারক হতে সুযোগ দেওয়া হয়; এবং আমার বোন প্রায়ই গাউন পছন্দের বিষয়ে আমার উপর আস্থা রেখেছে। আমি অন্য দিন তার জন্য একটি কিনেছিলাম, এবং যারা এটা দেখেছেন প্রত্যেক মহিলা কর্তৃক বিস্ময়কর দর কষাকষির পারঙ্গমতার বিষয়টি উচ্চারিত হয়েছিল। আমি এক গজ সত্যিকারের ভারতীয় মসলিনের জন্য মাত্র পাঁচ শিলিং মূল্য পরিশোধ করেছিলাম।’

মিসেস অ্যালেন তার প্রতিভা দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন। ‘সাধারণত পুরুষরা এই জিনিসগুলো খুব কমই খেয়াল করে’, সে বলেছিল; ‘আমি কখনোই মি. অ্যালেনকে ছাড়া আমার গাউন পছন্দের জন্য অন্য কারো উপর নির্ভর করতে পারি না। আপনি অবশ্যই আপনার বোনের জন্য একটি দুর্দান্ত ক্রয়ের জন্য নির্ভর করতে পারেন, স্যার।’

‘আমি আশা করি, ম্যাডাম।’

‘তবে আপনি জানেন, ম্যাডাম, মসলিন সব সময়ই কোনো না কোনো বিশেষ প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে; মিস মর্ল্যান্ড একটি রুমাল, একটি টুপি, বা একটি চাদরের জন্য যথেষ্টই নির্ভর করতে পারেন। ... মসলিনকে কখনোই নষ্ট বলা যাবে না। আমার কাছে এমন অভিজ্ঞতা আছে। আমার বোনকে চল্লিশ বার বলতে শুনেছি, যখন সে তার চেয়ে বেশি কেনার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, বা নির্বিকার সেসব কাটাকাটি করছে।’

বিলাতে একসময় সেই কাপড়ের পোশাক চলে এলো সাধারণের নাগালে! কবে, কীভাবে, কার হাত ধরে এই যজ্ঞ হয়েছিল? সেসবের একটু হদিস করা যাক।

স্যামুয়েল ওল্ডনো সিনিয়র ছিলেন নটিংহ্যামের একজন ব্যবসায়ী। মার্গারেট ফস্টার নামের একজন নারী তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে এন্ডারটনে জমি পেয়েছিলেন। ১৭৬২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর বিধবাকালে জোসেফ শোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। ১৭৬৪ সালে জোসেফ শো রোসকো লো, এন্ডারটনে প্রথম ব্রিটিশ মসলিনের প্রস্তুতকারক হিসেবে দাবিদার হন।

বোল্টনের স্যামুয়েল ক্রম্পটন ১৭৭৯ সালে সুতা পাকানোর যন্ত্র এবং জল কাঠামোর উপাদানগুলোকে একত্র করে সুতা পাকানোর কল তৈরি করেছিলেন। এই কলটি জলের ফ্রেমের চেয়ে শক্তিশালী সুতা তৈরি করেছিল। এভাবে ১৭৮০ সালে, দুটি কার্যকর হস্তচালিত সুতা পাকানোর পদ্ধতি ছিল যা জলের শক্তি দ্বারা চালানোর জন্য সহজেই অভিযোজিত হতে পারে। প্রারম্ভিক সুতা কাটার কলগুলো মসলিন তৈরিতে ব্যবহারের জন্য সুতা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত ছিল এবং মসলিন চাকা Hall র’ th’ Wood (pronounced Hall-ith-wood)  হিসেবে পরিচিত ছিল। কে এবং হারগিভসের মতো, ক্রম্পটন তার নিজের লাভের জন্য তার উদ্ভাবন কাজে লাগাতে সক্ষম হননি, এবং নিঃস্ব হয়ে মারা যান। স্যামুয়েল ক্রম্পটন এর ‘সুতা কাটার যন্ত্র’ই বস্ত্র উৎপাদনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।

স্যামুয়েল ওল্ডনো জুনিয়র স্টকপোর্টে মসলিন প্রস্তুতকারক হিসেবে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ১৭৮৭ সালে তিনি মেলোর, বটমস হল এস্টেট প্রথম ক্রয় করেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ তিনি তার কারখানা নির্মাণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, যা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম তুলা কল, বিশ্বের বৃহত্তম ওয়াটারহুইল যা বিল্ডিংয়ের স্থল স্তরের দুই তলায় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই কারখানায় উৎপাদনের জন্য ৫৫০ জন কর্মচারী ছিল, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই মহিলা এবং আট বছর বয়সী শিশু, সপ্তাহে ৬ দিন ১২ ঘণ্টা কাজ করেছে। ওল্ডনো একজন ভালো পরিকল্পনাকারী এবং সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও ১৮০০ সালের প্রথম দিকে রিচার্ড আর্করাইট জুনিয়র কর্তৃক তাকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হয়েছিল। ১৭ নভেম্বর ১৮৯২ মিলটি আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়।

স্লেটের সাথে কাজ করে ওল্ডনো ভাইরা খুব ভালো করেছিল। এপ্রিল ১৯, ১৭৮৬-এ, তিনি লিখেছেন ‘গতকাল আমরা আপনাকে পিকফোর্ড কর্তৃক ২০০ পাউন্ড পাঠিয়েছি।’ যদি আমরা এটিকে বর্তমান মূল্যে রূপান্তর করি, তাহলে ২৬০০০ পাউন্ড এভাবে পাঠানোর কথা কল্পনাও করা যায় না!

কেন ওল্ডনো এত সফল ছিল? স্যামুয়েল ওল্ডনো অ্যান্ড দ্য আর্করাইটস: স্টকপোর্ট এবং মার্পেলে শিল্প বিপ্লব, আনউইন লিখেছেন: “আমাদের রেকর্ডগুলো কেবল এই ঐতিহ্যকে নিশ্চিত করে না যে ওল্ডকনো ব্রিটিশ মসলিনের প্রথম সফল নির্মাতা ছিলেন, তবে এটিও প্রতিপন্ন করে যে তিনি সৃজনশীলতার জন্য তাঁর সাফল্যকে ঋণী করেছিলেন। যা ছিল নিছক ব্যবসায়িক চতুরতার চেয়ে নান্দনিক উপহার।” এর আগেও প্রচেষ্টা ছিল এবং আনউইন যোগ করেছেন, “এটা অসম্ভব নয় যে যদি সমস্ত তথ্য জানা যায় তবে আমাদের বোল্টনের টমাস আইন্সওয়ার্থ, অ্যান্ডারটনের জোসেফ শ বা নিঃশব্দে লড়ে যাওয়া কিছু তাঁত কারিগরকে এ উৎপাদনের সূচনার জন্য আরও বেশি যোগ্যতার দায় দিতে হবে। এমনকি পেসলির অলৌকিক তাঁতি যিনি আগের সময়ের আরও প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নিষ্ফল সংগ্রাম করেছিলেন।”

স্যামুয়েল ওল্ডনো সিনিয়র মার্গারেট ফস্টারের পুত্র স্যামুয়েল ওল্ডনো জুনিয়র প্রথম সফল ব্রিটিশ মসলিনের প্রস্তুতকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর জন্ম ১৭৫৬ সালে। ১৭ শতকের মাঝামাঝি ওল্ডনো’র জন্মের ১০০ বছর আগে ব্রিটিশদের সুতির সুতা সম্পর্কে প্রথম জানাশোনা হয়। মাত্র ৩০ বছর বয়সে ওল্ডনো বিশ্বখ্যাত ঢাকাই মসলিনের ব্রিটিশ ভার্সন বিলাতের কলে তৈরি ‘মেলোর মসলিন’ প্রস্তুত করেন। আজীবন অকৃতদার ওল্ডনো ৭২ বছর বেঁচে ছিলেন।

বিলাতে কলে তৈরি সস্তা মসলিন পরবর্তী সময় বিভিন্ন জায়গায় নানা নামে প্রস্তুত ও বাজারজাত হতে থাকে। সেসবের মধ্যে ছিল রেডক্লিফ মসলিন, বল্টন মসলিন, ব্রিটিশ মিউল মসলিন ইত্যাদি। 

এসব ছাড়িয়ে কিন্তু মসলিনের গল্পের ইতিবাচক নেতিবাচক দিকও রয়েছে। “১৯ শতকের গোড়ার দিকে, ফ্যাশন প্রবণতা অতীতের অভিনব পোশাক থেকে সাজসজ্জার সাথে অনেক বেশি সাধারণ, পরিচ্ছন্ন এবং মিতব্যয়ী ধরনের পোশাকে পরিবর্তিত হয়েছে... মহিলারা পেটিকোট পরা ... [যা] পাফ আউট স্কার্ট... গিলোটিন...ফ্যাশন অনুসরণ করার জন্য শুধু মসলিনের পোশাক পরা যথেষ্ট ছিল না। মহিলারা তাদের মসলিন পোশাক ভিজিয়ে প্রমাণ করত যে তারা নিচে কিছুই পরেনি। এ ছাড়াও সেই সময়ের আদর্শ, সুন্দরী মসলিন পরিহিত মহিলা যিনি সারা রাত বই পড়ে ক্লান্ত অবস্থায় জল ছিটিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে রেখেছেন এই অসাধারণ চিত্র যেন সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। মহিলারা সম্ভবত তাদের ফিগার দেখানোর জন্য মসলিনের পোশাকটি তাদের শরীরে লেপ্টে রাখতে চেয়েছিলেন (অনেকটা আধুনিক সময়ের ভেজা টি-শার্ট প্রতিযোগিতার মতো)।”

 “মহিলারা এমন পাতলা পোশাক পরেছিলেন এবং এমনকি নিজের গায়ে জল ঢালছিলেন তা বিবেচনায় নিলে অনুমান করা যায় শীতলতা। প্রকৃতপক্ষে ফ্রান্স ১৯ শতকের গোড়ার দিকে নিউমোনিয়ার একটি মহামারির শিকার হয়েছিল এবং প্রতিদিন ৬০০০০ রোগী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এই রোগীদের একটি বড় অংশ ছিল মহিলা, যারা ভেজা মসলিনের পোশাক পরতে পছন্দ করতেন। সুতরাং নিউমোনিয়ার ডাকনাম ছিল মসলিন রোগ।

ব্রিটিশ মসলিনের স্বর্ণসময় ১৭৯০ থেকে ১৮০৫ সালের মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ার, ইয়র্কশায়ার এবং স্কটল্যান্ডের গ্রামের তাঁতিদের যে সুখী জীবন ছিল তার বর্ণনা আছে রেডক্লিফের একটি লেখায়। বোল্টনের মসলিন তাঁতিরা ১৮০০ শতকের শুরুতে সপ্তাহান্তে সড়কে বেরিয়ে যেত মাথার টুপিতে ৫ পাউন্ড গুঁজে নিয়ে। যা ছিল তখনকার তাদের সাপ্তাহিক মজুরি! এর মাধ্যমে দেখানো হতো মসলিন তাঁতিদের ভালো মজুরির ফলে তাদের জামা, জুতা, খাদ্য পানাহার বিলাস যাপন!

কিন্তু তারপর থেকেই বস্ত্রশিল্পে উত্তরোত্তর যন্ত্রায়নের উন্নতির ফলে ১৮১৫ সাল থেকেই তাঁতি ও সুতা কাটার শ্রমিকদের বেকার দুর্দশা শুরু হয়, যা ১৮৪০ সালের মধ্যে তাদের অনাহারের মুখোমুখি করে।

এক তাঁতির ছেলে তাঁতি ও তাঁর ‘বাহারি বিজ্ঞাপন’ কথা 

ঢাকাই ও বিলাতি মসলিনের একটা সময়ের ইতিহাসের সাথে আলেকজান্ডার উইলিয়াম নামের একজন তাঁতি কবির নাম যুক্ত আছে। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে এই মসলিন ইতিহাস সম্পর্কিত নাম পরিচিত নয় মোটেও! ইতিহাসের পুরনো পৃষ্ঠা ঘেঁটে এই ক্ষণজন্মা তাঁতির ছেলে তাঁতির গল্প জানব। যে গল্প মোটেও নিস্তরঙ্গ নয়, বরং রুদ্ধশ্বাস এক জীবন কাহিনি।

১৮ শতকের শেষে এবং ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পেসলি এবং এর আশপাশকে অবশ্যই বিশেষ বস্ত্র বয়ন ঐতিহ্যের জন্য মনে রাখতে হয়। স্কটল্যান্ডের বৃহত্তম এই শহরটি কেবল ১৮০০ সালের দিকে বিশাল আকারে উৎপাদিত বস্ত্র বয়ন নকশা তৈরি করতে শুরু করেছিল যা বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে ওঠে, এই কর্মযজ্ঞে এমন একজন মানুষ যুক্ত ছিলেন যিনি সদাশয় তাঁতি হিসেবে তাঁর কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি নিজের কবিতার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন প্রকৃতি ও পক্ষীবিদ হিসেবে আরও বেশি বিখ্যাত হয়েছিলেন। 

আলেকজান্ডার উইলসন ১৭৬৬ সালের ৬ জুলাই স্কটল্যান্ডের পেসলি শহরতলির সিডহিলসে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা এক সময়ের চোরাকারবারি এবং সমৃদ্ধ তাঁতি অ্যালেক্স উইলসন এবং মা মেরি ম্যাকনাব। মাত্র পাঁচ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকারী একজন যুবক কীভাবে কবি, বন্দি তারপর শিল্পী ও পাখি বিশারদ হয়ে উঠলেন তার গল্পটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ। একটি বড়, দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা অত্যন্ত নম্র উইলসনের মা মারা গেলে তার বাবা পুনরায় বিয়ে করেন; এরপর তিনি পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের কাজে লিপ্ত হন। উইলসন কবিতা লিখতে পড়তে পছন্দ করতেন, এবং ভাবতেন কবিতা ও গান রচনা একটি মহৎ কাজ।

ফলস্বরূপ ১৭৭০-এর দশকে তাঁর কবিতা একটি জাতীয় আবেগের সূত্রে অনেক তরুণ স্কটিশ নারী পুরুষকে উদ্দীপিত করে। ১৩ বছর বয়সে তাঁত বয়নে শিক্ষানবিশ থেকে তিনি তাঁতি হিসেবে দশ বছর অতিবাহিত করেছিলেন। তারপর তৎকালীন স্কটল্যান্ডের বস্ত্র উৎপাদক ব্যবসায়ীদেরকে সমালোচনা করে আঞ্চলিক উপভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন, যা তিনি পোয়েমস (১৭৯০)-এ প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতায় কিছু ব্যঙ্গ বিদ্রূপের ফলে আইনি অবদমন, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে নিরুৎসাহিত হয়ে তিনি ১৭৯৪ সালে ২০ বছর বয়সে স্কটল্যান্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় চলে যেতে বাধ্য হন।

তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয় যখন তার মা মারা যান এবং তার বাবা পুনরায় বিয়ে করেন; উইলসনের বয়স তখন দশ। তিনি ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত গো- রাখাল হিসেবে কাজ করেছিলেন, তারপর উইলিয়াম ডানকানের কাছে একজন তাঁতি শিক্ষানবিশ হিসেবে পরের তিন বছর অতিবাহিত করেছিলেন। এর পরে, উইলসন ডানকান এবং অন্যদের সাথে প্রায় এক দশক কাজ করে কাটিয়েছেন, উভয়ই একজন তাঁতি হিসেবে এবং একজন ফেরিওয়ালা হিসেবে স্কটিশ গ্রামাঞ্চলে পায়ে হেঁটেছেন বোনা বস্ত্র পণ্যে ভরা একটি বিশাল গাট্টি কাঁধে পিঠে নিয়ে। 

তখনকার পেসলি তাঁতিরা ছিলেন শিক্ষিত এবং প্রতিবাদী। উইলসনের কবিতায় তখনকার বস্ত্র কলের ভয়ানক কাজের অবস্থা যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি মালিকদের জোরজবরদস্তির কথাও, আর এই সূত্রে তাকে একজন মিল মালিকের সাথে মামলা লড়তে বাধ্য হতে হয়েছে। প্রথম মামলাটি কখনোই এগোয়নি, কিন্তু পরবর্তীকালে একটি প্রতিবাদী কবিতা প্রকাশ করে মিল- মালিক উইলিয়াম শার্পের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। 

উইলসনের স্কটিশ কবিতাগুলো উপভোগ করা কঠিন, যদিও সেগুলো মাঝে মাঝে একজন কাপড় ফেরিওয়ালা হিসেবে তার দুঃসাহসিক ভাবনা ও কাজগুলোর বর্ণনা হিসেবে আকর্ষণীয় হয়।

সমালোচকদের মতে উইলসন ‘তর্কযোগ্যভাবে শিল্প বিপ্লবের প্রথম প্রতিবাদ সাহিত্য’ লিখেছিলেন এবং অবিলম্বে এটির জন্য সমস্যায় পড়েছিলেন। মিলের মালিক উইলিয়াম হেনরি উইলসনকে তার প্যামফলেট কবিতা ‘দ্য হল্যান্ডার’ 

(১৭৯০)-এর জন্য মানহানির মামলা করেছিলেন, যদিও মামলাটি কখনো বিচার করা হয়নি। উইলসন ‘The Shark, or Lang Mills Detected’ (১৭৯২) লেখার পর এতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না, উইলিয়াম শার্পের উপর তাঁর কাব্য আক্রমণ, যেটি মিল মালিককে তাদের কাপড়ের দৈনিক ফলন গণনা করার জন্য ব্যবহৃত পরিমাপ যন্ত্রগুলো পরিবর্তন করে তাঁতিদের প্রতারণা করার জন্য অভিযুক্ত করেছিল।

উইলিয়াম শার্প যিনি ‘দ্য হাঙ্গর’ শিরোনামের ব্যঙ্গাত্মক কবিতার উদ্দেশ্য ছিলেন, তিনি ছিলেন বিশাল সম্পত্তির মালিক এবং অনেক তাঁতির নিয়োগকর্তা হিসেবে স্থানীয়ভাবে যথেষ্ট প্রভাবশালী বিশিষ্ট ব্যক্তি। যদিও কবিতাটি লেখককে মানহানির জন্য দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে অতটা গুরুতর ছিল না, তবুও উইলিয়াম শার্প তার বিরুদ্ধে মামলা করে উইলসনের বিরুদ্ধে রায় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিল, যা উইলসনকে আইনি নির্দয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাতে তাঁর অল্প কিছুদিনের জেল হয়। কবিতাটি প্রকাশ না করার বিনিময়ে শার্পের কাছ থেকে ৫ পাউন্ড চাঁদা দাবি করার একটি অযোগ্য প্রচেষ্টা উইলসনকে পরের কয়েক বছর জেলে এবং বাইরে কাটাতে হয়, যার পরিণতিতে ‘হাঙ্গর’ এবং অন্যান্য আপত্তিকর কবিতাগুলোকে ১৭৯৩ সালে আদালত ভবনে পুড়িয়ে ফেলার মতো জনঅবমাননা করা হয়েছিল।

পরের বছরের মে মাসে, অপমানিত ২৮ বছর বয়সী কবি উইলসন ডানকানের ১৬ বছর বয়সী ছেলের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা করেন। সেই উইলসন পরবর্তীকালে ‘আমেরিকান পক্ষীবিদ্যার জনক’ হিসেবে পরিচিত হন। উইলসন, তাঁতি, কবি এবং আন্দোলনকারী শ্রমিক, একজন কবি, শিল্পী এবং একজন বিজ্ঞানী-অন্য কথায়, একজন নবজাগরণের মানুষ।

উইলসন ও তাঁর সমসাময়িকরা মোটেও অস্বাভাবিক ছিলেন না, প্রকৃতপক্ষে তারা এমন একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন যখন শ্রমজীবী পুরুষেরা স্ব-শিক্ষা এবং আত্ম-প্রকাশের জন্য আগ্রহী ছিল। আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের কারণে আলোকিতকরণ এবং রাজনৈতিক উদ্দীপনা এবং ১৮ শতকের শেষ হওয়ার সাথে সাথে পেসলিতে এমন একটি শক্তিশালী পরিস্থিতি দৃষ্ট ছিল। ১৩ বছর বয়সে, উইলসন জীবিকা নির্বাহের জন্য পশুপালন ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তার অনেক শহরবাসীর মতোই। ১৮১০ সালের মধ্যে পেসলিতে ৭০০০ তাঁতির মধ্যে তিনিও একজন শিক্ষানবিশ তাঁতি হয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষানবিশি তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং বয়নকাজে তার প্রশিক্ষক ছিলেন জন ফিনলেসন। শেখার সময় উইলসন তার কবিতা রচনাও শুরু করেছিলেন। উইলসন তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা কী হতে পারে তা লিখেছিলেন। তার শিক্ষানবিশির শেষে প্রশংসাপত্রে নিম্নলিখিত লাইনগুলো লিখিত হয়েছিল:

Be’t kent to a’ the warld in rhyme,

That wi’ right meikle wark n’ toil,

For three lang years I’ve ser’t my time,

Whiles feasted wi’ the hazel oil.?

একজন বয়ন কারিগর হিসেবে তিনি খুব সুখী ছিলেন না। ১৭৯০ সালে যখন তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে, তখনো তিনি একাধারে কবি ও তাঁত বয়ন কারিগর। পরবর্তী সময় উইলসনের লেখা একটি কবিতা যা স্কটল্যান্ড থেকে তাঁর বিতাড়িত হওয়াকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সেই বয়সে স্বল্প-পরিবর্তনকারী তাঁতিদের সংস্কারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে তাঁকে মিল মালিক কর্তৃক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

Ye weaver blades! 

Ye noble chiels!

Wha fill our land wi’ plenty,

And mak our vera barest fiels

To wave রি’ ilka dainty…

উইলসন তারপর কারখানার মালিক শার্ক/শার্পকে নিন্দা করে লেখেন 

Wha cou’d believe a chiel sae trig

Wad cheat us o’ a bodle?

Or that sae fair a gowden wig

Contained sae black a noddle?

But Shark beneath a sleekest smile

Conceals his fiercest girning;

And, like his neighbours of the Nile,

Devours wi’ little warning

By night or day.

প্রকৃতপক্ষে কবিতাটি শার্পকে ঝুলিয়ে বেত্রাঘাত এবং গুলি করার কল্পনা করেছে:

Kick out the scoun’rel to his shift,

We’ll pay him for his sporting.

উইলসন তাঁর ‘বাহারি বিজ্ঞাপন’ কবিতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমি যখন কাপড় ফেরি করতে বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম, তখন আমাকে প্রায় সবাই, একজন দর্জি, একজন কবি, মহিলা এবং জেলেরা আমাকে বলেছিলেন, যে কোনো বিষয়ে একটি কবিতা তৈরি করতে পারেন। বুদ্ধিমত্তার এই অসাধারণত্ব দেখতে আগ্রহী আমি একজনের কুঁড়েঘর খুঁজে পেলাম।

আমি সাহসের সঙ্গে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলাম কী কিনতে চায়। বলেন, কিছুই না। আপনার কাছে কোনো শক্ত ধূসর সুতা হবে? আমি তাকে বলেছিলাম যে দুঃখিত তা আমার কাছে নেই। কোনো সুচ ও থিম্বল? এই মুহূর্তে আমার কাছে সেসব কিছুই নেই। অতঃপর, তার জিজ্ঞাসা, তোমার কাছে আমার জন্য কিছুই নেই? এমন সব স্মৃতি অভিজ্ঞতার মিশেলে উইলসনের রচনায় মসলিন উপজীব্য হয়ে আছে। 

উইলসন তাঁত কাজে নিয়োজিত থাকাকালে কৌতূহলোদ্দীপক এই প্রচারপত্রের নামকরণ করেছিলেন ‘বাহারি বিজ্ঞাপন’! তিনি সেই বিজ্ঞাপন এমন সব লোকের হাতে দিতে চেয়েছিলেন যারা তাঁর কাজে উৎসাহী হবেন। তিনি তাতে রসিকতার সাথে ফেরিঅলার ঢঙে একটা একটা করে বিচিত্র সব বস্ত্র পণ্যের তালিকা নিষ্পত্তি করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এতে তিনি এমন তথ্যও দিতে চেয়েছেন যে তিনি একজন কবি যে কিনা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উৎসাহ প্রত্যাশা করেন। এই কৌতূহলী কাব্যিক প্রচারপত্রের ৫টি স্তবকে তিনি নারীদের সম্বোধন করে তাঁর বিজ্ঞাপনী বার্তা উত্থাপন করেছেন। চলুন পাঠ করা যাক-

‘সুন্দরী মা বইনেরা, একটু সময় চাই আপনাগো এবেলা,

ততক্ষণ, দেখবেন আর বাছবেন বস্ত্র আছে ম্যালা, 

দারুণ সব মসলিন, করতে পারবেন বাহারি ব্যবহার,

কবি নিয়া আইছে এসব বেচা বিক্রি করবার। 

এখানে আছে মোলায়েম রুমাল, সাদা মসলিন খাসা,

বুটিদার, ডোরাকাটা, মখমল আর চৌখুপি নকশা;

সুদর্শন কামদেবের জন্মদিনে মোহনীয় প্রেমদেবী কয়, 

বিলাতে তৈরি মসলিনে শত নকশার বাহার হয়।

আছে সস্তা থেকে দামি নানা জাতের মসলিন।

মাত্র এক শিলিং দামে কিনবেন এক ডজন,

পরিধানে এ বস্ত্র অপরূপা পোয়াতির দেবী, 

কোজেনস হতে বুড়ো বজ্র দেবী যার যা খুশি।

আছে কোমল চকচকে অসংখ্য মসলিন,

অস্বচ্ছ ফুটি ফুটি নকশা সেলাই করা; 

সীবন- চাকে হাতে তোলা ফুল লতাপাতা কত, 

আছে টুপি, কটি, এপ্রোন আর গাউন যত।

দেখে বেছে পছন্দ কইরা লইলে খুব খুশি হই, 

আসেন ত্বরা কইরা আপনাগো বেবাক বস্ত্র দেখাই;

ফেরিঅলার কিছুই বিকোবে না তা কী করে হয়,

জানি, কবি’র আশা পূরণে আপনারা হইবেন সহায়।” 

কবিতা লেখার দায়ে এতটা অসহিষ্ণুতার উদাহরণ তার আগে ইউরোপিয়ান ইতিহাসে বিরল। উইলসন তৃতীয়বারের মতো ১৭৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন। এর মাস ছয়েক পরে নিজে প্রচারপত্র বিলি করে জানিয়ে দেন যে তিনি নির্দোষ! উইলসন নিজ দেশের রবার্ট বার্নসের ছাঁচে কবি হওয়ার প্রাথমিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে দেশান্তর হয়ে স্কটল্যান্ড থেকে ফিলাডেলফিয়ার কাছে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে উদ্ভিদবিদ উইলিয়াম বার্ট্রাম শিল্প ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রতি তার প্রবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছিলেন। উইলসন ১২০০০ মাইল পায়ে হেঁটে, ঘোড়ার পিঠে, কাঠের নৌকায়, মঞ্চে এবং জাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন, যাত্রা পথ ধরে পর্যবেক্ষকদের একটি যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। তিনি দেশীয় পাখির শত শত বিবরণ লিখেছেন, অনেক নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন এবং তাঁর দেখা প্রতিটি প্রজাতির আচরণ এবং বাস্তুসংস্থানের স্কেচ করেছেন।

পৃথিবীতে আমরা অনেক বড় এবং আরও দুর্দান্ত কবির নাম খুঁজে পাব, তবে তাঁতি-প্রকৃতিবাদী-পক্ষীবিদ-কবি হিসেবে সম্পূর্ণরূপে আলেকজান্ডার উইলসনের পদগুলোকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়, কেননা উইলসন ‘প্রকৃতির কবি’, যাঁর ‘হৃদয়ে পাখিরা বাসা বেঁধে গান গেয়েছে।’

ব্রিটিশ মসলিন সূক্ষ্মতায় সৌকর্যে ঢাকাই মসলিনকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সে নজির প্রত্যক্ষ নয়। হাতের কুশলতায় ঢাকাই মসলিনের সমকক্ষতা অর্জন যে সম্ভব নয়, তা জেনেই ব্রিটিশরা মনোনিবেশ করেছিল যান্ত্রিক উন্নয়নে। বস্ত্র উৎপাদনের প্রতিটি বিষয়ে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে ঢাকাই মসলিন তথা ঢাকাই বস্ত্রের বাজার দখল করার চেষ্টা হয়েছিল তা স্পষ্ট। ১৭৫৭ সালে পলাশীর পতন, বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতা কাঠামোতে দখলদারিত্ব, বাণিজ্য কুক্ষিগত করা আর শিল্প কারখানার দ্রুত যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়ার সুবিধা ব্রিটিশ বস্ত্র পণ্যের একচেটিয়াত্বকে ত্বরান্বিত করেছে।

বস্ত্র উৎপাদনে আধুনিকতা ও যন্ত্রায়নের হুজুগে ১৮০০ শতকের শুরু থেকেই বাংলার সুতা উৎপাদনে (হাতে কাটা) ধস নামে। এ সময় জুড়ে দেখা যাবে বিলাতি সস্তা সুতায় তাঁত বুনছে ঢাকার তাঁতিরা। এ প্রসঙ্গে ১৮৫৩ সালে লর্ড এলফিনস্টোনের ঢাকায় মসলিন উৎপাদন সম্পর্কে প্রশ্ন: ‘এখন এর উৎপাদন বন্ধ মানে কিছুই অবশিষ্ট নেই?’

উত্তর: ‘খুবই সামান্য পরিমাণ এখনো বর্তমান। সূক্ষ্ম মসলিন এখনো কিছু তৈরি হচ্ছে, কিন্তু এই বস্ত্র উৎপাদনে অনেক ঘাপলা আছে। কিন্তু বিলাতে প্রস্তুত বস্ত্র ঢাকার কাপড়ের জায়গা দখল করেছে। তুলার সুতা এখন বিলাত থেকে ঢাকা আসছে, তাঁতিরা সেই সুতা ব্যবহার করছে। কিন্তু কাপড় আগের মতো এত সুখ শক্ত ও কোমল হচ্ছে না, যা আগে স্থানীয় সুতায় হতো।’

প্রশ্নের জবাবে বলা হয়-

উইলসন যখন মসলিন নিয়ে কবিতা লিখছেন তার সমসাময়িক কালে বাংলায় লেখা হচ্ছে ঢাকাই মসলিন বাখান:

‘আর এক নারী বেচে কার্পাসের বাস। 

বেশে দেয় পরিচয় ঢাকায় নিবাস॥ 

বিমল বারির স্রোত নাম আবরোঁয়া। 

পুরাথান বশবিলে সুখে যায় থোয়া॥ 

অনুপম শবনম সূক্ষ্ম অতিশয়। 

নিশীর শিশিরে যাহা দৃশ্য নাহি হয়॥ 

বিবিধ বিচিত্র পুষ্পদাম বিখচিত। 

জামদান কামদান রমণী রচিত॥ 

মজায় বিলীন সেই বুক মজলীন। 

সন্তানক কুসুম স্বরূপ অমলিন॥ 

শাবাশ শাবাশ তোরে ঢাকা জনপদ। 

শিল্প চাতুরীতে তোর অতুল সম্পদ॥ 

পরাভূত সবে বটে কৈল বাষ্পকল। 

কিন্তু জয়ী তব শিল্প-চাতুর্য্য, কৌশল।’

কৈফিয়ত

বছর কয় ধরে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ঢাকাই মসলিন পুনরুজ্জীবন নিয়ে বেশ শোরগোল হচ্ছে! সেসবে নানা ফলাফল ও মসলিন ফিরে আসার নানা ফিরিস্তি আছে! মসলিন স্রেফ গল্পগাথা নয়। মসলিন হাতের মুন্সিয়ানার গাথা বটে! ষোলোআনা না বুঝে, আধখেঁচড়া মসলিন কুশলতার বয়ান দিয়ে, নানা সাফল্য কীর্তির (!) আলাপে সয়লাব করে দেওয়া যায় বটে, কিন্তু ইতিহাসে সেসব সাব্যস্ত করে নেবে ঠিকঠাক। এই ইত্যাকার ভাবনা আলাপজুড়ে ব্রিটিশ মসলিনের বাজার, তাতে যন্ত্র প্রকৌশলের যোগ আর তৎকালীন পুঁজির শাসনে সেই ব্রিটিশ মসলিন পরবর্তীকালে দাবিকৃত তার যন্ত্র কারিগরি উৎকর্ষেও সূক্ষ্ম বস্ত্র সৌকর্যের প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

মোদ্দাকথা, তেমনি আজকের মসলিন পুনরুজ্জীবনের চাতুরীতে আদি ঢাকাই মসলিনের কিছুই অবশিষ্ট থাকবার অবকাশ নেই। সেমি অটো চরকায় কাটা সুতায় পাতলা কাপড় মসলিন হলে অথেন্টিক ব্রিটিশ মসলিন ঢাকাই মসলিনের স্থলাভিষিক্ত হতো বৈকি। ইতিহাস বলে তা হয়নি। কারণ যন্ত্র কারিগরের হাতের বিকল্প নয়, হতে পারে না। ফুটি কার্পাসে হাতের টাকুতে, চরকায় ৫০০-৭০০ কাউন্টের সুতা তৈরি একদা ঢাকাই কারিগরের মুন্সিয়ানা। যে পরম্পরা জ্ঞানের দাপট ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। ফলে এসব খোঁজাখুঁজির নথিপত্রে উচ্চকিত নানা কথা-আলাপ-তথ্য কোনোমতেই ব্রিটিশ মসলিনের জয়গান নয় বরং প্রপঞ্চ! বক্ষ্যমাণ অংশটি ঢাকাই বস্ত্রসংক্রান্ত বিস্তারিত গবেষণা প্রকল্পের টীকাভাষ্য হিসেবে আপাতত গ্রন্থিত থাকল।  

লেখক: চারুশিল্পী, বুনন শিল্প চর্চা ও গবেষক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //