তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ কী?

ছবি: টিআরটি

ছবি: টিআরটি

তুর্কি প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘আসেলসান’ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক ঘোষণায় জানায়, গত এক বছরে কোম্পানির আয় ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.২৩ বিলিয়ন ডলারে। এর মাঝে রফতানি আয় ছিল ৩৩১ মিলিয়ন ডলার। 

প্রতিরক্ষা খাতে তুরস্কের সবচেয়ে বড় এই কোম্পানি গত এক বছরে লাভ করেছে ৬৩০ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি। কোম্পানিটি জানায়, করোনাভাইরাসের মহামারি সত্ত্বেও তারা এই আয় করেছে। বিশ্বের মোট ১২টি দেশে আসেলসানের ব্যবসা রয়েছে। 

কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী হালুক গোরগুন তুর্কি ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ২০১৭ সালে আসেলসানের আয় ছিল ১.৪ বিলিয়ন ডলার। এখন পর্যন্ত ৬০টি দেশে সমরাস্ত্র রফতানি করেছে তারা। আর গত বছরে তারা ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের রফতানি অর্ডার পেয়েছে। 

গোরগুন আরো জানান, তারা কোম্পানিটিকে গবেষণা ও প্রকৌশল কোম্পানি বলে সংজ্ঞায়িত করেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০০ প্রতিরক্ষা কোম্পানির মাঝে থাকা এই কোম্পানিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। মহামারির মাঝেই তারা ১ হাজার ৪৭৯ জনকে নতুন করে রিক্রুট করেছে। তবে ২০২০ সালে আসেলসানের আয় বাড়লেও তুরস্কের পুরো প্রতিরক্ষা শিল্প আয় বাড়াতে পারেনি, যদিও বিগত কয়েক বছরে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প নিয়মিতই আলোচনায় এসেছে। 

‘টারকিশ এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’র হিসাবে, ২০২০ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা রফতানি ছিল ২.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম। ৭৪৮ মিলিয়ন ডলারে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় বাজার।

তুর্কি সরকারি মিডিয়া টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি অভ্যন্তরীণ ও বাইরের হুমকির কারণেই তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসেলসানের পণ্য তালিকার মাঝে রয়েছে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি, রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ইলেকট্রো অপটিক্স, এভিওনিক্স, মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান, স্থল বা সমুদ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ওয়েপন সিস্টেম, বিমান প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম, ইত্যাদি। 

আসেলসান ছাড়াও প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কে আরো বেশকিছু কোম্পানি ভালো করছে। এর মাঝে রয়েছে বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টারকিশ এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা টিএআই কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করা সফটওয়্যার কোম্পানি হাভেলসান, ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি রকেটসান, প্রতিরক্ষা গবেষণা কোম্পানি তুবিতাক, ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার, বিমানের ইঞ্জিন তৈরির কোম্পানি তুসাস ইঞ্জিন ইন্ডাস্ট্রিজ বা টিইআই, আর্মার্ড ভেহিকল তৈরি করা প্রতিষ্ঠান এফএনএসএস, অতোকার ও বিএমসি, যুদ্ধজাহাজ নির্মাতা টারকিশ অ্যাসোসিয়েটেড ইন্টারন্যাশনাল শিপইয়ার্ডস, এসটিএম, রাডার নির্মাতা আয়েসাস, মেতেকসান ইত্যাদি। 

তুরস্কের সামরিক শিল্প গত ১০ বছরে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে তুরস্ক তার অস্ত্র রফতানি ২৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। গত পাঁচ বছরের মাঝে তুরস্ক ড্রোন বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, আর্মার্ড ভেহিকল, আর্টিলারি ও যুদ্ধজাহাজ রফতানি করেছে। এর মাঝে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার ও আজারবাইজান ছিল বড় ক্রেতা। তুরস্কের সরবরাহ করা ড্রোন নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধে আজারবাইজানের জয় পেতে ব্যাপক সহায়তা করেছে। লিবিয়ার ত্রিপোলির জিএনএ সরকারও সেখানকার গৃহযুদ্ধে তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে ফেলে। এই সফলতাগুলো ইউক্রেনকে অনুপ্রাণিত করেছে তুর্কি ড্রোন কিনতে ও যৌথভাবে তৈরিতে। 

এছাড়া আঞ্চলিকভাবে তুরস্কের সামরিক অভিযানগুলোও দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেছে। সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালনার সময় সীমান্তে ‘হিসার-এ’ স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘হিসার-ও’ মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে তুরস্ক। এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে ডেভেলপ করেছে আসেলসান ও রকেটসান। 

প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ডিফেন্স নিউজকে তুর্কি কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সম্পর্কোন্নয়নের কারণে তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় বাজার দেখতে পাচ্ছেন। ২০২০ সালে আমিরাতে রফতানি ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করা একজন কর্মকর্তা বলেন, আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন হলে সেখানে এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রফতানি খুব কঠিন ব্যাপার নয়। ফেব্রুয়ারি মাসে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ‘আইডিইএক্স-২১’ প্রতিরক্ষা মেলায় ১১টি তুর্কি কোম্পানি অংশ নেয়; যদিও বড় সরকারি কোম্পানিগুলো অংশ নিতে যায়নি। 

তবে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এখনো সমস্যাসংকুল। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তুরস্কের নির্ভরশীলতা দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রধান দুর্বলতা। রাশিয়া থেকে ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা কেনায় যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘এফ-৩৫’ স্টিলথ বিমান প্রকল্প থেকে বের করে দেয়। রয়টার্স জানায়, তুরস্ক ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে ‘এফ-৩৫’ প্রকল্পে পুনরায় ঢোকার জন্য। পাকিস্তানের কাছে ‘টি ১২৯ আতাক’ হেলিকপ্টার রফতানিও থেমে রয়েছে ওয়াশিংটনের বাধার কারণে। হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনারশিপ রয়েছে। তুরস্ক তাই চেষ্টা করছে নিজস্ব হেলিকপ্টার ইঞ্জিন তৈরি করতে। ট্যাঙ্ক তৈরিও আটকে রয়েছে নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরি করতে না পারার কারণে। ২০১৮ সালে সিরিয়ার যুদ্ধে যোগ দেয়ার কারণে জার্মানি তুরস্কের কাছে ইঞ্জিন বিক্রি আটকে দিলে তুরস্ক নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরিতে মনোযোগী হয়। নিজস্ব ফাইটার বিমান ‘টিএফএক্স’এর ডেভেলপমেন্ট নিয়েও বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তুরস্ককে। 

বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ জানায়, তুরস্ক তার প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো থেকে বের হতে পাকিস্তানকে পাশে পেতে চাইছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে তুরস্ক হয়তো চীনা প্রযুক্তির সহায়তা পেতে পারে; বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ফাইটার বিমানের ক্ষেত্রে। 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের এক লেখায় সাংবাদিক ফেরহাত গুরিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিষয় ছাড়াও বড় সমস্যা হলো তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল ক্রেতা এখনো তুর্কি সরকার। নিজস্ব চাহিদা সমস্যায় পতিত হলে পুরো শিল্পই সমস্যায় পড়বে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো দিক হলো– এই শিল্পের পিছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হলেও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা শিল্প থাকবে অগ্রাধিকার। কারণ, এই প্রতিরক্ষা শিল্পের মাঝেই তুর্কিরা উসমানি খিলাফতের ছায়া দেখতে পায়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //